25-06-2026, 06:41 PM
একাদশ অধ্যায়: কুয়াশার স্মৃতি (এস্তারের পাহাড়ি শৈশব)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সবুজ চত্বরটায় তখন বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে। গাছেদের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা রোদটুকু কেমন যেন ক্লান্ত, ঠিক যেন একটা দীর্ঘশ্বাস। চারপাশের আড্ডার শোরগোল, হকারদের ডাক, গিটারের তারে তরুণদের টুংটাং সুর আর দূরবর্তী রাজপথের ট্রাফিকের আওয়াজ মিলেমিশে এক অদ্ভুত একঘেয়েমি তৈরি করছিল। ধুলো ওড়ানো বাতাসে চত্বরের এক কোণায় জরাজীর্ণ একটা কাঠের বেঞ্চে মুখোমুখি বসে ছিল এস্থার আর নিলয়।
তাদের মাঝখানে রাখা কাঠের টেবিলটার ওপর দুটো মাটির ভাঁড়। ভাঁড় থেকে আদা আর লেবু চায়ের কড়া সুগন্ধি ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। এস্তারের পরনে একটা সাধারণ সুতির কামিজ, কাঁধ পর্যন্ত ছাঁটা ছোট চুলগুলো বাতাসে উথাল-পাথাল হচ্ছিল। তার চোখে তখনো এক অলঙ্ঘ্য দূরত্বের চশমা। সে ক্যাম্পাসের চেনা কোলাহলের দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার দৃষ্টির গভীরে ছিল এক আদিম নিস্পৃহতা। সে সেখানে থেকেও যেন সেখানে ছিল না।
নিলয় বেশ কিছুক্ষণ ধরে এস্তারের এই গুমোট নীরবতা লক্ষ্য করছিল। সে নিজের চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে আলতো করে এস্তারের মুখের দিকে তাকাল। নিলয়ের চোখ দুটোতে কোনো সামাজিক চাতুরী ছিল না, ছিল এক শান্ত, গভীর ও পরম সহমর্মী কৌতূহল। নিলয় চায়ের ভাঁড়ে একটা ছোট চুমুক দিয়ে একটু ইতস্তত করে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা এস্থার, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? কিছু মনে করবে না তো?"
এস্থার চোখ না ফিরিয়েই শান্ত গলায় বলল, "বলো, শুনছি।"
-"আমি দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করছি, তুমি সবসময় ছেলেদের বড্ড বেশি এড়িয়ে চলো। শুধু এড়িয়ে চলাই নয়, তোমার চাউনিতে এক ধরনের তীব্র অবিশ্বাস কাজ করে। যেন যে কেউ তোমার সামনে এলেই তুমি একটা অদৃশ্য লোহার দেওয়াল তুলে দাও চারপাশে।" নিলয় একটু থেমে এস্তারের একটা হাত ছোঁয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু এস্থার আলতো করে হাতটা সরিয়ে নিল। নিলয় মৃদু হেসে আবার বলল, "সবাই তো এক নয় এস্থার। তুমি সবসময় ছেলেদের এত সন্দেহ করো কেন? সবাই তো আর শিকারী নয়।"
নিলয়ের এই সরাসরি কিন্তু সংবেদনশীল প্রশ্নটার উত্তরে এস্থার ঝট করে তার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে ম্লান, কুৎসিত হাসি। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক বুকচেরা তীব্র কষ্ট আর আজন্মের এক জমাট বাঁধা অবিশ্বাস।
-"সবাই এক নয়—এই থিওরিটা শুনতে বড্ড ভালো লাগে নিলয়," এস্থার চায়ের ভাঁড়টা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে নিজের অবাধ্য চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিল। "তোমাদের মতো শহরের সুশীল ছেলেদের মুখে এই উদারতার বুলি মানায়। কিন্তু আমার জীবনের রূঢ় বাস্তবতা, আমার বেড়ে ওঠার ইতিহাস আমাকে অন্য একটা নিষ্ঠুর সত্য শিখিয়েছে।"
