21-06-2026, 02:25 AM
**পর্ব ৩: নিরুপায়**
রাত তখন একটা বাজে। শহরের রাস্তা প্রায় ফাঁকা। আমরা দুজন কথা বলতে বলতে বাড়িতে ফিরলাম। গাড়ি থেকে নামতেই জোহরা বেগম নিজে গেইট খুলে দিলেন। তাঁর চোখে ঘুমের চিহ্ন নেই—শুধু উদ্বেগ আর অস্থিরতা।
আমি ক্লান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলাম,
“বাবা কোথায়?”
জোহরা বেগম ফিসফিস করে বললেন,
“এই তো একটু আগে ঘুমিয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে জানতে চাইছিলেন তোমরা কী করলে, কী অবস্থা। আমি কিছু বলতে পারিনি।”
তিনি আবার উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
“কী হয়েছে ওখানে? বলো তো সৈকত!”
আমি কিছু বলতে পারলাম না। গলা আটকে গিয়েছিল। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
নেহা আর সহ্য করতে পারল না। তার গলায় রাগ আর ঘৃণা মিশে উঠল।
“ও কেস করবে না, আম্মা। ও চায় আমি ওর বাসায় কাজ করি। রান্না করব, ঘরদোর দেখব, ওর মেয়ে আর বুড়ি মায়ের সেবা করব। বাস্টার্ডটা! আমি ওকে খুন করে ফেলব!”
জোহরা বেগমের চোখ কপালে উঠে গেল। তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়লেন,
“কী সাহস ওই ছোটলোকটার! আমার মেয়ে—যে কিনা এই বাড়ির একমাত্র আদরের সন্তান—তাকে কিনা ছোটলোকটার বাড়িতে কাজের লোক বানাতে চায়? এত বড় স্পর্ধা!”
ঠিক তখনই ড্রয়িং রুমের দরজায় শ্বশুর মি. রহমান এসে দাঁড়ালেন। ঘুম ভেঙে উঠে এসেছেন। চোখ লাল, মুখ ফ্যাকাশে। তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
“তা না কী হলে করবে নেহা? উপায় কী?”
নেহা আর আমি চুপ করে রইলাম। ঘরের ভেতরে একটা ভারী নীরবতা নেমে এল।
আমি শেষ চেষ্টা করলাম পরিস্থিতি শান্ত করতে।
“বাবা, আপনি ঘুমাতে যান। চিন্তা করবেন না। আমরা সামলে নেব।”
কিন্তু মি. রহমান আর শান্ত হলেন না। তিনি নেহার কাছে এগিয়ে এসে জোর দিয়ে বললেন,
“নেহা, বল সব। লুকাস না।”
নেহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কঠিন গলায় বলল,
“ও কেস করবে বাবা। তার স্ত্রীর হত্যার দায়ে। পুলিশে সব বলবে।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো বাড়িটা যেন থেমে গেল।
পরের দৃশ্যটা আমি কখনো ভুলব না। মি. রহমান—যিনি শহরের একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, যাঁর সামনে অনেকে মাথা নত করে—তিনি হঠাৎ নেহার পায়ে আছড়ে পড়লেন। দুই হাত দিয়ে নেহার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“নেহা… মা… আমাকে বাঁচা। আমি জেলে যেতে চাই না। আমার বয়স হয়েছে… আমি পারব না… তোরা যা করার কর, কিন্তু আমাকে বাঁচা…”
নেহা চমকে উঠে পিছিয়ে গেল।
“বাবা! কী করছ তুমি? উঠে দাঁড়াও!”
