21-06-2026, 01:09 AM
পর্ব ২: অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা
আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী। এক বছর।
আমি একা বসে আছি শোয়ার ঘরের বিছানায়। জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকার আকাশ দেখছি। আজকের এই দিনটাকে ঘিরে কোনো মোমবাতি, কোনো ফুল, কোনো হাসি নেই। নেহা সারাদিন আমার সাথে একবারও ভালো করে কথা বলেনি। সকালে শুধু একটা শুষ্ক “হ্যাপি অ্যানিভার্সারি” বলে দিয়েছিল, যেন কোনো ফর্মালিটি সেরে ফেলা। তারপর থেকে সে তার মায়ের সাথে ড্রয়িং রুমে বসে আছে। নতুন ড্রেসের ক্যাটালগ দেখছে, কোনটা কিনবে, কোনটা তার গায়ে মানাবে—এসব নিয়ে মগ্ন। আমি যেন এই বাড়ির একজন অতিথি মাত্র, কোনো স্বামী নই।
বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠছিল। আর সহ্য করতে না পেরে আমি উঠে পড়লাম। ধীর পায়ে ড্রয়িং রুমের দিকে গেলাম।
সেখানে দৃশ্যটা দেখে আমার হৃদয় আরও খানিকটা ভেঙে গেল। নেহা আর তার মা জোহরা বেগম দুজন মিলে সোফায় বসে টেবিলের উপর ছড়ানো নানা রঙের ড্রেসের ছবি দেখছেন। হাসি-ঠাট্টা, মেয়েলি আলোচনায় ঘর মুখরিত। আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলাম। কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকাল না।
ঠিক তখনই—
**দিং-দং! দিং-দং! দিং-দং!**
কলিং বেলটা হঠাৎ জোরে জোরে বেজে উঠল। একবার নয়, পরপর। যেন কেউ অধৈর্য হয়ে, জরুরি কোনো খবর নিয়ে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে।
আমার ভুরু কুঁচকে গেল। এখন শ্বশুর সাহেবের আসার কথা ছিল, কিন্তু তিনি কখনো এতটা অধৈর্য হন না। তাঁর ড্রাইভারও আজ ছুটিতে। যদি থাকতোও তবুও ত ওর সাহস হয় না, এভাবে কলিং বেল বাজাবে। তাহলে এমন অভদ্রের মতো বেল বাজাচ্ছে কে?
জোহরা বেগম একটু বিরক্ত হয়ে মেইডকে ডাকলেন,
“পপি! পপি, শোন! গেইটটা খুলে দেখ তো কে এমন করে বেল বাজাচ্ছে? কান ঝালাপালা হয়ে গেল!”
পপি দৌড়ে গেল। কিন্তু বেল বাজতেই থাকল—**দিং-দং! দিং-দং!** প্রতিটা শব্দ যেন বুকের ভেতর ধাক্কা মারছে।
অবশেষে গেইট খুলতেই বাইরের আলোয় দেখা গেল—শ্বশুর মি. রহমান। কিন্তু কী অবস্থা তাঁর! মুখ ফ্যাকাশে, চুল এলোমেলো, শার্টের কলার খোলা, হাঁপাচ্ছেন জোরে জোরে। যেন অনেক দূর থেকে দৌড়ে এসেছেন। চোখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক।
জোহরা বেগম তাঁকে দেখেই ছুটে গেলেন।
“ওগো! কী হয়েছে তোমার? এরকম অবস্থা কেন? কথা বলো!”
মি. রহমান কিছু বলছেন না। শুধু হাঁপাচ্ছেন। দুই হাতে হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘামে ভেজা কপাল।
নেহা উঠে দাঁড়াল। তার মুখেও উদ্বেগ ফুটে উঠেছে। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বাবার কাঁধে হাত রাখল।
“বাবা! কী হয়েছে? বলো কিছু! কথা বলো না কেন? কোনো অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে? অফিসে কিছু?”
মি. রহমান কোনোমতে মাথা তুললেন। তাঁর চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। গলা শুকিয়ে কাঁপছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে তিনি ফিসফিস করে বললেন,
“নেহা… সৈকত… সবাই… ভেতরে চলো।
এখনই।”
তাঁর কণ্ঠস্বরে এমন একটা ভয় আর জরুরি ভাব ছিল যে, পুরো ড্রয়িং রুমের বাতাস যেন ভারী হয়ে গেল। আমি দরজার কাছ থেকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। হৃদয়ের ধুকপুকানি বেড়ে গেছে।
কী হয়েছে?
কোনো খারাপ খবর?
নাকি এই বাড়ির জীবন আরও একটা বড় ঝড়ের মুখে পড়তে চলেছে?
