Thread Rating:
  • 7 Vote(s) - 3.86 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
#58
১১।
প্রশ্নটা করেই আমি বুঝলাম, কাজটা ঠিক হলো না। একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ড্রয়িংরুমে বসে, তার দামি সোফায় হেলান দিয়ে, তার বৈবাহিক জীবনের সবচেয়ে সেনসিটিভ একটা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করাটা স্রেফ অভদ্রতা নয়, রীতিমতো গণ্ডমূর্খের কাজ। আমি একজন অনুবাদক হতে পারি, কিন্তু তাই বলে অন্যের জীবনের এমন একটা প্রাইভেট চ্যাপ্টার নিজের ভাষায় অনুবাদ করার অধিকার আমার নেই। আনিকার মুখের ওপর নেমে আসা সেই বিব্রতকর ছায়াটা দেখে আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। আমি যে খুব সুকৌশলে উনার মনে আমার সম্পর্কে একটা ‘ম্যাচিউর’ আর ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ ইমেজ দাঁড় করিয়েছিলাম, একটা মাত্র বোকা প্রশ্নে সেটা এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম।
আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললাম, "আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি আনিকা। আমার আসলে এই প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি। প্লিজ, ইগনোর দা কোয়েশ্চেন।" আনিকা উনার চায়ের খালি মগটা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আবার আমার চোখের দিকে তাকালেন। উনার মুখের পেশিগুলো একটু রিল্যাক্সড হলো। উনি একটা হালকা, ক্যাজুয়াল হাসি দিয়ে বললেন, "আরে না না, ইটস ওকে রাশেদ। এত অ্যাপোলজাইটিক হওয়ার কিছু নেই। জানতে চাইতেই পারেন। এটা তো আর কোনো স্টেট সিক্রেট না।"

উনি সোফায় নিজের বসার ভঙ্গিটা একটু পরিবর্তন করলেন। পা মুড়ে বসার কারণে উনার ঢিলেঢালা প্লাজোটা হাঁটুর ওপর থেকে আরেকটু সরে গেল। ফর্সা
, মোলায়েম ঊরুর একটা সামান্য অংশ আলোয় আমার চোখের সামনে উঁকি দিল। আমি অনেক কষ্টে দৃষ্টিটা ওখান থেকে সরিয়ে উনার মুখের ওপর স্থির রাখলাম। "আসলে কী জানেন," আনিকা খুব শান্ত গলায় বলতে শুরু করলেন, "আমাদের সমাজের একটা কমন পারসেপশন হলো, বিয়ে হলেই বছর দুয়েকের মধ্যে একটা বাচ্চা নিতে হবে। কিন্তু লন্ডন বা ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিগুলোর রিয়েলিটি একটু ভিন্ন। আমি আর বেলাল— আমরা দুজনেই আমাদের ক্যারিয়ার নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত। বেলাল ওর ইউনিভার্সিটির টেনিউর ট্র্যাক, রিসার্চ, পাবলিকেশন— এসব নিয়ে দৌড়াচ্ছে। আর আমি আমার আইটি ফার্মটা মাত্র দাঁড় করালাম। এর পাশাপাশি আমার লেখালেখি আছে।"

আমি খুব বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নাড়লাম। "বুঝতে পারছি।"


"বাচ্চা নেওয়াটা তো শুধু বায়োলজিক্যাল একটা প্রসেস না রাশেদ," আনিকা একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ইটস আ হিউজ প্রজেক্ট। বাচ্চা হলে তাকে সামলানো, তার রেসপনসিবিলিটি নেওয়া, প্রপার প্যারেন্টিং— এগুলো খুব টাফ জব। আমরা মনে করি, একটা শিশুকে পৃথিবীতে আনার আগে নিজেদের মানসিক, আর্থিক এবং পারিপার্শ্বিক প্রস্তুতি শতভাগ থাকা উচিত। আমরা দুজনেই এখন যে ফেজে আছি, একটা বাচ্চা আমাদের দুজনের ক্যারিয়ারকেই চরমভাবে হ্যাম্পার করবে। তাছাড়া, প্যারেন্টিংয়ের জন্য যে সময়টা দেওয়া দরকার, সেটা আমরা এখন দিতে পারব না।"

