21-06-2026, 07:44 AM
**পর্ব ৫: অনুমতি **
ভোরের আলো ফোটার আগেই নেহা চলে যেত। তুলসি যেন জেগে না ওঠে, সেজন্য সে চুপিসাড়ে উঠে পড়ত। টিনের ঘরের ছোট্ট রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সে এখন রুটি বানাতে শিখেছে। হাতে আটা মাখা, কপালে ঘাম। যে নেহা একদিন সকালে বিছানায় শুয়ে মেইডের হাতে চা খেত, আজ সে নিজের হাতে রুটি সেঁকছে।
নিরঞ্জন আর তুলসি ঘুম থেকে উঠে খেতে বসল। ছোট্ট টেবিলের সামনে তুলসি খুশিতে বসে আছে। নিরঞ্জন রুটি ছিঁড়ে মুখে দিয়ে বলল,
“নেহা জি, আরেকটা দেন তো।”
নেহা নীরবে আরেকটা গরম রুটি তার প্লেটে দিয়ে দিল। তার চোখে এখন আর তীব্র ঘৃণা নেই—শুধু একটা অভ্যস্ত ক্লান্তি।
তুলসি হঠাৎ উৎসাহ নিয়ে বলে উঠল,
“বাবা, আমাদের কলেজ থেকে ঘুরতে নিয়ে যাবে। একজনের জন্য এক হাজার টাকা করে। সবাই যাচ্ছে।”
নিরঞ্জন ভুরু কুঁচকে তাকাল।
“ঘোরাঘুরির কী দরকার? বাসায় বসে থাক। পড়াশোনা কর।”
তুলসির মুখটা হঠাৎ বিষাদে ভরে গেল। সে অনুনয়ের সুরে বলল,
“বাবা, প্লিজ… আমি যাই না। সবাই যাবে।”
নিরঞ্জন বিরক্ত হয়ে বলল,
“কলেজে খালি টাকাই লাগে? এদিকে ঘরে চাল-ডালের টাকা জোগাড় করতে পারি না, আর তুই ঘুরতে যেতে চাস?”
নেহা আর চুপ করে থাকতে পারল না। সে রান্না করতে করতে বলে উঠল,
“মানে কী? ছেলেমেয়েরা অবশ্যই ঘুরাঘুরি করবে, নতুন জায়গা দেখবে, শিখবে। এটা তো তাদের বড় হওয়ার অংশ।”
নিরঞ্জন একটু রেগে,
“আমি কোনো টাকা দিতে পারব না।”
নেহা শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“আপনাকে কোনো টাকা দিতে হবে না। আমি দেখে নেব।”
নিরঞ্জন কয়েক মুহূর্ত নেহার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“যা ভালো বুঝেন তাই করেন। আমি কিছু জানি না।”
কথা শেষ করে সে রুটি শেষ করে উঠে পড়ল। রিকশা নিয়ে বেরিয়ে গেল।
তুলসি খুশিতে নেহার দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।
“নতুন মা, তুমি সত্যি নিয়ে যাবে?”
নেহা হালকা হাসল। এই হাসিতে তার নিজের অবাক লাগছিল। কয়েক সপ্তাহ আগেও সে ভাবতে পারত না যে একদিন সে একটা গরিব ঘরের মেয়েকে কলেজ ট্রিপে নিয়ে যাওয়ার কথা বলবে। কিন্তু তুলসির সেই নির্দোষ আনন্দ দেখে তার মনটা নরম হয়ে যাচ্ছিল।
আমি বাসায় বসে ক্যামেরায় সব দেখছিলাম। নেহার এই পরিবর্তনটা আমাকে অবাক করছিল। সে যে শুধু বেঁচে থাকার জন্য কাজ করছে তা নয়—সে ধীরে ধীরে এই ছোট্ট পরিবারের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। আর এই জড়িয়ে পড়াটা আমাদের দাম্পত্য জীবনকেও নতুন করে নাড়া দিচ্ছিল।
কিন্তু প্রশ্নটা রয়েই গেল—এই নতুন সম্পর্ক কতদূর গড়াবে? আর নিরঞ্জনের এই নীরব আধিপত্য কবে শেষ হবে?