পপি দৌড়ে এসে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে দাঁড়াল। তার হাত কাঁপছিল।
“সাহেবকে পানি দেন, ম্যাডাম।”
জোহরা বেগম কাঁপা হাতে গ্লাসটা নিয়ে মি. রহমানের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। তিনি অর্ধেক পানি এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেললেন। তারপর বাকিটা জোহরা বেগমের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়লেন সোফায়।
ঘরের ভেতরের বাতাস যেন জমে গিয়েছিল। কেউ কোনো কথা বলছিল না। শুধু মি. রহমানের জোরে জোরে হাঁপানোর শব্দ আর ঘড়ির টিকটিক।
অবশেষে তিনি আস্তে আস্তে মুখ খুললেন। গলা শুকনো, ভাঙা।
“আমি… অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি।”
জোহরা বেগমের চোখ বড় হয়ে গেল।
“ভুল? কী ভুল? কী হয়েছে বলো তো!”
নেহা বাবার পাশে বসে পড়ল। তার গলায় উদ্বেগ আর অধৈর্য মিশে আছে।
“বাবা, খুলে বলো। কিছু লুকিয়ে রেখ না।”
মি. রহমান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর কাঁপা গলায় বললেন,
“গাড়ি চালাচ্ছিলাম… রাস্তা প্রায় ফাঁকাই ছিল। হঠাৎ… সামনে একটা মহিলা এসে পড়ল। আমি ব্রেক চাপতে চেয়েছিলাম, কিন্তু… সময় পাইনি।”
সবাই চমকে উঠল।
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। পা দুটো যেন মাটিতে আটকে গেছে।
“কী বলছেন বাবা? ওই মহিলা কোথায়? সে কেমন আছে?”
মি. রহমান মাথা নিচু করে রইলেন। ঘামে ভেজা কপাল, চোখ দুটো লাল।
“আমি… জানি না। আমি ভয়ে গাড়ি থামাইনি। সোজা বাড়ির দিকে চলে এসেছি।”
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল। শুধু জোহরা বেগমের ফিসফিস করে কান্নার মতো শব্দ শোনা যাচ্ছিল। নেহার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার চোখে ভয়, বিস্ময় আর কিছুটা রাগ মিশে আছে।
আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। এটা শুধু একটা “ভুল” নয়। এটা একটা দুর্ঘটনা—যার পরিণতি ভয়ংকর হতে পারে। আমি নেহার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“নেহা, চলো। আমরা এখনই ওখানে যাই। দেখি কী অবস্থা। হয়তো এখনও কিছু করা যাবে।”
নেহা কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার মায়ের কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
“আম্মা, আমরা বাইরে যাচ্ছি। তুমি বাবার সাথে থাকো। চিন্তা কোরো না।”
জোহরা বেগম শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তাঁর চোখে পানি জমে আছে।
আমরা দুজন দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। বাইরের রাতের অন্ধকার যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। গাড়িতে উঠতে উঠতে আমার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
এই “ভুল”-এর দাম কতটা হতে পারে?
আর এই ঘটনার পর আমাদের জীবন কোন দিকে মোড় নেবে?
রাতের অন্ধকার রাস্তায় নেহা আর আমি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কোনো কথা বলছিলাম না দুজনেই। শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ আর আমাদের দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস। নেহার মুখ ফ্যাকাশে, হাত দুটো শক্ত করে মুঠো করা। আমার মাথায় শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—যদি মহিলা মারা যায়, তাহলে কী হবে?
ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমরা অনেক কষ্টে খবর নিলাম। স্থানীয় লোকজন ভয়ে কথা বলতে চাইছিল না। শেষে একজন দোকানদার ফিসফিস করে বলল, “মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। অবস্থা ভালো না।”
আমরা সোজা হাসপাতালের দিকে ছুটলাম।
হাসপাতালের বাইরের মর্গের সামনে পৌঁছাতেই দৃশ্যটা চোখে পড়ল। একটা সাদা চাদরে ঢাকা লাশ শুইয়ে রাখা হয়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন লম্বা, অসম্ভব রোগা মানুষ। শরীরে যেন মাংস বলতে কিছুই নেই—শুধু হাড় আর চামড়া। চোখ দুটো শূন্য, চেহারায় গভীর শোক আর হতবিহ্বলতা। তার পাশে ছোট্ট একটা মেয়ে—বয়স সাত কি আট। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, মায়ের চাদর ধরে টানছে।
আমার পা দুটো যেন মাটিতে আটকে গেল।
এই সেই মহিলা। যাকে বাবা অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন।
আমি নেহার দিকে তাকালাম। তার চোখেও একই ভয়। আমি চুপচাপ ভাবলাম—লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে কোনো কেস করার সামর্থ্য রাখে। হয়তো বাবাকে চিনতেও পারবে না। এখান থেকে চুপচাপ চলে যাওয়াই ভালো।
আমরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসছিলাম, ঠিক তখনই একজন ডাক্তার এসে লোকটার কাঁধে হাত রাখলেন।
“চিন্তা করো না, ভাই। আমি পুলিশে ফোন দিয়েছি। তারা আসছে।” ডাক্তার গম্ভীর গলায় বললেন, “তুমি কি লোকটাকে চিনতে পারবে? গাড়ির নম্বর দেখেছিলে?”
