20-06-2026, 09:59 PM
পরদিন সোমবার। কাকভোরেই সৌম্য বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। শ্রীময়ী তখনো আড়মোড়া ভাঙেনি, তার আগেই সৌম্য মুখে দুটো মুড়ি গুঁজে, ঝোলা ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে শহরের বাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। যাওয়ার সময় শ্রীময়ীর দিকে একটা আড়চোখে তাকানোর প্রয়োজনও বোধ করল না।
সারাটা দিন শ্রীময়ীর কাটল এক অদ্ভুত দোলাচলে। এক-একবার তার মনে হচ্ছিল—ওহোনা বৌদি যে পথের কথা বলেছে, সেই পথে পা বাড়ালে কেমন হয়? অন্তত এই নরকযন্ত্রণা আর শাশুড়ির মুখঝামটা থেকে তো রেহাই মিলবে! কিন্তু পরক্ষণেই তার বংশের আভিজাত্য, নিজের শিক্ষা আর আত্মসম্মানবোধ তাকে ভেতর থেকে চাবুক মারতে লাগল। না, এ কখনোই সম্ভব নয়! একটা ছোটজাতের জন-মজুরের কাছে নিজের সতীত্ব বিকিয়ে দিতে পারবে না। ছিঃ!
দুপুরবেলা শাশুড়ি মহামায়া পাড়ায় কার বাড়িতে যেন গেছেন। ঘর একেবারে নিঝুম। শ্রীময়ী বিছানায় শুয়ে শুয়ে মোবাইলটা ঘাঁটছিল। হঠাৎ অবচেতন মনেই সে ওহোনার নম্বরে একটা ফোন লাগিয়ে দিল। ফোনের ওপার থেকে রিং হওয়ার পর ওহোনা ফোনটা ধরল।
ওহোনা: "হ্যাঁ রে শ্রীময়ী, বল। কী খবর?"
শ্রীময়ী: "হ্যালো বৌদি... একটু ফ্রি আছো? আমাদের বাসায় আসতে পারবা একবার?"
ওহোনা: "হুম, আসতাছি। মিনিট দশেক দাঁড়া। জরুরি কিছু নাকি রে? ছেলেকে দুধ খাওয়াইতাছিলাম।"
শ্রীময়ী: "না না, এমন কিছু না। এমনিই আসো, একটু সময় নিয়ে এসো।"
প্রায় আধ ঘণ্টা পর ওহোনা এসে হাজির হলো। সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই একটু চড়া গলায় এদিক-ওদিক তাকিয়ে ডাকল—
ওহোনা: "কই রে শ্রীময়ী? কোথায় গেলি? তোর শাশুড়ি মাগী বুঝি বাইরে গেছে? নাইলে তো আমারে তোর ঘরে ডাকার সাহস কুলাইত না!"
শ্রীময়ী: (ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে) "তুমি ঘরে আসো বৌদি, ভেতরে এসে বসো।"
দুজনে খাটের ওপর বসল। ওহোনা তার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলল—
ওহোনা: "বল, কী বলবি? এত তড়িঘড়ি ডাকলি ক্যান?"
শ্রীময়ী: (একটু ইতস্তত করে গলাটা নামিয়ে) "বলছিলাম... তুমি তো শহরে অনেক ডাক্তার-কবিরাজ দেখাইছিলে। আজকাল তো টিভিতে-ফোনে শুনি কী সব 'টেস্টটিউব বাচ্চা' না কী যেন বলে! ওগুইলা কি আমাদের মতো মানুষের পক্ষে সম্ভব না বৌদি?"
ওহোনা: (একটু ভেবে) "কেন সম্ভব হইব না! সবই সম্ভব। তোর বরেরে সাথে নিয়া শহরে যা, কোনো বড় ডাক্তারের সাথে কথা বল। আজকাল বিজ্ঞানের যুগে কত কী হইতাছে!"
শ্রীময়ী: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) "কিন্তু ও কি টেস্ট করাইতে রাজি হবে?"
