Thread Rating:
  • 22 Vote(s) - 2.64 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Romance কিছু সম্পর্ক
কিছু সম্পর্কঃ ৯ (ছ)


আয়শা, জয় আর রানীকে নিয়ে বেরিয়ে গেলে জান্নাত অল্প কিছুক্ষণ বাড়িতে একাই ছিল। এই একা সময়টা জান্নাত আজকের সকালটা ভেবে কাটাল। সত্যিই অন্যরকম ছিল সকালটা। অনেক দিন পর চৌধুরী বাড়ির ভেতর এমন প্রাণের শব্দ উঠেছিল। হাসি, খোঁচাখুঁচি, রানীর লজ্জা, জয়ের অস্বাভাবিক ভদ্রতা, বড় আম্মুর ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে বাড়িটা আজ সকালে খুব জীবন্ত লাগছিল।
এখন অবশ্য বাড়িটা চুপচাপ। কাজের মানুষও আজ আসেনি, তাই নিচতলা থেকে কোনো হাঁকডাক নেই, রান্নাঘরের বাসন নড়ার শব্দ নেই। বারান্দা দিয়ে দুপুরের আগের আলো ঢুকে মেঝের এক পাশে স্থির হয়ে পড়ে আছে। এই নীরবতার ভেতরেই সকালটার শব্দগুলো যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ফিরে আসে জান্নাতের মনে।
কিন্তু বেশিক্ষণ জান্নাত এই ভালো লাগার অনুভূতি নিয়ে বসে থাকল না। গত রাতে জয়ের কাছ থেকে নেওয়া ক্রেডিট কার্ড তখনো ওর পকেটে ছিল। পকেটের ভেতর কার্ডের পাতলা শক্ত শরীরটা বারবার টের পাচ্ছিল ও।
তাই জান্নাত তৈরি হয়ে সোজা মার্কেটে চলে গেল।
মার্কেট তখন বেশ জমে উঠেছে। দোকানের সামনে কাপড় ঝুলছে, কোথাও লাইট টেস্ট করা হচ্ছে, কোথাও ছোট ছোট শোপিস সাজানো। দোকানদারদের ডাকাডাকি আর ক্রেতাদের দরদামের ভেতর জান্নাত এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরল।
সেখান থেকে নিজের চ্যানেলের শুটিং কর্নারের জন্য টুকটাক কিছু জিনিস কিনল। ভালো একটা কার্টেন, ব্যাকড্রপের জন্য কিছু লাইট, আর এমনি কিছু ছোটখাটো সাজানোর জিনিস। কার্টেনের কাপড় হাতে নিয়ে একবার চোখের সামনে মেলে ধরল, আলো পড়লে কেমন লাগবে ভাবল। খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু নিজের ছোট্ট জায়গাটাকে একটু নিজের মতো করে বানানোর আনন্দ।
জয়ের কাছ থেকে যা চেয়েছিল, তার চেয়ে কিছু বেশিই খরচ করল জান্নাত। তবে এই নিয়ে ওর মধ্যে কোনো অনুশোচনা হলো না। বরং অদ্ভুত একটা তৃপ্তি অনুভব করল। গত মাসখানেক জয় ওকে যত মানসিক অশান্তি দিয়েছে, তার সামান্য সুদ-আসলে ফেরত গেছে বলেই মনে হলো জান্নাতের। তা ছাড়া জান্নাত যতবার কার্ড সোয়াইপ করেছে, ওর ঠোঁটের কোণায় একটা হাসি ফুটে উঠছে।
মেশিনে কার্ড ঢোকানোর ছোট্ট শব্দ, তারপর পিন দেওয়ার সময় দোকানদারের ভদ্রভাবে অন্যদিকে তাকানোর অভিনয়, রসিদ বেরোনোর খসখসে শব্দ, সবকিছুতেই জান্নাতের অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছিল। প্রথমে হাসিটা নিজের কাছেই ভিলেনের মতো লাগছিল। যে জয়ের বিরুদ্ধে ভিডিও বানাতে জয়ের টাকা দিয়েই স্টুডিও সাজাচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছে, না, ভিডিওও জয়ের বিরুদ্ধে নয়, সিস্টেমের বিরুদ্ধে বানাচ্ছে, আর টাকা সিস্টেমের নয়, এই টাকা ওর ভাইয়ের; ভাইটা যদিও একটু ত্যাড়া টাইপ।