নিলয় সোজা হয়ে বসল। সে বুঝতে পারল, এস্তারের এই কঠিন খোলসের নিচে একটা বিশাল ক্ষতবিক্ষত আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে আছে। সে শান্ত গলায় বলল, "আমাকে বলবে সেই সত্যের কথা? আমি শুনতে চাই।"
এস্থার টিএসসির ছাদটার ওপারে থাকা শহরের ধোঁয়াটে আকাশটার দিকে তাকিয়ে স্মৃতির অবিনশ্বর কুয়াশার ভেতর ডুব দিল। তার গলার স্বর গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল, যেন সে বর্তমানের ঢাকা শহর থেকে হাজার মাইল দূরে এক পাহাড়ি অরণ্যে চলে গেছে।
-"তোমরা যারা শহর থেকে কয়েকদিনের জন্য সিলেটে, শ্রীমঙ্গলে বা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি বেড়াতে যাও, তারা পাহাড়ের সবুজ সৌন্দর্য, লেকের নীল জল আর কুয়াশার চাদর দেখে মুগ্ধ হও," এস্থার বলতে লাগল, তার চোখে তখন এক দূরবর্তী পাহাড়ি চা বাগানের প্রতিচ্ছবি।
-"কিন্তু ওই পাহাড়ের ভেতরের কান্নাটা, ওই সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদিম অন্ধকারটা তোমরা কোনোদিন দেখতে পাও না। আমার শৈশব, আমার কৈশোর কেটেছে ওই প্রত্যন্ত পাহাড়ি বাগানের লাইনে।"
নিলয় নিঃশব্দে শুনছিল। এস্থার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ছোটবেলা থেকেই আমি দেখে এসেছি, কুয়াশায় ঘেরা সেই চা বাগানের লাইনের পর লাইন সরল, খাসিয়া বা সাঁওতাল আদিবাসী মেয়েগুলোকে কীভাবে শহরের বাবুরা নিজেদের লালসার বস্তু বানাত। সেই সব স্যুট-বুট পরা, দামি গাড়ি চড়া শহরের সুশীল বাবুরা ক্ষমতার জোরে কিংবা সস্তা টাকার লোভে ওই নিরীহ, অভুক্ত মেয়েগুলোকে বাগানের নির্জন বাংলোয় ডেকে নিত। তারপর কিছুদিন তাদের শরীরটাকে ইচ্ছেমতো নিংড়ে ব্যবহার করত, ঠিক একটা সস্তা চুইংগামের মতো চিবিয়ে স্বাদ ফুরিয়ে গেলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আবার শহরের পাকা দালানে ফিরে যেত।"
এস্তারের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, তার চোখে এক আদিম হিংসা খেলে গেল। "জানো নিলয়, ওই মেয়েগুলোর পেটে যখন বাবুদের পাপের সন্তান আসত, তখন সমাজ কোনোদিন ওই নামী বাবুদের বিচার করতে যায়নি। বরং ওই জংলি মেয়েগুলোকেই ‘নষ্ট’, ‘নটী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হতো। আমি চোখের সামনে আমার অতি চেনা দিদিদের, আমার শৈশবের বান্ধবীদের এভাবে কুঁড়ি থেকে ফুল হওয়ার আগেই ঝরে যেতে দেখেছি। ক্ষমতার এই নোংরা, পাশবিক খেলা দেখতে দেখতেই পুরুষ জাতটার প্রতি আমার মনে এক তীব্র ঘৃণা আর অভেদ্য দেওয়াল তৈরি হয়ে গেছে। আমার মনে হয়, প্রতিটা সভ্য পোশাকের আড়ালে একটা ক্ষুধার্ত নেকড়ে ওৎ পেতে বসে আছে।"
এস্থার বলতে বলতে একটু থামল। বিকেলের বাতাসটা যেন আরও কিছুটা ঠান্ডা হয়ে এলো। সে চায়ের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ভাঁড়টা হাতে নিয়ে আবার বলতে শুরু করল, "আমার স্পষ্ট মনে আছে নিলয়, তখন আমার বয়স বড়জোর তেরো বা চৌদ্দ। প্রকৃতির নিয়মে সেদিন আমি প্রথম বালিকা থেকে তরুণীতে রূপ নিচ্ছিলাম। আমার শরীরে প্রথম নারীত্বের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছিল। আমি বড্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম নিজের শরীরের এই আচমকা পরিবর্তন দেখে।"