ওহোনা: "সেটা তো তোরে রাজি করাইতে হইব রে। তবে হ্যাঁ, ঐ সব টেস্টটিউব ফেস্টটিউব করতে গেলে কিন্তু খরচা কম না। আমি শুনছি পাঁচ-ছয় লাখ টাকা লাইগা যায় এক-একটা বাচ্চার লিগা।"
শ্রীময়ী: (মুখটা কালো হয়ে গেল) "ওহ! তাহলে তো মনে হয় ও কোনোদিনই রাজি হবে না। এত টাকা ও আমার জন্য খরচ করবে না বৌদি।"
কথার মাঝখানে শ্রীময়ী নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল—
শ্রীময়ী: "তুমি বসো বৌদি, আমি একটু জল নিয়ে আসি তোমার জন্য।"
ওহোনা: "আরে লাগবে না, তুই বোস।"
শ্রীময়ী: "আরে বসো তো তুমি, আমি আসতাছি।"
মিনিট পাঁচেক পর শ্রীময়ী রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল আর সাথে দুটো করকরে করে ভাজা রুই মাছ নিয়ে এল। ওহোনা জল আর মাছ ভাজা দেখে বেশ খুশিই হলো। জ্যৈষ্ঠের গরমে হাসফাস করতে করতে ওহোনা গ্লাসের জলটা এক ঢোক-দুই ঢোকে খেয়ে নিল। জল খাওয়ার সময় কয়েক ফোঁটা জল তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে নেমে গলার নিচে, গুমোট গরমে ঘেমে যাওয়া বুকের খাঁজে গিয়ে পড়ল। ওহোনার শরীর থেকে মাতাল করা একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। শ্রীময়ী সেটা খেয়াল করে ঘরের টেবিল ফ্যানের রেগুলেটরটা ঘুরিয়ে বাতাসটা আরও তেজ করে দিল।
ওহোনা: "তা, কিছু ভাবলি? কী করবি শেষমেশ?"
শ্রীময়ী খাটের খুঁটিটা ধরে মাথা নিচু করে বসল। তার শাড়ির আঁচলটা আঙুলের ফাঁকে জড়িয়ে মোচড়াতে মোচড়াতে অতি কষ্টে ভেতরের কান্নাটা চেপে বলল—
শ্রীময়ী: "জানি না বৌদি... কী করব আমি কিছুই জানি না। কাল রাতে আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে একটা কথা শুনে ফেলছি।"
ওহোনা: "কী কথা?"
শ্রীময়ী: "কাল রাতে ছেলে আর শাশুড়ি আড়ালে কথা বলতাছিল। শাশুড়ি বলছিল—আমারে ডিভোর্স দিয়ে যেন ও অন্য কোনো মেয়ে দেখে আবার বিয়ে করে। শাশুড়ি নাকি পাত্রীও খোঁজা শুরু করছে।"
ওহোনা: (চোখ বড় বড় করে) "বলিস কী রে! তা তোর বর কী বলল?"
শ্রীময়ী: (চোখের জলটা আর ধরে রাখতে পারল না) "সৌম্য মায়ের এই প্রস্তাবে কোনো রা-শব্দ করে নাই। কোনো প্রতিবাদও করে নাই। একদম চুপ করে ছিল। আমার মনে হয়, ও মনে মনে ভাবতাছে যে আমার হাত থেকে রেহাই পাইলে ও বাঁচে! ও নিজেই এখন আমারে তাড়াতে চায় বৌদি...।"
শ্রীময়ীর গলার স্বর বুজে এল। ওহোনা চুপ করে শ্রীময়ীর দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের ভেতর ফ্যানের সোঁ সোঁ আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ রইল না। শ্রীময়ীর মনে হলো, তার পায়ের তলার মাটিটা এবার সত্যি সত্যি সরে যাচ্ছে।
ওহোনা শ্রীময়ীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। শ্রীময়ীর কান্নার বেগ দেখে তার চোখেও কেমন এক আশঙ্কার ছায়া নামল। গলার স্বর আরও নামিয়ে, একটু শক্ত করে ওহোনা বলল—
