Thread Rating:
  • 7 Vote(s) - 3.86 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
#43
৯।
পুরুষেরা নারীর শরীরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এটা জগতের সবচেয়ে আদিম, নগ্ন এবং অকাট্য সত্য। আপনি যদি হাজারটা পুরুষকে ধরে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করান এবং তাদের বুকের ভেতর এক্সরে মেশিন বা লাই-ডিটেক্টর লাগিয়ে জিজ্ঞেস করেন— "ভাই, আপনি কি কোনো নারীকে শুধু তার মন, তার বুদ্ধিমত্তা বা তার আত্মার সৌন্দর্যের জন্য ভালোবাসেন?"

আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, হাজারে একজন পুরুষ পাওয়াও দুষ্কর হবে, যে বলবে, "হ্যাঁ, আমি নারীর শরীর দেখি না, আমি তার আত্মা দেখি।" যে এই কথা বলবে, সে হয় চরম মিথ্যুক, নয়তো সে শারীরিকভাবে অক্ষম, অথবা সে কোনো পীর-দরবেশ। পুরুষের মস্তিষ্ক প্রোগ্রাম করা হয়েছে খুব সহজ একটা অ্যালগরিদম দিয়ে। এটা একটা ভিজ্যুয়াল হার্ডওয়্যার। রাস্তা দিয়ে একটা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পুরুষের চোখ এক ন্যানোসেকেন্ডের মধ্যে মেয়েটার শরীরের একটা স্ক্যান করে ফেলে। মেয়েটার মুখটা কি সুন্দর? তার বক্ষদেশ কি ভরাট? তার কোমর কি সরু? তার নিতম্ব কি আকর্ষণীয়? এই জ্যামিতিক হিসাবগুলো মিলে গেলেই পুরুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন রিলিজ হয়। তার ভেতর আদিম বাসনা জেগে ওঠে। এই বাসনার কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই, এর উদ্দেশ্য স্রেফ দখল করা এবং ভোগ করা।

কিন্তু আমার মাথায় গত কয়েকদিন ধরে একটা অদ্ভুত দার্শনিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। পুরুষ নাহয় নারীর শরীরের লোভে পাগল হয়, কিন্তু একজন নারী কেন একজন পুরুষের প্রেমে পড়ে? নারীরা কিসে আকৃষ্ট হয়? পুরুষের শরীরে? আমি বাথরুমের আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে এই কথাটা ভাবছিলাম আর হাসছিলাম। পুরুষের শরীর আবার সুন্দর হয় নাকি? পুরুষ প্রজাতিটা দেখতে চরম কুৎসিত একটা প্রাণী। সারা গায়ে লোম, খসখসে চামড়া, এবড়োখেবড়ো পেশি, কর্কশ কণ্ঠস্বর। পৃথিবীতে লাখো-কোটি পুরুষের মধ্যে হয়তো হাতেগোনা কয়েকজন ব্র্যাড পিট বা টম ক্রুজ আছেন, যাদের দেখে মনে হতে পারে, "হ্যাঁ, লোকটা সুন্দর।" কিন্তু বাদবাকি ৯৯.৯৯% পুরুষই তো আমার বা আপনার মতো নিতান্তই সাধারণ, ম্যাড়ম্যাড়ে এবং আলুথালু।

তাহলে এত এত সুন্দরী নারী এই সাধারণ, কুৎসিত পুরুষগুলোর প্রেমে পড়ে কীভাবে? তারা এই পুরুষদের জন্য কাঁদে কেন? তাদের সাথে জীবন পার করে দেয় কীভাবে? নারীর আসলে আগ্রহটা কিসে? বিবর্তনবাদ বা ইভোলিউশনারি বায়োলজি বলে, আদিম যুগে নারীদের টিকে থাকার জন্য এমন একজন পুরুষের দরকার ছিল, যে পেশিশক্তিতে বলীয়ান, যে শিকার করে আনতে পারবে, এবং যে গুহার সামনে দাঁড়িয়ে বন্য প্রাণীর হাত থেকে নারীকে রক্ষা করতে পারবে। অর্থাৎ, নারীর কাছে আকর্ষণীয় ছিল পুরুষের ‘নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষমতা’।