শপিং শেষে জান্নাত সরাসরি ক্যাম্পাসে গেল। কেনাকাটাগুলো ওদের মাসিক পত্রিকার অফিসে রেখে একটা ক্লাস করল। পত্রিকার অফিসের ছোট ঘরটায় পুরোনো কাগজ, ধুলো আর প্রিন্টারের কালি মেশানো একটা গন্ধ থাকে। জান্নাত জিনিসগুলো এক কোণে রেখে দিল, যেন নিজের গোপন যুদ্ধের অস্ত্র সাময়িকভাবে জমা রাখল। তারপর ক্লাসে ঢুকল, কিন্তু পুরো মনটা ক্লাসে ছিল না। নোট নিচ্ছিল, মাথা নেড়ে শুনছিল, তবু ভেতরে ভেতরে হিসাব করছিল পরের কাজটা কীভাবে এগোবে।
ক্লাস শেষে আবরারকে কল দিল।
আবরারের ভয়েসগুলো শুনে জান্নাত বুঝেছিল, ছেলেটা রাজি হলেও পুরোপুরি রাজি হয়নি। কথার ফাঁকে ফাঁকে যতই শহীদ হওয়ার ঘোষণা দিক, ভেতরে ভেতরে জয় নামের দুর্যোগটার ভয় এখনো কাটেনি।
জান্নাতের মনে হলো, শুধু টেক্সট মেসেজে কাজ হবে না। আবরারকে সামনাসামনি মোটিভেট করতে হবে। নইলে হয়তো ও কাজটা করতে ভয় পাবে। এতে অবশ্য জান্নাত আবরারকে দোষ দেয় না, গ্রামের গরিব ছেলে শহরে এসেছে লেখাপড়া করতে। জান্নাত আর জয়ের মতো বিলাসিতা ওদের নেই।
ক্যাম্পাস চত্বরের সেই চায়ের দোকানে জান্নাত আসার কয়েক মিনিট পরেই এলো আবরার। দোকানটা রাস্তার ধারের পরিচিত বিশৃঙ্খলা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। টিনের ছাউনি, কাঠের বেঞ্চ, কাচের বয়ামে বিস্কুট, পাশে ফুটন্ত কেটলি। চায়ের ধোঁয়া আর ধুলোর গন্ধ মিশে বাতাসে একটা আলাদা ক্যাম্পাসি স্বাদ বানিয়েছে। দোকানের সামনে দু-একটা রিকশা দাঁড়িয়ে, একটু দূরে কয়েকজন ছাত্র তর্ক করছে, আর মাঝেমধ্যে রাস্তা থেকে বাসের হর্ন এসে কথাবার্তার উপর ধাক্কা মেরে যাচ্ছে।
আবরার সেই পরিচিত চেক শার্ট, ব্লু ডেনিম, পায়ে চটি পরে এসেছে। হাঁটার ভঙ্গিতে একটু সতর্কতা আছে, যেন চারপাশের বাতাসও আগে যাচাই করে নেয়। জয়ের মতো ড্যাশিং ভাব নেই, রাজীবের মতো শুদ্ধ সৌন্দর্যও ওর নেই। আছে শুধু চোখের মাঝে একটা ঝিলিক, আর কথা বলার একটা ব্যক্তিগত প্যাটার্ন। আর এসেই সেই প্যাটার্ন অনুযায়ী বলল, “আরে বস, আমি তো বললামই লিখব, কিন্তু লেখার আগে একটা লাস্ট উইশ লেখার চান্স তো দিবেন।”
“তোমার লাস্ট উইশ যদি এক কাপ মালাই চা হয়, সেটা এখনই আমি পূরণ করে দিতে পারি,” বলে জান্নাত হেসে ফেলল। হাসিটা দরকারও ছিল। একটু আগেই রাজীবকে মনে মনে “শুদ্ধ সৌন্দর্য” বলে বসার পর ওর গালে যে অকারণ লালিমা উঠেছিল, এই হাসি সেটা কিছুটা আড়াল করে দিল।
“বস, আপনি তো আমার লাস্ট উইশের দৈর্ঘ্য বাড়ায়া দিলেন, মালাই চা খারাপ না,” আবরার হাসিতে যোগ দিয়ে বলল।
“মামা, একটা মালাই চা। আপনার ওই গুঁড়া দুধের মালাই না, গরুর দুধের মালাই দিয়েন,” জান্নাত চা বিক্রেতাকে উদ্দেশ্য করে বলল, যদিও ওর জানা এখানে সব গুঁড়া দুধের কারবার।