নিলয় এস্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এস্তারের চোখের কোণটা সামান্য ভিজে উঠেছে। এস্থার ফিসফিস করে বলতে লাগল, "সেদিন বিকেলে আমার মা আমার হাত ধরে পাহাড়ের আরও গভীরে, যেখানে লোকচক্ষুর আড়ালে একটা নির্জন ঝর্ণা কলকল শব্দে বয়ে যেত, সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। ঝর্ণার জল তখন পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ছে, আর চারপাশে বুনো লতাপাতা আর ভেজা মাটির একটা কড়া গন্ধ। মা আমাকে ঝর্ণার জলে স্নান করিয়ে দিলেন। তারপর আমার ভেজা কাঁধে তার সেই শক্ত, খসখসে হাত দুটো রেখে বড্ড গম্ভীর আর এক অদ্ভুত ভয়ার্ত গলায় বলেছিলেন—‘এস্থার, আজ থেকে তুই বড় হয়েছিস। তোর শরীরে আজ থেকে এক নতুন সুবাস তৈরি হয়েছে। মনে রাখিস মা, আজ থেকে তুই আর এই পাহাড়ে, এই বনে একা একা কোথাও যাবি না।’"
এস্থার একটা ঢোক গিলল। "আমি মাকে অবুঝের মতো জিজ্ঞেস করেছিলাম—কেন মা? বনে কি চিতাবাঘ আসবে? মা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে এক কুৎসিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন—‘না রে এস্থার। এই গভীর অরণ্যের বুনো জানোয়ারদের চেয়েও শহরের ওই শিকারী পুরুষরা হাজার গুণ বেশি বিপজ্জনক। জানোয়ারেরা শুধু পেটের ক্ষুধার জন্য শিকার করে, আর ওই সভ্য পুরুষরা শিকার করে নিজেদের অহংকার, ক্ষমতা আর লালসা মেটাতে। ওরা তোর এই সুন্দর শরীরটাকে ছিঁড়ে খাবে, তারপর তোকে জ্যান্ত লাশ বানিয়ে রেখে চলে যাবে। ওদের থেকে সবসময় চার হাত দূরে থাকবি।’"
এস্থার নিলয়ের দিকে তাকাল, তার চোখ দুটো তখন কুয়াশার মতোই ঝাপসা। "মায়ের সেই বুনো ভয় আর নিষেধাজ্ঞা আমার মনের অবচেতনে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এত বড় ক্যাম্পাসে এসেও আমি কোনো পুরুষকে সহজভাবে নিতে পারি না। প্রতিটা বন্ধুত্বের প্রস্তাব, প্রতিটা প্রশংসার পেছনে আমি কেবল ওই শিকারী নেকড়েদের চক্রান্ত দেখতে পাই।"
এস্তারের কথাগুলো শেষ হওয়ার পর তাদের মাঝখানের টেবিলে এক দীর্ঘ, ভারী নীরবতা নেমে এলো। টিএসসির চারপাশের কোলাহল যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। নিলয় এক দৃষ্টিতে এস্তারের দিকে তাকিয়ে রইল। সে কোনো সস্তা সান্ত্বনা দেওয়ার সস্তা চেষ্টা করল না, কিংবা ‘আমি অন্য সবার মতো নই, আমাকে বিশ্বাস করো’—এমন কোনো পুরুষালি বাহাদুরি বা নাটকীয় সংলাপও ছুঁড়ে দিল না। সে এস্তারের ভেতরের এই দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষত, তার মায়ের দেওয়া সেই পাহাড়ি শিক্ষা আর অবদমিত ট্রমাকে সম্পূর্ণ মন থেকে শ্রদ্ধা করল।
নিলয় অত্যন্ত ধীর গতিতে, পরম যত্নে টেবিলের ওপর রাখা এস্তারের সেই শক্ত হয়ে থাকা হাতটার ওপর নিজের হাতটা রাখল। এবার এস্থার হাতটা সরিয়ে নিল না। নিলয়ের হাতের ছোঁয়ায় কোনো চটচটে লালসার উত্তাপ ছিল না, ছিল এক নিটোল সুরক্ষার ওম।