ওহোনা: "দেখ শ্রীময়ী, আমি জানি তোর মনের ব্যাথা। কিন্তু এই মুহূর্তে তোর তো পিঠ দেয়ালে ঠেইক্যা গেছে রে ! কোনো উপায় নাই তোর। কাইল যখন দেখবি অপবাদ মাথায় নিয়া বাপের বাড়ির এক কোণে পইড়া আছিস, আর এদিকে তোর বর অন্য একটা ছুঁড়িরে বিয়া কইরা ঘরে তুলছে, তখন কান্নাকাটি কইরাও কিচ্ছু বদলাতে পারবি না। সমাজ তোরেই থুতু দিবে, তোর বরেরে কিচ্ছু বলবে না।"
শ্রীময়ী একদম নিশ্চুপ হয়ে রইল। তার মাথার ভেতর শাশুড়ির ডিভোর্সের চক্রান্ত আর বাপের বাড়ির লাঞ্ছনার ছবিটা যমদূতের মতো নাচতে লাগল। ওহোনা সুযোগ বুঝে আবার ওপরে চাল চালল—
ওহোনা: "আমি তোরে গ্যারান্টি দিয়া বলতেছি, তুই ঠকবি না। আসিফরে একবার ভরসা কর। আমি নিশ্চিত, তোর পেট বাঁধবেই বাঁধবে।"
শ্রীময়ী: (খুব ক্ষীণ, কাঁপাকাঁপা গলায়) "আমার পক্ষে সম্ভব না বৌদি... ওইভাবে নিজের সতীত্ব বিসর্জন দেওয়া আমার পক্ষে কোনোদিন সম্ভব না।"
ওহোনা: "সব সম্ভব! তুই শুধু একবার ওর কাছে যাবি, একবার মাত্র। দরকার হইলে আমি তোর সাথে থাকব, পাহারায় দাঁড়াব। তুই মনে মনে ভাববি—তোর কোনো বড় রোগ হইছে আর এটা তার চিকিৎসা। নিজের সংসার বাঁচাইতে এইটুক সহ্য করতে পারবি না তুই?"
শ্রীময়ী এবার আর কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার চোখের সামনে নিজের অতীতটা ভেসে উঠল। বিয়ের আগে সে কোনো ছেলের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি, কোনোদিন প্রেম-ভালোবাসার ধারেকাছেও যায়নি। সৌম্যই তার জীবনের প্রথম এবং একমাত্র পুরুষ। সেই শরীরে অন্য একটা পরপুরুষ, তাও আবার একজন খেটে খাওয়া দিনমজুরের ছোঁয়া লাগবে—ভাবতেই তার বমি আসতে লাগল।
ওহোনা: "তুই রাজি হইলে তোর এই শ্বশুরবাড়ির লোক তরে আর তাড়িয়ে দেওয়ার সাহস পাবে না। চাদরের মতো মাথায় তুইল্যা রাখবে। এই দেখ, তোর সামনেই আমি আসিফরে কল দিতাছি। তুই নিজে শোন।"
কথাটা বলেই ওহোনা তার ব্লাউজের ভাঁজ থেকে চট করে মোবাইল ফোনটা বের করল।
শ্রীময়ী: (আতঙ্কে শিউরে উঠে) "না না বৌদি! এমন জঘন্য কাজ করো না, তোমার পায়ে পড়ি। ফোনটা কাটো!"
ওহোনা: "আরে দাঁড়া তো তুই! কী ভীতুর ডিম রে বাবা!"
শ্রীময়ীর বারণ কানেই তুলল না ওহোনা। চটপট নম্বর খুঁজে আসিফের মোবাইলে কল লাগিয়ে দিল। নিঝুম ঘরের ভেতর শ্রীময়ীর বুকের ধকধকানি যেন ফ্যানের আওয়াজকেও ছাপিয়ে গেল। বেশ কতক্ষণ রিং হওয়ার পর ওপার থেকে একটা ভারী, খসখসে পুরুষালি গলা ভেসে এল। ওহোনা ফোনের স্পিকারটা অন করে দিল।
আসিফ: "হ্যাল্লো, ভাবি যে! কী ব্যাপার, কেমন আছ? অনেক দিন পর ফোন দিলা?"
ওহোনা: "এই তো আসিফ , ভালোই। না মানে, এমনি জাস্ট একটা কথা জিগানোর ছিল তোমারে।"
আসিফ: "কেন? জমিতে আবার লাঙল দেওয়া লাগব নাকি? তা কী বলো, কবে আসমু?"