চা বিক্রেতা কথাটা শুনে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে হাঁ করে হাসল, যেন এই ধরনের দাবি সে প্রতিদিনই শোনে, প্রতিদিনই মানে না। কেটলির মুখ থেকে ধোঁয়া উঠছে। দুধের ওপর পাতলা সর জমে আবার ভেঙে যাচ্ছে চামচের নাড়াচাড়ায়। জান্নাত বেঞ্চের এক পাশে বসল, আবরার একটু সাবধানে সামনে।
“না, ভাবলাম তুমি আমার বিছানাপত্তর নিয়া ভাগলে নাকি? তাই সামনাসামনি একটু মোটিভেট করতে এলাম। ভয় নাই, জয় গুন্ডা হলে আমি আমার গুন্ডার বাপ, জয় ভূত হলে আমি মামদো ভূত, তোমার কিচ্ছু হবে না,” জান্নাত যখন এই কথাগুলো বলল, তখন দেখল হঠাৎ করেই আবরার একটু নিচু হয়ে গেল, আর মেইন রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।
জান্নাত কপাল কুঁচকে বলল, “এই আবরার, কী হয়েছে, এমন চোরের মতো করতেস কেনো?”
“ভাই, যম নিয়ে কথার মাঝে যম হাজির। ওই দেখ জয় সাহেব, সাথে রানীও আছে। জয় সাহেব গাড়ি কিনলো কবে?” আবরার মাথা নিচু রেখেই বলল।
জান্নাত আবরারের দেখানো দিকে তাকাতেই দেখল, জয় ওদের গাড়িটা ড্রাইভ করছে। দুপুরের আলোতে গাড়ির কাঁচে রোদের ঝিলিক পড়ে এক মুহূর্ত চোখে লাগল। ভেতরে রানী। দুজনেই কিছু একটা নিয়ে হাসাহাসি করছে। গাড়িটা কয়েকটা ধীরগতির রিকশার পেছনে আটকে পড়েছে।
রিকশাগুলোর ঘণ্টা, রাস্তার ধুলা, গরমে বিরক্ত চালকদের মুখ, সবকিছুর মাঝেও গাড়ির ভেতরের ওই হাসিটা আলাদা করে চোখে পড়ছিল। বাইরে দুপুরের শুকনো তাপ, ভেতরে যেন ওদের দুজনের আলাদা ছোট পৃথিবী।
তবে জয়কে বেশিক্ষণ আটকে রাখা যায় না। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটা রিকশাগুলোকে পাশ কাটিয়ে ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের দিকে চলে গেল। গাড়ির পেছনের ধুলো কয়েক সেকেন্ড বাতাসে ভাসল। আবরার আরও কয়েক সেকেন্ড মাথা নিচু করে বসে রইল, যেন গাড়ির শব্দটা পুরোপুরি মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত মাথা তুললে বিপদ হতে পারে।
জান্নাত সেটা দেখে হেসে বলল, “ওটা জয়ের না, আব্বুর। জয় আজকে দায়িত্বশীল বয়ফ্রেন্ড হওয়ার জন্য বাইক রেখে গাড়ি নিয়েছে।”
কথাটা বলেই ওর হাসিটা এক পলকের জন্য একটু মলিন হয়ে গেল। মলিন হলো, কারণ নিজের ভাইকে ও চেনে। আগের রাতের জয়ের মুখটা মনে পড়ে গেল। সেই দৃঢ় চোখ, সেই অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। রানীর পুরো জগত জুড়ে শুধু নিজেকে রাখার কথা বলেছিল ও।
চা এসে গেল। কাচের গ্লাসের গায়ে গরমে পাতলা বাষ্প জমেছে। চা বিক্রেতা গ্লাসটা নামিয়ে দিতেই টেবিলের ওপর ছোট্ট টুং শব্দ হলো। আবরার গ্লাসটা হাতে নিতেই জান্নাত হঠাৎ বলল, “আচ্ছা আবরার, তুমি কোনোদিন এমন লড়াই লড়েছো, যেখানে শত্রুটা ঠিক সামনে নেই? না, সামনে নেই বললেও ভুল হবে। শত্রু নেই-ই?”