রাতে ঘরে ফিরে নেহা আমাকে বলল, “আমি তুলসিকে নিয়ে সোনারগাঁ ঘুরতে যাব। কলেজের ট্রিপ।”
আমি ভুরু কুঁচকে বললাম, “কী দরকার এসবের? তুমি কি এখন ওদের পরিবারের সদস্য হয়ে গেছ?”
নেহা একটু চুপ করে থেকে বলল,
“ছোট বাচ্চাটা একটু ঘুরুক। আর আমি একা নিয়ে গেলে যদি কোনো সমস্যা হয়, নিরঞ্জন তাহলে আমাদের আরও চাপ দেবে। এটা শুধু সাবধানতা।”
আমি আর কী বলব? শুধু ফিসফিস করে বললাম, “সাবধানে যেও। খেয়াল রেখো।”
---
সেদিন সকালে নেহা খুব সুন্দর করে সেজেছিল। অনেকদিন পর তার সেই পুরোনো আভা ফিরে এসেছিল। হালকা মেকআপ, সুন্দর শাড়ি, চুল খোলা। তুলসির জন্যও নতুন ড্রেস কিনে এনেছিল। ছোট মেয়েটা ড্রেস পরে আয়নার সামনে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। কিন্তু তার মুখটা খুশি খুশি নয়।
নেহা জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে তুলসি? ঘুরতে যাচ্ছ না, দুখি কেন তবে?”
তুলসি মাথা নিচু করে বলল, “বাবা যাচ্ছে না তাই মন খারাপ।”
নেহা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর আস্তে করে বলল,
“তুমি চাও তোমার বাবা যাক?”
তুলসি উজ্জ্বল চোখে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ নতুন মা।”
নেহা নিরঞ্জনের রুমের দরজায় টোকা দিল।
“আসতে পারি?”
ভেতর থেকে নিরঞ্জনের গলা ভেসে এল, “হ্যাঁ, আসুন।”
নিরঞ্জন জামা পরছিল। তার রোগা শরীরে পুরোনো শার্ট। নেহা দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,
“কোথাও যাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ, রিকশা চালাতে। টাকা না আনলে চলবে কী করে?”
নেহা নরম গলায় বলল,
“আজ না গেলে হয় না? মেয়ের সাথে একটু ঘুরতে গেলেন। সে খুব খুশি হবে।”
নিরঞ্জন একটু হাসল। সেই হাসিতে তিক্ততা।
“না, হবে না। আপনাদের মতো বড়লোকদের কাছে টাকা আয় করা সহজ। আমরা গরিব মানুষ। আর আপনি তুলসির যে খারাপ অভ্যাস করছেন, আপনি চলে গেলে পরে দেখব কী হয়।”
নেহার মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সে তুলসিকে আপন করে ফেলেছে। ছোট মেয়েটার সেই নির্দোষ ভালোবাসা তার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু নিরঞ্জনের কথায় সে বুঝতে পারল—এই সম্পর্ক স্থায়ী নয়।
তবু নেহা নাছোড়বান্দা। সে হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে নিরঞ্জনের হাত থেকে শার্টটা টেনে নিল।
“না, আজ আপনি যাবেন। যদি আমার কাছ থেকে শার্ট নিতে পারেন, তাহলে রিকশা চালাতে যান।”
নিরঞ্জন অবাক হয়ে দৌড় দিল শার্টের জন্য। কিন্তু নেহা দ্রুত বেরিয়ে দরজায় খিল লাগিয়ে দিল।
নিরঞ্জন দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল,
“খুলুন! কী করছেন?”
নেহা দরজার ওপাশ থেকে একটু ভয় পেয়ে বলল,
“কী করছেন আপনি? দরজা ভেঙে যাব ত।”
নিরঞ্জনের গলায় একটা অদ্ভুত সুর।
“ভয় পেলেন নাকি?”
নেহা দরজায় হাত রেখে দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি ভয় পাব? আর আপনাকে?”
