21-06-2026, 09:27 PM
১০ম অধ্যায়: বকুলতলার প্রথম প্রেম
মফস্বল শহরের দুপুরগুলো বড্ড অলস আর একঘেয়ে। বাইরে তখন তপ্ত রোদে বকুলগাছের পাতাগুলো ঝিমোচ্ছিল। বিকাশ চ্যাটার্জি কলেজে গিয়েছেন এক জরুরি মিটিংয়ে, ফিরতে বিকেল হবে। এই ফাঁকে প্রিয়ংবদা ড্রইংরুমের বিশাল মেহগনি কাঠের আলমারিটা গোছাতে বসেছিল। স্বামী বিকাশের সব কিছু একদম পরিপাটি, নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা থাকা চাই। তার ইস্ত্রি করা শার্ট, ধোপদুরুস্ত ধুতি আর পাঞ্জাবিগুলো আলমারির তাকে স্তরে স্তরে সাজানো।
বিকাশের কাপড়ের পেছনের দিকে, যেখানে আলমারির কাঠটা একটু অন্ধকার হয়ে আছে, সেখানে হাত দিতেই প্রিয়ার আঙুলে শক্ত মলাটের কিছু একটা ঠেকল। কৌতূহলবশত সেটা টেনে বের করতেই প্রিয়া দেখল ওটা একটা পুরনো, নীল রঙের কাপড়ে বাঁধানো ডায়েরি। ডায়েরিটার ওপর জমে আছে ধুলোর এক পাতলা আস্তরণ।
ধুলোটা ফুঁ দিয়ে ওড়াতেই ডায়েরির পাতাগুলো মড়মড় শব্দে খুলে গেল। আর ঠিক মাঝখানের একটা পাতা থেকে মেঝেতে খসে পড়ল শুকনো, কালো হয়ে যাওয়া একটা বকুল ফুল। ফুলটার সুবাস বহু বছর আগেই উবে গেছে, কিন্তু তার পাপড়িগুলোর গায়ে লেগে আছে আঠারো বছর বয়সের এক অলৌকিক স্পর্শ।
শুকনো ফুলটার দিকে তাকিয়ে প্রিয়ার চারপাশের বাস্তব দেওয়ালগুলো যেন এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। মফস্বলের স্যাঁতস্যাতে ঘরের চুনকাম করা গন্ধ ছাপিয়ে তার নাকে এসে লাগল বহু বছর আগের সেই ভেজা মাটির আর বকুলতলার চেনা সুঘ্রাণ। প্রিয়ার মন চলে গেল তার কলেজ জীবনের সেই দিনগুলোয়, যখন তার বয়স ছিল মাত্র আঠারো। সে তখন এক মুক্ত বিহঙ্গ, যার ডানায় সমাজ এখনো কোনো অদৃশ্য শেকল পরায়নি।
বিকাশ চ্যাটার্জির এই নিচ্ছিদ্র শাসন, প্রতিদিনের পোশাকের দৈর্ঘ্য মেপে দেওয়া আর কণ্ঠরোধের সংসারে আসার আগে প্রিয়ার জীবনে একজন মানুষ ছিল—সাব্বির। সাব্বির ছিল সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সবচেয়ে মেধাবী, শান্ত আর গভীর চোখের একটি ছেলে।
এই উপমহাদেশে পুরুষরা যখনই কোনো তরুণী মেয়ের দিকে তাকায়, তাদের চাউনিতে এক ধরনের পরিমাপক বা লোলুপ দৃষ্টি থাকে—যা প্রিয়া প্রতিদিন রাস্তায়, বাসে কিংবা এখন নিজের শোবার ঘরে বিকাশের চোখে দেখতে পায়। কিন্তু সাব্বিরের চোখ দুটো ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সে যখন প্রিয়ার দিকে তাকাত, তখন সেই দৃষ্টিতে কোনো আদিম ক্ষুধা থাকত না; থাকত এক পরম আকাশসম শ্রদ্ধা আর এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