কিন্তু মি. রহমান উঠলেন না। তিনি মেঝেতে বসে কাঁদতে থাকলেন। সেই দৃশ্য দেখে আমার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। এই একই মানুষ একদিন আমাকে ঘরজামাই হতে বাধ্য করেছিলেন, নিজের ক্ষমতা আর টাকার জোর দেখিয়েছিলেন। আজ সেই মানুষটাই নিজের মেয়ের পায়ে পড়ে প্রাণ ভিক্ষা চাইছেন।
এই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম—টাকা, ক্ষমতা আর অহংকার কতটা ভঙ্গুর। নেহার বাইরের শক্ত অবয়বের আড়ালে এখন ভয় আর অসহায়তা। আমি, যে গ্রামের সাধারণ ছেলে, আজ এই পরিবারের সবচেয়ে বড় সংকটের সাক্ষী। আর নিরঞ্জন—যে একজন সাধারণ রিকশাওয়ালা—সে আজ আমাদের সবার জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। একটা দুর্ঘটনা পুরো একটা শক্তিশালী পরিবারকে নিরুপায় করে ফেলেছে।
এই রাতটা ভয়ংকরভাবে কেটেছিল। কেউ ঘুমাতে পারেনি। শুধু চিন্তা, ভয়, অপরাধবোধ আর আসন্ন বিপদের ছায়া।
পরদিন সকাল সাতটায় আমার ঘুম ভাঙল। জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়েছে, কিন্তু ঘরের ভেতরটা এখনও অন্ধকার মনে হচ্ছিল। পাশ ফিরে দেখি নেহা বিছানায় নেই। আমার পরনের শার্টটা এখনও ভেজা। গত রাতে নেহা আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল—এমনভাবে যে তার চোখের পানিতে আমার কাপড় ভিজে গিয়েছিল।
আমি কখনো নেহাকে এতটা ভেঙে পড়তে দেখিনি। সেই অহংকারী, আত্মবিশ্বাসী মেয়েটা, যে কখনো কারও সামনে দুর্বলতা দেখায় না—সে গত রাতে আমার বুকে মুখ গুঁজে শিশুর মতো কেঁদেছিল। আমার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। আমি তাকে অনেক ভালোবাসি। সত্যিই ভালোবাসি। কিন্তু এই বিপদের মুহূর্তে আমি তার কোনো সাহায্যই করতে পারছি না। শুধু অসহায়ের মতো পাশে দাঁড়িয়ে দেখছি।
একটু পর রুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখি নেহা ড্রয়িং রুমের সোফায় একা চুপচাপ বসে আছে। চুল এলোমেলো, চোখ ফোলা। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কিছুই দেখছে না।
আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। সে কোনো কথা না বলে আমার কাঁধে মাথা রেখে দিল। তার শরীরটা অস্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা। কয়েক মিনিট নীরবে কাটার পর সে ফিসফিস করে বলল,
“বাবাকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় আছে, সৈকত?”
আমি কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু তার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখলাম। কী বলব? সত্যি কথা বললে তো সে আরও ভেঙে পড়বে।
একটু পর জোহরা বেগম ঘুম থেকে উঠে এলেন। তাঁর চেহারাও রাত জাগা। তিনি নেহার সামনে এসে দাঁড়ালেন। গলা কাঁপছিল।
“নেহা, কী ভাবলি মা?”
নেহা আমার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তার নখ আমার তালুতে বিঁধছিল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে সে দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি যাব মা। বাবাকে বাঁচাতে হবে।”
জোহরা বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনি নেহাকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
“মা… সাবধানে যাস। আর আমাদের মাফ করে দিস। এই বিপদে তোকে এত বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে…”
নেহা কিছু বলল না। শুধু চুপ করে মায়ের বুকে মাথা রেখে রইল। সেই দৃশ্য দেখে আমার গলা বন্ধ হয়ে আসছিল। এই পরিবারের অহংকার, টাকা, ক্ষমতা—সবকিছু আজ একজন সাধারণ রিকশাওয়ালার সামনে নত হয়ে গেছে।
আমরা দুজন গাড়িতে উঠলাম। পুরো রাস্তায় প্রায় কোনো কথা হলো না। বস্তির দিকে যাওয়ার পথে আমি শেষ চেষ্টা করলাম তাকে সান্ত্বনা দিতে।
“নেহা, চিন্তা কোরো না। তুমি দিনের বেলা যা যা করতে হয় করে রেখো। আমি রাতে এসে তোমাকে নিয়ে আসব।”
নেহা একটু অদ্ভুতভাবে হাসল। তার হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না—শুধু একটা কালো, তিক্ততা।
“আজ ওই রিকশাওয়ালার খবর আছে।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
“কেন? কী করবে?”