আমি বললাম, "তা ঠিক। এখনকার দিনের প্যারেন্টিং আর আমাদের বাবা-চাচাদের আমলের প্যারেন্টিং এক না। আমাদের বাবা-মায়েরা দশটা বাচ্চা জন্ম দিয়ে মাঠে ছেড়ে দিতেন, বাচ্চারা প্রকৃতির নিয়মে বড় হয়ে যেত। এখন একটা বাচ্চার পেছনে যে পরিমাণ ইনভেস্টমেন্ট আর অ্যাটেনশন লাগে, সেটা একটা স্টার্টআপ কোম্পানি দাঁড় করানোর চেয়ে কোনো অংশে কম না।" আমার কথা শুনে আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। উনার হাসির শব্দটা এই বিশাল ফ্ল্যাটের নিস্তব্ধতায় একটা মধুর সিম্ফনির মতো শোনাল। "এক্সাক্টলি!" আনিকা হাসতে হাসতেই বললেন। "স্টার্টআপ কোম্পানির সাথে খুব সুন্দর তুলনা দিয়েছেন। তো আমাদের প্ল্যান হলো, ক্যারিয়ারটা যখন একটা একদম সলিড, স্টেবল জায়গায় পৌঁছাবে, তখন আমরা এই ‘প্রজেক্টে’ হাত দেব। আপাতত আমাদের প্ল্যান হলো, চল্লিশের কোঠায় পৌঁছালে তারপর একটা বাচ্চা নেওয়ার ট্রাই করা। তখন আমাদের হাতে সময় থাকবে, ম্যাচুরিটি থাকবে।"

আমি মাথা নাড়লাম। লজিকটা খুব আধুনিক, খুব ক্যালকুলেটেড এবং আপার-মিডল ক্লাস ক্যাপিটালিস্ট সমাজের সাথে একদম মানানসই। সবকিছু এক্সেল শিটে ফেলে হিসাব করা। কখন প্রেম, কখন বিয়ে, কখন বাচ্চা, কখন রিটায়ারমেন্ট। কিন্তু আমার মাথার ভেতরে সেই বন্য, আদিম পুরুষটা তখনো ফিসফিস করে যাচ্ছিল। সে বলছিল— "রাশেদ, এই নারী একটা পারফেক্ট উর্বরতার প্রতীক। এর শরীরটা সৃষ্টি হয়েছে একটা নতুন প্রাণ ধারণ করার জন্য। আর তুই বসে বসে উনার সাথে প্যারেন্টিং প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলছিস!" আমি আমার আদিম সত্তাকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে রাখলাম।

"আচ্ছা রাশেদ, একটা কথা বলুন তো।" আনিকা হঠাৎ উনার সোফা থেকে একটু আমার দিকে ঝুঁকে এলেন। উনার ঢিলেঢালা টি-শার্টের গলার কাছে যে শূন্যতা তৈরি হলো, আমি সচেতনভাবে সেদিকে তাকালাম না। আমি আমার অনুবাদক মস্তিষ্কের পুরোটা ফোকাস উনার প্রশ্নের দিকে দিলাম। 

"কী কথা?"