সাব্বির প্রিয়াকে স্রেফ একটা ‘নারী শরীর’ হিসেবে দেখেনি। সে ভালোবাসত প্রিয়ার লেখা ডায়েরির পেছনের পাতার কবিতাগুলোকে, সে কদর করত প্রিয়ার প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর থিয়েটারের প্রতি তার তীব্র আবেগকে। কলেজের বকুলতলায় বসে যখন প্রিয়া নিজের লেখা নতুন কোনো কবিতার লাইন শোনাত, সাব্বির তখন এক দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনত। কবিতা শেষ হলে সে আলতো করে বলত, "প্রিয়া, তোমার এই কলম একদিন অনেক বড় বড় শৃঙ্খল ভেঙে দেবে।"
স্মৃতির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে প্রিয়ার মনে পড়ে গেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের সেই অভিশপ্ত অথচ সুন্দর দিনটির কথা। প্রিয়া সেদিন ক্লাসের তাড়াহুড়োয় লাইব্রেরির পুরোনো কাঠের একটা বেঞ্চ থেকে ওঠার সময় খেয়াল করেনি। বেঞ্চের কোণায় একটা মরচে ধরা তলোয়ারের মতো ধারালো পেরেক বেরিয়ে ছিল। প্রিয়া যখন সজোরে টান দিয়ে উঠে দাঁড়াল, তখন এক মড়মড় শব্দে তার সুতির কামিজের পেছনটা বড় একটা অংশ জুড়ে চিরে গেল।
সে তখনো বুঝতে পারেনি কী ঘটেছে। সে যখন লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে কলেজের ব্যস্ত করিডোরে এসে দাঁড়াল, তখন চারপাশের ছাত্রদের লোলুপ দৃষ্টি, বাঁকা হাসি আর ছাত্রীদের চাপা ফিসফিসানি তার নজরে এলো। কামিজের পেছনটা ফেটে যাওয়ায় তার পিঠের একটা বড় অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল, যা সেই রক্ষণশীল মফস্বল শহরের কলেজের পরিবেশে ছিল এক চরম কেলেঙ্কারির মতো। ছেলেরা ইশারা-ইঙ্গিতে হাসাহাসি করছিল, আর প্রিয়া হুট করে নিজের পিঠে হাত দিয়ে টের পেল তার পোশাকের এই ভয়াবহ বিপর্যয়।
মুহূর্তের মধ্যে আঠারো বছরের প্রিয়া লজ্জায়, অপমানে আর এক তীব্র হীনমন্যতায় এক্কেবারে জমে পাথর হয়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল মাটির নিচে যদি কোনো ফাটল থাকত, তবে সে এখনই সেখানে নিজেকে লুকিয়ে ফেলত। সে দেওয়ালের সাথে নিজের পিঠ ঠেকিয়ে কান্না চেপে দাঁড়িয়ে রইল, চারপাশের প্রতিটি চোখ যেন বিষাক্ত তীরের মতো তাকে বিঁধছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে এলো সাব্বির। সে কোনো দ্বিধা করল না, চারপাশের মানুষের কানাঘুষো বা বাঁকা চাউনিকে এক বিন্দুও পরোয়া করল না। সে নিজের কাঁধ থেকে তার সাধের খয়েরি রঙের সুতির চাদরটা এক টানে খুলে নিল। তারপর অত্যন্ত আলতো কিন্তু সুরক্ষাদায়ক ভঙ্গিতে চাদরটা প্রিয়ার কাঁধ আর পিঠের চারপাশ দিয়ে জড়িয়ে দিল, যাতে পেছনের সেই ছেঁড়া অংশটা পুরোপুরি ঢাকা পড়ে যায়।
সাব্বির প্রিয়ার কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার স্পর্শে কোনো কামনার উত্তাপ ছিল না, ছিল এক পরম বন্ধুর মতো নিঃশর্ত সুরক্ষা। সে প্রিয়ার থরথর করে কাঁপতে থাকা চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত, পরিপক্ক গলায় বলেছিল,