যুগ পাল্টেছে। মানুষ এখন আর গুহায় থাকে না, বন্য প্রাণীও আক্রমণ করে না। কিন্তু নারীর মস্তিষ্কের সেই আদিম সফটওয়্যারটা আজও আপডেট হয়নি। শুধু ‘পেশিশক্তি’র জায়গাটা দখল করে নিয়েছে ‘সামাজিক ও আর্থিক ক্ষমতা’। আধুনিক যুগে একজন নারী একজন পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয় তার ক্ষমতা, তার প্রতিপত্তি, তার ব্যাংক ব্যালেন্স এবং তার সামাজিক অবস্থান দেখে। কারণ এই জিনিসগুলো তাকে একটা সাবকনশাস সিগন্যাল দেয়— "এই লোকটার সাথে থাকলে আমি এবং আমার অনাগত সন্তান সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকব।" একজন বিলিয়নিয়ার বৃদ্ধ, যার মাথায় চুল নেই, পেট মোটা— তার পাশেও দেখবেন একজন বিশ্বসুন্দরী তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। এটা কোনো ম্যাজিক নয়, এটা বিবর্তনের খেলা। নারীরা পুরুষের টাকা বা ক্ষমতাকে ভালোবাসে, কারণ টাকাটাই এখন আধুনিক যুগের ‘শিকার করে আনা হরিণের মাংস’।

কিন্তু শুধু টাকাই কি সব? না। সাইকোলজি বলে অন্য কথা। পুরুষ প্রেমে পড়ে চোখ দিয়ে, আর নারী প্রেমে পড়ে কান দিয়ে। নারীরা আকৃষ্ট হয় পুরুষের বুদ্ধিমত্তায়, তার রসবোধে (Sense of humor), তার কণ্ঠস্বরে এবং তার কনফিডেন্সে। একজন পুরুষ যখন খুব গুছিয়ে কথা বলে, যখন তার কথার ভেতর একটা রহস্য থাকে, যখন সে একজন নারীকে অনুভব করাতে পারে যে "তুমি স্পেশাল"— তখন নারী সেই পুরুষের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। নারীরা চায় এমন কাউকে, যে তার কথা মন দিয়ে শুনবে, যে তার চোখের দিকে তাকিয়ে তার আত্মার ভেতরে ঢুকতে পারবে।

একজন নারী আসলে পুরুষের শরীর চায় না, সে চায় পুরুষের মনোযোগ। সে চায় একজন পুরুষ তাকে জয় করুক, তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে, তার রসবোধ দিয়ে, তার ব্যক্তিত্বের সেই আলফা-মেল (Alpha male) অরা দিয়ে। আমি নিজের কথা ভাবলাম। আমি রাশেদ আহমেদ। মিরপুরের মেসে থাকি। বেতন পঁচিশ হাজার টাকা। দেখতে চরম সাধারণ। আমার না আছে ক্ষমতা, না আছে টাকা, না আছে কোনো গ্ল্যামার।

তাহলে আনিকা নাওহারের মতো একজন নিখুঁত, আভিজাত্যে মোড়ানো, লন্ডনপ্রবাসী বড়লোক নারী আমার সাথে প্রতিদিন মেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটছেন কেন? উনি আমাকে রাত জেগে মেসেজ দিচ্ছেন কেন? উত্তরটা খুব সোজা। 

আমি হয়তো উনার কাছে একটা ‘নভেলটি’ বা নতুনত্ব। ইংল্যান্ডের যান্ত্রিক জীবনে উনার স্বামী হয়তো সারাদিন আইটি ফার্মের ব্যালেন্স শিট নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। উনাকে হয়তো কেউ উনার কবিতার শূন্যতা নিয়ে এত সুন্দর করে লেকচার দেয় না। উনার চোখের দিকে তাকিয়ে কেউ হয়তো এত মনোযোগ দিয়ে উনার কথা শোনে না।