নেহা জানালার বাইরে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“দেখবে… আজকের পর আর ডাকবে না।”
আমরা দুজনেই হেসে উঠলাম। কিন্তু সেই হাসি কান্নার চেয়েও ভয়ংকর ছিল। কষ্টের মাঝে এই হাসিটা যেন আমাদের দুজনের মধ্যে একটা অন্ধকার বন্ধন তৈরি করল।
গাড়িটা বস্তির দিকে এগিয়ে চলল। সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা কেউ জানে না।
সকাল দশটার কিছু আগে আমরা বস্তির একদম শেষ কোনায় পৌঁছালাম। চারপাশে তেমন কোনো বাড়িঘর নেই—শুধু কয়েকটা ছড়ানো-ছিটানো টিনের চালা আর কাঁচা রাস্তা। সরকারি অনুদানে তৈরি ছোট্ট একটা ঘর। ঘরের পাশেই নিরঞ্জনের রিকশাটা দাঁড়িয়ে আছে, মাটিতে কাদা লেগে।
আমি গাড়ি থেকে নেমে ঘরের সামনে গিয়ে ডাকলাম,
“কেউ আছেন?”
কয়েক সেকেন্ড পর নিরঞ্জন বেরিয়ে এল। গায়ে কোনো জামা নেই—শুধু একটা পুরোনো ধুতি কোমরে জড়ানো। তার রোগা শরীরে ঘাম চকচক করছে। সে আমাদের দেখে একটু হাসল, যেন এটাই স্বাভাবিক।
“আরে আপনারা! আসুন, ঘরে আসুন।”
আমি আর নেহা ঘরের ভেতর ঢুকলাম। তীব্র একটা গন্ধ নাকে এসে লাগল—ভেজা মাটি, পুরোনো কাপড়, রান্নার ধোঁয়া আর দারিদ্র্যের মিশ্রিত গন্ধ। নেহার মুখটা তৎক্ষণাৎ বিকৃত হয়ে গেল। সে যে অতিরিক্ত পরিষ্কারপরায়ণ, এখানে কীভাবে টিকবে তা ভেবেই আমার বুক কেঁপে উঠল।
নিরঞ্জন আমাদের বসতে বলে একটা প্লেটে কয়েকটা সন্দেশ আর দুই গ্লাস পানি এগিয়ে দিল। আমার তো দেখেই ঘৃণা লাগছিল, নেহার তো কথাই নেই। সে শুধু চুপ করে বসে রইল। সে তার বাবার জন্য এই ত্যাগ করছে।
নিরঞ্জন গলা পরিষ্কার করে বলল,
“আপনারা অনেক ভালো করেছেন যে এসেছেন। সকালেই আমার বউয়ের চিতা পুড়িয়েছি। ওই যে দরজার উপরে তার ছবি—প্রতিদিন সকালে এসে ধূপ দিবেন।”
তারপর সে নেহার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“আচ্ছা, আপনার নামটা কী?”
নেহা তার স্বভাবসুলভ অহংকার নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমাকে ম্যাডাম বলে ডাকবে। আমার নাম জেনে তোমার কী দরকার?”
নেহার অহংকার এখনও পুরোপুরি যায়নি। কিন্তু নিরঞ্জনের মুখে একটা চাপা হাসি ফুটে উঠল। সে শান্তভাবে বলল,
“আপনি তো আমার বাসায় কাজ করতে এসেছেন। তাহলে তো আপনাকে ‘খালা’ বলেই ডাকব। আপনারা তো কাজের বুয়াদের এভাবেই ডাকেন, তাই না?”
আমার ঠোঁটের কোণে একটু হাসি খেলে গেল। যে নেহা সারাজীবন দাম্ভিকতা আর অহংকার দেখিয়ে এসেছে, আজ একজন রিকশাওয়ালা তাকে “খালা” বলে সম্বোধন করে মজার পাত্রী বানিয়ে দিল। নেহার মুখ লাল হয়ে উঠল, কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না।
নেহা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমার নাম নেহা। আচ্ছা, তোমার মেয়ে কোথায়? তার নাম কী?”