"মন খারাপ কোরো না প্রিয়া। মাথা একদম নিচু করবে না। এটা তো একটা দুর্ঘটনা মাত্র, এতে তোমার কোনো লজ্জা বা দোষ নেই। চলো, তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।"
সেদিন সাব্বির প্রিয়াকে শুধু সমাজ আর সহপাঠীদের লোলুপ বিদ্রূপ থেকে বাঁচায়নি; সে প্রিয়ার মনে নিজের আত্মসম্মানের এক অমোঘ দেওয়াল তুলে দিয়েছিল। সাব্বির জানত কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে একজন নারীর পাশে সম্মানের সাথে দাঁড়াতে হয়।
কিন্তু এই উপমহাদেশের নির্মম বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে প্রিয়ংবদা চ্যাটার্জির সাথে অন্য জাতের এক ছেলে সাব্বিরের বিয়ে হওয়াটা তৎকালীন সমাজে ছিল এক অসম্ভবের নামান্তর। জাত, ধর্ম, সমাজ আর বংশের আভিজাত্যের যে বিশাল বিষাক্ত বেড়াজাল—তার সামনে দাঁড়িয়ে সাব্বির আর প্রিয়ার সেই প্রেম মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। প্রিয়ার বাবা তাকে জোর করে, কেঁদে-কেটে সুইসাইডের হুমকি দিয়ে বিয়ে দিয়ে দিলেন কলেজের গম্ভীর, প্রভাবশালী অধ্যাপক বিকাশ চ্যাটার্জির সাথে।
আজ এই নরকগুলজারে, যেখানে প্রতি রাতে বিকাশ চ্যাটার্জি প্রিয়ার সম্মতি ছাড়াই তার ওপর নিজের পুরুষতান্ত্রিক অধিকার ফলায়, যেখানে প্রতি মুহূর্তে প্রিয়ার পোশাক আর হাসির ডেসিবেল মেপে দেওয়া হয়—সেখানে বেঁচে থাকার জন্য প্রিয়া প্রতিদিন গোপনে এক মনস্তাত্ত্বিক ফ্যান্টাসি বোনে।
সে মনে মনে জানে, সে কোনোদিন ‘পরকীয়া’ করবে না। সে একজন আদর্শ শিক্ষিকা, সমাজের চোখে সে একজন সতী সাধ্বী স্ত্রী। সে শরীর দিয়ে কোনোদিন সাব্বিরের কাছে ফিরে যাবে না, বিকাশ চ্যাটার্জির বিশ্বাসের অমর্যাদা বাস্তবে করবে না। কিন্তু তার মনটা? তার সেই আঠারো বছর বয়সের অবিনশ্বর আত্মাটা আজীবন সাব্বিরের সেই খয়েরি চাদরের ওমেই বন্ধক রয়ে গেছে।
ডায়েরিটা সযত্নে কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখার পর প্রিয়া যখন বিছানার এককোণে এসে বসল, তখন দুপুরের নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। এই সেই বিছানা, যেখানে প্রতি রাতে বিকাশ চ্যাটার্জির অধিকারবোধের স্থূলতা তাকে ক্লান্ত করে, যেখানে ভালোবাসা শব্দটা কেবলই একটা যান্ত্রিক ও একতরফা শারীরিক দায়বদ্ধতা। কিন্তু এই মুহূর্তে, নিজের অজান্তেই প্রিয়ার মন অবাধ্য হয়ে উঠল। সে চোখ দুটো বন্ধ করতেই তার মনস্তাত্ত্বিক ফ্যান্টাসি এক আদিম ও তীব্র রূপ নিল।
সে কল্পনা করতে লাগল, এই বন্ধ ঘরের দরজাটা আলতো করে খুলে ভেতরে ঢুকে এলো সাব্বির। পঁচিশ বছর আগের সেই শান্ত ছেলেটি নয়, বরং এক পূর্ণবয়স্ক, তীব্র পুরুষালি আবেদনে ভরা সাব্বির। প্রিয়ার কল্পনায় সাব্বির তার চিরচেনা সেই খয়েরি চাদরটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার চোখে কোনো লোলুপতা নেই, আছে এক সর্বগ্রাসী অধিকারবোধ আর তীব্র ভালোবাসা।
