Yesterday, 02:46 AM
(This post was last modified: 6 hours ago by Orbachin. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
১০।
আমি চোখেমুখে একটু পানি দিলাম। ধানমন্ডির এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাথরুমের বেসিনের পানির তাপমাত্রাও মনে হচ্ছে নিখুঁতভাবে সেট করা। পানিটা খুব বেশি ঠান্ডাও না, আবার গরমও না। একটা মোলায়েম, স্নিগ্ধ পরশ।
মুখে পানি ছিটিয়ে ঢাকা শহরের রাস্তার ধুলোবালি আর সারাদিনের ক্লান্তিটা খানিকটা ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করলাম। তোয়ালে স্ট্যান্ডে ঝোলানো ধবধবে সাদা, সুগন্ধি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। আমার ভেতরের সেই আদিম, ক্ষুধার্ত নেকড়েটা আয়নার ওপাশ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে যেন দাঁত বের করে হাসছে। আমি মনে মনে তাকে ধমক দিলাম, "চুপ করে থাক ব্যাটা! এটা মিরপুরের মেস না, এটা একটা ভদ্রলোকের ফ্ল্যাট।"
বাথরুম থেকে বেরিয়ে আমি আবার ড্রয়িংরুমের সেই বিশাল লেদার সোফায় এসে বসলাম। সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা বাতাসে শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। কিচেন থেকে খুব মৃদু একটা টুংটাং শব্দ আসছে। আনিকা নাওহার চা বানাচ্ছেন।
আমি গলাটা একটু চড়িয়ে বললাম, "আনিকা, আপনি চাইলে আমি চা বানাতে হেল্প করতে পারি।" কিচেন থেকে আনিকার সেই মোহনীয় কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "আরে না না, আপনাকে হেল্প করতে হবে না। আমার বানানো প্রায় শেষ।"
আমি সোফায় হেলান দিয়ে বসে রইলাম। একটু পরেই আনিকা একটা কাঠের ট্রে হাতে নিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। ট্রে-তে দুটো ধবধবে সাদা সিরামিকের মগ। মগগুলো দেখে দামি মনে হচ্ছে। উনি ট্রে-টা আমার সামনের গ্লাস-টপ সেন্ট্রাল টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর নিজের মগটার ওপর একটা ছোট পিরিচ দিয়ে সেটা ঢেকে দিলেন।
"রাশেদ, আপনি চা খান। গরম আছে। আমি জাস্ট একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি।"
"ঠিক আছে।"
আনিকা ঘুরে দাঁড়ালেন এবং নিজের বেডরুমের দিকে পা বাড়ালেন। আমি সোফায় স্থির হয়ে বসে রইলাম, কিন্তু আমার চোখ জোড়া যেন আঠা দিয়ে উনার শরীরের সাথে সেঁটে গেল। আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম উনার হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গির দিকে। কী অদ্ভুত একটা ছন্দ উনার হাঁটায়! কালো শাড়ির কুঁচিগুলো উনার প্রতিটি কদমের সাথে একটা মায়াবী ঢেউ তুলছে। উনার সেই নিখুঁত, সরু কোমর আর তার ঠিক নিচেই প্রশস্ত, আকর্ষণীয় নিতম্বের আন্দোলন— সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো ক্লাসিক্যাল ড্যান্সারের পারফরম্যান্স দেখছি। হাইহিল ছাড়া খালি পায়ে হাঁটছেন উনি, তবুও উনার হাঁটার মধ্যে এক ধরনের রাজকীয় আভিজাত্য। শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে একটু খসে পড়েছে, আর উনার ফর্সা, মসৃণ পিঠের অনেকটা অংশ করিডোরের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। আমি যেন সম্মোহিত হয়ে গেলাম। এত সুন্দর, এত অপরূপ একটা মানবদেহ কীভাবে হতে পারে!