নিলয় এস্তারের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মায়াবী গলায় বলল, "আমি জানি এস্থার, তোমার এই দীর্ঘদিনের ভাঙা বিশ্বাসকে রাতারাতি ফিরিয়ে আনা কোনো জাদু নয়। আমি কোনো তাড়াহুড়ো করব না। আমি তোমাকে কোনোদিন জোর করব না যে তুমি আজই বা কালই আমাকে বিশ্বাস করো। তুমি যতটা সময় চাও, নাও। আমি শুধু তোমার এই দীর্ঘ লড়াইয়ের রাজপথে পাশে একটা নিরাপদ ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে চাই। যদি কোনোদিন তোমার মনে হয় যে লোহার দেওয়ালটা একটু ভাঙা দরকার, সেদিন দেখবে আমি ঠিক এইভাবেই হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি।"
নিলয়ের এই পরিস্থিতি-সচেতন, ধৈর্যশীল এবং প্রগাঢ় সংবেদনশীল আচরণ এস্তারের মনের সেই বহু বছরের পুরোনো, শক্ত বরফের মতো জমে থাকা আদিম ভয়টাকে আস্তে আস্তে গলিয়ে দিতে শুরু করল। এস্থার প্রথমবার টের পেল, নিলয়ের হাতের এই উষ্ণতা তাকে কোনো বিপদের সংকেত দিচ্ছে না, বরং এক পরম নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে।
সে চায়ের শেষ চুমুকটা দিতে দিতে মনে মনে ভাবল—হয়তো এই দীর্ঘ লড়াইয়ের রাজপথে সব পুরুষই শিকারী নয়। কেউ কেউ হয়তো ঝড়ের রাতে এক নিঃস্পাপ, নিরাপদ আশ্রয়ও হতে পারে। নিলয়ের এই নীরব সহমর্মিতা এস্তারের ভেতরের অবাধ্য বাঘিনীকে শান্ত করল না ঠিকই, কিন্তু তাকে এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক শক্তি দিল যে—এই বিশাল, নোংরা পৃথিবীতে লড়াইয়ের ময়দানে সে অন্তত সম্পূর্ণ একা নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সবুজ চত্বরটায় তখন বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে। গাছেদের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা রোদটুকু কেমন যেন ক্লান্ত, ঠিক যেন একটা দীর্ঘশ্বাস। চারপাশের আড্ডার শোরগোল, হকারদের ডাক, গিটারের তারে তরুণদের টুংটাং সুর আর দূরবর্তী রাজপথের ট্রাফিকের আওয়াজ মিলেমিশে এক অদ্ভুত একঘেয়েমি তৈরি করছিল। ধুলো ওড়ানো বাতাসে চত্বরের এক কোণায় জরাজীর্ণ একটা কাঠের বেঞ্চে মুখোমুখি বসে ছিল এস্থার আর নিলয়।
তাদের মাঝখানে রাখা কাঠের টেবিলটার ওপর দুটো মাটির ভাঁড়। ভাঁড় থেকে আদা আর লেবু চায়ের কড়া সুগন্ধি ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। এস্তারের পরনে একটা সাধারণ সুতির কামিজ, কাঁধ পর্যন্ত ছাঁটা ছোট চুলগুলো বাতাসে উথাল-পাথাল হচ্ছিল। তার চোখে তখনো এক অলঙ্ঘ্য দূরত্বের চশমা। সে ক্যাম্পাসের চেনা কোলাহলের দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার দৃষ্টির গভীরে ছিল এক আদিম নিস্পৃহতা। সে সেখানে থেকেও যেন সেখানে ছিল না।
নিলয় বেশ কিছুক্ষণ ধরে এস্তারের এই গুমোট নীরবতা লক্ষ্য করছিল। সে নিজের চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে আলতো করে এস্তারের মুখের দিকে তাকাল। নিলয়ের চোখ দুটোতে কোনো সামাজিক চাতুরী ছিল না, ছিল এক শান্ত, গভীর ও পরম সহমর্মী কৌতূহল। নিলয় চায়ের ভাঁড়ে একটা ছোট চুমুক দিয়ে একটু ইতস্তত করে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা এস্থার, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? কিছু মনে করবে না তো?"