সাব্বির এসে প্রিয়ার মুখোমুখি বসল। প্রিয়ার মনে হলো, সাব্বিরের উষ্ণ শ্বাস তার মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে। সে তার সেই বড়, যত্নশীল হাত দুটো দিয়ে প্রিয়ার মুখটা তুলে ধরল। প্রিয়ার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল যখন সাব্বিরের বুড়ো আঙুলটা তার ঠোঁটের ওপর আলতো করে চেপে বসল। কোনো জোরজুলুম নেই, কেবলই এক আদিম আকর্ষণের টান।
প্রিয়ার অবদমিত কামনার দেওয়াল ভেঙে সাব্বির তাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। প্রিয়া কল্পনা করতে লাগল সাব্বিরের শক্ত চওড়া বুকের সেই ওম, যেখানে কোনো ভয় নেই। সাব্বিরের ঠোঁট দুটো প্রিয়ার কপাল, চোখ পেরিয়ে নেমে এলো তার ঘাড়ে। তার ঠোঁটের প্রতিটি ছোঁয়া ছিল যেমন তীব্র, তেমনই গভীর মায়ায় ভরা। প্রিয়ার সমস্ত অস্তিত্ব যেন গলে জল হয়ে যাচ্ছিল। সাব্বিরের হাত দুটি তখন প্রিয়ার পিঠের সুতির শাড়ির আঁচলটা আলতো করে সরিয়ে দিচ্ছে, আর প্রিয়া কোনো দ্বিধা ছাড়াই নিজেকে সঁপে দিচ্ছে সেই পরম ভালোবাসার স্পর্শে।
কল্পনার সেই গভীরতায় সাব্বির প্রিয়ার প্রতিটি অঙ্গকে পরম তৃপ্তিতে, পরম আদরে নিজের ভালোবাসায় জড়িয়ে নিচ্ছিল। সাব্বিরের পুরুষালি হাত দুটি প্রিয়ার উন্মুক্ত কোমর আর নিতম্বের খাঁজে তীব্র আকুলতায় নেমে এলো, যেখানে জড়িয়ে ছিল পঁচিশ বছরের এক তীব্র ক্ষুধা। প্রিয়ার বুকের প্রতিটি স্পন্দন যেন সাব্বিরের হাতের মুঠোয় এসে এক অলৌকিক সুখে কাঁপতে লাগল। সাব্বিরের ঠোঁট তখন প্রিয়ার ঠোঁট থেকে নেমে তার উন্মুক্ত স্তনযুগলের ওপর গভীর আর তৃষ্ণার্ত চুম্বনে মেতে উঠেছে, যা প্রিয়াকে এক আদিম আনন্দের শিখরে নিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে কোনো সামাজিক শৃঙ্খল নেই, কোনো জাত-ধর্মের গ্লানি নেই। সাব্বিরের বাহুবন্ধনে আটকে থেকে প্রিয়া এক তীব্র আনন্দের চরম মুহূর্তে পৌঁছানোর ঠিক আগের সেকেন্ডে—যখন তাদের শরীর দুটি এক পরম একাত্মতায় বিলীন হতে যাবে—
হঠাৎ করেই পাশের ঘরের ঘড়িতে একটা তীব্র অ্যালার্ম বেজে উঠতেই প্রিয়ার চোখ দুটো খুলে গেল। ঘরের সেই চেনা এসি-র ঠান্ডা বাতাস আর একঘেয়ে নিস্তব্ধতা আবার তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। তার বুকটা তখনো দ্রুত ওঠানামা করছে, কপালে জমে উঠেছে হালকা ঘাম।
সে বুঝতে পারল, শরীর দিয়ে সে কোনোদিন এই ঘরের বাইরে যাবে না, কিন্তু তার অবদমিত কামনার প্রতিটি কণা, তার নারীত্বের আসল তৃপ্তি আজীবন সাব্বিরের সেই কল্পিত ছোঁয়ার কাছেই বন্ধক রয়ে গেছে। বিকাশ চ্যাটার্জি কেবলই এক শূন্য খোলস পাহারা দিচ্ছে, আর প্রিয়ার আসল সত্ত্বা সাব্বিরের সেই রাউ ভালোবাসার চাদরে মুড়ে প্রতিদিন বেঁচে থাকে।