আনিকা বেডরুমে ঢুকে গেলেন। এরপর করিডোরের শেষের দিক থেকে একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল। আমি শব্দ শুনে বুঝলাম, উনি বাথরুমে ঢুকেছেন। এবং ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মস্তিষ্কের ভেতরে একটা ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আমার মাথার ভেতরে থাকা সেই আদিম পুরুষটা ফিসফিস করে বলতে শুরু করল, "রাশেদ, যা না! একটু এগিয়ে গিয়ে করিডোরের দেয়ালের আড়াল থেকে উঁকি দে। হয়তো বাথরুমের দরজাটা পুরোপুরি ভেজানো নেই। হয়তো একটু ফাঁক আছে। তুই দেখতে পাবি উনি কীভাবে ওই কালো শাড়িটা শরীর থেকে খসিয়ে ফেলছেন। জাস্ট একবার ভাব, ওই কালো আবরণের নিচে উনার সেই ফর্সা, রোদ-পোহানো শরীরটা..."
আমার বুকের ভেতরটা ধকধক করতে লাগল। আমি সোফা থেকে প্রায় এক ইঞ্চি উঠেও পড়েছিলাম। আমার পায়ের পেশিগুলো উন্মুখ হয়ে আছে করিডোরের দিকে এগোতে। কিন্তু পরক্ষণেই আমার ভেতরের 'ভদ্র অনুবাদক' সত্তাটা কষে একটা থাপ্পড় মারল আমাকে। "রাশেদ! তুই কি পাগল হয়ে গেলি? তুই একজন শিক্ষিত ছেলে। তুই যদি এখন উঁকি দিস, আর উনি যদি কোনোভাবে বুঝতে পারেন, তোর আর কোনো সম্মান থাকবে? উনি তোকে পুলিশে না দিক, অন্তত ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বের করে দেবেন। তোর এই ছ্যাঁচড়ামির কোনো ক্ষমা নেই।"
আমি নিজেকে দমিয়ে ধপ করে আবার সোফায় বসে পড়লাম। দুই হাত দিয়ে নিজের মাথাটা চেপে ধরলাম। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি মন থেকে এই দৃশ্যগুলো সরাতে। আমি লজিক্যালি চিন্তা করার চেষ্টা করলাম— কিম জং উনের মিসাইল, ইউক্রেনের যুদ্ধ, মিরপুরের মেস, নিহাদের বাইকের ক্ষতিপূরণ। কিন্তু হায় রে! আমার এই মন এত বেহায়া কেন!
আমার সমস্ত লজিককে লাথি মেরে আমার কল্পনার ক্যানভাসে বারবার আনিকা নাওহারের নগ্ন শরীরের ছবি ভেসে উঠতে লাগল। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, উনি বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে উনার কালো ব্লাউজের হুকগুলো খুলছেন। উনার সেই ভরাট, উদ্ধত বক্ষদেশ মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। পানি ছেড়ে উনি যখন শাওয়ারের নিচে দাঁড়াচ্ছেন, পানির ফোঁটাগুলো উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতিক শরীরের প্রতিটি বাঁক বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। উনার ভেজা চুলগুলো পিঠে লেপ্টে আছে।
আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। আমার শরীরের নিচের দিকে একটা প্রচণ্ড চাপ আর উত্তেজনা তৈরি হতে শুরু করেছে। আমি দ্রুত টেবিল থেকে চায়ের মগটা তুলে নিলাম। গরম চা খেলে হয়তো আমার এই নোংরা, অবাধ্য স্নায়ুগুলো একটু শান্ত হবে।