এস্থার চোখ না ফিরিয়েই শান্ত গলায় বলল, "বলো, শুনছি।"
-"আমি দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করছি, তুমি সবসময় ছেলেদের বড্ড বেশি এড়িয়ে চলো। শুধু এড়িয়ে চলাই নয়, তোমার চাউনিতে এক ধরনের তীব্র অবিশ্বাস কাজ করে। যেন যে কেউ তোমার সামনে এলেই তুমি একটা অদৃশ্য লোহার দেওয়াল তুলে দাও চারপাশে।" নিলয় একটু থেমে এস্তারের একটা হাত ছোঁয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু এস্থার আলতো করে হাতটা সরিয়ে নিল। নিলয় মৃদু হেসে আবার বলল, "সবাই তো এক নয় এস্থার। তুমি সবসময় ছেলেদের এত সন্দেহ করো কেন? সবাই তো আর শিকারী নয়।"
নিলয়ের এই সরাসরি কিন্তু সংবেদনশীল প্রশ্নটার উত্তরে এস্থার ঝট করে তার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে ম্লান, কুৎসিত হাসি। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক বুকচেরা তীব্র কষ্ট আর আজন্মের এক জমাট বাঁধা অবিশ্বাস।
-"সবাই এক নয়—এই থিওরিটা শুনতে বড্ড ভালো লাগে নিলয়," এস্থার চায়ের ভাঁড়টা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে নিজের অবাধ্য চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিল। "তোমাদের মতো শহরের সুশীল ছেলেদের মুখে এই উদারতার বুলি মানায়। কিন্তু আমার জীবনের রূঢ় বাস্তবতা, আমার বেড়ে ওঠার ইতিহাস আমাকে অন্য একটা নিষ্ঠুর সত্য শিখিয়েছে।"
নিলয় সোজা হয়ে বসল। সে বুঝতে পারল, এস্তারের এই কঠিন খোলসের নিচে একটা বিশাল ক্ষতবিক্ষত আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে আছে। সে শান্ত গলায় বলল, "আমাকে বলবে সেই সত্যের কথা? আমি শুনতে চাই।"
এস্থার টিএসসির ছাদটার ওপারে থাকা শহরের ধোঁয়াটে আকাশটার দিকে তাকিয়ে স্মৃতির অবিনশ্বর কুয়াশার ভেতর ডুব দিল। তার গলার স্বর গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল, যেন সে বর্তমানের ঢাকা শহর থেকে হাজার মাইল দূরে এক পাহাড়ি অরণ্যে চলে গেছে।
-"তোমরা যারা শহর থেকে কয়েকদিনের জন্য সিলেটে, শ্রীমঙ্গলে বা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি বেড়াতে যাও, তারা পাহাড়ের সবুজ সৌন্দর্য, লেকের নীল জল আর কুয়াশার চাদর দেখে মুগ্ধ হও," এস্থার বলতে লাগল, তার চোখে তখন এক দূরবর্তী পাহাড়ি চা বাগানের প্রতিচ্ছবি।
-"কিন্তু ওই পাহাড়ের ভেতরের কান্নাটা, ওই সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদিম অন্ধকারটা তোমরা কোনোদিন দেখতে পাও না। আমার শৈশব, আমার কৈশোর কেটেছে ওই প্রত্যন্ত পাহাড়ি বাগানের লাইনে।"
নিলয় নিঃশব্দে শুনছিল। এস্থার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ছোটবেলা থেকেই আমি দেখে এসেছি, কুয়াশায় ঘেরা সেই চা বাগানের লাইনের পর লাইন সরল, খাসিয়া বা সাঁওতাল আদিবাসী মেয়েগুলোকে কীভাবে শহরের বাবুরা নিজেদের লালসার বস্তু বানাত। সেই সব স্যুট-বুট পরা, দামি গাড়ি চড়া শহরের সুশীল বাবুরা ক্ষমতার জোরে কিংবা সস্তা টাকার লোভে ওই নিরীহ, অভুক্ত মেয়েগুলোকে বাগানের নির্জন বাংলোয় ডেকে নিত। তারপর কিছুদিন তাদের শরীরটাকে ইচ্ছেমতো নিংড়ে ব্যবহার করত, ঠিক একটা সস্তা চুইংগামের মতো চিবিয়ে স্বাদ ফুরিয়ে গেলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আবার শহরের পাকা দালানে ফিরে যেত।"