আমি উনার সেই ইন্টেলেকচুয়াল খিদেটা মেটাচ্ছি। আমি খুব গুছিয়ে কথা বলি, একটু রহস্য করে হাসি, উনার রূপের প্রশংসা করি খুব সাবধানে, একটু ঘুরিয়ে। উনার মনে হচ্ছে, আমি একজন গভীর বোধসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু উনি জানেন না, আমার এই বুদ্ধিবৃত্তিক মুখোশের পেছনে কতটা বন্য, কতটা ক্ষুধার্ত এবং কতটা ইতর একটা পুরুষ লুকিয়ে আছে। উনি জানেন না, উনার সাথে আমি যখন স্প্যানিশ সাহিত্য নিয়ে কথা বলি, তখন আমার চোখ উনার শাড়ির কুঁচির নিচে উনার নাভির গভীরতা মাপতে ব্যস্ত থাকে। উনি জানেন না, রাতে উনার মেসেজ পেয়ে আমি বাথরুমের ফ্লোরে উনার ছবি দেখে আমার অবদমিত পশুকে শান্ত করি। নারীরা হয়তো পুরুষের মন খোঁজে। কিন্তু আমি একজন খাঁটি পুরুষ। আমি আনিকা নাওহারের মন চাই না। আমি উনার ওই স্বর্গীয় শরীরটা চাই।

২৫ ফেব্রুয়ারি।
 দিনটা আগের দিনগুলোর মতোই শুরু হলো। সেই একই একঘেয়ে রুটিন। সকালে রহিমা খালার বাসি রুটি, বিকল্প বাসের কনুই-যুদ্ধ, আর কারওয়ান বাজারের অফিস। অফিসে এসে আমি কিম জং উনের খবর বাদ দিয়ে সিরিয়ার খবর অনুবাদ করতে বসলাম। এহসান ভাই আজ একটু বেশি চিল্লাচিল্লি করছেন। মামুন তার ডেস্কে বসে "পুতিনের নতুন প্রেমিকা" নিয়ে একটা চটকদার খবর বানাচ্ছে। সবকিছু একদম নরমাল।

কিন্তু আমার মাথার ভেতর সারাদিন ধরে একটা ঘড়ি টিকটিক করছিল। কখন ছয়টা বাজবে! পাঁচটা চল্লিশ মিনিটে আমি বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে এলাম। চুলটা একটু চিরুনি দিয়ে ভিজিয়ে আঁচড়ালাম। চোখে-মুখে একটা ফ্রেশ ভাব আনার চেষ্টা করলাম। পাঁচটা পঞ্চাশ মিনিটে আমি আমার ডেস্ক থেকে আনিকাকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলাম। 

আমি: "কোথায় আপনি
?" এক মিনিটের মধ্যেই রিপ্লাই এল।
আনিকা: "মেলায়। আজ একটু আগেই চলে এসেছি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে লেকের পাড়ে বসে আছি। আপনি বের হয়েছেন?"
আমি: "জাস্ট বের হচ্ছি। জ্যাম না থাকলে সিক্স ফর্টির ভেতর পৌঁছে যাব। ওয়েট ফর মি।"
আনিকা: "ওয়েটিং।"

ছয়টা বাজার সাথে সাথেই আমি ল্যাপটপ শাটডাউন করে এহসান ভাইকে একটা সালাম দিয়ে দৌড় দিলাম। নিচে নেমে উবার মোটো ডাকলাম। আজকের বাইকারটা মনে হয় আগে কোনোকালে রেসিং ট্র্যাকে রেস করত। সে কারওয়ান বাজার থেকে শাহবাগ পৌঁছাল মাত্র পঁচিশ মিনিটে। ছয়টা পঁয়ত্রিশ মিনিটে আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লেকের পাড়ে এসে দাঁড়ালাম।

আনিকা একটা কংক্রিটের বেঞ্চে বসে ছিলেন। উনাকে দেখেই আমার বুকের ভেতরকার সেই চিরচেনা ধাক্কাটা নতুন করে লাগল। 
আজ উনার পরনে একটা কুচকুচে কালো রঙের শাড়ি। কালো শাড়িতে যেকোনো নারীকে সুন্দর লাগে, কিন্তু আনিকা নাওহারকে কালো শাড়িতে দেখে মনে হচ্ছিল, উনি যেন সাক্ষাৎ রাতের দেবী ‘নিক্স’। ব্লাউজটাও কালো, স্লিভলেস এবং পিঠের দিকটা বেশ গভীর করে কাটা। উনার ফর্সা, মসৃণ পিঠের অনেকটা অংশ উন্মুক্ত। শীতের শেষ দিকের এই হালকা বাতাসে উনার খোলা চুলগুলো উড়ছে। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক।