ঘরের ভেতরে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। নিরঞ্জনের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। নেহার হৃদয় দ্রুত ধুকপুক করছিল। সে বুঝতে পারছিল না—এই খেলাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
আমি বাসায় বসে ক্যামেরায় সব দেখছিলাম। আমার হাত শক্ত হয়ে গিয়েছিল। নেহা এখন কতটা এগিয়ে গেছে। আর নিরঞ্জনের সাথে এই নতুন ধরনের সম্পর্ক আমার ভেতরে এক অদ্ভুত জ্বালা তৈরি করছিল।
দরজায় খিল লাগানোর পর ঘরের ভেতরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছিল। নিরঞ্জনের গলায় একটা চ্যালেঞ্জিং সুর। নেহার হৃদয় দ্রুত ধুকপুক করছিল, কিন্তু সে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল।
ঠিক তখনই পাশের রুম থেকে নিরঞ্জনের অন্ধ মা বেরিয়ে এলেন। বয়স্ক, ভঙ্গুর শরীর, চোখ দুটো সাদা। তিনি অস্থির গলায় বললেন,
“আরে কী করছ তোমরা? এত চেঁচামেচি কেন?”
বৃদ্ধা হাতড়ে হাতড়ে এসে দরজার খিল খুলে দিলেন। তারপর আর কিছু না বলে নিজের রুমের দিকে ফিরে গেলেন।
নিরঞ্জন দরজা খুলে বেরিয়ে এসে নেহার দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের হাসি হাসল।
“এখন কে বাঁচাবে আপনাকে?”
নেহা কিছু বলার আগেই তুলসি ওয়াশরুম থেকে ছুটে এল। তার চোখে উত্তেজনা।
“বাবা, তুমি চলো না! প্লিজ!”
নেহা তুলসির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নিরঞ্জনের দিকে তাকাল। তার গলায় একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা।
“তোমার বাবা অবশ্যই যাবে। কেন যাবে না?”
তুলসির মুখটা তৎক্ষণাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
“সত্যি বাবা? তুমি যাবে? ইয়াহু!”
নেহা সরাসরি নিরঞ্জনের চোখে চোখ রেখে বলল,
“হ্যাঁ, উনি যাবেন। আমি বলছি।”
নিরঞ্জন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার চোখে বিরক্তি, বিস্ময় আর একটা অদ্ভুত আত্মসমর্পণ মিশে ছিল। শেষমেশ সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “ঠিক আছে।”
---
বাসে ওঠার আগে আমি নেহার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সে তুলসির হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি তার কাছে গিয়ে চাপা গলায় বললাম,
“সাবধানে যেও। কোনো সমস্যা হলে আমাকে ফোন করো।”
নেহা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমিও চলো না।”
আমি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলাম। কী পরিচয়ে যাব? নেহার স্বামী? নাকি শুধু একজন অপরিচিত? এই জটিলতার মধ্যে আমি জড়াতে চাইছিলাম না। আমি শুধু মাথা নেড়ে বললাম, “তুমি সাবধানে থেকো।”
নেহা আর জোর করল না।
বাসে উঠে নেহা আর তুলসি পাশাপাশি বসল। তুলসি খুশিতে নেহার কোলে মাথা রেখে বসে আছে। নেহা তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। পুরো বাসটা কলেজের বাচ্চাদের হাসি-চিৎকারে মুখরিত। কলেজ পার্টি শুরু হয়েছে।
নিরঞ্জন একটু দূরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। তার মুখে কোনো হাসি নেই। আর নেহা? সে প্রথমবারের মতো এই ছোট্ট মেয়েটির সাথে এতটা স্বাভাবিকভাবে মিশে যাচ্ছে যে, আমি দূর থেকেও অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম।
কিন্তু আমার ভেতরে একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—এই ঘনিষ্ঠতা কি শুধুই তুলসির জন্য? নাকি নেহার ভেতরেও কিছু বদলে যাচ্ছে? আর নিরঞ্জনের সাথে এই নতুন সম্পর্ক কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের সবাইকে?