ওহোনা: "আরে না, লাঙল না। বলছিলাম... আমার এক বান্ধবী খুব সমস্যায় পড়ছে। বিয়ে হইছে কদ্দিন হইয়া গেল, পেটে বাচ্চা আসতাছে না। শ্বশুরবাড়ির লোক তারে তাড়াইয়া দিতে চায়।"
ওপার থেকে আসিফ একটুখানি থামল। তারপর একটা চাপা খলখলে হাসি দিয়ে সবটা বুঝে নেওয়ার ভঙ্গিতে বলল—
আসিফ: "ও আচ্ছা, বুঝছি! তা কোনো সমস্যা নাই ভাবি, পাঠাইয়া দিও আমার কাছে। গাছ যখন ফল দেয় না, তখন ঠিকঠাক চাষ দিতে হয়।"
ওহোনা: (একটু থতমত খেয়ে) "না না মানে... ও তো খুব ভালো ঘরের মেয়ে, খুব ডরায়।"
আসিফ: "ভয়ের কোনো ব্যাপার না ভাবি। শুধু আমার পাওনাটা যেন ঠিকঠাক বুঝাইয়া দেয়, তাতেই হইব। আসিফ ভাইয়ের কামে কোনো খামতি থাকে না, তা তো তুমি জানোই।"
ওহোনা: "আচ্ছা ঠিক আছে ভাই, তোমারে পরে জানাব।"
বলেই ওহোনা তাড়াহুড়ো করে ফোনটা কেটে দিল।
ঘরের ভেতর আবার সেই নিস্তব্ধতা নেমে এল। শ্রীময়ীর মুখখানা একদম আমসি হয়ে গেছে। রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখে সে ওহোনার দিকে তাকিয়ে রইল। আসিফের সেই সোজা সাপটা আর আত্মবিশ্বাসী কথাগুলো যেন তার কানের পর্দায় তীরের মতো বিঁধে রইল। এক জোড়া সোনার দুল কিংবা কিছু পাওনার বিনিময়ে সে কি তবে নিজের নারীত্বের সবচেয়ে বড় জুয়াটা খেলতে চলেছে? তার অবচেতন মন যেন এক অজানা অন্ধকারের দিকে পা বাড়াতে শুরু করেছে।
সারাটা দিন শ্রীময়ীর কাটল এক অদ্ভুত দোলাচলে। এক-একবার তার মনে হচ্ছিল—ওহোনা বৌদি যে পথের কথা বলেছে, সেই পথে পা বাড়ালে কেমন হয়? অন্তত এই নরকযন্ত্রণা আর শাশুড়ির মুখঝামটা থেকে তো রেহাই মিলবে! কিন্তু পরক্ষণেই তার বংশের আভিজাত্য, নিজের শিক্ষা আর আত্মসম্মানবোধ তাকে ভেতর থেকে চাবুক মারতে লাগল। না, এ কখনোই সম্ভব নয়! একটা ছোটজাতের জন-মজুরের কাছে নিজের সতীত্ব বিকিয়ে দিতে পারবে না। ছিঃ!
দুপুরবেলা শাশুড়ি মহামায়া পাড়ায় কার বাড়িতে যেন গেছেন। ঘর একেবারে নিঝুম। শ্রীময়ী বিছানায় শুয়ে শুয়ে মোবাইলটা ঘাঁটছিল। হঠাৎ অবচেতন মনেই সে ওহোনার নম্বরে একটা ফোন লাগিয়ে দিল। ফোনের ওপার থেকে রিং হওয়ার পর ওহোনা ফোনটা ধরল।
ওহোনা: "হ্যাঁ রে শ্রীময়ী, বল। কী খবর?"
শ্রীময়ী: "হ্যালো বৌদি... একটু ফ্রি আছো? আমাদের বাসায় আসতে পারবা একবার?"