"
মানুষ আসলে কেন বাচ্চা চায়? হোয়াই ডু উই ওয়ান্ট টু রিপ্রোডিউস? আমি অনেককে দেখেছি, নিজে খেতে পারছে না, থাকার জায়গা নেই, কিন্তু ঠিকই বছর বছর বাচ্চা জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক বড় বড় ধনী মানুষ, যাদের সব আছে, তারাও পাগল হয়ে থাকে একটা সন্তানের জন্য। মানুষ কেন তার নিজের একটা প্রজন্ম পৃথিবীতে রেখে যেতে চায়?" প্রশ্নটা দারুণ। একটা আড্ডা যখন ব্যক্তিগত স্তর থেকে দার্শনিক স্তরে উন্নীত হয়, তখন সেই আড্ডার গভীরতা অন্য রকম হয়ে যায়। আনিকা নাওহার শুধু রূপবতীই নন, উনার মস্তিষ্কটাও খুব শার্প। আমি সোফায় একটু সোজা হয়ে বসলাম। গলাটা পরিষ্কার করে নিলাম। "এটা নিয়ে তো প্রচুর থিওরি আছে আনিকা। আপনি যদি রিচার্ড ডকিন্সের কথা ধরেন, তাহলে উত্তর খুব সহজ— আমাদের জিনগুলো অত্যন্ত স্বার্থপর। 'দ্য সেলফিশ জিন'। তারা শুধু চায় বেঁচে থাকতে এবং নিজেদের রেপ্লিকেট করতে। আমরা মানুষরা হলাম সেই জিনগুলোকে বহন করার একটা গাড়ি মাত্র। জিনের কমান্ডেই আমরা রিপ্রোডিউস করি।"

আনিকা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। উনার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।


আমি বলতে থাকলাম, "কিন্তু আপনি যদি ফিলোসফিক্যাল অ্যাঙ্গেল থেকে দেখেন, তাহলে ব্যাপারটা অন্যরকম। মানুষ আসলে মৃত্যুভয়ে ভীত। আমরা সবাই জানি, আমরা একদিন মরে যাব। আমাদের এই অস্তিত্ব, এই নাম, এই পরিচয়— সব একদিন মাটির নিচে পচে যাবে। মানুষ অবচেতনভাবে এই মৃত্যুকে অস্বীকার করতে চায়। তারা চায় অমরত্ব বা ইমমর্টালিটি।" 

"ইমমর্টালিটি?" আনিকা একটু ভ্রু কুঁচকালেন।

"
হ্যাঁ। মানুষ যখন নিজের একটা সন্তান পৃথিবীতে রেখে যায়, তখন সে সাবকনশাসলি ভাবে যে— 'আমি মরে গেলেও আমার রক্তের একটা অংশ, আমার ডিএনএ-র একটা অংশ এই পৃথিবীতে হেঁটে বেড়াবে। আমি আমার সন্তানের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকব।' এটা মানুষের এক ধরনের অমরত্ব প্রজেক্ট। সাইকোলজিস্ট আর্নেস্ট বেকার তার 'দ্য ডিনায়াল অফ ডেথ' বইয়ে বলেছেন, মানুষের সমস্ত কর্মকাণ্ডের মূলে হলো এই মৃত্যুভয়। আমরা পিরামিড বানাই, বই লিখি, সাম্রাজ্য দখল করি, অথবা সন্তান জন্ম দিই— শুধু একটাই কারণে, মৃত্যুর পর যেন আমরা একেবারে মুছে না যাই।" আনিকা মুগ্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

আমি মনে মনে হাসলাম। ঢাকা শহরের মেসে থাকা ব্যাচেলরদের দুটো জিনিস খুব স্ট্রং থাকে— এক, গ্যাস্ট্রিক; আর দুই, ফিলোসফি। মাস শেষে পকেটে যখন টাকা থাকে না, তখন দার্শনিক হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও থাকে না। "আমার কিন্তু আরেকটা থিওরি মনে হয়," আনিকা বললেন। উনার গলার স্বরে এখন গভীর চিন্তার ছাপ।

"
কী থিওরি?"