ছোট মেয়েটা কান্না থামিয়ে মুখ তুলল। তার চোখে অদ্ভুত একটা দৃঢ়তা।
“আমি জানি, ডাক্তার কাকু। আমার গাড়ির নাম্বার মনে আছে।”
ডাক্তার মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“তাই নাকি? খুব ভালো। পুলিশ এলে সব বলবে, ঠিক আছে? তোমার মায়ের জন্য।”
মেয়েটা ছোট্ট মাথা নেড়ে বলল, “আচ্ছা।”
এই কথাগুলো শুনে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। নেহার দিকে তাকালাম। সে-ও আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমাদের চোখে চোখ পড়তেই একটা নীরব বোঝাপড়া হলো।
হাসপাতালের বাইরের সেই নিস্তব্ধ করিডরে দাঁড়িয়ে আমরা দুজন একে অপরের দিকে তাকালাম। নেহার চোখে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত। আমার বুকের ভেতরটা তখনও ধুকপুক করছিল। আমি একজন নার্সকে ডেকে চুপিসাড়ে কয়েকটা টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে বললাম, “ওই ভদ্রলোককে একটু একান্তে ডেকে দিতে পারবেন? জরুরি দরকার।”
নার্সটি কিছুক্ষণ আমাদের দেখে নিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর লোকটাকে নিয়ে ফিরে এল। আমরা তাকে হাসপাতালের পেছনের একটা নির্জন বারান্দায় নিয়ে গেলাম। রাতের ঠান্ডা বাতাসে তার রোগা শরীরটা আরও ভঙ্গুর লাগছিল।
কাছ থেকে দেখে মনে হচ্ছিল তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, কিন্তু দারিদ্র্য আর দুঃখের ভারে তাকে পঞ্চাশের ওপরে মনে হচ্ছিল। চোখের নিচে কালি, গাল বসা, চুলে পাক ধরেছে।
আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম,
“আপনার নাম কী?”
লোকটি আমাদের দুজনকে সন্দেহের চোখে দেখে ধীরে ধীরে বলল,
“নিরঞ্জন। আপনারা কারা? আমার সাথে কী দরকার?”
আমি এক মুহূর্ত থেমে, যতটা সম্ভব নরম গলায় বললাম,
“দেখুন নিরঞ্জন দাদা, আপনার স্ত্রী যে চলে গেছেন, তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমরা জানি এটা আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। কিন্তু আপনার আর আপনার মেয়ের ভবিষ্যৎ যদি সুন্দর করতে চান, তাহলে আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পারি।”
নিরঞ্জনের চোখ সরু হয়ে গেল। সে কিছু বুঝতে পারছিল না।
“কী বলতে চাইছেন আপনি?”
এবার নেহা আর অপেক্ষা করল না। সে সরাসরি, ঠান্ডা ও দৃঢ় গলায় বলে উঠল,
“আপনি ভালোই বুঝতে পারছেন। আপনি কোনো কেস করতে পারবেন না। পুলিশি ঝামেলা, মামলা, কোর্ট—এসব আপনার মতো মানুষের জন্য শুধু কষ্ট বাড়াবে। আমরা দেখে নেব আপনার কী কী লাগবে। টাকা, চাকরি, মেয়ের পড়াশোনা—যা যা দরকার।”
নিরঞ্জন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে প্রথমে বিস্ময়, তারপর তীব্র ঘৃণা ফুটে উঠল।
“মানে… আপনারা আমাকে কিনতে এসেছেন? আমার স্ত্রীর লাশের দাম দিয়ে আমাকে চুপ করিয়ে দিতে চান?”