ওহোনা: "হুম, আসতাছি। মিনিট দশেক দাঁড়া। জরুরি কিছু নাকি রে? ছেলেকে দুধ খাওয়াইতাছিলাম।"
শ্রীময়ী: "না না, এমন কিছু না। এমনিই আসো, একটু সময় নিয়ে এসো।"
প্রায় আধ ঘণ্টা পর ওহোনা এসে হাজির হলো। সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই একটু চড়া গলায় এদিক-ওদিক তাকিয়ে ডাকল—
ওহোনা: "কই রে শ্রীময়ী? কোথায় গেলি? তোর শাশুড়ি মাগী বুঝি বাইরে গেছে? নাইলে তো আমারে তোর ঘরে ডাকার সাহস কুলাইত না!"
শ্রীময়ী: (ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে) "তুমি ঘরে আসো বৌদি, ভেতরে এসে বসো।"
দুজনে খাটের ওপর বসল। ওহোনা তার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলল—
ওহোনা: "বল, কী বলবি? এত তড়িঘড়ি ডাকলি ক্যান?"
শ্রীময়ী: (একটু ইতস্তত করে গলাটা নামিয়ে) "বলছিলাম... তুমি তো শহরে অনেক ডাক্তার-কবিরাজ দেখাইছিলে। আজকাল তো টিভিতে-ফোনে শুনি কী সব 'টেস্টটিউব বাচ্চা' না কী যেন বলে! ওগুইলা কি আমাদের মতো মানুষের পক্ষে সম্ভব না বৌদি?"
ওহোনা: (একটু ভেবে) "কেন সম্ভব হইব না! সবই সম্ভব। তোর বরেরে সাথে নিয়া শহরে যা, কোনো বড় ডাক্তারের সাথে কথা বল। আজকাল বিজ্ঞানের যুগে কত কী হইতাছে!"
শ্রীময়ী: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) "কিন্তু ও কি টেস্ট করাইতে রাজি হবে?"
ওহোনা: "সেটা তো তোরে রাজি করাইতে হইব রে। তবে হ্যাঁ, ঐ সব টেস্টটিউব ফেস্টটিউব করতে গেলে কিন্তু খরচা কম না। আমি শুনছি পাঁচ-ছয় লাখ টাকা লাইগা যায় এক-একটা বাচ্চার লিগা।"
শ্রীময়ী: (মুখটা কালো হয়ে গেল) "ওহ! তাহলে তো মনে হয় ও কোনোদিনই রাজি হবে না। এত টাকা ও আমার জন্য খরচ করবে না বৌদি।"
কথার মাঝখানে শ্রীময়ী নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল—
শ্রীময়ী: "তুমি বসো বৌদি, আমি একটু জল নিয়ে আসি তোমার জন্য।"
ওহোনা: "আরে লাগবে না, তুই বোস।"
শ্রীময়ী: "আরে বসো তো তুমি, আমি আসতাছি।"
মিনিট পাঁচেক পর শ্রীময়ী রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল আর সাথে দুটো করকরে করে ভাজা রুই মাছ নিয়ে এল। ওহোনা জল আর মাছ ভাজা দেখে বেশ খুশিই হলো। জ্যৈষ্ঠের গরমে হাসফাস করতে করতে ওহোনা গ্লাসের জলটা এক ঢোক-দুই ঢোকে খেয়ে নিল। জল খাওয়ার সময় কয়েক ফোঁটা জল তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে নেমে গলার নিচে, গুমোট গরমে ঘেমে যাওয়া বুকের খাঁজে গিয়ে পড়ল। ওহোনার শরীর থেকে মাতাল করা একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। শ্রীময়ী সেটা খেয়াল করে ঘরের টেবিল ফ্যানের রেগুলেটরটা ঘুরিয়ে বাতাসটা আরও তেজ করে দিল।
ওহোনা: "তা, কিছু ভাবলি? কী করবি শেষমেশ?"
শ্রীময়ী খাটের খুঁটিটা ধরে মাথা নিচু করে বসল। তার শাড়ির আঁচলটা আঙুলের ফাঁকে জড়িয়ে মোচড়াতে মোচড়াতে অতি কষ্টে ভেতরের কান্নাটা চেপে বলল—
শ্রীময়ী: "জানি না বৌদি... কী করব আমি কিছুই জানি না। কাল রাতে আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে একটা কথা শুনে ফেলছি।"
ওহোনা: "কী কথা?"