নিরঞ্জন উত্তর দিল,
“তুলসি। ও এখন কলেজে গেছে।”
“আসুন নেহা জি, আপনাকে পুরো ঘরটা দেখাই।”
ঘর বলতে মাত্র দুটো ছোট ছোট রুম। একটা রুমে নিরঞ্জনের অসুস্থ বৃদ্ধ মা শুয়ে আছেন। সেখানেই তুলসি দাদির সাথে ঘুমায়। আরেকটা রুমে নিরঞ্জন আর তার স্ত্রী থাকতেন। বারান্দায় একটা পুরোনো চৌকি পাতা। বারান্দায় একটা গ্যাসের চুলা সেখানেই রান্না করা হয়।
সব ঘর ঘুরে দেখানোর সময় আমি চুপিসাড়ে ছোট ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন লাগিয়ে দিয়েছি। নেহাও বিষয়টা জানে না। যদি কোনো নির্যাতন বা অসম্মান হয় নেহার, তাহলে প্রমাণ থাকবে। পুলিশকে দেখাতে পারব।
সব দেখানো শেষ হলে আমি চলে আসার জন্য উঠলাম। নেহা আমাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিল। তার চোখে ভয়, ঘৃণা আর অসহায়তা মিশে আছে। আমি তার কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বললাম,
“সাবধানে থেকো। রাতে এসে নিয়ে যাব।”
নেহা কিছু বলল না। শুধু মাথা নেড়ে ঘরের দিকে ফিরে গেল।
গাড়িতে উঠে আমি রিয়ার ভিউ মিররে তাকালাম। ছোট্ট টিনের ঘরটা যেন নেহার স্বপ্নের প্রাসাদকে গিলে খাচ্ছে।
এই ত্যাগ কতদিন চলবে? আর কতটা নামবে আমাদের অহংকার?
রাত তখন একটা বাজে। শহরের রাস্তা প্রায় ফাঁকা। আমরা দুজন কথা বলতে বলতে বাড়িতে ফিরলাম। গাড়ি থেকে নামতেই জোহরা বেগম নিজে গেইট খুলে দিলেন। তাঁর চোখে ঘুমের চিহ্ন নেই—শুধু উদ্বেগ আর অস্থিরতা।
আমি ক্লান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলাম,
“বাবা কোথায়?”
জোহরা বেগম ফিসফিস করে বললেন,
“এই তো একটু আগে ঘুমিয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে জানতে চাইছিলেন তোমরা কী করলে, কী অবস্থা। আমি কিছু বলতে পারিনি।”
তিনি আবার উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
“কী হয়েছে ওখানে? বলো তো সৈকত!”
আমি কিছু বলতে পারলাম না। গলা আটকে গিয়েছিল। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
নেহা আর সহ্য করতে পারল না। তার গলায় রাগ আর ঘৃণা মিশে উঠল।
“ও কেস করবে না, আম্মা। ও চায় আমি ওর বাসায় কাজ করি। রান্না করব, ঘরদোর দেখব, ওর মেয়ে আর বুড়ি মায়ের সেবা করব। বাস্টার্ডটা! আমি ওকে খুন করে ফেলব!”
জোহরা বেগমের চোখ কপালে উঠে গেল। তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়লেন,
“কী সাহস ওই ছোটলোকটার! আমার মেয়ে—যে কিনা এই বাড়ির একমাত্র আদরের সন্তান—তাকে কিনা ছোটলোকটার বাড়িতে কাজের লোক বানাতে চায়? এত বড় স্পর্ধা!”
ঠিক তখনই ড্রয়িং রুমের দরজায় শ্বশুর মি. রহমান এসে দাঁড়ালেন। ঘুম ভেঙে উঠে এসেছেন। চোখ লাল, মুখ ফ্যাকাশে। তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
“তা না কী হলে করবে নেহা? উপায় কী?”