আমি চা হাতে নিয়েই বসে রইলাম। কতক্ষণ বসে ছিলাম জানি না। ঢাকা শহরের এই কোলাহলমুক্ত, এসি-চলা ফ্ল্যাটের ভেতর সময় যেন থমকে আছে। বেশ কিছুক্ষণ পর, আমি যখন চায়ের মগে চুমুক দেওয়ার জন্য মগটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে গেছি, ঠিক তখনই বেডরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো।
আমি চোখ তুলে তাকালাম। আনিকা বেডরুম থেকে বেরিয়ে আসছেন।উনাকে দেখে আমি চায়ের মগে এমনভাবে বিষম খেলাম যে, গরম চা আমার গলায় আটকে গেল। আমি "খক খক" করে কাশতে শুরু করলাম। কোনোমতে মগটা টেবিলে নামিয়ে রেখে আমি চোখ বড় বড় করে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি আউলে গেলাম। আমার মস্তিষ্ক শর্টসার্কিট হয়ে গেল।
একটু আগে যে নারীকে আমি একটা কুচকুচে কালো শাড়িতে গ্রিক দেবীর মতো রাজকীয় আর রহস্যময়ী রূপে দেখেছি, সেই নারী এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপে আমার সামনে দাঁড়িয়ে। উনার পরনে এখন একটা খুব ঢিলেঢালা সাদা রঙের টি-শার্ট (যাকে আমরা ব্যাচেলররা বাংলায় সোজাসাপ্টা ‘গেঞ্জি’ বলি)। টি-শার্টটার সামনে ইংরেজিতে কী যেন লেখা। আর নিচে একটা ঢিলেঢালা শর্ট প্যান্ট বা প্লাজো টাইপের কিছু, যেটা উনার হাঁটুর ঠিক নিচ পর্যন্ত এসে শেষ হয়েছে।
উনার মুখে মেকআপের কোনো লেশমাত্র নেই। ঠোঁটের সেই গাঢ় লাল লিপস্টিক ধুয়ে ফেলা হয়েছে। মুখটা একদম ফ্রেশ, সতেজ। চুলগুলো একটা তোয়ালে দিয়ে মোছা হয়েছে, তবে এখনো আগায় হালকা ভেজা ভাব লেগে আছে। সব মিলিয়ে উনাকে এখন আর কোনো ছত্রিশ বছর বয়সী, লন্ডনপ্রবাসী, আইটি ফার্মের মালকিন মনে হচ্ছে না। উনাকে দেখে মনে হচ্ছে, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে পড়া কোনো তরুণী, যে মাত্রই ক্লাস শেষ করে হলে ফিরে ক্যাজুয়াল কাপড় পরেছে।
আমার দম আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো। একটা নারী শাড়িতে এত আবেদনময়ী হতে পারে, সেটা আমি জানতাম। কিন্তু একটা সাধারণ ঢিলেঢালা গেঞ্জি আর শর্ট প্লাজোতে যে একজন নারী এত বেশি ভয়ংকর সুন্দর আর আকর্ষণীয় হতে পারে, সেটা আমার ধারণার বাইরে ছিল। ঢিলেঢালা টি-শার্টের ভেতর দিয়ে উনার শরীরের সেই নিখুঁত ভরাট গঠনটা সরাসরি বোঝা না গেলেও, উনার হাঁটার সময় টি-শার্টের কাপড়ের ভেতর দিয়ে উনার বক্ষদেশের যে একটা সূক্ষ্ম মুভমেন্ট আমি খেয়াল করলাম, তা আমার রক্তচাপ বাড়িয়ে দিল। উনার হাঁটুর নিচ থেকে ফর্সা, মসৃণ পায়ের পাতা পর্যন্ত উন্মুক্ত।
"কী হলো রাশেদ? বিষম খেলেন নাকি?" আনিকা হাসিমুখে আমার সামনের সোফায় এসে বসলেন। বসার সময় উনার প্লাজোটা আরেকটু ওপরে উঠে গিয়ে উনার ফর্সা হাঁটুর কিছুটা অংশ বের হয়ে পড়ল।
আমি কোনোমতে কাশি থামিয়ে বললাম, "হ্যাঁ... মানে চা-টা একটু বেশি গরম তো, তাই গলায় লেগে গেছে। এখন ঠিক আছে।" আনিকা উনার মগের ওপর থেকে পিরিচটা সরিয়ে চায়ের মগটা হাতে নিলেন। উনার গা থেকে এখন আর সেই শ্যানেল পারফিউমের গন্ধ আসছে না। বরং একটা খুব রিফ্রেশিং, সাবান বা শাওয়ার জেলের হালকা, সতেজ ঘ্রাণ আসছে। এই ঘ্রাণটা আরও বেশি অন্তরঙ্গ, আরও বেশি ব্যক্তিগত।
