20-06-2026, 08:22 AM
পর্ব ১: সাধের উঠান ও শাশুড়ির বিষবাণ
জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুর। ছায়াবাজ গ্রামটায় আজ একটু উৎসবের আমেজ। দিয়া ভাবির সাধের অনুষ্ঠান। দিয়াদের দোতলা দালানের মস্ত বড় উঠানে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। চারপাশ থেকে পাড়া-পড়শী, জ্যাঠাই-খুড়ি আর বউ-ঝিদের আনাগোনা। বাতাসে কচি পাঁঠার মাংস আর গোবিন্দভোগ চালের পায়েসের সুবাস।
উঠানের এক কোণে একটা কাঠের সোফায় সেজেগুজে বসে আছে দিয়া। গা ভর্তি সোনার গয়না, কপালে বড় লাল সিঁদুরের টিপ, লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন আস্ত একটা লক্ষ্মী প্রতিমা। পাশে বসে পাড়ার বউরা কেউ ঠাট্টা-তামাশা করছে, কেউ বা দিয়ার গোলগাল পেটটা দেখিয়ে বলছে, "লক্ষণ তো পুরা কোল আলো করা পুত্তুর সন্তানের রে দিয়া!"
চারপাশে এতো কোলাহল, মিষ্টি একটা পরিবেশ, কিন্তু শ্রীময়ীর কানে সেসব কিছুই ঢুকছে না। সে বসে আছে তার শাশুড়ি মহামায়া দেবীর ঠিক গা ঘেঁষে। মহামায়ার মুখটা সকাল থেকেই তিতা করলার মতো হয়ে আছে। একে তো অন্যের ঘরের সুখ সহ্য হয় না, তার ওপর নিজের ঘরে কোনো 'সুসংবাদ' নাই। শ্রীময়ীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে একটা চিলতে থুতু ফেললেন মহামায়া। তারপর ফিসফিসানি অথচ ধারালো গলায় শুরু করলেন—
শাশুড়ি: "আমার যে কবে ভাগ্য হইবো, একটু নাতি-নাতনির মুখ দেখুম! কপালটাই পোড়া আমার। দুনিয়ার সব মাগীগো কোলে ছাও-পাও খেলে, আর আমার ঘরে একখান অলক্ষ্মী আইসা জাঁইতা বসছে!"
শ্রীময়ী মাথা নিচু করে রইল। শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে চোখ দুটো বুজে ফেলল। এই তিন বছরে এমন কথা তার নিত্যদিনের সঙ্গী। ডাক্তার-কবিরাজ, শিবের মাথায় জল ঢালা, মাদুলি—কিছুই বাকি রাখেনি সে। অথচ বছর খানেক আগে একবার খুব মিনতি করে স্বামী সৌম্যকে বলেছিল—
শ্রীময়ী: "ওগো, ডাক্তার তো আমার কোনো সমস্যা পায় নাই। তুমি যদি একবার শহরে গিয়া একটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাইতা...।"
ঐ কথা শোনামাত্র সৌম্য যেন বাঘের মতো গর্জে উঠেছিল। খাটের ওপর লাথি মেরে বলেছিল—
সৌম্য: "তর এতো বড় সাহস? তুই আমারে নপুংসক কবি? নিজের বাঝা (বন্ধ্যা) দোষ ঢাকনের লিগা আমার ওপর দোষ চাপাস? আর কোনোদিন যদি এই কথা মুখে আনছস, "
এই কথা যদি শাশুড়ির কানে যেত, তবে তো শ্রীময়ীকে মেরেই কেটে ভাসিয়ে দিত নদীতে।
মহামায়া দেবী শ্রীময়ীকে চুপ করে থাকতে দেখে আরও খেপে গেলেন। কনুই দিয়ে একটা গুঁতো মেরে বললেন—
শাশুড়ি: "কী রে ? কানে তালা লাগছে? কী কপাল কইরা যে একখান বাঝা মাইয়া ঘরে তুলছিলাম! বিয়ার তিন বছর পার হইয়া গেল, এখনো পেটডায় একটা ইঁদুরও পয়দা করতে পারলি না? কান ছিদ্র কইরা কথা ঢুকতাছে, নাকি তুলা গুঁজ্যা রাখছ?"