নেহা আর আমি চুপ করে রইলাম। ঘরের ভেতরে একটা ভারী নীরবতা নেমে এল।
আমি শেষ চেষ্টা করলাম পরিস্থিতি শান্ত করতে।
“বাবা, আপনি ঘুমাতে যান। চিন্তা করবেন না। আমরা সামলে নেব।”
কিন্তু মি. রহমান আর শান্ত হলেন না। তিনি নেহার কাছে এগিয়ে এসে জোর দিয়ে বললেন,
“নেহা, বল সব। লুকাস না।”
নেহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কঠিন গলায় বলল,
“ও কেস করবে বাবা। তার স্ত্রীর হত্যার দায়ে। পুলিশে সব বলবে।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো বাড়িটা যেন থেমে গেল।
পরের দৃশ্যটা আমি কখনো ভুলব না। মি. রহমান—যিনি শহরের একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, যাঁর সামনে অনেকে মাথা নত করে—তিনি হঠাৎ নেহার পায়ে আছড়ে পড়লেন। দুই হাত দিয়ে নেহার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“নেহা… মা… আমাকে বাঁচা। আমি জেলে যেতে চাই না। আমার বয়স হয়েছে… আমি পারব না… তোরা যা করার কর, কিন্তু আমাকে বাঁচা…”
নেহা চমকে উঠে পিছিয়ে গেল।
“বাবা! কী করছ তুমি? উঠে দাঁড়াও!”
কিন্তু মি. রহমান উঠলেন না। তিনি মেঝেতে বসে কাঁদতে থাকলেন। সেই দৃশ্য দেখে আমার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। এই একই মানুষ একদিন আমাকে ঘরজামাই হতে বাধ্য করেছিলেন, নিজের ক্ষমতা আর টাকার জোর দেখিয়েছিলেন। আজ সেই মানুষটাই নিজের মেয়ের পায়ে পড়ে প্রাণ ভিক্ষা চাইছেন।
এই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম—টাকা, ক্ষমতা আর অহংকার কতটা ভঙ্গুর। নেহার বাইরের শক্ত অবয়বের আড়ালে এখন ভয় আর অসহায়তা। আমি, যে গ্রামের সাধারণ ছেলে, আজ এই পরিবারের সবচেয়ে বড় সংকটের সাক্ষী। আর নিরঞ্জন—যে একজন সাধারণ রিকশাওয়ালা—সে আজ আমাদের সবার জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। একটা দুর্ঘটনা পুরো একটা শক্তিশালী পরিবারকে নিরুপায় করে ফেলেছে।
এই রাতটা ভয়ংকরভাবে কেটেছিল। কেউ ঘুমাতে পারেনি। শুধু চিন্তা, ভয়, অপরাধবোধ আর আসন্ন বিপদের ছায়া।
পরদিন সকাল সাতটায় আমার ঘুম ভাঙল। জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়েছে, কিন্তু ঘরের ভেতরটা এখনও অন্ধকার মনে হচ্ছিল। পাশ ফিরে দেখি নেহা বিছানায় নেই। আমার পরনের শার্টটা এখনও ভেজা। গত রাতে নেহা আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল—এমনভাবে যে তার চোখের পানিতে আমার কাপড় ভিজে গিয়েছিল।
আমি কখনো নেহাকে এতটা ভেঙে পড়তে দেখিনি। সেই অহংকারী, আত্মবিশ্বাসী মেয়েটা, যে কখনো কারও সামনে দুর্বলতা দেখায় না—সে গত রাতে আমার বুকে মুখ গুঁজে শিশুর মতো কেঁদেছিল। আমার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। আমি তাকে অনেক ভালোবাসি। সত্যিই ভালোবাসি। কিন্তু এই বিপদের মুহূর্তে আমি তার কোনো সাহায্যই করতে পারছি না। শুধু অসহায়ের মতো পাশে দাঁড়িয়ে দেখছি।
একটু পর রুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখি নেহা ড্রয়িং রুমের সোফায় একা চুপচাপ বসে আছে। চুল এলোমেলো, চোখ ফোলা। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কিছুই দেখছে না।
আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। সে কোনো কথা না বলে আমার কাঁধে মাথা রেখে দিল। তার শরীরটা অস্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা। কয়েক মিনিট নীরবে কাটার পর সে ফিসফিস করে বলল,
“বাবাকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় আছে, সৈকত?”