"শাড়িতে আসলে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। ঢাকা শহরের যা ধুলাবালি আর গরম! তাই একবারে শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। কিছু মনে করেননি তো?" আনিকা চায়ে চুমুক দিয়ে খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললেন।
"না না, মনে করার কী আছে! আপনি আপনার বাসায় আছেন, আপনি কমফোর্টেবল থাকবেন, এটাই তো স্বাভাবিক," আমি আমার চোখের দৃষ্টিকে অত্যন্ত ভদ্রভাবে উনার মুখের ওপর স্থির রাখার চেষ্টা করে বললাম। যদিও আমার চোখ বারবার বিদ্রোহী হয়ে উনার টি-শার্টের গলার কাছের ফাঁকা অংশটার দিকে চলে যেতে চাইছিল।
আনিকা সোফায় একটা পা মুড়ে খুব আয়েশ করে বসলেন। এই বসার ভঙ্গিটা এতটাই ইনফর্মাল এবং অন্তরঙ্গ যে, আমার মনে হলো আমি যেন উনার খুব কাছের কেউ।
"জানেন রাশেদ, এই বাসাটা আসলে আমার মামার," আনিকা নিজে থেকেই গল্প শুরু করলেন। আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। "তাই নাকি? আপনার মামা কী করেন?"
আনিকা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। "মামা সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। পিডব্লিউডি বা ওইরকম কোনো একটা ডিপার্টমেন্টে খুব বড় পোস্টে ছিলেন। সোজাসাপ্টা বাংলায় বললে, আমার মামা ছিলেন একজন প্রচণ্ড দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ। সারা জীবন দুই হাত ভরে নিজের ইচ্ছেমতো ঘুষ খেয়েছেন। ঢাকা শহরের গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি মিলিয়ে উনার অনেকগুলো ফ্ল্যাট আছে। এই বিল্ডিংয়ের এই ফ্ল্যাটটাও উনার।"
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, "উনি এখন কোথায় থাকেন? দেশেই?"
"আরে না!" আনিকা হো হো করে হেসে উঠলেন। "বাংলাদেশের দুর্নীতিবাজ আমলাদের শেষ গন্তব্য কোথায় হয়, আপনি জানেন না? রিটায়ারমেন্টের পর মামা উনার অবৈধ টাকার পাহাড় নিয়ে সোজা ইউএসএ চলে গেছেন। এখন নিউইয়র্কে বসে বসে মসজিদে নামাজ পড়েন, আর ফেসবুকে বাংলাদেশের রাজনীতি আর ইসলামিক মূল্যবোধ নিয়ে বড় বড় জ্ঞানগর্ভ স্ট্যাটাস দেন। এটা একটা খুব ক্লাসিক প্যাটার্ন, তাই না?"
আমিও হাসলাম। "একদম। হালাল দুর্নীতির খুব সুন্দর একটা রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান। তো এই ফ্ল্যাটটা কি তাহলে পড়েই থাকে?"
"হ্যাঁ, পড়েই থাকে। মামার তো আর টাকার অভাব নেই যে ভাড়া দিয়ে দুই পয়সা কামাতে হবে। বরং ভাড়া দিলে ফ্ল্যাট নষ্ট হবে, এই ভয়ে তালা মেরে রেখেছেন। আমি বা আমার হাসব্যান্ড, অথবা আমার কাজিনরা যখন বিদেশ থেকে দেশে আসি, তখন আমরা কয়েকদিনের জন্য এই ফ্ল্যাটগুলো ব্যবহার করি। মামা আমাদের কাছে চাবি দিয়ে রেখেছেন।"
"আপনার হাসব্যান্ড..." আমি খুব সতর্কভাবে সুযোগটা লুফে নিলাম। "আপনার হাসব্যান্ড তো মনে হয় দেশে আসেন না খুব একটা?"