শ্রীময়ী: "কাল রাতে ছেলে আর শাশুড়ি আড়ালে কথা বলতাছিল। শাশুড়ি বলছিল—আমারে ডিভোর্স দিয়ে যেন ও অন্য কোনো মেয়ে দেখে আবার বিয়ে করে। শাশুড়ি নাকি পাত্রীও খোঁজা শুরু করছে।"
ওহোনা: (চোখ বড় বড় করে) "বলিস কী রে! তা তোর বর কী বলল?"
শ্রীময়ী: (চোখের জলটা আর ধরে রাখতে পারল না) "সৌম্য মায়ের এই প্রস্তাবে কোনো রা-শব্দ করে নাই। কোনো প্রতিবাদও করে নাই। একদম চুপ করে ছিল। আমার মনে হয়, ও মনে মনে ভাবতাছে যে আমার হাত থেকে রেহাই পাইলে ও বাঁচে! ও নিজেই এখন আমারে তাড়াতে চায় বৌদি...।"
শ্রীময়ীর গলার স্বর বুজে এল। ওহোনা চুপ করে শ্রীময়ীর দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের ভেতর ফ্যানের সোঁ সোঁ আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ রইল না। শ্রীময়ীর মনে হলো, তার পায়ের তলার মাটিটা এবার সত্যি সত্যি সরে যাচ্ছে।
ওহোনা শ্রীময়ীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। শ্রীময়ীর কান্নার বেগ দেখে তার চোখেও কেমন এক আশঙ্কার ছায়া নামল। গলার স্বর আরও নামিয়ে, একটু শক্ত করে ওহোনা বলল—
ওহোনা: "দেখ শ্রীময়ী, আমি জানি তোর মনের ব্যাথা। কিন্তু এই মুহূর্তে তোর তো পিঠ দেয়ালে ঠেইক্যা গেছে রে ! কোনো উপায় নাই তোর। কাইল যখন দেখবি অপবাদ মাথায় নিয়া বাপের বাড়ির এক কোণে পইড়া আছিস, আর এদিকে তোর বর অন্য একটা ছুঁড়িরে বিয়া কইরা ঘরে তুলছে, তখন কান্নাকাটি কইরাও কিচ্ছু বদলাতে পারবি না। সমাজ তোরেই থুতু দিবে, তোর বরেরে কিচ্ছু বলবে না।"
শ্রীময়ী একদম নিশ্চুপ হয়ে রইল। তার মাথার ভেতর শাশুড়ির ডিভোর্সের চক্রান্ত আর বাপের বাড়ির লাঞ্ছনার ছবিটা যমদূতের মতো নাচতে লাগল। ওহোনা সুযোগ বুঝে আবার ওপরে চাল চালল—
ওহোনা: "আমি তোরে গ্যারান্টি দিয়া বলতেছি, তুই ঠকবি না। আসিফরে একবার ভরসা কর। আমি নিশ্চিত, তোর পেট বাঁধবেই বাঁধবে।"
শ্রীময়ী: (খুব ক্ষীণ, কাঁপাকাঁপা গলায়) "আমার পক্ষে সম্ভব না বৌদি... ওইভাবে নিজের সতীত্ব বিসর্জন দেওয়া আমার পক্ষে কোনোদিন সম্ভব না।"
ওহোনা: "সব সম্ভব! তুই শুধু একবার ওর কাছে যাবি, একবার মাত্র। দরকার হইলে আমি তোর সাথে থাকব, পাহারায় দাঁড়াব। তুই মনে মনে ভাববি—তোর কোনো বড় রোগ হইছে আর এটা তার চিকিৎসা। নিজের সংসার বাঁচাইতে এইটুক সহ্য করতে পারবি না তুই?"