মফস্বল শহরের দুপুরগুলো বড্ড অলস আর একঘেয়ে। বাইরে তখন তপ্ত রোদে বকুলগাছের পাতাগুলো ঝিমোচ্ছিল। বিকাশ চ্যাটার্জি কলেজে গিয়েছেন এক জরুরি মিটিংয়ে, ফিরতে বিকেল হবে। এই ফাঁকে প্রিয়ংবদা ড্রইংরুমের বিশাল মেহগনি কাঠের আলমারিটা গোছাতে বসেছিল। স্বামী বিকাশের সব কিছু একদম পরিপাটি, নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা থাকা চাই। তার ইস্ত্রি করা শার্ট, ধোপদুরুস্ত ধুতি আর পাঞ্জাবিগুলো আলমারির তাকে স্তরে স্তরে সাজানো।
বিকাশের কাপড়ের পেছনের দিকে, যেখানে আলমারির কাঠটা একটু অন্ধকার হয়ে আছে, সেখানে হাত দিতেই প্রিয়ার আঙুলে শক্ত মলাটের কিছু একটা ঠেকল। কৌতূহলবশত সেটা টেনে বের করতেই প্রিয়া দেখল ওটা একটা পুরনো, নীল রঙের কাপড়ে বাঁধানো ডায়েরি। ডায়েরিটার ওপর জমে আছে ধুলোর এক পাতলা আস্তরণ।
ধুলোটা ফুঁ দিয়ে ওড়াতেই ডায়েরির পাতাগুলো মড়মড় শব্দে খুলে গেল। আর ঠিক মাঝখানের একটা পাতা থেকে মেঝেতে খসে পড়ল শুকনো, কালো হয়ে যাওয়া একটা বকুল ফুল। ফুলটার সুবাস বহু বছর আগেই উবে গেছে, কিন্তু তার পাপড়িগুলোর গায়ে লেগে আছে আঠারো বছর বয়সের এক অলৌকিক স্পর্শ।
শুকনো ফুলটার দিকে তাকিয়ে প্রিয়ার চারপাশের বাস্তব দেওয়ালগুলো যেন এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। মফস্বলের স্যাঁতস্যাতে ঘরের চুনকাম করা গন্ধ ছাপিয়ে তার নাকে এসে লাগল বহু বছর আগের সেই ভেজা মাটির আর বকুলতলার চেনা সুঘ্রাণ। প্রিয়ার মন চলে গেল তার কলেজ জীবনের সেই দিনগুলোয়, যখন তার বয়স ছিল মাত্র আঠারো। সে তখন এক মুক্ত বিহঙ্গ, যার ডানায় সমাজ এখনো কোনো অদৃশ্য শেকল পরায়নি।
বিকাশ চ্যাটার্জির এই নিচ্ছিদ্র শাসন, প্রতিদিনের পোশাকের দৈর্ঘ্য মেপে দেওয়া আর কণ্ঠরোধের সংসারে আসার আগে প্রিয়ার জীবনে একজন মানুষ ছিল—সাব্বির। সাব্বির ছিল সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সবচেয়ে মেধাবী, শান্ত আর গভীর চোখের একটি ছেলে।
এই উপমহাদেশে পুরুষরা যখনই কোনো তরুণী মেয়ের দিকে তাকায়, তাদের চাউনিতে এক ধরনের পরিমাপক বা লোলুপ দৃষ্টি থাকে—যা প্রিয়া প্রতিদিন রাস্তায়, বাসে কিংবা এখন নিজের শোবার ঘরে বিকাশের চোখে দেখতে পায়। কিন্তু সাব্বিরের চোখ দুটো ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সে যখন প্রিয়ার দিকে তাকাত, তখন সেই দৃষ্টিতে কোনো আদিম ক্ষুধা থাকত না; থাকত এক পরম আকাশসম শ্রদ্ধা আর এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