আবরার গ্লাস মুখের কাছে নিয়ে থেমে গেল। “মানে?”
“মানে ধরো, তুমি লড়ছো। খুব সিরিয়াসলি লড়ছো। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে লড়ছ, তারা হয়তো জানেই না যে যুদ্ধ চলছে। জানলেও হয়তো বলত, ভাই, এই যুদ্ধ আমাদের না।”
আবরার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার সামনে চায়ের ধোঁয়া সরু সাদা সাপের মতো উঠে বাতাসে মিশে যাচ্ছে। রাস্তার শব্দ যেন ওই কয়েক মুহূর্তে একটু দূরে সরে গেল। তারপর একটু হেসে বলল, “এটা তো খুবই ক্লান্তিকর লড়াই, বস।”
“কেন?”
“কারণ সামনে মানুষ থাকলে অন্তত বোঝা যায়, ঘুষি মারব, না পালাব। কিন্তু শত্রু যদি হাওয়ার মতো হয়, তখন মানুষ নিজের সাথেই কুস্তি করে। জেতে না, হারেও না, শুধু হাঁপিয়ে যায়।”
জান্নাত চায়ের ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। ধোঁয়াটা একটু উঠে ভেঙে যাচ্ছে, ঠিক যেমন কিছু কথা মুখে আসার আগেই ভেঙে যায়।
“হুম,” ও আস্তে বলল। “এই লাইনটা খারাপ না।”
কথাটা বলে জান্নাত একটু চুপ করে রইল। ওর এই মৌনতা ভাঙল আবরারের পরের কথায়।
আবরার বলল, “ভাই, স্ক্রিপ্ট কি একটু পিছিয়ে দেবো?”
জান্নাত চট করে আবরারের দিকে তাকাল। অতি সাধারণ দেখতে ছেলেটার আরও একটা গুণ আছে, মানুষের মন বুঝতে পারে। চায়ের দোকানের কোলাহলের মাঝেও ও জান্নাতের ভেতরের হালকা থেমে যাওয়া শুনে ফেলেছে। তাই জান্নাত জানে, আবরার কেন কথাটা বলেছে। কিন্তু সেদিকে গেল না। উল্টো নিজের স্বাভাবিক স্বরে বলল, “কেন, যম দেখে ভয় পেলে নাকি?”