শ্রীময়ী এবার আর কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার চোখের সামনে নিজের অতীতটা ভেসে উঠল। বিয়ের আগে সে কোনো ছেলের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি, কোনোদিন প্রেম-ভালোবাসার ধারেকাছেও যায়নি। সৌম্যই তার জীবনের প্রথম এবং একমাত্র পুরুষ। সেই শরীরে অন্য একটা পরপুরুষ, তাও আবার একজন খেটে খাওয়া দিনমজুরের ছোঁয়া লাগবে—ভাবতেই তার বমি আসতে লাগল।
ওহোনা: "তুই রাজি হইলে তোর এই শ্বশুরবাড়ির লোক তরে আর তাড়িয়ে দেওয়ার সাহস পাবে না। চাদরের মতো মাথায় তুইল্যা রাখবে। এই দেখ, তোর সামনেই আমি আসিফরে কল দিতাছি। তুই নিজে শোন।"
কথাটা বলেই ওহোনা তার ব্লাউজের ভাঁজ থেকে চট করে মোবাইল ফোনটা বের করল।
শ্রীময়ী: (আতঙ্কে শিউরে উঠে) "না না বৌদি! এমন জঘন্য কাজ করো না, তোমার পায়ে পড়ি। ফোনটা কাটো!"
ওহোনা: "আরে দাঁড়া তো তুই! কী ভীতুর ডিম রে বাবা!"
শ্রীময়ীর বারণ কানেই তুলল না ওহোনা। চটপট নম্বর খুঁজে আসিফের মোবাইলে কল লাগিয়ে দিল। নিঝুম ঘরের ভেতর শ্রীময়ীর বুকের ধকধকানি যেন ফ্যানের আওয়াজকেও ছাপিয়ে গেল। বেশ কতক্ষণ রিং হওয়ার পর ওপার থেকে একটা ভারী, খসখসে পুরুষালি গলা ভেসে এল। ওহোনা ফোনের স্পিকারটা অন করে দিল।
আসিফ: "হ্যাল্লো, ভাবি যে! কী ব্যাপার, কেমন আছ? অনেক দিন পর ফোন দিলা?"
ওহোনা: "এই তো আসিফ , ভালোই। না মানে, এমনি জাস্ট একটা কথা জিগানোর ছিল তোমারে।"
আসিফ: "কেন? জমিতে আবার লাঙল দেওয়া লাগব নাকি? তা কী বলো, কবে আসমু?"
ওহোনা: "আরে না, লাঙল না। বলছিলাম... আমার এক বান্ধবী খুব সমস্যায় পড়ছে। বিয়ে হইছে কদ্দিন হইয়া গেল, পেটে বাচ্চা আসতাছে না। শ্বশুরবাড়ির লোক তারে তাড়াইয়া দিতে চায়।"
ওপার থেকে আসিফ একটুখানি থামল। তারপর একটা চাপা খলখলে হাসি দিয়ে সবটা বুঝে নেওয়ার ভঙ্গিতে বলল—
আসিফ: "ও আচ্ছা, বুঝছি! তা কোনো সমস্যা নাই ভাবি, পাঠাইয়া দিও আমার কাছে। গাছ যখন ফল দেয় না, তখন ঠিকঠাক চাষ দিতে হয়।"
ওহোনা: (একটু থতমত খেয়ে) "না না মানে... ও তো খুব ভালো ঘরের মেয়ে, খুব ডরায়।"
আসিফ: "ভয়ের কোনো ব্যাপার না ভাবি। শুধু আমার পাওনাটা যেন ঠিকঠাক বুঝাইয়া দেয়, তাতেই হইব। আসিফ ভাইয়ের কামে কোনো খামতি থাকে না, তা তো তুমি জানোই।"
ওহোনা: "আচ্ছা ঠিক আছে ভাই, তোমারে পরে জানাব।"
বলেই ওহোনা তাড়াহুড়ো করে ফোনটা কেটে দিল।
ঘরের ভেতর আবার সেই নিস্তব্ধতা নেমে এল। শ্রীময়ীর মুখখানা একদম আমসি হয়ে গেছে। রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখে সে ওহোনার দিকে তাকিয়ে রইল। আসিফের সেই সোজা সাপটা আর আত্মবিশ্বাসী কথাগুলো যেন তার কানের পর্দায় তীরের মতো বিঁধে রইল। এক জোড়া সোনার দুল কিংবা কিছু পাওনার বিনিময়ে সে কি তবে নিজের নারীত্বের সবচেয়ে বড় জুয়াটা খেলতে চলেছে? তার অবচেতন মন যেন এক অজানা অন্ধকারের দিকে পা বাড়াতে শুরু করেছে।



![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)