19-06-2026, 01:09 PM
অধ্যায় ৩৭ : যে চোখে প্রাণীরা দেখে
শীতের সকাল কেটে দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
কাশীপুর গ্রামের ওপর একটা অলস নীরবতা নেমে এসেছে।
⸻
কলেজ ছুটি হয়েছে কিছুক্ষণ আগে।
⸻
রতন একাই ফিরছে।
⸻
সিবু আজ মামার বাড়ি গেছে।
কার্তিকও অন্য পথে।
⸻
ধান কাটা হয়ে যাওয়া মাঠের পাশ দিয়ে মাটির সরু রাস্তা ধরে হাঁটছে সে।
⸻
হাওয়ায় শুকনো খড়ের গন্ধ।
⸻
দূরে কয়েকটা সাদা বক জমির ওপর দাঁড়িয়ে।
⸻
সবকিছু স্বাভাবিক।
⸻
অথচ আজ সারাদিন রতনের মনটা কেমন অস্থির।
⸻
কারণ ছাড়াই।
⸻
রাস্তার মোড় ঘুরতেই সে একটা কুকুরকে দেখতে পেল।
⸻
গ্রামেরই কুকুর।
⸻
হলদে-বাদামি রঙ।
⸻
চোখের নিচে পুরোনো একটা দাগ।
⸻
রতন তাকে আগেও দেখেছে।
⸻
কুকুরটাও সাধারণত মানুষ দেখলে লেজ নাড়ে।
⸻
কিন্তু আজ…
ঘটল অন্য কিছু।
⸻
কুকুরটা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
⸻
তারপর রতনকে দেখল।
⸻
এক সেকেন্ড।
⸻
দুই সেকেন্ড।
⸻
তিন সেকেন্ড।
⸻
হঠাৎ কুকুরটার শরীর শক্ত হয়ে গেল।
⸻
লেজ ধীরে ধীরে পায়ের ফাঁকে ঢুকে গেল।
⸻
কান দুটো মাথার সঙ্গে লেগে গেল।
⸻
চোখে অদ্ভুত আতঙ্ক।
⸻
যেন সে এমন কিছু দেখছে যা মানুষের চোখে ধরা পড়ে না।
⸻
রতন থেমে গেল।
⸻
— এই?
⸻
সে ডাক দিল।
⸻
কুকুরটা কুঁই কুঁই করে পিছিয়ে গেল।
⸻
আর তারপর…
এক ঝটকায় দৌড়ে পালাল।
⸻
যেন মৃত্যুকে দেখে ফেলেছে।
⸻
রতন কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
⸻
বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি।
⸻
কষ্ট নয়।
⸻
ভয়ও নয়।
⸻
বরং…
অচেনা এক পরিচিতি।
⸻
যেন এই দৃশ্য সে আগেও দেখেছে।
⸻
অনেকবার।
⸻
অনেক বছর আগে।
⸻
তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল।
⸻
খুব ক্ষীণ।
⸻
খুব ছোট।
⸻
তারপরই হাসিটা মিলিয়ে গেল।
⸻
রতন নিজেই বুঝতে পারল না কেন হাসল।
⸻
সে আবার হাঁটতে শুরু করল।
⸻
কিন্তু তার ভেতরের অন্ধকারে…
একটা স্মৃতি জেগে উঠেছিল।
⸻
একটা বহু পুরোনো স্মৃতি।
⸻
রাত্রি।
⸻
আগুনের আলো।
⸻
গাছের ছায়া।
⸻
আর কয়েকটা কুকুর।
⸻
তারা দূরে দাঁড়িয়ে কাঁপছে।
⸻
কারও সাহস হচ্ছে না কাছে আসার।
⸻
সেই স্মৃতির গভীর থেকে একটা ভাবনা ভেসে উঠল।
⸻
“ওরা আগে থেকেই বুঝত…”
⸻
“প্রাণীরা সবসময় আগে বুঝে।”
⸻
তারপর আবার অন্ধকার।
⸻
আবার নীরবতা।
⸻
সন্ধ্যার দিকে রতন বাড়ি পৌঁছল।
⸻
প্রতিমা উঠোনে ধোয়া কাপড় মেলছিলেন।
⸻
রমাপদ এখনও ফেরেননি।
⸻
সব আগের মতো।
⸻
তবু আজ রতনের মনে হচ্ছে—
কেউ যেন তাকে লক্ষ করছে।
⸻
কোথা থেকে?