শ্রীময়ী: (খুব ধীর আর অপরাধীর গলায়) "হ মা, শুনতেছি...।"
শাশুড়ি: "হ তো কী? মুখ দিয়া শুধু 'হ' বাইর হয়! ঐ দেহো, ওহোনাও তো একটা ফুটফুটে ছেলে জন্ম দিল গেল বৈশাখে। আর এই দিয়াও পোয়াতি। তর কবে হইবো রে বাঝার বেটি? কাইলকা যদি আমি মরি, পাড়ার মাইনষে তো আমারে শ্মশানে নেওয়ার আগেও থুতু দিব, বলবে তর বংশে পিণ্ডি দেওয়ার কেউ নাই!"
ওহোনা দিয়ার পাশেই বসে ছিল। সে শ্রীময়ীর খুড়তুতো শ্বশুরের বউমা, দুই বাড়ি পরেই থাকে। ওহোনাও বিয়ের পর দুই-তিন বছর ভুগেছিল। কত ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়ে শেষমেশ গত বৈশাখে তার কোল আলো করে ছেলে এসেছে।
শাশুড়ি: "একটু লজ্জা শরম থাকলে ওহোনার পায়ে গিয়া পড়তি। জিগাইতি, কোন ডাক্তারের ওষুদ খাইয়া ওর পেটটা বাঁধলো! আমার পোলাডা রোদে পুইড়া, বৃষ্টিতে ভিইজ্যা শহরে পইড়া রইছে টাকা কামানোর লিগা। আর এই নচ্ছার মাগী গাঁয়ে হাওয়া লাগাইয়া ঘুইরা বেড়ায়!"
শ্রীময়ীর চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। কান্নাটা গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছে। সৌম্য সপ্তাহে মাত্র দুই দিনের জন্য বাড়ি আসে। শনিবার-রবিবার থেকে সোমবার ভোরে আবার শহরে চলে যায়। ওই দুই দিনে শ্রীময়ী নিজের মনের ব্যথা, চোখের জল ভাগ করে নেওয়ার মতো একটু সময়ও পায় না। উল্টো সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়, কখন স্বামী রেগে যায়।
এমন সময় দিয়া ভাবির শ্বশুর অমরবাবু ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন। হাসিমুখে বললেন—
অমরবাবু: "বৌদি, ও বউমারা, আসেন আসেন। দুপুরের খাবারের আয়োজন পুরা রেডি। ছাদের ওপর প্যান্ডেল করা হইছে, সবাই চলেন।"
মহামায়া দেবী একগাল কৃত্রিম হাসি ছড়ালেন—
শাশুড়ি: "হ চলেন দাদা, আমরা তো ঘরের মানুষই। চল রে বউ।"
সবাই হুড়মুড় করে দোતলার ছাদের দিকে রওনা দিল। মহামায়াও আগে আগে হাঁটা দিলেন। কিন্তু শ্রীময়ীর পা দুটো যেন মাটির সাথে আটকে গেছে। বুকের ভেতর এমন এক জ্বালা, যেখানে আজ এই আনন্দের দিনে এক লোকমা ভাত মুখে তোলার রুচিও তার নেই। মানুষের নানান কথার খোঁচা আর শাশুড়ির বিষাক্ত গালিগালাজ তার পেটের ক্ষিধেকে এক নিমেষে মেরে ফেলেছে।
খাওয়াদাওয়া শেষ হলো। পাড়ার লোকজনের সাথে লোকদেখানো হাসি-কুশল বিনিময় করে বিদায় নিলেন মহামায়া দেবী। শ্রীময়ী শাশুড়ির পিছু পিছু ধীরপায়ে বাড়ির পথ ধরল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছি হচ্ছি করছে, বাঁশঝাড়ের ওপাশ থেকে তপ্ত হাওয়া বইছে।
গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মহামায়ার মুখের বিষ একটুও কমেনি। বরং ভরপেট খাওয়ার পর তাঁর গলার জোর আরও বেড়েছে।
শ্রীময়ী আঁচল দিয়ে মুখটা চেপে ধরল, যাতে কান্নার আওয়াজ বাইরে না আসে। সে জানে, এই গ্রামের মাটিতে তার চোখের জলের কোনো দাম নেই। যতক্ষণ না তার গর্ভ থেকে কোনো সন্তান আসছে, ততক্ষণ সে এই বাড়িতে একটা দাসী আর 'অপয়া' ছাড়া আর কিছুই না। সূয্যি মামাটা যেমন আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে, শ্রীময়ীর জীবনটাও যেন এক অতল অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে।
জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুর। ছায়াবাজ গ্রামটায় আজ একটু উৎসবের আমেজ। দিয়া ভাবির সাধের অনুষ্ঠান। দিয়াদের দোতলা দালানের মস্ত বড় উঠানে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। চারপাশ থেকে পাড়া-পড়শী, জ্যাঠাই-খুড়ি আর বউ-ঝিদের আনাগোনা। বাতাসে কচি পাঁঠার মাংস আর গোবিন্দভোগ চালের পায়েসের সুবাস।
উঠানের এক কোণে একটা কাঠের সোফায় সেজেগুজে বসে আছে দিয়া। গা ভর্তি সোনার গয়না, কপালে বড় লাল সিঁদুরের টিপ, লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন আস্ত একটা লক্ষ্মী প্রতিমা। পাশে বসে পাড়ার বউরা কেউ ঠাট্টা-তামাশা করছে, কেউ বা দিয়ার গোলগাল পেটটা দেখিয়ে বলছে, "লক্ষণ তো পুরা কোল আলো করা পুত্তুর সন্তানের রে দিয়া!"