ভোরের আলো ফোটার আগেই নেহা চলে যেত। তুলসি যেন জেগে না ওঠে, সেজন্য সে চুপিসাড়ে উঠে পড়ত। টিনের ঘরের ছোট্ট রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সে এখন রুটি বানাতে শিখেছে। হাতে আটা মাখা, কপালে ঘাম। যে নেহা একদিন সকালে বিছানায় শুয়ে মেইডের হাতে চা খেত, আজ সে নিজের হাতে রুটি সেঁকছে।
নিরঞ্জন আর তুলসি ঘুম থেকে উঠে খেতে বসল। ছোট্ট টেবিলের সামনে তুলসি খুশিতে বসে আছে। নিরঞ্জন রুটি ছিঁড়ে মুখে দিয়ে বলল,
“নেহা জি, আরেকটা দেন তো।”
নেহা নীরবে আরেকটা গরম রুটি তার প্লেটে দিয়ে দিল। তার চোখে এখন আর তীব্র ঘৃণা নেই—শুধু একটা অভ্যস্ত ক্লান্তি।
তুলসি হঠাৎ উৎসাহ নিয়ে বলে উঠল,
“বাবা, আমাদের কলেজ থেকে ঘুরতে নিয়ে যাবে। একজনের জন্য এক হাজার টাকা করে। সবাই যাচ্ছে।”
নিরঞ্জন ভুরু কুঁচকে তাকাল।
“ঘোরাঘুরির কী দরকার? বাসায় বসে থাক। পড়াশোনা কর।”
তুলসির মুখটা হঠাৎ বিষাদে ভরে গেল। সে অনুনয়ের সুরে বলল,
“বাবা, প্লিজ… আমি যাই না। সবাই যাবে।”
নিরঞ্জন বিরক্ত হয়ে বলল,
“কলেজে খালি টাকাই লাগে? এদিকে ঘরে চাল-ডালের টাকা জোগাড় করতে পারি না, আর তুই ঘুরতে যেতে চাস?”
নেহা আর চুপ করে থাকতে পারল না। সে রান্না করতে করতে বলে উঠল,
“মানে কী? ছেলেমেয়েরা অবশ্যই ঘুরাঘুরি করবে, নতুন জায়গা দেখবে, শিখবে। এটা তো তাদের বড় হওয়ার অংশ।”
নিরঞ্জন একটু রেগে,
“আমি কোনো টাকা দিতে পারব না।”
নেহা শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“আপনাকে কোনো টাকা দিতে হবে না। আমি দেখে নেব।”
নিরঞ্জন কয়েক মুহূর্ত নেহার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“যা ভালো বুঝেন তাই করেন। আমি কিছু জানি না।”
কথা শেষ করে সে রুটি শেষ করে উঠে পড়ল। রিকশা নিয়ে বেরিয়ে গেল।
তুলসি খুশিতে নেহার দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।
“নতুন মা, তুমি সত্যি নিয়ে যাবে?”
নেহা হালকা হাসল। এই হাসিতে তার নিজের অবাক লাগছিল। কয়েক সপ্তাহ আগেও সে ভাবতে পারত না যে একদিন সে একটা গরিব ঘরের মেয়েকে কলেজ ট্রিপে নিয়ে যাওয়ার কথা বলবে। কিন্তু তুলসির সেই নির্দোষ আনন্দ দেখে তার মনটা নরম হয়ে যাচ্ছিল।
আমি বাসায় বসে ক্যামেরায় সব দেখছিলাম। নেহার এই পরিবর্তনটা আমাকে অবাক করছিল। সে যে শুধু বেঁচে থাকার জন্য কাজ করছে তা নয়—সে ধীরে ধীরে এই ছোট্ট পরিবারের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। আর এই জড়িয়ে পড়াটা আমাদের দাম্পত্য জীবনকেও নতুন করে নাড়া দিচ্ছিল।
কিন্তু প্রশ্নটা রয়েই গেল—এই নতুন সম্পর্ক কতদূর গড়াবে? আর নিরঞ্জনের এই নীরব আধিপত্য কবে শেষ হবে?