আমি উনার পাশে গিয়ে বসলাম। "লেট হয়ে গেল?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। উনি আমার দিকে ফিরে হাসলেন। "একদম না। ইউ আর অন টাইম।" আমরা আড্ডা দিতে শুরু করলাম। প্রতিদিনের মতোই। মেলার ভিড়, মানুষের কোলাহল, মাইকে ভেসে আসা নতুন বইয়ের ঘোষণা— সবকিছুর বাইরে আমরা দুজন যেন একটা আলাদা দ্বীপে বসে আছি।

আনিকা উনার নতুন উপন্যাসের প্লট নিয়ে কথা বলছিলেন। আমি মাথা নেড়ে নেড়ে সায় দিচ্ছিলাম। কিন্তু আমার চোখ উনার সারা শরীরে একটা রাডারের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কালো শাড়ির ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে উনার ভরাট, উদ্ধত বক্ষদেশের যে রূপরেখাটা বোঝা যাচ্ছিল, তা আমার স্নায়ুতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল। উনি যখন কথা বলার সময় হাত নাড়ছিলেন, উনার উন্মুক্ত ফর্সা বাহুর পেশিগুলো একটা অদ্ভুত সম্মোহনী ছন্দের সৃষ্টি করছিল।

আমি উনার কথা গিলছিলাম না, আমি উনার রূপ গিলছিলাম। উনার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি বাঁক আমি আমার চোখের তৃষ্ণা দিয়ে পান করছিলাম। এত সুন্দর, এত আকর্ষণীয়, এত স্বর্গীয় একটা শরীর কীভাবে হতে পারে! আমি মনে মনে ভাবছিলাম, এই শরীরটা যদি একবার, শুধু একবারের জন্য আমার বিছানায়, আমার দুই হাতের নিচে আসত— তাহলে হয়তো আমি হাসতে হাসতে মরে যেতে পারতাম।

রাত পৌনে নয়টা বাজল। মেলায় ভিড় কমতে শুরু করেছে। "চলুন, ওঠা যাক। মেলা তো বন্ধ হয়ে যাবে," আনিকা বললেন। আমরা মেলা থেকে বেরিয়ে এলাম। প্রতিদিনের মতোই আমি উনাকে ধানমন্ডি ড্রপ করার জন্য একটা রিকশা নিলাম। রাত নয়টা। ঢাকা শহরের রাস্তায় তখন গাড়ির স্রোত। নিওন আলো, সোডিয়াম বাতি আর হেডলাইটের আলো মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। রিকশায় আমরা পাশাপাশি বসেছি। রিকশার ছোট্ট পরিসরে উনার শরীরটা আমার শরীরের সাথে খুব হালকাভাবে লেপ্টে আছে।

আমি আমার বাঁ হাতটা রিকশার হুডের রডের ওপর এমনভাবে রাখলাম, যেন আনিকা আমার হাতের বলয়ের ভেতর নিরাপদ আছেন। রিকশা যখনই স্পিডব্রেকার পার হচ্ছিল বা গর্তে পড়ছিল, উনার নরম শরীরটা এসে আমার কাঁধে আর বাহুতে ধাক্কা খাচ্ছিল। উনার গায়ের সেই দামি শ্যানেল পারফিউমের গন্ধটা রাতের শীতল বাতাসে মিশে একটা মাতাল করা ঘ্রাণ তৈরি করেছে। আমি চোখ বন্ধ করে একটা গভীর শ্বাস নিলাম। এই ঘ্রাণটা, এই স্পর্শটা আমার ভেতরে একটা আদিম বিস্ফোরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

আমি আড়চোখে উনার দিকে তাকালাম। রাস্তার আলো-আঁধারিতে উনার কালো শাড়িতে ঢাকা শরীরটাকে একটা রহস্যময়ী ভাস্কর্যের মতো মনে হচ্ছিল। উনার ঘাড়ের কাছে চুলগুলো একটু সরে যাওয়ায় গলার ফর্সা অংশটা দেখা যাচ্ছে। আমার প্রচণ্ড ইচ্ছে করছিল, আমি আমার মুখটা ওখানে গুঁজে দিই। উনার ঘাড়ের ওই জায়গাটায় আমি আমার দাঁত বসিয়ে দিই। কিন্তু আমি তো রাশেদ আহমেদ। ভদ্র, অনুবাদক। আমি আমার পশুকে শিকল পরিয়ে রাখলাম।