চারপাশে এতো কোলাহল, মিষ্টি একটা পরিবেশ, কিন্তু শ্রীময়ীর কানে সেসব কিছুই ঢুকছে না। সে বসে আছে তার শাশুড়ি মহামায়া দেবীর ঠিক গা ঘেঁষে। মহামায়ার মুখটা সকাল থেকেই তিতা করলার মতো হয়ে আছে। একে তো অন্যের ঘরের সুখ সহ্য হয় না, তার ওপর নিজের ঘরে কোনো 'সুসংবাদ' নাই। শ্রীময়ীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে একটা চিলতে থুতু ফেললেন মহামায়া। তারপর ফিসফিসানি অথচ ধারালো গলায় শুরু করলেন—
শাশুড়ি: "আমার যে কবে ভাগ্য হইবো, একটু নাতি-নাতনির মুখ দেখুম! কপালটাই পোড়া আমার। দুনিয়ার সব মাগীগো কোলে ছাও-পাও খেলে, আর আমার ঘরে একখান অলক্ষ্মী আইসা জাঁইতা বসছে!"
শ্রীময়ী মাথা নিচু করে রইল। শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে চোখ দুটো বুজে ফেলল। এই তিন বছরে এমন কথা তার নিত্যদিনের সঙ্গী। ডাক্তার-কবিরাজ, শিবের মাথায় জল ঢালা, মাদুলি—কিছুই বাকি রাখেনি সে। অথচ বছর খানেক আগে একবার খুব মিনতি করে স্বামী সৌম্যকে বলেছিল—
শ্রীময়ী: "ওগো, ডাক্তার তো আমার কোনো সমস্যা পায় নাই। তুমি যদি একবার শহরে গিয়া একটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাইতা...।"
ঐ কথা শোনামাত্র সৌম্য যেন বাঘের মতো গর্জে উঠেছিল। খাটের ওপর লাথি মেরে বলেছিল—
সৌম্য: "তর এতো বড় সাহস? তুই আমারে নপুংসক কবি? নিজের বাঝা (বন্ধ্যা) দোষ ঢাকনের লিগা আমার ওপর দোষ চাপাস? আর কোনোদিন যদি এই কথা মুখে আনছস, "
এই কথা যদি শাশুড়ির কানে যেত, তবে তো শ্রীময়ীকে মেরেই কেটে ভাসিয়ে দিত নদীতে।
মহামায়া দেবী শ্রীময়ীকে চুপ করে থাকতে দেখে আরও খেপে গেলেন। কনুই দিয়ে একটা গুঁতো মেরে বললেন—
শাশুড়ি: "কী রে ? কানে তালা লাগছে? কী কপাল কইরা যে একখান বাঝা মাইয়া ঘরে তুলছিলাম! বিয়ার তিন বছর পার হইয়া গেল, এখনো পেটডায় একটা ইঁদুরও পয়দা করতে পারলি না? কান ছিদ্র কইরা কথা ঢুকতাছে, নাকি তুলা গুঁজ্যা রাখছ?"