“তা তো লাগবেই,” আবরারও হালকা স্বরে বলল, নিজের প্রশ্নের আসল কারণ এড়িয়ে গিয়ে। “মানুষ বিপদে পা দেওয়ার আগে বিধাতা সাইন দেখায়। এইটা তো, বস, আমার জন্য সাইনই ছিল। হা হা হা।”
“জয়ের চেয়ে বড় বিপদ তোমার সামনে বসে আছে। সময়মতো লেখা শেষ করো। আর এখন চা খাও, শহীদ আবরার।”
চা শেষ করতে করতে জান্নাত আবরারকে আরও কিছু ইন্সট্রাকশন বুঝিয়ে দিল। কথা বলতে বলতে ও মাঝে মাঝে হাত দিয়ে বাতাসে লাইন কাটছিল, যেন স্ক্রিপ্টের গঠন সামনে দেখতে পাচ্ছে। আবরার মাথা নাড়ছিল, কখনো সিরিয়াস, কখনো ভেতরে ভেতরে ভয় পাওয়া হাসি। চায়ের দোকানের কাঁচের বয়ামের ভেতর বিস্কুট কমতে থাকল, কেটলি আবার চড়ল চুলায়, আশেপাশে ছাত্রদের ভিড় একটু বদলে গেল, কিন্তু ওদের কথার ভিতরটা ধীরে ধীরে কাজের দিকে সোজা হয়ে গেল।
তারপর জান্নাত বলল, “আমি একটু ছোট আব্বুর কাছে যাব। তুমি আসবা?”
আবরার কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, “নাহ, তুমি আমার পক্ষ থেকে কন্ডোলেন্স দিয়ে দিও।”
জান্নাত আবরারকে বিদায় দিয়ে চায়ের বিল মিটিয়ে একটা রিকশা নিল, হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
এখনও গরম পুরোপুরি পড়েনি, কিন্তু দুপুরের রোদ বেশ চড়া। রাস্তার ওপর রোদের পাতলা কাঁপুনি উঠছে। ফুটপাতের পাশে শুকনো ধুলো জমে আছে, মাঝে মাঝে গাড়ির চাকা সেটা উড়িয়ে দিচ্ছে। বাতাসেও গরমের একটা শুকনো তাপ মিশে আছে। রিকশার সিটে বসতেই পিঠে পুরোনো কৃত্রিম চামড়ার গরম ভাব লাগল। রিকশাওয়ালা প্যাডেলে চাপ দিতেই চাকা ধীরে ধীরে ঘুরল, তারপর শহরের ভাঙাচোরা ছন্দে এগোতে শুরু করল।
রিকশা চলার সঙ্গে সঙ্গে জান্নাতের চুল উড়ছে, কপালের পাশের কয়েকটা এলোমেলো গোছা বারবার চোখের কাছে এসে পড়ছে। জান্নাত হাত তুলে সেগুলো সরাল না। রাস্তার পাশে দোকান, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ, দূরের হর্ন, গরমে হাঁপানো মানুষ, সব মিলিয়ে দুপুরটা ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠছে।
সামনের উত্তাপটা ও বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছে।
তবু গরম দেখলেই ছায়া খোঁজার মেয়ে জান্নাত নয়। শীত, বর্ষা, গরম, যা-ই থাকুক, নিজের রাস্তা নিজের গতিতেই পার হওয়া ওর স্বভাব।
***    


জান্নাত যখন হসপিটালে পৌঁছল, তখন রুমে দারুণ আড্ডা জমেছে, রহিম, জয়নাল আর আয়শা। কেবিনে ঢুকতেই নাকে লাগল হসপিটালের পরিচিত অ্যান্টিসেপটিক গন্ধ, তার সঙ্গে মিশে আছে এসির ঠান্ডা বাতাস আর কোথাও থেকে আসা ওষুধের হালকা গন্ধ। বিছানার পাশে ছোট মনিটরের আলো জ্বলছে, স্যালাইনের স্ট্যান্ডটা এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু রুমের ভেতরের কথাবার্তায় অসুস্থতার ভারটা যেন একটু পিছিয়ে গেছে। হসপিটালের কেবিনটা অচেনা, কিন্তু আড্ডাটা বড় চেনা। ছোটবেলা থেকেই এমন আড্ডা দেখেই বড় হয়েছে জান্নাত।
জান্নাত ঢুকেই যেন আগের জান্নাতের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন জান্নাত হয়ে গেল। দরজার কাছে দাঁড়িয়েই চপল কিশোরীর মতো বলল, “কী ব্যাপার, এটা হসপিটালের কেবিন, না কি ভার্সিটির ক্যানটিন?”
তিনজনই জান্নাতের দিকে তাকাল। জয়নাল বলে উঠল, “এতক্ষণ কোথায় ছিলি, তোর ছোট আব্বু অসুস্থ আর তুই এলি দুপুরের পর?”