সাব্বির প্রিয়াকে স্রেফ একটা ‘নারী শরীর’ হিসেবে দেখেনি। সে ভালোবাসত প্রিয়ার লেখা ডায়েরির পেছনের পাতার কবিতাগুলোকে, সে কদর করত প্রিয়ার প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর থিয়েটারের প্রতি তার তীব্র আবেগকে। কলেজের বকুলতলায় বসে যখন প্রিয়া নিজের লেখা নতুন কোনো কবিতার লাইন শোনাত, সাব্বির তখন এক দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনত। কবিতা শেষ হলে সে আলতো করে বলত, "প্রিয়া, তোমার এই কলম একদিন অনেক বড় বড় শৃঙ্খল ভেঙে দেবে।"
স্মৃতির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে প্রিয়ার মনে পড়ে গেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের সেই অভিশপ্ত অথচ সুন্দর দিনটির কথা। প্রিয়া সেদিন ক্লাসের তাড়াহুড়োয় লাইব্রেরির পুরোনো কাঠের একটা বেঞ্চ থেকে ওঠার সময় খেয়াল করেনি। বেঞ্চের কোণায় একটা মরচে ধরা তলোয়ারের মতো ধারালো পেরেক বেরিয়ে ছিল। প্রিয়া যখন সজোরে টান দিয়ে উঠে দাঁড়াল, তখন এক মড়মড় শব্দে তার সুতির কামিজের পেছনটা বড় একটা অংশ জুড়ে চিরে গেল।
সে তখনো বুঝতে পারেনি কী ঘটেছে। সে যখন লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে কলেজের ব্যস্ত করিডোরে এসে দাঁড়াল, তখন চারপাশের ছাত্রদের লোলুপ দৃষ্টি, বাঁকা হাসি আর ছাত্রীদের চাপা ফিসফিসানি তার নজরে এলো। কামিজের পেছনটা ফেটে যাওয়ায় তার পিঠের একটা বড় অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল, যা সেই রক্ষণশীল মফস্বল শহরের কলেজের পরিবেশে ছিল এক চরম কেলেঙ্কারির মতো। ছেলেরা ইশারা-ইঙ্গিতে হাসাহাসি করছিল, আর প্রিয়া হুট করে নিজের পিঠে হাত দিয়ে টের পেল তার পোশাকের এই ভয়াবহ বিপর্যয়।
মুহূর্তের মধ্যে আঠারো বছরের প্রিয়া লজ্জায়, অপমানে আর এক তীব্র হীনমন্যতায় এক্কেবারে জমে পাথর হয়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল মাটির নিচে যদি কোনো ফাটল থাকত, তবে সে এখনই সেখানে নিজেকে লুকিয়ে ফেলত। সে দেওয়ালের সাথে নিজের পিঠ ঠেকিয়ে কান্না চেপে দাঁড়িয়ে রইল, চারপাশের প্রতিটি চোখ যেন বিষাক্ত তীরের মতো তাকে বিঁধছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে এলো সাব্বির। সে কোনো দ্বিধা করল না, চারপাশের মানুষের কানাঘুষো বা বাঁকা চাউনিকে এক বিন্দুও পরোয়া করল না। সে নিজের কাঁধ থেকে তার সাধের খয়েরি রঙের সুতির চাদরটা এক টানে খুলে নিল। তারপর অত্যন্ত আলতো কিন্তু সুরক্ষাদায়ক ভঙ্গিতে চাদরটা প্রিয়ার কাঁধ আর পিঠের চারপাশ দিয়ে জড়িয়ে দিল, যাতে পেছনের সেই ছেঁড়া অংশটা পুরোপুরি ঢাকা পড়ে যায়।
সাব্বির প্রিয়ার কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার স্পর্শে কোনো কামনার উত্তাপ ছিল না, ছিল এক পরম বন্ধুর মতো নিঃশর্ত সুরক্ষা। সে প্রিয়ার থরথর করে কাঁপতে থাকা চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত, পরিপক্ক গলায় বলেছিল,