"আমার মনে হয়, সন্তান জন্ম দেওয়াটা মানুষের চরম স্বার্থপরতার একটা রূপ। একটু আগে আপনি নিজেই বলছিলেন না, বাবা-মায়েরা চায় শেষ বয়সে সন্তান তাদের দেখভাল করুক? মানুষ আসলে এমন একজনকে পৃথিবীতে আনতে চায়, যে তাকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসবে, যে তাকে 'মা' বা 'বাবা' বলে ডাকবে, যাকে নিজের মতো করে ছাঁচে ফেলে গড়া যাবে। আমরা আসলে একটা নতুন প্রাণকে পৃথিবীতে ডাকি আমাদের নিজেদের শূন্যতা পূরণের জন্য। এটা কি খুব সেলফিশ একটা কাজ না?" আমি আনিকার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনার কথাগুলোতে একটা অদ্ভুত শূন্যতা আছে, যেটা উনার কবিতায় পাওয়া যায়। এই নারী উনার উপন্যাসের ভাষা নিয়ে যতটা না চিন্তিত, তার চেয়েও বেশি চিন্তিত মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে। "আপনি ঠিকই বলেছেন আনিকা," আমি মৃদু স্বরে বললাম। "স্বার্থপরতা তো বটেই। পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ বলে আসলে কিছু নেই। আপনি যে সন্তানকে জন্ম দিয়ে তাকে নিজের মতো গড়তে চাইছেন, সেখানেও আপনি আপনার ইগোকে স্যাটিসফাই করছেন।" 

এভাবেই আমাদের আড্ডা চলতে লাগল।

বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে। আমরা সন্তান জন্ম দেওয়ার দর্শন থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকার সাহিত্য
, স্প্যানিশ ভাষার অনুবাদ, ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম, লন্ডনের বৃষ্টি, এবং মানুষের একাকিত্ব— সব কিছু নিয়ে কথা বলতে লাগলাম। আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, এই নারীর সাথে কথা বলার সময় আমার কোনো মেকি আবরণ পরতে হচ্ছে না। আমি যেমন, আমি ঠিক সেভাবেই কথা বলছি। উনার উপস্থিতিতে আমার ভেতরের সেই আদিম, ক্ষুধার্ত পুরুষটা এখন একটা শান্ত, সমঝদার শ্রোতার রূপ নিয়েছে। উনার ঢিলেঢালা টি-শার্টের নিচে উনার শারীরিক আকর্ষণ আমাকে তখনো চুম্বকের মতো টানছে ঠিকই, কিন্তু উনার মাথার ভেতরের সৌন্দর্যটা আমাকে যেন আরও বেশি মোহগ্রস্ত করে ফেলল।

সময় কীভাবে কেটে যাচ্ছিল, আমি টেরই পাইনি।

আনিকার ফ্ল্যাটের সেন্ট্রাল এসি, নিস্তব্ধ পরিবেশ, ড্রয়িংরুমের এই মায়াবী স্পটলাইটের আলো আর উনার এই রিফ্রেশিং উপস্থিতি— সবকিছু মিলিয়ে আমি যেন একটা টাইম মেশিনের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলাম, যেখানে ঘড়ির কাঁটা কাজ করে না। হঠাৎ আনিকা কথা বলতে বলতে উনার হাতের আইফোনটার স্ক্রিন অন করে সময় দেখলেন। আমারও হঠাৎ হুঁশ হলো। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালাম।

রাত প্রায় বারোটা বাজে!

বারোটা!

আমার চোখের সামনে থেকে নিমেষেই দর্শন, সাহিত্য, ইমমর্টালিটি প্রজেক্ট এবং আনিকা নাওহারের মোহনীয় মুখমণ্ডল মুছে গিয়ে সেখানে ভেসে উঠল মিরপুর দশ নাম্বারের সেই চারতলা মেস বাড়ির লোহায় জং ধরা বিশাল গেটটা। এবং সেই গেটের পাশে ডিউটি করা মফিজ দারোয়ানের পান খাওয়া মুখটা। আমি যেন কারেন্ট শট খেয়েছি, এমনভাবে সোফা থেকে ছিটকে উঠে দাঁড়ালাম।
"সর্বনাশ!" আমার মুখ দিয়ে অজান্তেই শব্দটা বেরিয়ে এল। আনিকা আমার এই হঠাৎ লাফিয়ে ওঠায় চমকে গেলেন। উনিও সোজা হয়ে বসে বললেন, "কী হলো রাশেদ? এনিথিং রং?"