নেহা কোনো ইতস্তত না করে বলল,
“হ্যাঁ, ঠিক তাই বলেছেন।”
বাতাস যেন জমে গিয়েছিল। নিরঞ্জনের রোগা শরীরটা কাঁপছিল—রাগে, না দুঃখে, বোঝা যাচ্ছিল না।
ঠিক তখনই দূর থেকে পুলিশের সাইরেনের শব্দ ভেসে এল। নিরঞ্জন আমাদের দিকে আরেকবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কোনো কথা না বলে চলে গেল মর্গের দিকে।
আমরা দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। নেহার নখ আমার হাতের তালুতে বিঁধছিল। পুলিশ এসে নিরঞ্জনের সাথে কথা বলতে শুরু করল। আমরা একটু দূরে থেকে সব শুনছিলাম। প্রতিটা মুহূর্ত যেন একেকটা যুগ।
নিরঞ্জন প্রথমে চুপচাপ ছিল। পুলিশ যখন জিজ্ঞাসা করল গাড়ির নম্বর বা লোকটাকে চেনে কি না, তখন সে তার মেয়ের দিকে তাকাল। ছোট মেয়েটা মুখ খুলতে যাচ্ছিল—“আমি চিনি কাকু, সাদা গাড়ি…”—ঠিক তখনই নিরঞ্জন তার মেয়ের হাতে চিমটি কেটে দিল। মেয়েটা কেঁদে উঠলেও চুপ করে গেল।
নিরঞ্জন শান্ত গলায় পুলিশকে বলল,
“অন্ধকারে ভালো করে দেখতে পাইনি স্যার। গাড়ির নম্বরও মনে নেই। আর মনে হয় না এটা উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ছিল।”
পুলিশ কিছুক্ষণ জেরা করলেও নিরঞ্জন আর কিছু বলল না।
আমরা দূর থেকে সব দেখছিলাম। নেহার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। আমার কপালে ঘাম জমেছে।
এই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম—একটা ভয়ংকর খেলা শুরু হয়ে গেছে। নিরঞ্জন আজ চুপ করেছে, কিন্তু এই চুপ করা কতদিন চলবে? আর তার চোখের সেই ঘৃণার দৃষ্টিটা আমার মনে গেঁথে গিয়েছে।
কিছুক্ষণ পর, হাসপাতালের পেছনের সেই অন্ধকার বারান্দায় নিরঞ্জন আবার ফিরে এল। তার চোখে এক অদ্ভুত মিশ্রণ—শোক, ঘৃণা আর একটা হিসাবি ঠান্ডা ভাব। আমরা দুজন তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। বাতাস ভারী হয়ে আছে।
আমি প্রথমে কথা বললাম, গলা যথাসম্ভব নরম করে।
“ধন্যবাদ দাদা। আপনি আমাদের অনেক উপকার করলেন।”
নেহা আমাকে থামিয়ে দিয়ে সরাসরি এগিয়ে গেল। তার কণ্ঠস্বরে একটা অস্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস।
“কী লাগবে আপনার? চিন্তা করবেন না। যা যা দরকার, নির্দ্বিধায় বলে ফেলুন। টাকা, জমি, চাকরি—আমরা যতটা সম্ভব সাহায্য করব।”
নিরঞ্জন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে আমাদের দেখল। তার রোগা শরীরটা রাতের আলোয় আরও ভঙ্গুর দেখাচ্ছিল। তারপর ধীরে ধীরে, ভাঙা গলায় বলতে শুরু করল,
“আমি অত্যন্ত গরিব মানুষ। রিকশা চালাই। সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কোনোমতে দুটো পয়সা জোগাড় করি। আমার একমাত্র বউ… সে-ই ছিল সংসারের সব। ঘরদোর দেখাশোনা, রান্না, আমার মেয়ের লেখাপড়া, আমার বৃদ্ধ মায়ের সেবা—সব সে করত।”
সে একটু থেমে গেল। তার চোখ দুটো জ্বলছে। তারপর হঠাৎ করে সোজা নেহার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি চাই… আমার স্ত্রীর জায়গায় আপনি সব কাজ করবেন। আমার ঘরের দেখাশোনা করবেন। রান্না করবেন। আমার মেয়ে আর মায়ের সেবা করবেন।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো জায়গাটা নীরব হয়ে গেল।
নেহার চোখে আগুন জ্বলে উঠল। তার শরীর কাঁপছিল রাগে। পরের মুহূর্তেই সে সামনে এগিয়ে গিয়ে নিরঞ্জনের গালে জোরে একটা চড় মেরে বসল।
**চড়!**
“কী বলতে চাস তুই? অসভ্য কোথাকার! তোর সাহস কত বড়!”
আমি চমকে উঠেলাম আর নিরঞ্জনকে বললাম
“তোমার খেয়াল আছে তুমি কী বলছ?”
নিরঞ্জন গালে হাত দিয়ে পিছিয়ে গেল। তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, শুধু একটা ঠান্ডা, প্রতিশোধস্পৃহা ভাব। গাল লাল হয়ে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে বলল,
“যদি তা না হয়… তাহলে আগামীকাল সকাল দশটায় আমি পুলিশের কাছে যাব। সব বলে দেব। আপনারা যদি রাজি থাকেন, তাহলে আগামীকাল দশটায় বস্তির শেষ কোনায় আসবেন। যদি মানেন।”
কথা শেষ করে নিরঞ্জন আর একবারও পেছন ফিরে তাকাল না। সে ধীর পায়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। তার রোগা শরীরটা যেন ছায়ার মতো হারিয়ে গেল।
আমি আর নেহা সেখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। নেহার হাত এখনও কাঁপছে। আমার মাথার ভেতরটা ঘুরছে। এই লোকটা সত্যিই কী চায়? প্রতিশোধ? নাকি শুধুই একটা অসম্ভব দাবি করে আমাদের আরও গভীর গর্তে ঠেলে দিতে চায়?