ধানমন্ডির ২ নাম্বার রোডের ভেতরে একটা সুউচ্চ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের সামনে এসে রিকশা থামল। এই বিল্ডিংটা আমি গত কয়েকদিন ধরে দেখছি। পনেরো-ষোল তলা হবে। গ্লাস আর স্টিলের তৈরি অত্যাধুনিক একটা টাওয়ার। সামনে বিশাল লোহা আর কাঠের তৈরি মেন গেট। ভেতরে সিকিউরিটি গার্ডদের জন্য আলাদা রুম। সিসি ক্যামেরা বসানো।

এই ধরনের বিল্ডিংয়ে ঢাকা শহরের এলিট ক্লাসরা থাকে। মিরপুরের মেসের একজন ব্যাচেলর হিসেবে এই বিল্ডিংয়ের দিকে তাকালেই আমার এক ধরনের হীনম্মন্যতা কাজ করে। এখানে ব্যাচেলরদের কেউ ফ্ল্যাট ভাড়া দেবে না, তা তো শতভাগ নিশ্চিত। আর দিলেও, এই বিল্ডিংয়ের এক মাসের মেইনটেন্যান্স বা সার্ভিস চার্জই হয়তো আমার সারা মাসের বেতনের সমান। আমি রিকশা থেকে নেমে আনিকাকে নামতে সাহায্য করলাম। "থ্যাংক ইউ রাশেদ," আনিকা শাড়িটা একটু ঠিক করে নিয়ে বললেন। প্রতিদিন এই জায়গাতেই আমাদের বিদায় পর্ব সম্পন্ন হয়। উনি ভেতরে ঢুকে যান, আর আমি আরেকটা রিকশা বা সিএনজি নিয়ে মিরপুরের দিকে রওনা দিই।

কিন্তু আজ আনিকা গেটের দিকে না গিয়ে আমার দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। "রাশেদ, আপনি প্রতিদিন এত কষ্ট করে আমাকে নামিয়ে দিয়ে যান। আর এখান থেকে আপনাকে আবার সেই মিরপুর ফিরতে হয়। আমি সত্যিই খুব গিল্টি ফিল করি," আনিকা নরম গলায় বললেন। আমি বীরদর্পে মুচকি হাসলাম। "গিল্টি ফিল করার কী আছে আনিকা? আমি তো আগেই বলেছি, এই জ্যামের শহরে আপনাকে একা ছেড়ে দেওয়াটা আমার বিবেকে বাধে। ইটস মাই প্লেজার।"

আনিকা একটু চুপ করে রইলেন। তারপর উনার সেই বাদামি চোখ জোড়া আমার চোখের ওপর স্থির করে বললেন, "আজকে আর এখান থেকে ফিরে যাবেন না। আজকে বাসায় আসুন। এক কাপ চা খেয়ে যান।" অফারটা শোনার সাথে সাথে আমার বুকের ভেতর যেন একটা হাতুড়ি দিয়ে কেউ প্রচণ্ড জোরে বাড়ি মারল। বাসায় আসুন! এক কাপ চা খেয়ে যান!

এই রাত নয়টার সময় একজন বিবাহিতা নারী আমাকে তার ফ্ল্যাটে ডাকছেন! আমার শরীরের ভেতরের রক্ত চলাচলের গতি তিনগুণ বেড়ে গেল। আমার মাথার ভেতরকার আদিম পুরুষটা আনন্দে চিৎকার করে উঠল— "যা ব্যাটা! ভেতরে যা! আজ তোর কপাল খুলে গেছে!" কিন্তু আমার বাইরের ভদ্র, বুদ্ধিবৃত্তিক মুখোশটা সাথে সাথে অন হলো। আমি জানি, নারীরা খুব সহজে রাজি হওয়া পুরুষদের পছন্দ করে না। একটু 'প্লে হার্ড টু গেট' খেলতে হয়।