⸻
সে জানে না।
⸻
সেই সময়…
গ্রামের অন্য প্রান্তে।
⸻
শিবমন্দিরের চাতালে বসেছিলেন হরিঠাকুমা।
⸻
হাতে জপমালা।
⸻
কিন্তু আজ তার মন জপে নেই।
⸻
সকালের পর থেকে বুকের ভেতর অকারণ একটা অস্বস্তি।
⸻
হঠাৎ মন্দিরের সামনে একটা কালো কুকুর এসে দাঁড়াল।
⸻
কুকুরটা কয়েক মুহূর্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
⸻
তারপর ধীরে ধীরে কুঁই কুঁই শব্দ করল।
⸻
আর মন্দিরের সিঁড়ির নিচে শুয়ে পড়ল।
⸻
যেন আশ্রয় চাইছে।
⸻
হরিঠাকুমা কাঁপা হাতে কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
⸻
তারপর খুব আস্তে বললেন—
“তুইও কি টের পাচ্ছিস রে?”
⸻
কুকুরটা মাথা তুলল না।
⸻
শুধু চোখ বন্ধ করল।
⸻
সেই রাত।
⸻
রতন ঘুমিয়ে।
⸻
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে।
⸻
বাইরে কুয়াশা।
⸻
দূরে শেয়ালের ডাক।
⸻
আর গভীর অন্ধকারে…
কেউ একজন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে।
⸻
শক্তি এখনও অসম্পূর্ণ।
⸻
বন্ধন এখনও পুরো ভাঙেনি।
⸻
তবু আজকের ঘটনায় সে খুশি।
⸻
কারণ বহু বছর পরে আবার একবার নিশ্চিত হলো—
⸻
প্রাণীরা এখনও তাকে চিনতে পারে।
⸻
আর যেদিন মানুষও চিনতে শুরু করবে…
সেদিন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
⸻
বটগাছটার কালো ছায়া দূরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।
⸻
কিন্তু তার শিকড়ের গভীরে…
কোথাও যেন অদৃশ্যভাবে আরেকটা বন্ধন একটু আলগা হয়ে গেল।
শীতের সকাল কেটে দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
কাশীপুর গ্রামের ওপর একটা অলস নীরবতা নেমে এসেছে।
⸻
কলেজ ছুটি হয়েছে কিছুক্ষণ আগে।
⸻
রতন একাই ফিরছে।
⸻
সিবু আজ মামার বাড়ি গেছে।
কার্তিকও অন্য পথে।
⸻
ধান কাটা হয়ে যাওয়া মাঠের পাশ দিয়ে মাটির সরু রাস্তা ধরে হাঁটছে সে।
⸻
হাওয়ায় শুকনো খড়ের গন্ধ।
⸻
দূরে কয়েকটা সাদা বক জমির ওপর দাঁড়িয়ে।
⸻
সবকিছু স্বাভাবিক।
⸻
অথচ আজ সারাদিন রতনের মনটা কেমন অস্থির।
⸻
কারণ ছাড়াই।
⸻
রাস্তার মোড় ঘুরতেই সে একটা কুকুরকে দেখতে পেল।
⸻
গ্রামেরই কুকুর।
⸻
হলদে-বাদামি রঙ।
⸻
চোখের নিচে পুরোনো একটা দাগ।
⸻
রতন তাকে আগেও দেখেছে।
⸻
কুকুরটাও সাধারণত মানুষ দেখলে লেজ নাড়ে।
⸻
কিন্তু আজ…
ঘটল অন্য কিছু।
⸻
কুকুরটা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
⸻
তারপর রতনকে দেখল।
⸻
এক সেকেন্ড।
⸻
দুই সেকেন্ড।
⸻
তিন সেকেন্ড।
⸻
হঠাৎ কুকুরটার শরীর শক্ত হয়ে গেল।
⸻
লেজ ধীরে ধীরে পায়ের ফাঁকে ঢুকে গেল।
⸻
কান দুটো মাথার সঙ্গে লেগে গেল।
⸻
চোখে অদ্ভুত আতঙ্ক।
⸻
যেন সে এমন কিছু দেখছে যা মানুষের চোখে ধরা পড়ে না।
⸻
রতন থেমে গেল।
⸻
— এই?