রাতে ঘরে ফিরে নেহা আমাকে বলল, “আমি তুলসিকে নিয়ে সোনারগাঁ ঘুরতে যাব। কলেজের ট্রিপ।”
আমি ভুরু কুঁচকে বললাম, “কী দরকার এসবের? তুমি কি এখন ওদের পরিবারের সদস্য হয়ে গেছ?”
নেহা একটু চুপ করে থেকে বলল,
“ছোট বাচ্চাটা একটু ঘুরুক। আর আমি একা নিয়ে গেলে যদি কোনো সমস্যা হয়, নিরঞ্জন তাহলে আমাদের আরও চাপ দেবে। এটা শুধু সাবধানতা।”
আমি আর কী বলব? শুধু ফিসফিস করে বললাম, “সাবধানে যেও। খেয়াল রেখো।”
---
সেদিন সকালে নেহা খুব সুন্দর করে সেজেছিল। অনেকদিন পর তার সেই পুরোনো আভা ফিরে এসেছিল। হালকা মেকআপ, সুন্দর শাড়ি, চুল খোলা। তুলসির জন্যও নতুন ড্রেস কিনে এনেছিল। ছোট মেয়েটা ড্রেস পরে আয়নার সামনে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। কিন্তু তার মুখটা খুশি খুশি নয়।
নেহা জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে তুলসি? ঘুরতে যাচ্ছ না, দুখি কেন তবে?”
তুলসি মাথা নিচু করে বলল, “বাবা যাচ্ছে না তাই মন খারাপ।”
নেহা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর আস্তে করে বলল,
“তুমি চাও তোমার বাবা যাক?”
তুলসি উজ্জ্বল চোখে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ নতুন মা।”
নেহা নিরঞ্জনের রুমের দরজায় টোকা দিল।
“আসতে পারি?”
ভেতর থেকে নিরঞ্জনের গলা ভেসে এল, “হ্যাঁ, আসুন।”
নিরঞ্জন জামা পরছিল। তার রোগা শরীরে পুরোনো শার্ট। নেহা দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,
“কোথাও যাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ, রিকশা চালাতে। টাকা না আনলে চলবে কী করে?”
নেহা নরম গলায় বলল,
“আজ না গেলে হয় না? মেয়ের সাথে একটু ঘুরতে গেলেন। সে খুব খুশি হবে।”
নিরঞ্জন একটু হাসল। সেই হাসিতে তিক্ততা।
“না, হবে না। আপনাদের মতো বড়লোকদের কাছে টাকা আয় করা সহজ। আমরা গরিব মানুষ। আর আপনি তুলসির যে খারাপ অভ্যাস করছেন, আপনি চলে গেলে পরে দেখব কী হয়।”
নেহার মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সে তুলসিকে আপন করে ফেলেছে। ছোট মেয়েটার সেই নির্দোষ ভালোবাসা তার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু নিরঞ্জনের কথায় সে বুঝতে পারল—এই সম্পর্ক স্থায়ী নয়।
তবু নেহা নাছোড়বান্দা। সে হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে নিরঞ্জনের হাত থেকে শার্টটা টেনে নিল।
“না, আজ আপনি যাবেন। যদি আমার কাছ থেকে শার্ট নিতে পারেন, তাহলে রিকশা চালাতে যান।”
নিরঞ্জন অবাক হয়ে দৌড় দিল শার্টের জন্য। কিন্তু নেহা দ্রুত বেরিয়ে দরজায় খিল লাগিয়ে দিল।
নিরঞ্জন দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল,
“খুলুন! কী করছেন?”
নেহা দরজার ওপাশ থেকে একটু ভয় পেয়ে বলল,
“কী করছেন আপনি? দরজা ভেঙে যাব ত।”
নিরঞ্জনের গলায় একটা অদ্ভুত সুর।
“ভয় পেলেন নাকি?”
নেহা দরজায় হাত রেখে দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি ভয় পাব? আর আপনাকে?”