আনিকা চায়ের মগটা দুই হাত দিয়ে ধরে একটু উদাস ভঙ্গিতে বললেন, "ও খুব ব্যস্ত থাকে। ওর তো ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর পাশাপাশি নিজের রিসার্চের অনেক প্রজেক্ট থাকে। বছরে হয়তো দুই-এক সপ্তাহের জন্য একবার দেশে আসে। আমার মতো এত লম্বা ছুটি ম্যানেজ করতে পারে না।"
"আপনাদের বিয়ে হয়েছে কতদিন?" আমি খুব স্বাভাবিক একটা কৌতূহল দেখানোর ভান করে জিজ্ঞেস করলাম।
আনিকা একটু পেছনের দিকে হেলান দিলেন। উনার চোখ দুটো একটু ওপরের দিকে উঠল, যেন স্মৃতির পাতা হাতড়াচ্ছেন। "আমাদের বিয়ের বয়স তো প্রায় ছয় বছর হয়ে গেল।"
"আপনাদের কি লাভ ম্যারেজ ছিল?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। আমার ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত মাসোকিজম কাজ করছিল। যে নারীকে আমি মনে মনে এত তীব্রভাবে কামনা করছি, তার অন্য একজন পুরুষের সাথে ভালোবাসার গল্প শুনতে আমার বুকের ভেতরটা পুড়ছিল ঠিকই, কিন্তু আমি তবুও শুনতে চাইছিলাম।
আনিকা হাসলেন। সেই হাসিতে একটু নস্টালজিয়া ছিল। "হ্যাঁ, লাভ ম্যারেজ। আমাদের পরিচয় ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। আমি পড়তাম ইংলিশে, আর বেলাল— মানে আমার হাসব্যান্ড— ছিল আমার তিন ব্যাচ সিনিয়র। ইকোনোমিক্সে পড়ত। টিএসসিতে একটা কালচারাল প্রোগ্রামে আমাদের প্রথম পরিচয়। আমি সেদিন একটা আবৃত্তি করছিলাম, আর ও ছিল অর্গানাইজারদের একজন।"
"তারপর প্রেম?"
"তারপর তো ঢাকা ভার্সিটির চিরচেনা প্রেমের গল্প। হাকিম চত্বরে বসে চা খাওয়া, চারুকলায় আড্ডা, শাহবাগে রিকশায় ঘোরা। বেলাল খুব ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল। অনার্স-মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। ওর লক্ষ্যই ছিল বাইরে গিয়ে পিএইচডি করা। আমি যখন থার্ড ইয়ারে, তখন ও স্কলারশিপ নিয়ে ইউকে চলে গেল।"
"লং ডিসট্যান্স রিলেশনশিপ?" আমি মন্তব্য করলাম। "এটা তো খুব কঠিন জিনিস।"
"কঠিন তো বটেই," আনিকা একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "প্রায় চার বছর আমরা লং ডিসট্যান্সে ছিলাম। তখন তো আর হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের যুগ এত সহজ ছিল না। স্কাইপিতে কথা হতো। ও ওখানে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত, আমি এখানে। অনেক চড়াই-উতরাই ছিল। অনেকবার মনে হয়েছে এই সম্পর্ক টিকবে না। কিন্তু বেলাল মানুষ হিসেবে খুব স্টেডি। ওর ইমোশন কম, কিন্তু কমিটমেন্ট খুব স্ট্রং। ও পিএইচডি শেষ করে ওখানেই একটা ইউনিভার্সিটিতে টিচিং পজিশন পেয়ে গেল।"
আমি চুপচাপ শুনছিলাম। আনিকার টি-শার্টের গলার অংশটা একটু ঢিলা থাকায়, উনি যখন নড়াচড়া করছিলেন, তখন উনার ফর্সা বুকের উপরিভাগের একটা ছোট অংশ আমার চোখে পড়ছিল। আমি আমার দৃষ্টিকে উনার চোখের ওপর ধরে রাখার জন্য আপ্রাণ যুদ্ধ করছিলাম।
"তারপর ও দেশে ফিরে এল," আনিকা বলে চললেন। "এসে অফিশিয়ালি আমাকে প্রপোজ করল। আমাদের দুই পরিবার রাজি হলো। খুব ধুমধাম করে আমাদের বিয়ে হলো। বিয়ের মাস ছয়েক পর আমি স্পাউস ভিসায় ইউকে চলে গেলাম। তারপর থেকে তো ওখানেই আছি।"