আমি মুখে একটা বিনয়ী
, অনিচ্ছুক ভাব ফুটিয়ে তুলে বললাম, "আরে না না! আজ আর চা খাব না। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। কাল তো আবার অফিস আছে। আরেক দিন খাব।" আমার মনে মনে তখন দোয়া দরুদ পড়া শুরু হয়ে গেছে— 'হে আল্লাহ, উনি যেন জোড়াজুরি করেন! উনি যেন আমার এই 'না' টাকে মেনে নিয়ে চলে না যান! উনি যদি এখন চলে যান, আমি হয়তো রিকশার চাকার নিচে মাথা দিয়ে মরে যাব!'

আমার দোয়া কবুল হলো।

আনিকা একটু জেদের সুরে বললেন, "আরে না। কোনো কথা শুনব না। আজ আপনাকে চা খেতেই হবে। আপনি প্রতিদিন আমাকে ড্রপ করেন, আর আমি আপনাকে এক কাপ চা না খাইয়েই বিদায় দিই— এটা খুব আনসিভিলাইজড দেখায়। চলুন, ভেতরে চলুন।" আমি আর দ্বিতীয়বার না করলাম না। আমি অত্যন্ত 'নিরুপায়' ভঙ্গিতে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "আপনি যখন এত করে বলছেন... ঠিক আছে, চলুন। তবে খুব বেশিক্ষণের জন্য নয় কিন্তু।"

আনিকা হাসলেন। "আচ্ছা বাবা, বেশিক্ষণ আটকে রাখব না আপনাকে।" আমরা মেইন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। সিকিউরিটি গার্ড আনিকাকে দেখে স্যালুট দিল। আমার দিকে একবার আড়চোখে তাকাল, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না।

ভেতরে ঢুকে দেখলাম বিশাল এক লবি। মার্বেল পাথরের ফ্লোর। এক কোণায় একটা ফোয়ারা, যদিও সেটা এখন বন্ধ। দুটো অত্যাধুনিক লিফট। আমরা লিফটে গিয়ে দাঁড়ালাম। আনিকা ৭ নাম্বার বাটনটা চাপলেন। লাকি সেভেন। লিফট খুব নিঃশব্দে ওপরে উঠতে লাগল। লিফটের ভেতরের আয়নায় আমি আনিকার পাশে নিজেকে দেখলাম। পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের রাশেদ আহমেদ, একজন বিলিয়নিয়ার, অপরূপা নারীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এটা কি কোনো স্বপ্ন, নাকি সত্যিই ঘটছে? সাত তলায় লিফট থামল। একটা ফ্লোরে মাত্র দুটো ফ্ল্যাট। আনিকা ডান দিকের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে উনার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে চাবি বের করলেন। দরজা খুলে উনি আমাকে ভেতরে ইশারা করলেন। "আসুন।"

আমি ভেতরে পা রাখলাম।

এবং সাথে সাথে আমি বুঝতে পারলাম, আমি একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে এসে পড়েছি। ফ্ল্যাটটা বিশাল। আমার মিরপুরের চার রুমের পুরো মেসটা হয়তো এই ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমটার সমান হবে। বিশাল স্পেস। ফ্লোরে কাঠের টেক্সচার দেওয়া দামি টাইলস। সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা বাতাস আমাকে ছুঁয়ে গেল। সিলিংয়ে ফলস সিলিং করা, সেখান থেকে ওয়ার্ম হোয়াইট স্পটলাইটের আলো পুরো ঘরটাকে একটা মায়াবী রূপ দিয়েছে।

এক পাশে বিশাল এল-প্যাটার্নের একটা লেদার সোফা। দেয়ালে বড় বড় সব পেইন্টিং। এক কোণায় একটা ইনডোর প্ল্যান্ট। সামনের দিকে ডাইনিং স্পেস, আর তার ওপাশে হয়তো বেডরুমগুলো। আমি আন্দাজ করলাম, এই ফ্ল্যাটে অন্তত চারটা বা পাঁচটা বিশাল রুম আছে। আমি সোফার পাশে একটা সিঙ্গেল কাউচে আড়ষ্ট হয়ে বসলাম। আনিকা উনার ভ্যানিটি ব্যাগটা একটা টেবিলের ওপর রেখে আমার দিকে ঘুরলেন। "আপনার ফ্ল্যাটটা তো দারুণ সুন্দর," আমি চারদিকে তাকাতে তাকাতে বললাম। 