শ্রীময়ী: (খুব ধীর আর অপরাধীর গলায়) "হ মা, শুনতেছি...।"
শাশুড়ি: "হ তো কী? মুখ দিয়া শুধু 'হ' বাইর হয়! ঐ দেহো, ওহোনাও তো একটা ফুটফুটে ছেলে জন্ম দিল গেল বৈশাখে। আর এই দিয়াও পোয়াতি। তর কবে হইবো রে বাঝার বেটি? কাইলকা যদি আমি মরি, পাড়ার মাইনষে তো আমারে শ্মশানে নেওয়ার আগেও থুতু দিব, বলবে তর বংশে পিণ্ডি দেওয়ার কেউ নাই!"
ওহোনা দিয়ার পাশেই বসে ছিল। সে শ্রীময়ীর খুড়তুতো শ্বশুরের বউমা, দুই বাড়ি পরেই থাকে। ওহোনাও বিয়ের পর দুই-তিন বছর ভুগেছিল। কত ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়ে শেষমেশ গত বৈশাখে তার কোল আলো করে ছেলে এসেছে।
শাশুড়ি: "একটু লজ্জা শরম থাকলে ওহোনার পায়ে গিয়া পড়তি। জিগাইতি, কোন ডাক্তারের ওষুদ খাইয়া ওর পেটটা বাঁধলো! আমার পোলাডা রোদে পুইড়া, বৃষ্টিতে ভিইজ্যা শহরে পইড়া রইছে টাকা কামানোর লিগা। আর এই নচ্ছার মাগী গাঁয়ে হাওয়া লাগাইয়া ঘুইরা বেড়ায়!"
শ্রীময়ীর চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। কান্নাটা গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছে। সৌম্য সপ্তাহে মাত্র দুই দিনের জন্য বাড়ি আসে। শনিবার-রবিবার থেকে সোমবার ভোরে আবার শহরে চলে যায়। ওই দুই দিনে শ্রীময়ী নিজের মনের ব্যথা, চোখের জল ভাগ করে নেওয়ার মতো একটু সময়ও পায় না। উল্টো সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়, কখন স্বামী রেগে যায়।
এমন সময় দিয়া ভাবির শ্বশুর অমরবাবু ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন। হাসিমুখে বললেন—
অমরবাবু: "বৌদি, ও বউমারা, আসেন আসেন। দুপুরের খাবারের আয়োজন পুরা রেডি। ছাদের ওপর প্যান্ডেল করা হইছে, সবাই চলেন।"
মহামায়া দেবী একগাল কৃত্রিম হাসি ছড়ালেন—
শাশুড়ি: "হ চলেন দাদা, আমরা তো ঘরের মানুষই। চল রে বউ।"
সবাই হুড়মুড় করে দোતলার ছাদের দিকে রওনা দিল। মহামায়াও আগে আগে হাঁটা দিলেন। কিন্তু শ্রীময়ীর পা দুটো যেন মাটির সাথে আটকে গেছে। বুকের ভেতর এমন এক জ্বালা, যেখানে আজ এই আনন্দের দিনে এক লোকমা ভাত মুখে তোলার রুচিও তার নেই। মানুষের নানান কথার খোঁচা আর শাশুড়ির বিষাক্ত গালিগালাজ তার পেটের ক্ষিধেকে এক নিমেষে মেরে ফেলেছে।
খাওয়াদাওয়া শেষ হলো। পাড়ার লোকজনের সাথে লোকদেখানো হাসি-কুশল বিনিময় করে বিদায় নিলেন মহামায়া দেবী। শ্রীময়ী শাশুড়ির পিছু পিছু ধীরপায়ে বাড়ির পথ ধরল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছি হচ্ছি করছে, বাঁশঝাড়ের ওপাশ থেকে তপ্ত হাওয়া বইছে।
গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মহামায়ার মুখের বিষ একটুও কমেনি। বরং ভরপেট খাওয়ার পর তাঁর গলার জোর আরও বেড়েছে।
শ্রীময়ী আঁচল দিয়ে মুখটা চেপে ধরল, যাতে কান্নার আওয়াজ বাইরে না আসে। সে জানে, এই গ্রামের মাটিতে তার চোখের জলের কোনো দাম নেই। যতক্ষণ না তার গর্ভ থেকে কোনো সন্তান আসছে, ততক্ষণ সে এই বাড়িতে একটা দাসী আর 'অপয়া' ছাড়া আর কিছুই না। সূয্যি মামাটা যেমন আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে, শ্রীময়ীর জীবনটাও যেন এক অতল অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে।



![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)