রাতটা আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। আর আমাদের সামনে একটা ভয়ংকর সিদ্ধান্তের দরজা খুলে গেছে।
আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী। এক বছর।
আমি একা বসে আছি শোয়ার ঘরের বিছানায়। জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকার আকাশ দেখছি। আজকের এই দিনটাকে ঘিরে কোনো মোমবাতি, কোনো ফুল, কোনো হাসি নেই। নেহা সারাদিন আমার সাথে একবারও ভালো করে কথা বলেনি। সকালে শুধু একটা শুষ্ক “হ্যাপি অ্যানিভার্সারি” বলে দিয়েছিল, যেন কোনো ফর্মালিটি সেরে ফেলা। তারপর থেকে সে তার মায়ের সাথে ড্রয়িং রুমে বসে আছে। নতুন ড্রেসের ক্যাটালগ দেখছে, কোনটা কিনবে, কোনটা তার গায়ে মানাবে—এসব নিয়ে মগ্ন। আমি যেন এই বাড়ির একজন অতিথি মাত্র, কোনো স্বামী নই।
বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠছিল। আর সহ্য করতে না পেরে আমি উঠে পড়লাম। ধীর পায়ে ড্রয়িং রুমের দিকে গেলাম।
সেখানে দৃশ্যটা দেখে আমার হৃদয় আরও খানিকটা ভেঙে গেল। নেহা আর তার মা জোহরা বেগম দুজন মিলে সোফায় বসে টেবিলের উপর ছড়ানো নানা রঙের ড্রেসের ছবি দেখছেন। হাসি-ঠাট্টা, মেয়েলি আলোচনায় ঘর মুখরিত। আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলাম। কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকাল না।
ঠিক তখনই—
**দিং-দং! দিং-দং! দিং-দং!**
কলিং বেলটা হঠাৎ জোরে জোরে বেজে উঠল। একবার নয়, পরপর। যেন কেউ অধৈর্য হয়ে, জরুরি কোনো খবর নিয়ে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে।
আমার ভুরু কুঁচকে গেল। এখন শ্বশুর সাহেবের আসার কথা ছিল, কিন্তু তিনি কখনো এতটা অধৈর্য হন না। তাঁর ড্রাইভারও আজ ছুটিতে। যদি থাকতোও তবুও ত ওর সাহস হয় না, এভাবে কলিং বেল বাজাবে। তাহলে এমন অভদ্রের মতো বেল বাজাচ্ছে কে?
জোহরা বেগম একটু বিরক্ত হয়ে মেইডকে ডাকলেন,
“পপি! পপি, শোন! গেইটটা খুলে দেখ তো কে এমন করে বেল বাজাচ্ছে? কান ঝালাপালা হয়ে গেল!”
পপি দৌড়ে গেল। কিন্তু বেল বাজতেই থাকল—**দিং-দং! দিং-দং!** প্রতিটা শব্দ যেন বুকের ভেতর ধাক্কা মারছে।
অবশেষে গেইট খুলতেই বাইরের আলোয় দেখা গেল—শ্বশুর মি. রহমান। কিন্তু কী অবস্থা তাঁর! মুখ ফ্যাকাশে, চুল এলোমেলো, শার্টের কলার খোলা, হাঁপাচ্ছেন জোরে জোরে। যেন অনেক দূর থেকে দৌড়ে এসেছেন। চোখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক।
জোহরা বেগম তাঁকে দেখেই ছুটে গেলেন।
“ওগো! কী হয়েছে তোমার? এরকম অবস্থা কেন? কথা বলো!”
মি. রহমান কিছু বলছেন না। শুধু হাঁপাচ্ছেন। দুই হাতে হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘামে ভেজা কপাল।
নেহা উঠে দাঁড়াল। তার মুখেও উদ্বেগ ফুটে উঠেছে। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বাবার কাঁধে হাত রাখল।
“বাবা! কী হয়েছে? বলো কিছু! কথা বলো না কেন? কোনো অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে? অফিসে কিছু?”
মি. রহমান কোনোমতে মাথা তুললেন। তাঁর চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। গলা শুকিয়ে কাঁপছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে তিনি ফিসফিস করে বললেন,
“নেহা… সৈকত… সবাই… ভেতরে চলো।
এখনই।”
তাঁর কণ্ঠস্বরে এমন একটা ভয় আর জরুরি ভাব ছিল যে, পুরো ড্রয়িং রুমের বাতাস যেন ভারী হয়ে গেল। আমি দরজার কাছ থেকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। হৃদয়ের ধুকপুকানি বেড়ে গেছে।
কী হয়েছে?
কোনো খারাপ খবর?
নাকি এই বাড়ির জীবন আরও একটা বড় ঝড়ের মুখে পড়তে চলেছে?