আনিকা একটু হাসলেন। উনার সেই হাসিতে এক ধরনের অদ্ভুত রহস্য লুকিয়ে ছিল। "আমার ফ্ল্যাট না রাশেদ, আমার মামার ফ্ল্যাট। আমি যখন বছরে একবার দেশে আসি, তখন আমি এখানেই থাকি।" আমার বুকের স্পন্দন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। "মানে... আপনি এই এত বড় ফ্ল্যাটে... একাই থাকেন?"

"হ্যাঁ। আমি একাই থাকি।" আনিকা খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললেন। আমার মাথার ভেতরে এখন আর কোনো লজিক কাজ করছে না। রাত সাড়ে নয়টা। ১৬ তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার একটা বিশাল, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটে আমি আর আনিকা নাওহার ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নেই। সম্পূর্ণ একা। আমি একজন ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো উনার দিকে তাকালাম।

আনিকা উনার কালো শাড়ির আঁচলটা একটু ঢিলা করে দিলেন। উনার সেই মোহনীয় , ফর্সা, মসৃণ কাঁধ এবং পিঠের অংশটুকু স্পটলাইটের আলোয় যেন চকচক করে উঠল।"আপনি বসুন রাশেদ। আমি কিচেন থেকে চা নিয়ে আসছি," এই বলে আনিকা কিচেনের দিকে পা বাড়ালেন। আমি সোফায় জমে গিয়ে উনার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

এই পুরো সময়টা— সেই রিকশা থেকে শুরু করে লিফট হয়ে এই কিচেন অব্দি যাওয়ার সময়টুকু— আমি উনার রূপ, উনার আকর্ষণ, উনার শারীরিক বাঁকগুলোকে আমার চোখ দিয়ে গিলেছি। উনার সেই কালো শাড়ি পরা ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতি যখন হেঁটে যাচ্ছিল, উনার নিতম্বের সেই মোহনীয় দুলুনি, উনার সরু কোমরের সেই ছন্দ— সবকিছু আমি পান করছিলাম। উনার শরীরের প্রতিটি নড়াচড়া যেন আমাকে নেশাগ্রস্ত করে দিচ্ছিল। আমি যেন এক ফোঁটা সুধা পান করছিলাম, যা আমাকে আরও বেশি তৃষ্ণার্ত করে তুলছে।

আনিকা কিচেনের দরজার কাছে গিয়ে একটু থামলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে উনার সেই রহস্যময় হাসিটা হাসলেন। "রাশেদ, ডান দিকের করিডোর দিয়ে প্রথম দরজাটা বাথরুম। আপনি চাইলে ফ্রেশ হয়ে নিতে পারেন। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।" উনি কিচেনের ভেতর ঢুকে গেলেন। আমি সোফা থেকে উঠলাম। আমার পা দুটো কাঁপছে। আমার শরীরের ভেতরের সেই অবদমিত, বন্য পুরুষটা এখন শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার জন্য উন্মাদ হয়ে আছে।

আমি ডান দিকের করিডোর ধরে বাথরুমের দিকে এগোলাম। আমার মাথার ভেতর শুধু একটাই বাক্য প্রতিধ্বনিত হচ্ছে— "উনি একা থাকেন। এই ফ্ল্যাটে উনি সম্পূর্ণ একা।" আমি বাথরুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। আমার মুখমণ্ডল ঘামে ভিজে গেছে। রাশেদ আহমেদ, পঁচিশ হাজার টাকার অনুবাদক, আজ হয়তো এমন একটা কিছু অনুবাদ করতে যাচ্ছে, যার ভাষা পৃথিবীর কোনো ডিকশনারিতে লেখা নেই। আমি বাথরুমের আয়নায় নিজের বন্য চোখের দিকে তাকালাম।
[+] 9 users Like Orbachin's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস? - by Orbachin - 19-06-2026, 01:25 PM



Users browsing this thread: 3 Guest(s)