⸻
সে ডাক দিল।
⸻
কুকুরটা কুঁই কুঁই করে পিছিয়ে গেল।
⸻
আর তারপর…
এক ঝটকায় দৌড়ে পালাল।
⸻
যেন মৃত্যুকে দেখে ফেলেছে।
⸻
রতন কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
⸻
বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি।
⸻
কষ্ট নয়।
⸻
ভয়ও নয়।
⸻
বরং…
অচেনা এক পরিচিতি।
⸻
যেন এই দৃশ্য সে আগেও দেখেছে।
⸻
অনেকবার।
⸻
অনেক বছর আগে।
⸻
তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল।
⸻
খুব ক্ষীণ।
⸻
খুব ছোট।
⸻
তারপরই হাসিটা মিলিয়ে গেল।
⸻
রতন নিজেই বুঝতে পারল না কেন হাসল।
⸻
সে আবার হাঁটতে শুরু করল।
⸻
কিন্তু তার ভেতরের অন্ধকারে…
একটা স্মৃতি জেগে উঠেছিল।
⸻
একটা বহু পুরোনো স্মৃতি।
⸻
রাত্রি।
⸻
আগুনের আলো।
⸻
গাছের ছায়া।
⸻
আর কয়েকটা কুকুর।
⸻
তারা দূরে দাঁড়িয়ে কাঁপছে।
⸻
কারও সাহস হচ্ছে না কাছে আসার।
⸻
সেই স্মৃতির গভীর থেকে একটা ভাবনা ভেসে উঠল।
⸻
“ওরা আগে থেকেই বুঝত…”
⸻
“প্রাণীরা সবসময় আগে বুঝে।”
⸻
তারপর আবার অন্ধকার।
⸻
আবার নীরবতা।
⸻
সন্ধ্যার দিকে রতন বাড়ি পৌঁছল।
⸻
প্রতিমা উঠোনে ধোয়া কাপড় মেলছিলেন।
⸻
রমাপদ এখনও ফেরেননি।
⸻
সব আগের মতো।
⸻
তবু আজ রতনের মনে হচ্ছে—
কেউ যেন তাকে লক্ষ করছে।
⸻
কোথা থেকে?
⸻
সে জানে না।
⸻
সেই সময়…
গ্রামের অন্য প্রান্তে।
⸻
শিবমন্দিরের চাতালে বসেছিলেন হরিঠাকুমা।
⸻
হাতে জপমালা।
⸻
কিন্তু আজ তার মন জপে নেই।
⸻
সকালের পর থেকে বুকের ভেতর অকারণ একটা অস্বস্তি।
⸻
হঠাৎ মন্দিরের সামনে একটা কালো কুকুর এসে দাঁড়াল।
⸻
কুকুরটা কয়েক মুহূর্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
⸻
তারপর ধীরে ধীরে কুঁই কুঁই শব্দ করল।
⸻
আর মন্দিরের সিঁড়ির নিচে শুয়ে পড়ল।
⸻
যেন আশ্রয় চাইছে।
⸻
হরিঠাকুমা কাঁপা হাতে কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
⸻
তারপর খুব আস্তে বললেন—
“তুইও কি টের পাচ্ছিস রে?”
⸻
কুকুরটা মাথা তুলল না।
⸻
শুধু চোখ বন্ধ করল।
⸻
সেই রাত।
⸻
রতন ঘুমিয়ে।
⸻
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে।
⸻
বাইরে কুয়াশা।
⸻
দূরে শেয়ালের ডাক।
⸻
আর গভীর অন্ধকারে…
কেউ একজন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে।
⸻
শক্তি এখনও অসম্পূর্ণ।
⸻
বন্ধন এখনও পুরো ভাঙেনি।
⸻
তবু আজকের ঘটনায় সে খুশি।
⸻
কারণ বহু বছর পরে আবার একবার নিশ্চিত হলো—
⸻
প্রাণীরা এখনও তাকে চিনতে পারে।
⸻
আর যেদিন মানুষও চিনতে শুরু করবে…
সেদিন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
⸻
বটগাছটার কালো ছায়া দূরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।
⸻
কিন্তু তার শিকড়ের গভীরে…
কোথাও যেন অদৃশ্যভাবে আরেকটা বন্ধন একটু আলগা হয়ে গেল।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)