পপি দৌড়ে এসে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে দাঁড়াল। তার হাত কাঁপছিল।
“সাহেবকে পানি দেন, ম্যাডাম।”
জোহরা বেগম কাঁপা হাতে গ্লাসটা নিয়ে মি. রহমানের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। তিনি অর্ধেক পানি এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেললেন। তারপর বাকিটা জোহরা বেগমের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়লেন সোফায়।
ঘরের ভেতরের বাতাস যেন জমে গিয়েছিল। কেউ কোনো কথা বলছিল না। শুধু মি. রহমানের জোরে জোরে হাঁপানোর শব্দ আর ঘড়ির টিকটিক।
অবশেষে তিনি আস্তে আস্তে মুখ খুললেন। গলা শুকনো, ভাঙা।
“আমি… অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি।”
জোহরা বেগমের চোখ বড় হয়ে গেল।
“ভুল? কী ভুল? কী হয়েছে বলো তো!”
নেহা বাবার পাশে বসে পড়ল। তার গলায় উদ্বেগ আর অধৈর্য মিশে আছে।
“বাবা, খুলে বলো। কিছু লুকিয়ে রেখ না।”
মি. রহমান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর কাঁপা গলায় বললেন,
“গাড়ি চালাচ্ছিলাম… রাস্তা প্রায় ফাঁকাই ছিল। হঠাৎ… সামনে একটা মহিলা এসে পড়ল। আমি ব্রেক চাপতে চেয়েছিলাম, কিন্তু… সময় পাইনি।”
সবাই চমকে উঠল।
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। পা দুটো যেন মাটিতে আটকে গেছে।
“কী বলছেন বাবা? ওই মহিলা কোথায়? সে কেমন আছে?”
মি. রহমান মাথা নিচু করে রইলেন। ঘামে ভেজা কপাল, চোখ দুটো লাল।
“আমি… জানি না। আমি ভয়ে গাড়ি থামাইনি। সোজা বাড়ির দিকে চলে এসেছি।”
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল। শুধু জোহরা বেগমের ফিসফিস করে কান্নার মতো শব্দ শোনা যাচ্ছিল। নেহার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার চোখে ভয়, বিস্ময় আর কিছুটা রাগ মিশে আছে।
আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। এটা শুধু একটা “ভুল” নয়। এটা একটা দুর্ঘটনা—যার পরিণতি ভয়ংকর হতে পারে। আমি নেহার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“নেহা, চলো। আমরা এখনই ওখানে যাই। দেখি কী অবস্থা। হয়তো এখনও কিছু করা যাবে।”
নেহা কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার মায়ের কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
“আম্মা, আমরা বাইরে যাচ্ছি। তুমি বাবার সাথে থাকো। চিন্তা কোরো না।”
জোহরা বেগম শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তাঁর চোখে পানি জমে আছে।
আমরা দুজন দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। বাইরের রাতের অন্ধকার যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। গাড়িতে উঠতে উঠতে আমার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
এই “ভুল”-এর দাম কতটা হতে পারে?
আর এই ঘটনার পর আমাদের জীবন কোন দিকে মোড় নেবে?
রাতের অন্ধকার রাস্তায় নেহা আর আমি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কোনো কথা বলছিলাম না দুজনেই। শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ আর আমাদের দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস। নেহার মুখ ফ্যাকাশে, হাত দুটো শক্ত করে মুঠো করা। আমার মাথায় শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—যদি মহিলা মারা যায়, তাহলে কী হবে?
ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমরা অনেক কষ্টে খবর নিলাম। স্থানীয় লোকজন ভয়ে কথা বলতে চাইছিল না। শেষে একজন দোকানদার ফিসফিস করে বলল, “মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। অবস্থা ভালো না।”
আমরা সোজা হাসপাতালের দিকে ছুটলাম।
হাসপাতালের বাইরের মর্গের সামনে পৌঁছাতেই দৃশ্যটা চোখে পড়ল। একটা সাদা চাদরে ঢাকা লাশ শুইয়ে রাখা হয়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন লম্বা, অসম্ভব রোগা মানুষ। শরীরে যেন মাংস বলতে কিছুই নেই—শুধু হাড় আর চামড়া। চোখ দুটো শূন্য, চেহারায় গভীর শোক আর হতবিহ্বলতা। তার পাশে ছোট্ট একটা মেয়ে—বয়স সাত কি আট। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, মায়ের চাদর ধরে টানছে।
আমার পা দুটো যেন মাটিতে আটকে গেল।
এই সেই মহিলা। যাকে বাবা অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন।
আমি নেহার দিকে তাকালাম। তার চোখেও একই ভয়। আমি চুপচাপ ভাবলাম—লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে কোনো কেস করার সামর্থ্য রাখে। হয়তো বাবাকে চিনতেও পারবে না। এখান থেকে চুপচাপ চলে যাওয়াই ভালো।
আমরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসছিলাম, ঠিক তখনই একজন ডাক্তার এসে লোকটার কাঁধে হাত রাখলেন।
“চিন্তা করো না, ভাই। আমি পুলিশে ফোন দিয়েছি। তারা আসছে।” ডাক্তার গম্ভীর গলায় বললেন, “তুমি কি লোকটাকে চিনতে পারবে? গাড়ির নম্বর দেখেছিলে?”