ঘরের ভেতরে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। নিরঞ্জনের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। নেহার হৃদয় দ্রুত ধুকপুক করছিল। সে বুঝতে পারছিল না—এই খেলাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
আমি বাসায় বসে ক্যামেরায় সব দেখছিলাম। আমার হাত শক্ত হয়ে গিয়েছিল। নেহা এখন কতটা এগিয়ে গেছে। আর নিরঞ্জনের সাথে এই নতুন ধরনের সম্পর্ক আমার ভেতরে এক অদ্ভুত জ্বালা তৈরি করছিল।
দরজায় খিল লাগানোর পর ঘরের ভেতরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছিল। নিরঞ্জনের গলায় একটা চ্যালেঞ্জিং সুর। নেহার হৃদয় দ্রুত ধুকপুক করছিল, কিন্তু সে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল।
ঠিক তখনই পাশের রুম থেকে নিরঞ্জনের অন্ধ মা বেরিয়ে এলেন। বয়স্ক, ভঙ্গুর শরীর, চোখ দুটো সাদা। তিনি অস্থির গলায় বললেন,
“আরে কী করছ তোমরা? এত চেঁচামেচি কেন?”
বৃদ্ধা হাতড়ে হাতড়ে এসে দরজার খিল খুলে দিলেন। তারপর আর কিছু না বলে নিজের রুমের দিকে ফিরে গেলেন।
নিরঞ্জন দরজা খুলে বেরিয়ে এসে নেহার দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের হাসি হাসল।
“এখন কে বাঁচাবে আপনাকে?”
নেহা কিছু বলার আগেই তুলসি ওয়াশরুম থেকে ছুটে এল। তার চোখে উত্তেজনা।
“বাবা, তুমি চলো না! প্লিজ!”
নেহা তুলসির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নিরঞ্জনের দিকে তাকাল। তার গলায় একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা।
“তোমার বাবা অবশ্যই যাবে। কেন যাবে না?”
তুলসির মুখটা তৎক্ষণাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
“সত্যি বাবা? তুমি যাবে? ইয়াহু!”
নেহা সরাসরি নিরঞ্জনের চোখে চোখ রেখে বলল,
“হ্যাঁ, উনি যাবেন। আমি বলছি।”
নিরঞ্জন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার চোখে বিরক্তি, বিস্ময় আর একটা অদ্ভুত আত্মসমর্পণ মিশে ছিল। শেষমেশ সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “ঠিক আছে।”
---
বাসে ওঠার আগে আমি নেহার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সে তুলসির হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি তার কাছে গিয়ে চাপা গলায় বললাম,
“সাবধানে যেও। কোনো সমস্যা হলে আমাকে ফোন করো।”
নেহা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমিও চলো না।”
আমি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলাম। কী পরিচয়ে যাব? নেহার স্বামী? নাকি শুধু একজন অপরিচিত? এই জটিলতার মধ্যে আমি জড়াতে চাইছিলাম না। আমি শুধু মাথা নেড়ে বললাম, “তুমি সাবধানে থেকো।”
নেহা আর জোর করল না।
বাসে উঠে নেহা আর তুলসি পাশাপাশি বসল। তুলসি খুশিতে নেহার কোলে মাথা রেখে বসে আছে। নেহা তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। পুরো বাসটা কলেজের বাচ্চাদের হাসি-চিৎকারে মুখরিত। কলেজ পার্টি শুরু হয়েছে।
নিরঞ্জন একটু দূরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। তার মুখে কোনো হাসি নেই। আর নেহা? সে প্রথমবারের মতো এই ছোট্ট মেয়েটির সাথে এতটা স্বাভাবিকভাবে মিশে যাচ্ছে যে, আমি দূর থেকেও অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম।
কিন্তু আমার ভেতরে একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—এই ঘনিষ্ঠতা কি শুধুই তুলসির জন্য? নাকি নেহার ভেতরেও কিছু বদলে যাচ্ছে? আর নিরঞ্জনের সাথে এই নতুন সম্পর্ক কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের সবাইকে?


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)