"মন খারাপ কোরো না প্রিয়া। মাথা একদম নিচু করবে না। এটা তো একটা দুর্ঘটনা মাত্র, এতে তোমার কোনো লজ্জা বা দোষ নেই। চলো, তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।"
সেদিন সাব্বির প্রিয়াকে শুধু সমাজ আর সহপাঠীদের লোলুপ বিদ্রূপ থেকে বাঁচায়নি; সে প্রিয়ার মনে নিজের আত্মসম্মানের এক অমোঘ দেওয়াল তুলে দিয়েছিল। সাব্বির জানত কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে একজন নারীর পাশে সম্মানের সাথে দাঁড়াতে হয়।
কিন্তু এই উপমহাদেশের নির্মম বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে প্রিয়ংবদা চ্যাটার্জির সাথে অন্য জাতের এক ছেলে সাব্বিরের বিয়ে হওয়াটা তৎকালীন সমাজে ছিল এক অসম্ভবের নামান্তর। জাত, ধর্ম, সমাজ আর বংশের আভিজাত্যের যে বিশাল বিষাক্ত বেড়াজাল—তার সামনে দাঁড়িয়ে সাব্বির আর প্রিয়ার সেই প্রেম মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। প্রিয়ার বাবা তাকে জোর করে, কেঁদে-কেটে সুইসাইডের হুমকি দিয়ে বিয়ে দিয়ে দিলেন কলেজের গম্ভীর, প্রভাবশালী অধ্যাপক বিকাশ চ্যাটার্জির সাথে।
আজ এই নরকগুলজারে, যেখানে প্রতি রাতে বিকাশ চ্যাটার্জি প্রিয়ার সম্মতি ছাড়াই তার ওপর নিজের পুরুষতান্ত্রিক অধিকার ফলায়, যেখানে প্রতি মুহূর্তে প্রিয়ার পোশাক আর হাসির ডেসিবেল মেপে দেওয়া হয়—সেখানে বেঁচে থাকার জন্য প্রিয়া প্রতিদিন গোপনে এক মনস্তাত্ত্বিক ফ্যান্টাসি বোনে।
সে মনে মনে জানে, সে কোনোদিন ‘পরকীয়া’ করবে না। সে একজন আদর্শ শিক্ষিকা, সমাজের চোখে সে একজন সতী সাধ্বী স্ত্রী। সে শরীর দিয়ে কোনোদিন সাব্বিরের কাছে ফিরে যাবে না, বিকাশ চ্যাটার্জির বিশ্বাসের অমর্যাদা বাস্তবে করবে না। কিন্তু তার মনটা? তার সেই আঠারো বছর বয়সের অবিনশ্বর আত্মাটা আজীবন সাব্বিরের সেই খয়েরি চাদরের ওমেই বন্ধক রয়ে গেছে।
ডায়েরিটা সযত্নে কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখার পর প্রিয়া যখন বিছানার এককোণে এসে বসল, তখন দুপুরের নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। এই সেই বিছানা, যেখানে প্রতি রাতে বিকাশ চ্যাটার্জির অধিকারবোধের স্থূলতা তাকে ক্লান্ত করে, যেখানে ভালোবাসা শব্দটা কেবলই একটা যান্ত্রিক ও একতরফা শারীরিক দায়বদ্ধতা। কিন্তু এই মুহূর্তে, নিজের অজান্তেই প্রিয়ার মন অবাধ্য হয়ে উঠল। সে চোখ দুটো বন্ধ করতেই তার মনস্তাত্ত্বিক ফ্যান্টাসি এক আদিম ও তীব্র রূপ নিল।
সে কল্পনা করতে লাগল, এই বন্ধ ঘরের দরজাটা আলতো করে খুলে ভেতরে ঢুকে এলো সাব্বির। পঁচিশ বছর আগের সেই শান্ত ছেলেটি নয়, বরং এক পূর্ণবয়স্ক, তীব্র পুরুষালি আবেদনে ভরা সাব্বির। প্রিয়ার কল্পনায় সাব্বির তার চিরচেনা সেই খয়েরি চাদরটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার চোখে কোনো লোলুপতা নেই, আছে এক সর্বগ্রাসী অধিকারবোধ আর তীব্র ভালোবাসা।