এস্তারের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, তার চোখে এক আদিম হিংসা খেলে গেল। "জানো নিলয়, ওই মেয়েগুলোর পেটে যখন বাবুদের পাপের সন্তান আসত, তখন সমাজ কোনোদিন ওই নামী বাবুদের বিচার করতে যায়নি। বরং ওই জংলি মেয়েগুলোকেই ‘নষ্ট’, ‘নটী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হতো। আমি চোখের সামনে আমার অতি চেনা দিদিদের, আমার শৈশবের বান্ধবীদের এভাবে কুঁড়ি থেকে ফুল হওয়ার আগেই ঝরে যেতে দেখেছি। ক্ষমতার এই নোংরা, পাশবিক খেলা দেখতে দেখতেই পুরুষ জাতটার প্রতি আমার মনে এক তীব্র ঘৃণা আর অভেদ্য দেওয়াল তৈরি হয়ে গেছে। আমার মনে হয়, প্রতিটা সভ্য পোশাকের আড়ালে একটা ক্ষুধার্ত নেকড়ে ওৎ পেতে বসে আছে।"
এস্থার বলতে বলতে একটু থামল। বিকেলের বাতাসটা যেন আরও কিছুটা ঠান্ডা হয়ে এলো। সে চায়ের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ভাঁড়টা হাতে নিয়ে আবার বলতে শুরু করল, "আমার স্পষ্ট মনে আছে নিলয়, তখন আমার বয়স বড়জোর তেরো বা চৌদ্দ। প্রকৃতির নিয়মে সেদিন আমি প্রথম বালিকা থেকে তরুণীতে রূপ নিচ্ছিলাম। আমার শরীরে প্রথম নারীত্বের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছিল। আমি বড্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম নিজের শরীরের এই আচমকা পরিবর্তন দেখে।"
নিলয় এস্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এস্তারের চোখের কোণটা সামান্য ভিজে উঠেছে। এস্থার ফিসফিস করে বলতে লাগল, "সেদিন বিকেলে আমার মা আমার হাত ধরে পাহাড়ের আরও গভীরে, যেখানে লোকচক্ষুর আড়ালে একটা নির্জন ঝর্ণা কলকল শব্দে বয়ে যেত, সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। ঝর্ণার জল তখন পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ছে, আর চারপাশে বুনো লতাপাতা আর ভেজা মাটির একটা কড়া গন্ধ। মা আমাকে ঝর্ণার জলে স্নান করিয়ে দিলেন। তারপর আমার ভেজা কাঁধে তার সেই শক্ত, খসখসে হাত দুটো রেখে বড্ড গম্ভীর আর এক অদ্ভুত ভয়ার্ত গলায় বলেছিলেন—‘এস্থার, আজ থেকে তুই বড় হয়েছিস। তোর শরীরে আজ থেকে এক নতুন সুবাস তৈরি হয়েছে। মনে রাখিস মা, আজ থেকে তুই আর এই পাহাড়ে, এই বনে একা একা কোথাও যাবি না।’"
এস্থার একটা ঢোক গিলল। "আমি মাকে অবুঝের মতো জিজ্ঞেস করেছিলাম—কেন মা? বনে কি চিতাবাঘ আসবে? মা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে এক কুৎসিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন—‘না রে এস্থার। এই গভীর অরণ্যের বুনো জানোয়ারদের চেয়েও শহরের ওই শিকারী পুরুষরা হাজার গুণ বেশি বিপজ্জনক। জানোয়ারেরা শুধু পেটের ক্ষুধার জন্য শিকার করে, আর ওই সভ্য পুরুষরা শিকার করে নিজেদের অহংকার, ক্ষমতা আর লালসা মেটাতে। ওরা তোর এই সুন্দর শরীরটাকে ছিঁড়ে খাবে, তারপর তোকে জ্যান্ত লাশ বানিয়ে রেখে চলে যাবে। ওদের থেকে সবসময় চার হাত দূরে থাকবি।’"