আমি কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু তার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখলাম। কী বলব? সত্যি কথা বললে তো সে আরও ভেঙে পড়বে।
একটু পর জোহরা বেগম ঘুম থেকে উঠে এলেন। তাঁর চেহারাও রাত জাগা। তিনি নেহার সামনে এসে দাঁড়ালেন। গলা কাঁপছিল।
“নেহা, কী ভাবলি মা?”
নেহা আমার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তার নখ আমার তালুতে বিঁধছিল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে সে দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি যাব মা। বাবাকে বাঁচাতে হবে।”
জোহরা বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনি নেহাকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
“মা… সাবধানে যাস। আর আমাদের মাফ করে দিস। এই বিপদে তোকে এত বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে…”
নেহা কিছু বলল না। শুধু চুপ করে মায়ের বুকে মাথা রেখে রইল। সেই দৃশ্য দেখে আমার গলা বন্ধ হয়ে আসছিল। এই পরিবারের অহংকার, টাকা, ক্ষমতা—সবকিছু আজ একজন সাধারণ রিকশাওয়ালার সামনে নত হয়ে গেছে।
আমরা দুজন গাড়িতে উঠলাম। পুরো রাস্তায় প্রায় কোনো কথা হলো না। বস্তির দিকে যাওয়ার পথে আমি শেষ চেষ্টা করলাম তাকে সান্ত্বনা দিতে।
“নেহা, চিন্তা কোরো না। তুমি দিনের বেলা যা যা করতে হয় করে রেখো। আমি রাতে এসে তোমাকে নিয়ে আসব।”
নেহা একটু অদ্ভুতভাবে হাসল। তার হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না—শুধু একটা কালো, তিক্ততা।
“আজ ওই রিকশাওয়ালার খবর আছে।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
“কেন? কী করবে?”
নেহা জানালার বাইরে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“দেখবে… আজকের পর আর ডাকবে না।”
আমরা দুজনেই হেসে উঠলাম। কিন্তু সেই হাসি কান্নার চেয়েও ভয়ংকর ছিল। কষ্টের মাঝে এই হাসিটা যেন আমাদের দুজনের মধ্যে একটা অন্ধকার বন্ধন তৈরি করল।
গাড়িটা বস্তির দিকে এগিয়ে চলল। সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা কেউ জানে না।
সকাল দশটার কিছু আগে আমরা বস্তির একদম শেষ কোনায় পৌঁছালাম। চারপাশে তেমন কোনো বাড়িঘর নেই—শুধু কয়েকটা ছড়ানো-ছিটানো টিনের চালা আর কাঁচা রাস্তা। সরকারি অনুদানে তৈরি ছোট্ট একটা ঘর। ঘরের পাশেই নিরঞ্জনের রিকশাটা দাঁড়িয়ে আছে, মাটিতে কাদা লেগে।
আমি গাড়ি থেকে নেমে ঘরের সামনে গিয়ে ডাকলাম,
“কেউ আছেন?”