সাব্বির এসে প্রিয়ার মুখোমুখি বসল। প্রিয়ার মনে হলো, সাব্বিরের উষ্ণ শ্বাস তার মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে। সে তার সেই বড়, যত্নশীল হাত দুটো দিয়ে প্রিয়ার মুখটা তুলে ধরল। প্রিয়ার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল যখন সাব্বিরের বুড়ো আঙুলটা তার ঠোঁটের ওপর আলতো করে চেপে বসল। কোনো জোরজুলুম নেই, কেবলই এক আদিম আকর্ষণের টান।
প্রিয়ার অবদমিত কামনার দেওয়াল ভেঙে সাব্বির তাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। প্রিয়া কল্পনা করতে লাগল সাব্বিরের শক্ত চওড়া বুকের সেই ওম, যেখানে কোনো ভয় নেই। সাব্বিরের ঠোঁট দুটো প্রিয়ার কপাল, চোখ পেরিয়ে নেমে এলো তার ঘাড়ে। তার ঠোঁটের প্রতিটি ছোঁয়া ছিল যেমন তীব্র, তেমনই গভীর মায়ায় ভরা। প্রিয়ার সমস্ত অস্তিত্ব যেন গলে জল হয়ে যাচ্ছিল। সাব্বিরের হাত দুটি তখন প্রিয়ার পিঠের সুতির শাড়ির আঁচলটা আলতো করে সরিয়ে দিচ্ছে, আর প্রিয়া কোনো দ্বিধা ছাড়াই নিজেকে সঁপে দিচ্ছে সেই পরম ভালোবাসার স্পর্শে।
কল্পনার সেই গভীরতায় সাব্বির প্রিয়ার প্রতিটি অঙ্গকে পরম তৃপ্তিতে, পরম আদরে নিজের ভালোবাসায় জড়িয়ে নিচ্ছিল। সাব্বিরের পুরুষালি হাত দুটি প্রিয়ার উন্মুক্ত কোমর আর নিতম্বের খাঁজে তীব্র আকুলতায় নেমে এলো, যেখানে জড়িয়ে ছিল পঁচিশ বছরের এক তীব্র ক্ষুধা। প্রিয়ার বুকের প্রতিটি স্পন্দন যেন সাব্বিরের হাতের মুঠোয় এসে এক অলৌকিক সুখে কাঁপতে লাগল। সাব্বিরের ঠোঁট তখন প্রিয়ার ঠোঁট থেকে নেমে তার উন্মুক্ত স্তনযুগলের ওপর গভীর আর তৃষ্ণার্ত চুম্বনে মেতে উঠেছে, যা প্রিয়াকে এক আদিম আনন্দের শিখরে নিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে কোনো সামাজিক শৃঙ্খল নেই, কোনো জাত-ধর্মের গ্লানি নেই। সাব্বিরের বাহুবন্ধনে আটকে থেকে প্রিয়া এক তীব্র আনন্দের চরম মুহূর্তে পৌঁছানোর ঠিক আগের সেকেন্ডে—যখন তাদের শরীর দুটি এক পরম একাত্মতায় বিলীন হতে যাবে—
হঠাৎ করেই পাশের ঘরের ঘড়িতে একটা তীব্র অ্যালার্ম বেজে উঠতেই প্রিয়ার চোখ দুটো খুলে গেল। ঘরের সেই চেনা এসি-র ঠান্ডা বাতাস আর একঘেয়ে নিস্তব্ধতা আবার তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। তার বুকটা তখনো দ্রুত ওঠানামা করছে, কপালে জমে উঠেছে হালকা ঘাম।
সে বুঝতে পারল, শরীর দিয়ে সে কোনোদিন এই ঘরের বাইরে যাবে না, কিন্তু তার অবদমিত কামনার প্রতিটি কণা, তার নারীত্বের আসল তৃপ্তি আজীবন সাব্বিরের সেই কল্পিত ছোঁয়ার কাছেই বন্ধক রয়ে গেছে। বিকাশ চ্যাটার্জি কেবলই এক শূন্য খোলস পাহারা দিচ্ছে, আর প্রিয়ার আসল সত্ত্বা সাব্বিরের সেই রাউ ভালোবাসার চাদরে মুড়ে প্রতিদিন বেঁচে থাকে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)