এস্থার নিলয়ের দিকে তাকাল, তার চোখ দুটো তখন কুয়াশার মতোই ঝাপসা। "মায়ের সেই বুনো ভয় আর নিষেধাজ্ঞা আমার মনের অবচেতনে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এত বড় ক্যাম্পাসে এসেও আমি কোনো পুরুষকে সহজভাবে নিতে পারি না। প্রতিটা বন্ধুত্বের প্রস্তাব, প্রতিটা প্রশংসার পেছনে আমি কেবল ওই শিকারী নেকড়েদের চক্রান্ত দেখতে পাই।"
এস্তারের কথাগুলো শেষ হওয়ার পর তাদের মাঝখানের টেবিলে এক দীর্ঘ, ভারী নীরবতা নেমে এলো। টিএসসির চারপাশের কোলাহল যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। নিলয় এক দৃষ্টিতে এস্তারের দিকে তাকিয়ে রইল। সে কোনো সস্তা সান্ত্বনা দেওয়ার সস্তা চেষ্টা করল না, কিংবা ‘আমি অন্য সবার মতো নই, আমাকে বিশ্বাস করো’—এমন কোনো পুরুষালি বাহাদুরি বা নাটকীয় সংলাপও ছুঁড়ে দিল না। সে এস্তারের ভেতরের এই দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষত, তার মায়ের দেওয়া সেই পাহাড়ি শিক্ষা আর অবদমিত ট্রমাকে সম্পূর্ণ মন থেকে শ্রদ্ধা করল।
নিলয় অত্যন্ত ধীর গতিতে, পরম যত্নে টেবিলের ওপর রাখা এস্তারের সেই শক্ত হয়ে থাকা হাতটার ওপর নিজের হাতটা রাখল। এবার এস্থার হাতটা সরিয়ে নিল না। নিলয়ের হাতের ছোঁয়ায় কোনো চটচটে লালসার উত্তাপ ছিল না, ছিল এক নিটোল সুরক্ষার ওম।
নিলয় এস্তারের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মায়াবী গলায় বলল, "আমি জানি এস্থার, তোমার এই দীর্ঘদিনের ভাঙা বিশ্বাসকে রাতারাতি ফিরিয়ে আনা কোনো জাদু নয়। আমি কোনো তাড়াহুড়ো করব না। আমি তোমাকে কোনোদিন জোর করব না যে তুমি আজই বা কালই আমাকে বিশ্বাস করো। তুমি যতটা সময় চাও, নাও। আমি শুধু তোমার এই দীর্ঘ লড়াইয়ের রাজপথে পাশে একটা নিরাপদ ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে চাই। যদি কোনোদিন তোমার মনে হয় যে লোহার দেওয়ালটা একটু ভাঙা দরকার, সেদিন দেখবে আমি ঠিক এইভাবেই হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি।"
নিলয়ের এই পরিস্থিতি-সচেতন, ধৈর্যশীল এবং প্রগাঢ় সংবেদনশীল আচরণ এস্তারের মনের সেই বহু বছরের পুরোনো, শক্ত বরফের মতো জমে থাকা আদিম ভয়টাকে আস্তে আস্তে গলিয়ে দিতে শুরু করল। এস্থার প্রথমবার টের পেল, নিলয়ের হাতের এই উষ্ণতা তাকে কোনো বিপদের সংকেত দিচ্ছে না, বরং এক পরম নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে।
সে চায়ের শেষ চুমুকটা দিতে দিতে মনে মনে ভাবল—হয়তো এই দীর্ঘ লড়াইয়ের রাজপথে সব পুরুষই শিকারী নয়। কেউ কেউ হয়তো ঝড়ের রাতে এক নিঃস্পাপ, নিরাপদ আশ্রয়ও হতে পারে। নিলয়ের এই নীরব সহমর্মিতা এস্তারের ভেতরের অবাধ্য বাঘিনীকে শান্ত করল না ঠিকই, কিন্তু তাকে এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক শক্তি দিল যে—এই বিশাল, নোংরা পৃথিবীতে লড়াইয়ের ময়দানে সে অন্তত সম্পূর্ণ একা নয়।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)