ছোট মেয়েটা কান্না থামিয়ে মুখ তুলল। তার চোখে অদ্ভুত একটা দৃঢ়তা।
“আমি জানি, ডাক্তার কাকু। আমার গাড়ির নাম্বার মনে আছে।”
ডাক্তার মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“তাই নাকি? খুব ভালো। পুলিশ এলে সব বলবে, ঠিক আছে? তোমার মায়ের জন্য।”
মেয়েটা ছোট্ট মাথা নেড়ে বলল, “আচ্ছা।”
এই কথাগুলো শুনে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। নেহার দিকে তাকালাম। সে-ও আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমাদের চোখে চোখ পড়তেই একটা নীরব বোঝাপড়া হলো।
হাসপাতালের বাইরের সেই নিস্তব্ধ করিডরে দাঁড়িয়ে আমরা দুজন একে অপরের দিকে তাকালাম। নেহার চোখে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত। আমার বুকের ভেতরটা তখনও ধুকপুক করছিল। আমি একজন নার্সকে ডেকে চুপিসাড়ে কয়েকটা টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে বললাম, “ওই ভদ্রলোককে একটু একান্তে ডেকে দিতে পারবেন? জরুরি দরকার।”
নার্সটি কিছুক্ষণ আমাদের দেখে নিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর লোকটাকে নিয়ে ফিরে এল। আমরা তাকে হাসপাতালের পেছনের একটা নির্জন বারান্দায় নিয়ে গেলাম। রাতের ঠান্ডা বাতাসে তার রোগা শরীরটা আরও ভঙ্গুর লাগছিল।
কাছ থেকে দেখে মনে হচ্ছিল তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, কিন্তু দারিদ্র্য আর দুঃখের ভারে তাকে পঞ্চাশের ওপরে মনে হচ্ছিল। চোখের নিচে কালি, গাল বসা, চুলে পাক ধরেছে।
আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম,
“আপনার নাম কী?”
লোকটি আমাদের দুজনকে সন্দেহের চোখে দেখে ধীরে ধীরে বলল,
“নিরঞ্জন। আপনারা কারা? আমার সাথে কী দরকার?”
আমি এক মুহূর্ত থেমে, যতটা সম্ভব নরম গলায় বললাম,
“দেখুন নিরঞ্জন দাদা, আপনার স্ত্রী যে চলে গেছেন, তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমরা জানি এটা আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। কিন্তু আপনার আর আপনার মেয়ের ভবিষ্যৎ যদি সুন্দর করতে চান, তাহলে আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পারি।”
নিরঞ্জনের চোখ সরু হয়ে গেল। সে কিছু বুঝতে পারছিল না।
“কী বলতে চাইছেন আপনি?”
এবার নেহা আর অপেক্ষা করল না। সে সরাসরি, ঠান্ডা ও দৃঢ় গলায় বলে উঠল,
“আপনি ভালোই বুঝতে পারছেন। আপনি কোনো কেস করতে পারবেন না। পুলিশি ঝামেলা, মামলা, কোর্ট—এসব আপনার মতো মানুষের জন্য শুধু কষ্ট বাড়াবে। আমরা দেখে নেব আপনার কী কী লাগবে। টাকা, চাকরি, মেয়ের পড়াশোনা—যা যা দরকার।”
নিরঞ্জন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে প্রথমে বিস্ময়, তারপর তীব্র ঘৃণা ফুটে উঠল।
“মানে… আপনারা আমাকে কিনতে এসেছেন? আমার স্ত্রীর লাশের দাম দিয়ে আমাকে চুপ করিয়ে দিতে চান?”