“আহ, জয়নাল থাম তো,” রহিম তৎক্ষণাৎ থামিয়ে দিল জয়নালকে। অবশ্য জান্নাত জয়নালের কথার উত্তর দিল না। কথাটা যেন কানে গেল, কিন্তু সে কথার দিকে না ঘুরে সোজা রহিমের কাছে গেল। বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “ছোট আব্বু, তুমি তো পুরো ফিট আছো, চলো তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাই।”
রহিম মৃদু হেসে বলল, “এটা তোর বাপকে বোঝা রে মা। ও তো চাইছিল আমি আরও দুদিন আইসিইউতে থাকি। আমাকে সুস্থ হতে দিতেই চায় না। তুইই আমার আসল মা, তুই বুঝলি আমি কী চাই।”
জান্নাত রহিমের হাতটা ধরল। হাতটা গরম, কিন্তু দুর্বলতা আছে। এই দুর্বলতা রহিমের মুখের হাসির সঙ্গে মিলছে না। জান্নাত আঙুলের চাপটা একটু নরম করল। তারপর বলল, “তাহলে তো এই মায়ের কথাও তোমাকে আরও ভালো করে শুনতে হবে। এখন থেকে কোচিংয়ের ক্লাস করা কমিয়ে দিতে হবে।”
যদিও জান্নাত কথাগুলো হাসিমুখে বলছে, কিন্তু ওর মনের ভেতরে উঁকি দিচ্ছে গতকাল এই হসপিটালের করিডোরে দাঁড়িয়ে রাজীবের অসহায় কান্না। আর রানীর সেই অসহায় চাহনি, বিড়বিড় করে বলা, “আমার আব্বু কি মরে গেছে?”
আয়শা পাশেই বসা ছিল। এতক্ষণ জান্নাত আর অন্যদের কথা চুপ করে শুনছিল। রহিমের কথা শেষ হতেই আয়শা বলে উঠল, “মা বললেন যেহেতু, এখন কিন্তু ভাই মায়ের কথামতো চলতেও হবে। আমাদের কথা তো শুনলেন না, মায়ের কথা শুনেন।”
কথাটা বলে আয়শা জান্নাতের দিকে তাকায়। আয়শার চোখে জয়নালের মতো শাসন বা দেরি করে আসার প্রশ্ন নেই, আছে স্নেহমিশ্রিত স্বীকৃতি। যেন মেয়েটাকে সে শুধু মেয়ে হিসেবে না, একটু দূর থেকে বড় হয়ে ওঠা একজন মানুষ হিসেবেও দেখছে।
জয়নাল পাশ থেকে বলে উঠল, “শুধু কমানো কী রে, ওকে বল ক্লাস পুরো বন্ধ। নইলে আমি ওকে এই হসপিটাল থেকে বের হতে দেবো না।”
এই কথা শুনে রহিম জান্নাতের দিকে এমন করে তাকাল, যেন এক বন্ধু আরেক বন্ধুর নামে নালিশ করছে। মুখে কিছু বলল না, কিন্তু চোখ বলল, দেখলি তো, আমাকে কী অবস্থায় রেখেছে?
জান্নাত তা দেখে হেসে বলল, “তোমরা চা খেয়েছো? আর রাজীব কোথায়?”
“রাজীবকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি,” উত্তর দিল আয়শা।
শুনে জান্নাত মনে মনে ভাবল, ভালোই হয়েছে। গত সকাল থেকে কম ঝামেলা যায়নি। প্রথমে ছোট আব্বু রহিমের আকস্মিক অসুস্থতা, তারপর রানীর ওই অবস্থা। ছেলেটা একা ভেঙে গেছে।
“তোমরা থাকো, আমি চা নিয়ে আসি। আর ডিউটি ডাক্তারের সাথে কথা বলে আসি।”
জান্নাত বেরিয়ে গেল।
কেবিনের দরজা টেনে বেরোতেই ভেতরের আড্ডার গরম শব্দটা পিছনে পড়ে গেল। করিডোরটা তুলনায় অনেক ঠান্ডা, অনেক সাদা। দেয়ালে ঝোলানো পোস্টার, দূরে নার্সের ডেস্ক, কারও চাপা কাশি, কোথাও ট্রলির চাকার শব্দ। সাদা আলোয় সবকিছু একটু বেশি পরিষ্কার, একটু বেশি নির্দয় লাগে।
কেবিন থেকে বেরিয়ে প্রথমে জান্নাত গেল ডিউটি ডাক্তারের ঘরে। রোগীর নাম, কেবিন নম্বর বলে পুরো ডিটেইল নিল। ডাক্তার বেশ ভালো রিপোর্ট দিল। বলল, রহিম এখন বিপদের বাইরে। ওটা একটা সতর্ক বার্তা ছিল, এখন নিজেকে সামলানোর সময় হয়েছে। তা ছাড়া রহিমের ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপও বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। তবে হসপিটালে থাকার দরকার হবে না। আজ বিকেলে বড় ডাক্তারের রাউন্ড শেষে হয়তো রিলিজ করে দেবে, কিন্তু বাড়িতে রেস্টে থাকতে হবে।
ডাক্তারের কথাগুলো শুনতে শুনতে জান্নাত মাথা নেড়ে সব মনে রাখল। কোন ওষুধ, কত দিন রেস্ট, কী কী কমাতে হবে, কী কী খেয়াল রাখতে হবে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, সে শুধু রোগীর খবর নিচ্ছে। কিন্তু জান্নাত নিজের ভেতরে ইতিমধ্যেই হিসাব কষতে শুরু করেছে, বাড়িতে গিয়ে কার কী দায়িত্ব হবে, ছোট আব্বুকে কীভাবে ক্লাস কমাতে রাজি করানো যায়, আর জয়নালের অতিরিক্ত ভয়কে কীভাবে সামলানো যায়।
ডাক্তারের কাছ থেকে আশা-জাগানিয়া তথ্য পেয়ে জান্নাত খুশি মনেই গেল চা নিয়ে আসতে। ক্যান্টিনে যাওয়ার পথে সেই করিডোর চোখে পড়ল, যেখানে দাঁড়িয়ে রাজীব নিজের সব পর্দা সরিয়ে একজন ভয় পাওয়া ছেলে হয়ে গিয়েছিল। করিডোরের একই সাদা আলো, একই দেয়াল, একই দূরের শব্দ। শুধু তখন এই জায়গাটা অনেক ভারী ছিল। রাজীবের মুখে তখন সেই পরিচিত স্থিরতা ছিল না, ছিল একেবারে কাঁচা ভয়। আর সেই বিরল মুহূর্তের সাক্ষী ছিল একমাত্র জান্নাত।
জান্নাতের মনে হলো, আরও সবার দেখা উচিত ছিল সেই দৃশ্য। বিশেষ করে রানীর।
তবে রানীর কথা ভাবতেই জান্নাতের মনে পড়ে গেল, নিজের একটু বিরক্তি কীভাবে রাজীবের ওপর আরও নতুন একটা ভার চাপিয়ে দিয়েছিল।
ক্যান্টিনের দিক থেকে খাবারের গন্ধ ভেসে আসছিল। দুধ জ্বাল দেওয়ার গন্ধ, রোগির স্যুপ এর গন্ধ, আর মানুষের ছোট ছোট কথাবার্তা। জান্নাত একবার করিডোরটার দিকে তাকাল, তারপর হাঁটা বাড়াল। এখন চা নিতে হবে। ডাক্তারের কথা জানাতে হবে। আর ছোট আব্বুকে বাড়ি নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। 

*****  
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


[+] 3 users Like gungchill's post
Like Reply


Messages In This Thread
কিছু সম্পর্ক - by gungchill - 29-07-2025, 04:17 PM
RE: কিছু সম্পর্ক - by gungchill - Yesterday, 08:59 PM



Users browsing this thread: 2 Guest(s)