"আপনার কি ওখানে গিয়ে একা লাগত না? নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ।"
"প্রথমে একটু লাগত। বেলাল তো সারাদিন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে থাকত। আমি বাসায় একা। তখন আমি একটা আইটি ফার্মে জব শুরু করলাম। কাজ শিখলাম। এরপর ধীরে ধীরে আমি নিজেই একটা ছোট আইটি ফার্ম দাঁড় করালাম। লেখালেখিটাও সিরিয়াসলি শুরু করলাম। আসলে মানুষ যখন খুব একা হয়ে যায়, তখন সে হয়তো টাকার পেছনে ছোটে, নয়তো শিল্পের পেছনে। আমি দুটোই করার চেষ্টা করেছি।"
আমি আনিকার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনার কথাগুলোর মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত বাস্তববোধ আছে। কোনো রোমান্টিক ন্যাকামি নেই। ছয় বছরের বিবাহিত জীবন উনাকে অনেক বেশি প্র্যাকটিক্যাল করে তুলেছে। "ছয় বছর তো অনেক সময়," আমি হঠাৎ করেই কথাটা বলে ফেললাম।
"হ্যাঁ, দেখতে দেখতে সময় চলে যায়," আনিকা চায়ের শেষ চুমুকটা দিলেন। আমাদের মাঝখানে একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। ড্রয়িংরুমের সেন্ট্রাল এসির মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
আমি উনার চোখের দিকে তাকালাম। এই নারী, যিনি এত সুন্দর, এত বুদ্ধিমতী, যার একটা সেটেলড লাইফ আছে— উনার ভেতরে কি কোনো শূন্যতা নেই? উনার লেখা কবিতাগুলোতে যে এত আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের কথা, এত একাকিত্বের কথা— সেটা কি শুধুই সাহিত্যের জন্য, নাকি উনার দাম্পত্য জীবনে কোনো ফাঁকি আছে?
আমার সাংবাদিক এবং অনুবাদক মস্তিষ্কের কৌতূহলটা হঠাৎ করে আমার ভদ্রতার সীমানাটা অতিক্রম করে গেল। আমি জানি, এই প্রশ্নটা করা আমার উচিত হচ্ছে না। এটা অত্যন্ত ব্যক্তিগত, এমনকি একটু অভদ্রোচিত একটা প্রশ্ন। কিন্তু আমার ভেতরের সেই অবদমিত ঈর্ষা, সেই অধিকারবোধ এবং উনার সম্পর্কে সবকিছু জানার একটা বন্য আগ্রহ আমাকে প্রশ্নটা করতে বাধ্য করল।
আমি চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে, উনার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, একটু নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বললাম—"আনিকা, আপনাদের বিয়ের ছয় বছর হয়ে গেছে। আপনাদের তো সেটেলড লাইফ। ছেলে-মেয়ে না থাকাটা কি আপনাদের কোনো কনশাস ডিসিশন?"
কথাটা বাতাস কেটে আনিকার কানে পৌঁছানোর পর, ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা যেন মুহূর্তের জন্য বরফ হয়ে গেল। আমি দেখলাম, আনিকার মুখের সেই ক্যাজুয়াল, সতেজ হাসিটা হঠাৎ করেই থেমে গেল। উনার বাদামি চোখের তারায় একটা অদ্ভুত অস্বস্তি আর বিব্রতকর ছায়া ফুটে উঠল। উনি উনার খালি চায়ের মগটার দিকে দৃষ্টি নামিয়ে নিলেন। উনার হাত দুটো একটু শক্ত হয়ে মগটাকে আঁকড়ে ধরল।আনিকা চুপ করে আছেন। উনার নীরবতা ফ্ল্যাটের বাতাসকে ভারী করে তুলছে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)