আমি আমার প্যান্টের পকেট হাতড়ে ফোনটা বের করতে করতে বললাম, "প্রচুর রং! রাত বারোটা বেজে গেছে আনিকা! আড্ডা দিতে দিতে আমি তো সময়ের খেয়ালই করিনি। আমাকে এক্ষুনি বের হতে হবে। এক্ষুনি!" আনিকা অবাক হয়ে বললেন, "বারোটা বেজেছে তো কী হয়েছে? আপনি তো ছেলে মানুষ। আপনার তো আর ঢাকা শহরে কোনো কার্ফ্যু নেই। যাবেন রিকশা বা সিএনজি নিয়ে।"

"
আপনি বুঝবেন না আনিকা," আমি হতাশ গলায় বললাম। "আমার কার্ফ্যু নেই, কিন্তু আমার মেসের কার্ফ্যু আছে। আমাদের মেসের গেট রাত সাড়ে এগারোটায় বন্ধ হয়ে যায়। আমি যদি এখন না যাই, আমি আজ রাতে আর মেসে ঢুকতে পারব না।" আনিকা হেসে উঠলেন। "আরে, গেট বন্ধ হয়ে গেলে কী হয়েছে? দারোয়ান নেই? দারোয়ানকে নক করবেন, খুলে দেবে।"

"আমাদের দারোয়ানের নাম মফিজ। সে কানে কম শোনে, আর একবার ঘুমালে কেয়ামতের শিঙা ফুঁকলেও সে ওঠে না। তাকে ডেকে তোলা আর মরা মানুষকে কবর থেকে তোলা একই কথা।"
"তাহলে আপনার রুমমেটদের ফোন দেবেন। ওরা তো নামতে পারে।" আনিকা খুব লজিক্যাল সমাধান দিলেন। আমি অসহায় ভঙ্গিতে আনিকার দিকে তাকালাম। "আনিকা, আপনি ব্যাচেলর মেসের সাইকোলজি জানেন না। আমার মেসে তিনজন থাকে। রাজু, যে বিসিএস পরীক্ষার্থী। সে রাত জেগে পড়ে আর দিনে ঘুমায়। এখন যদি আমি তাকে ফোন দিই, সে হয়তো আফগানিস্তানের রাজধানীর নাম মুখস্থ করছে, সে ফোন ধরবে না। আরেকজন তুহিন, যে আইইএলটিএস দেয়। সে হয়তো কানে হেডফোন লাগিয়ে ব্রিটিশ এক্সেন্ট শুনছে। আর তিন নম্বর জন তো রাত দশটায় ঘুমিয়ে যায়। এই রাত বারোটার সময় চারতলা থেকে নেমে এসে, তালা খুলে আমাকে উদ্ধার করবে— এমন মানবদরদী একটাও নেই আমার মেসে। গতবার একবার বারোটায় ফিরেছিলাম, আমাকে রাস্তার ধারের টং দোকানে বসে রাত পার করতে হয়েছিল।"

আমার এই করুণ এবং অতি বাস্তব বর্ণনা শুনে আনিকা এবার শব্দ করে হেসে উঠলেন। উনার হাসি থামছেই না। "ওহ গড! রাশেদ, আপনাদের মেসের অবস্থা তো খুব ভয়াবহ! এটা তো রীতিমতো জেলখানা!" আমি চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম, "জেলখানার চেয়েও খারাপ। জেলখানায় অন্তত সকালের নাশতাটা ফ্রি দেয়, আমাদের সেটাও দেয় না। আমাকে বের হতে হবে আনিকা। আমি নিচে গিয়ে দেখি যদি কোনো উবার বা সিএনজি পাই। মফিজকে যদি দুই-তিনশ টাকা ঘুষের অফার দিই জানলার ফাঁক দিয়ে, হয়তো খুলতে পারে।"