নেহা কোনো ইতস্তত না করে বলল,
“হ্যাঁ, ঠিক তাই বলেছেন।”
বাতাস যেন জমে গিয়েছিল। নিরঞ্জনের রোগা শরীরটা কাঁপছিল—রাগে, না দুঃখে, বোঝা যাচ্ছিল না।
ঠিক তখনই দূর থেকে পুলিশের সাইরেনের শব্দ ভেসে এল। নিরঞ্জন আমাদের দিকে আরেকবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কোনো কথা না বলে চলে গেল মর্গের দিকে।
আমরা দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। নেহার নখ আমার হাতের তালুতে বিঁধছিল। পুলিশ এসে নিরঞ্জনের সাথে কথা বলতে শুরু করল। আমরা একটু দূরে থেকে সব শুনছিলাম। প্রতিটা মুহূর্ত যেন একেকটা যুগ।
নিরঞ্জন প্রথমে চুপচাপ ছিল। পুলিশ যখন জিজ্ঞাসা করল গাড়ির নম্বর বা লোকটাকে চেনে কি না, তখন সে তার মেয়ের দিকে তাকাল। ছোট মেয়েটা মুখ খুলতে যাচ্ছিল—“আমি চিনি কাকু, সাদা গাড়ি…”—ঠিক তখনই নিরঞ্জন তার মেয়ের হাতে চিমটি কেটে দিল। মেয়েটা কেঁদে উঠলেও চুপ করে গেল।
নিরঞ্জন শান্ত গলায় পুলিশকে বলল,
“অন্ধকারে ভালো করে দেখতে পাইনি স্যার। গাড়ির নম্বরও মনে নেই। আর মনে হয় না এটা উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ছিল।”
পুলিশ কিছুক্ষণ জেরা করলেও নিরঞ্জন আর কিছু বলল না।
আমরা দূর থেকে সব দেখছিলাম। নেহার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। আমার কপালে ঘাম জমেছে।
এই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম—একটা ভয়ংকর খেলা শুরু হয়ে গেছে। নিরঞ্জন আজ চুপ করেছে, কিন্তু এই চুপ করা কতদিন চলবে? আর তার চোখের সেই ঘৃণার দৃষ্টিটা আমার মনে গেঁথে গিয়েছে।
কিছুক্ষণ পর, হাসপাতালের পেছনের সেই অন্ধকার বারান্দায় নিরঞ্জন আবার ফিরে এল। তার চোখে এক অদ্ভুত মিশ্রণ—শোক, ঘৃণা আর একটা হিসাবি ঠান্ডা ভাব। আমরা দুজন তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। বাতাস ভারী হয়ে আছে।
আমি প্রথমে কথা বললাম, গলা যথাসম্ভব নরম করে।
“ধন্যবাদ দাদা। আপনি আমাদের অনেক উপকার করলেন।”
নেহা আমাকে থামিয়ে দিয়ে সরাসরি এগিয়ে গেল। তার কণ্ঠস্বরে একটা অস্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস।
“কী লাগবে আপনার? চিন্তা করবেন না। যা যা দরকার, নির্দ্বিধায় বলে ফেলুন। টাকা, জমি, চাকরি—আমরা যতটা সম্ভব সাহায্য করব।”
নিরঞ্জন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে আমাদের দেখল। তার রোগা শরীরটা রাতের আলোয় আরও ভঙ্গুর দেখাচ্ছিল। তারপর ধীরে ধীরে, ভাঙা গলায় বলতে শুরু করল,
“আমি অত্যন্ত গরিব মানুষ। রিকশা চালাই। সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কোনোমতে দুটো পয়সা জোগাড় করি। আমার একমাত্র বউ… সে-ই ছিল সংসারের সব। ঘরদোর দেখাশোনা, রান্না, আমার মেয়ের লেখাপড়া, আমার বৃদ্ধ মায়ের সেবা—সব সে করত।”
সে একটু থেমে গেল। তার চোখ দুটো জ্বলছে। তারপর হঠাৎ করে সোজা নেহার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি চাই… আমার স্ত্রীর জায়গায় আপনি সব কাজ করবেন। আমার ঘরের দেখাশোনা করবেন। রান্না করবেন। আমার মেয়ে আর মায়ের সেবা করবেন।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো জায়গাটা নীরব হয়ে গেল।
নেহার চোখে আগুন জ্বলে উঠল। তার শরীর কাঁপছিল রাগে। পরের মুহূর্তেই সে সামনে এগিয়ে গিয়ে নিরঞ্জনের গালে জোরে একটা চড় মেরে বসল।
**চড়!**
“কী বলতে চাস তুই? অসভ্য কোথাকার! তোর সাহস কত বড়!”
আমি চমকে উঠেলাম আর নিরঞ্জনকে বললাম
“তোমার খেয়াল আছে তুমি কী বলছ?”
নিরঞ্জন গালে হাত দিয়ে পিছিয়ে গেল। তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, শুধু একটা ঠান্ডা, প্রতিশোধস্পৃহা ভাব। গাল লাল হয়ে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে বলল,
“যদি তা না হয়… তাহলে আগামীকাল সকাল দশটায় আমি পুলিশের কাছে যাব। সব বলে দেব। আপনারা যদি রাজি থাকেন, তাহলে আগামীকাল দশটায় বস্তির শেষ কোনায় আসবেন। যদি মানেন।”
কথা শেষ করে নিরঞ্জন আর একবারও পেছন ফিরে তাকাল না। সে ধীর পায়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। তার রোগা শরীরটা যেন ছায়ার মতো হারিয়ে গেল।
আমি আর নেহা সেখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। নেহার হাত এখনও কাঁপছে। আমার মাথার ভেতরটা ঘুরছে। এই লোকটা সত্যিই কী চায়? প্রতিশোধ? নাকি শুধুই একটা অসম্ভব দাবি করে আমাদের আরও গভীর গর্তে ঠেলে দিতে চায়?
রাতটা আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। আর আমাদের সামনে একটা ভয়ংকর সিদ্ধান্তের দরজা খুলে গেছে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)