কয়েক সেকেন্ড পর নিরঞ্জন বেরিয়ে এল। গায়ে কোনো জামা নেই—শুধু একটা পুরোনো ধুতি কোমরে জড়ানো। তার রোগা শরীরে ঘাম চকচক করছে। সে আমাদের দেখে একটু হাসল, যেন এটাই স্বাভাবিক।
“আরে আপনারা! আসুন, ঘরে আসুন।”
আমি আর নেহা ঘরের ভেতর ঢুকলাম। তীব্র একটা গন্ধ নাকে এসে লাগল—ভেজা মাটি, পুরোনো কাপড়, রান্নার ধোঁয়া আর দারিদ্র্যের মিশ্রিত গন্ধ। নেহার মুখটা তৎক্ষণাৎ বিকৃত হয়ে গেল। সে যে অতিরিক্ত পরিষ্কারপরায়ণ, এখানে কীভাবে টিকবে তা ভেবেই আমার বুক কেঁপে উঠল।
নিরঞ্জন আমাদের বসতে বলে একটা প্লেটে কয়েকটা সন্দেশ আর দুই গ্লাস পানি এগিয়ে দিল। আমার তো দেখেই ঘৃণা লাগছিল, নেহার তো কথাই নেই। সে শুধু চুপ করে বসে রইল। সে তার বাবার জন্য এই ত্যাগ করছে।
নিরঞ্জন গলা পরিষ্কার করে বলল,
“আপনারা অনেক ভালো করেছেন যে এসেছেন। সকালেই আমার বউয়ের চিতা পুড়িয়েছি। ওই যে দরজার উপরে তার ছবি—প্রতিদিন সকালে এসে ধূপ দিবেন।”
তারপর সে নেহার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“আচ্ছা, আপনার নামটা কী?”
নেহা তার স্বভাবসুলভ অহংকার নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমাকে ম্যাডাম বলে ডাকবে। আমার নাম জেনে তোমার কী দরকার?”
নেহার অহংকার এখনও পুরোপুরি যায়নি। কিন্তু নিরঞ্জনের মুখে একটা চাপা হাসি ফুটে উঠল। সে শান্তভাবে বলল,
“আপনি তো আমার বাসায় কাজ করতে এসেছেন। তাহলে তো আপনাকে ‘খালা’ বলেই ডাকব। আপনারা তো কাজের বুয়াদের এভাবেই ডাকেন, তাই না?”
আমার ঠোঁটের কোণে একটু হাসি খেলে গেল। যে নেহা সারাজীবন দাম্ভিকতা আর অহংকার দেখিয়ে এসেছে, আজ একজন রিকশাওয়ালা তাকে “খালা” বলে সম্বোধন করে মজার পাত্রী বানিয়ে দিল। নেহার মুখ লাল হয়ে উঠল, কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না।
নেহা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমার নাম নেহা। আচ্ছা, তোমার মেয়ে কোথায়? তার নাম কী?”
নিরঞ্জন উত্তর দিল,
“তুলসি। ও এখন কলেজে গেছে।”
“আসুন নেহা জি, আপনাকে পুরো ঘরটা দেখাই।”
ঘর বলতে মাত্র দুটো ছোট ছোট রুম। একটা রুমে নিরঞ্জনের অসুস্থ বৃদ্ধ মা শুয়ে আছেন। সেখানেই তুলসি দাদির সাথে ঘুমায়। আরেকটা রুমে নিরঞ্জন আর তার স্ত্রী থাকতেন। বারান্দায় একটা পুরোনো চৌকি পাতা। বারান্দায় একটা গ্যাসের চুলা সেখানেই রান্না করা হয়।
সব ঘর ঘুরে দেখানোর সময় আমি চুপিসাড়ে ছোট ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন লাগিয়ে দিয়েছি। নেহাও বিষয়টা জানে না। যদি কোনো নির্যাতন বা অসম্মান হয় নেহার, তাহলে প্রমাণ থাকবে। পুলিশকে দেখাতে পারব।
সব দেখানো শেষ হলে আমি চলে আসার জন্য উঠলাম। নেহা আমাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিল। তার চোখে ভয়, ঘৃণা আর অসহায়তা মিশে আছে। আমি তার কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বললাম,
“সাবধানে থেকো। রাতে এসে নিয়ে যাব।”
নেহা কিছু বলল না। শুধু মাথা নেড়ে ঘরের দিকে ফিরে গেল।
গাড়িতে উঠে আমি রিয়ার ভিউ মিররে তাকালাম। ছোট্ট টিনের ঘরটা যেন নেহার স্বপ্নের প্রাসাদকে গিলে খাচ্ছে।
এই ত্যাগ কতদিন চলবে? আর কতটা নামবে আমাদের অহংকার?


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)