আমি দরজার দিকে পা বাড়ালাম। আমার মাথার ভেতর তখন টেনশন। এই ধানমন্ডি থেকে মিরপুর দশ নাম্বার যেতে অন্তত চল্লিশ মিনিট লাগবে। রাত পৌনে একটায় গেট ধাক্কাধাক্কি করলে মেস মালিক কাল সকালেই আমাকে নোটিশ ধরিয়ে দেবে। আমি যখন ফ্ল্যাটের মেন দরজার হাতল ধরতে যাব, ঠিক তখন আনিকার কণ্ঠস্বর আমাকে থামিয়ে দিল। উনার গলাটা এখন আর হাসিখুশি নেই। খুব শান্ত, খুব ধীর, কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্ট।

"রাশেদ, দাঁড়ান।"

আমি দরজার হাতল ধরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। আনিকা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন। উনার সেই ঢিলেঢালা টি-শার্ট আর প্লাজো পরা শরীরটা নিয়ে উনি খুব ধীর পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। উনার খালি পায়ের পাতাগুলো কাঠের ফ্লোরে কোনো শব্দ করছে না। উনি আমার থেকে মাত্র দুই হাত দূরে এসে দাঁড়ালেন। উনার সেই রিফ্রেশিং, ব্যক্তিগত সুবাসটা আমার নাকে এসে ধাক্কা দিল। উনার চোখের দৃষ্টিতে এখন আর কোনো সাহিত্য বা দর্শন নেই। সেখানে এক অদ্ভুত, স্থির, এবং অবর্ণনীয় কিছু একটা লেখা আছে। আমি উনার দিকে তাকিয়ে আক্ষরিক অর্থেই পাথর হয়ে গেলাম। আনিকা উনার ডান হাতটা আলতো করে তুললেন। উনার আঙুলগুলো আমার শার্টের কলারে একবার ছুঁয়ে গেল। তারপর উনি আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, কোনো ধরনের জড়তা বা ভণিতা ছাড়াই, খুব সহজ এবং ক্যাজুয়াল গলায় বললেন—

"আজকে থেকে যা। এই ফ্ল্যাটে রুমের তো অভাব নেই।"

এই একটা বাক্য।

মাত্র কয়েকটা শব্দ।

কিন্তু এই শব্দগুলো আমার কানের পর্দা ভেদ করে আমার মস্তিষ্কে এমন একটা প্রলয়ঙ্করী বিস্ফোরণ ঘটাল যে, আমার মনে হলো ধানমন্ডির এই ১৬ তলা বিল্ডিংটা একটা প্রচণ্ড ভূমিকম্পে কাঁপতে শুরু করেছে। রাত বারোটা বাজে। আমি একটা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমার স্বপ্নের, আমার ফ্যান্টাসির, আমার অবদমিত কামনার সেই অপরূপা নারী। এবং সে আমাকে রাতটা তার ফ্ল্যাটে থেকে যাওয়ার অফার দিচ্ছে। আমার পুরো নার্ভাস সিস্টেম, আমার এক্সেল শিট, আমার জীবনের সমস্ত লজিক— নিমেষের মধ্যে শাটডাউন হয়ে গেল।


সাহস আর পাগলামির মধ্যে আসলে পার্থক্য কীখুব সূক্ষ্ম একটা পার্থক্য আছে। ধরুন, আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন আপনি এভারেস্ট জয় করবেন। আপনি বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নিলেন, অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনলেন, শেরপা ভাড়া করলেন, আবহাওয়া দপ্তর থেকে রিপোর্ট নিলেন, তারপর একদিন পাহাড়ের চূড়ায় উঠে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিলেন। পৃথিবীর মানুষ আপনাকে বলবে— ‘কী অসীম সাহসী একজন মানুষ!’

এবার ধরুন, আপনি একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে, পরনের লুঙ্গিটা একটু শক্ত করে গিঁট দিয়ে, খালি পায়ে হাঁটা শুরু করলেন। আপনার পকেটে কোনো টাকা নেই, সাথে কোনো অক্সিজেন নেই, এমনকি একটা সোয়েটারও নেই। আপনি বললেন, ‘আমি খালি পায়ে হিমালয় জয় করব।’ আপনি হয়তো হিমালয়ের বেসক্যাম্প পর্যন্তও যেতে পারবেন না, তার আগেই ঠান্ডায় জমে আপনার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে। পৃথিবীর মানুষ তখন আপনার মৃতদেহ দেখে বলবে— ‘কী পাগল একটা লোক! আস্ত একটা আহাম্মক!’ লজিকটা খুব পরিষ্কার। আপনি যখন কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করবেন, তার পেছনে যদি একটা শক্ত যুক্তি থাকে এবং কাজটা যদি সফল হয়, তাহলে সেটা ‘সাহসিকতা’। আর কাজটা যদি সম্পূর্ণ যুক্তির বাইরে হয় এবং তার ফলাফল যদি হয় নিশ্চিত ধ্বংস, তাহলে সেটা ‘পাগলামি’। আমি, রাশেদ আহমেদ, বর্তমানে এই সাহস এবং পাগলামির ঠিক মাঝখানের একটা সীমারেখায় শুয়ে আছি।

সময় রাত দুইটা বেজে পনেরো মিনিট।

আমি একটা বিশাল, নরম, স্প্রিংয়ের ম্যাট্রেস দেওয়া কিং-সাইজ বিছানায় শুয়ে আছি। ঘরের তাপমাত্রা বাইশ ডিগ্রিতে সেট করা। এসির একটা খুব মৃদু, ঘুমপাড়ানি শব্দ হচ্ছে। আমার গায়ের ওপর একটা দামি কমফোর্টার টানা। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত এবং পরাবাস্তব ব্যাপারটা হলো আমার পরনের পোশাক। আমার গায়ে এখন একটা সিল্কের স্লিপিং গাউন। গাউনটা গাঢ় নীল রঙের। এর ফেব্রিকটা এতই মোলায়েম যে গায়ের চামড়ার সাথে লাগলে মনে হয় পানির ওপর দিয়ে হাত বুলিয়ে নিচ্ছি। এই স্লিপিং গাউনটা আমার নয়। এটা আনিকা নাওহারের স্বামী, লন্ডনপ্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার বেলাল সাহেবের।

লন্ডনে বসে বেলাল সাহেব হয়তো এখন তার কোনো পিএইচডি থিসিস বা আইটি ফার্মের ব্যালেন্স শিট নিয়ে ব্যস্ত। আর এদিকে ঢাকা শহরের ধানমন্ডির ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে, তার কেনা দামি বিছানায় শুয়ে, তারই ব্যবহৃত স্লিপিং গাউন পরে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে মিরপুরের মেস নিবাসী পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের এক সাধারণ অনুবাদক। পরিস্থিতিটা এতই অবাস্তব আর হাস্যকর যে, আমার নিজেরই একবার জোরে হেসে উঠতে ইচ্ছে করল। কিন্তু আমি হাসলাম না। আমার মাথার ভেতর এখন জট পাকানো অনেকগুলো চিন্তা। 

ঠিক দেড় ঘণ্টা আগের কথা।

আমি ফ্ল্যাটের মেন দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার মাথার ভেতর মেসের কার্ফ্যু
, দারোয়ান মফিজের ঘুম এবং ঢাকা শহরের রাতের জ্যাম নিয়ে একটা বিশাল টেনশন চলছিল। আর ঠিক তখনই আনিকা নাওহার আমাকে বললেন— ‘আজকে থেকে যা। রুমের তো অভাব নেই।’ অফারটা শোনার পর প্রথম কয়েক সেকেন্ড আমি আক্ষরিক অর্থেই পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। একজন বিবাহিতা, রূপবতী নারী রাত বারোটার সময় আমাকে তার ফ্ল্যাটে থেকে যাওয়ার অফার দিচ্ছেন! আমার ভেতরের আদিম পুরুষটা তখন আনন্দে ব্রেক ড্যান্স দেওয়া শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু আমার সামাজিক, ভদ্র এবং ‘ভালো ছেলে’ সত্তাটা সাথে সাথে অ্যাকটিভ হয়ে গেল।

আমি খুব নার্ভাস গলায় বলেছিলাম, "আরে না না আনিকা! এটা কী বলছেন! আমি এখানে থেকে যাব মানে? এটা কোনো কথা হলো? আমি ম্যানেজ করে চলে যেতে পারব।" আনিকা সোফা থেকে উঠে আমার দিকে আরেকটু এগিয়ে এসেছিলেন। উনার চোখেমুখে কোনো সংকোচ বা দ্বিধা ছিল না। উনি খুব স্বাভাবিক, প্র্যাকটিক্যাল গলায় বললেন, "রাশেদ, বাচ্চাদের মতো করবেন না তো। রাত বারোটা বাজে। আপনি নিজে একটু আগে বললেন আপনার মেসের দারোয়ান কানে শোনে না, আপনার রুমমেটরা দরজা খুলবে না। আপনি কি আজ রাতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবেন? নাকি কোনো থানার বেঞ্চে বসে রাত পার করবেন? আমার এখানে চারটা বেডরুম। তিনটা একদম খালি পড়ে আছে। একটা রুমে আপনি চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়বেন, সকালে উঠে যে যার কাজে চলে যাব। এতে এত প্যানিক করার কী আছে?"

উনার যুক্তিগুলো এতই অকাট্য ছিল যে, আমি আর কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। আসলেই তো! আমি তো কোনো অবিবাহিত তরুণীর মেসে বা হোস্টেলে থাকছি না। এটা একটা বিশাল ফ্ল্যাট। আমি একটা গেস্টরুমে ঘুমাব। এতে তো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কিছু নেই। ইউরোপ-আমেরিকায় এটা ডালভাত। একজন বন্ধু আরেকজন বন্ধুর বাসায় কাউচে বা গেস্টরুমে রাত কাটাতেই পারে।
আমি যখন আমার এই ‘ভদ্র’ লজিকগুলো দিয়ে নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম, আমার অবচেতন মন তখন মিটিমিটি হাসছিল। সে জানত, আমি আসলে মেসের ভয়ে এখানে থাকছি না। আমি থাকছি এই নারীর কাছাকাছি, একই ছাদের নিচে একটা রাত কাটানোর তীব্র লোভ থেকে।

আমি একটা দুর্বল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলাম, "ঠিক আছে। কিন্তু আপনাকে আমি মিছামিছি একটা ঝামেলার মধ্যে ফেলে দিলাম।"
"কোনো ঝামেলা না," আনিকা হাসিমুখে বললেন। "আপনি আসুন। আমি আপনাকে রুম দেখিয়ে দিচ্ছি।"

আমি উনার পিছু পিছু করিডোর দিয়ে ভেতরে গেলাম। উনি আমাকে একটা বিশাল বেডরুমে নিয়ে গেলেন। অ্যাটাচড বাথ
, বিশাল জানালা, দামি পর্দা। "আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন। তোয়ালে বাথরুমে দেওয়াই আছে," আনিকা বললেন। তারপর হঠাৎ কী যেন একটা মনে করে উনি থামলেন। আমার দিকে আপাদমস্তক একবার তাকিয়ে বললেন, "রাশেদ, আপনি তো সারাদিন অফিস করে এসেছেন। এই ফরমাল শার্ট আর প্যান্ট পরে তো ঘুমাতে পারবেন না। খুব অস্বস্তি হবে।" আমি একটু কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, "অসুবিধা নেই। আমি এভাবেই ম্যানেজ করে নেব। একদিনের তো ব্যাপার।"

"আরে না, পাগল নাকি!" আনিকা খুব অধিকার খাটানোর সুরে বললেন। "এভাবে কেউ ঘুমাতে পারে? আপনি দাঁড়ান, আমি আসছি।"
[+] 5 users Like Orbachin's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস? - by Orbachin - 9 hours ago



Users browsing this thread: Anhaf-, 2 Guest(s)