19-06-2026, 01:06 PM
অধ্যায় ৩৫ : শীতের সকাল
ভোরের কুয়াশা তখন ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে আসছে।
কাশীপুর গ্রামের ওপর নরম রোদ নামতে শুরু করেছে।
দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ।
আরও দূরে কারও উঠোনে ঝাড়ু দেওয়ার খসখস আওয়াজ।
⸻
মুখার্জী বাড়ির রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে।
⸻
প্রতিমা উনুনের সামনে দুই পা ভাঁজ করে বসে আছেন।
⸻
সামনে বাঁশের ছোট ঝুড়িতে আলু আর ভেন্ডি।
⸻
ধীরে ধীরে সবজি কেটে চলেছেন।
⸻
উনুনের আগুনে তার মুখের একপাশ লালচে হয়ে উঠেছে।
⸻
আজ তিনি হালকা হলুদ রঙের ওপর সবুজ ছাপা একটা শাড়ি পরেছেন।
সঙ্গে কালো ব্লাউজ।
⸻
উনুনের তাপের জন্য কপালের কাছে ছোট ছোট ঘামের বিন্দু জমেছে।
⸻
পাশেই হাঁড়িতে ভাত প্রায় হয়ে এসেছে।
⸻
ডাল ধোয়া আছে।
একটু পরেই চাপাবেন।
⸻
রতনের জন্য দুটো রুটি আর আলুভাজা আগেই বানিয়ে একটা স্টিলের টিফিন বক্সে ভরে রাখা হয়েছে।
⸻
প্রায় প্রতিদিনই ওই টিফিন নিয়েই কলেজে যায় সে।
⸻
উঠোনের দিকে মুখ করে বসে ছিলেন রমাপদ।
⸻
হাতে একটা পুরোনো খবরের কাগজ।
⸻
যদিও বেশিরভাগ সময়ই তিনি খবরের কাগজের চেয়ে আশেপাশের মানুষজনকেই বেশি লক্ষ করেন।
⸻
প্রতিমা বললেন,
— কাল বিকেলে হাটে গিয়েছিলে, বাঁধাকপি কত করে?
⸻
— কুড়ি টাকা।
⸻
— এত!
⸻
— এ বছর ফলন কম হয়েছে বোধহয়।
⸻
প্রতিমা মাথা নাড়লেন।
⸻
তারপর বললেন,
— সিবুর মায়ের শরীর কেমন?
⸻
— ভালোই শুনলাম।
⸻
— সেদিন দেখলাম কেমন ফ্যাকাশে লাগছিল।
⸻
রমাপদ কাঁধ ঝাঁকালেন।
⸻
গ্রামে এমন কথাবার্তাই হয়।
⸻
একজনের খবর আরেকজনের কাছে পৌঁছে যায়।
⸻
কখনও পুরোটা।
⸻
কখনও অর্ধেক।
⸻
হঠাৎ প্রতিমা বললেন,
— ওগো, রতনকে একবার ডাকো তো।
⸻
— এখনও ওঠেনি?
⸻
— না।
⸻
— কাল বোধহয় অনেক রাত পর্যন্ত পড়েছে।
⸻
রমাপদ উঠে দাঁড়ালেন।
⸻
তারপর ঘরের দিকে তাকিয়ে ডাকলেন,
— রতন!
⸻
কোনো উত্তর নেই।
⸻
আরেকবার ডাকলেন।
⸻
— ও রতন!
⸻
এইবার ভেতর থেকে শব্দ এল।
⸻
— উঠছি বাবা…
⸻
ঘুম জড়ানো গলা।
⸻
প্রতিমা হেসে ফেললেন।
⸻
— পড়াশোনা যতই করুক, সকালে উঠতে গেলে আর জোটে না।
⸻
রমাপদও হেসে মাথা নাড়লেন।
⸻
কয়েক মিনিট পরে রতন বেরিয়ে এল।
⸻
চুল এলোমেলো।
⸻
চোখে এখনও ঘুমের ছাপ।
⸻
প্রতিমা বললেন,
— আগে মুখ ধুয়ে আয়।
⸻
— হ্যাঁ।
⸻
রতন কলতলার দিকে চলে গেল।
⸻
শীতের সকালের জল বরাবরের মতো ঠান্ডা।
⸻
মুখে জল দিতেই তার ঘুম কেটে গেল।
⸻
কিন্তু…
ঠিক সেই সময়।
⸻
একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো।
⸻
খুব ক্ষণিকের জন্য।
⸻
যেন কেউ তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
⸻
রতন ঘুরে তাকাল।
⸻
কেউ নেই।
⸻
শুধু কলতলার পাশে কলাগাছ।
⸻
আর শিশির ভেজা মাটি।
⸻
সে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
⸻
তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে ফিরে এল।
⸻
খাওয়ার সময় রমাপদ নিজের টিফিন গুছিয়ে নিলেন।
⸻
আজও আটটা রুটি।
⸻
সঙ্গে আলুভাজা।
⸻
আর ছোট একটা ডিব্বায় ডাল।
⸻
কলেজে সারাদিন কাটাতে হয়।
⸻
তাই বাড়ি থেকেই সব নিয়ে যান।
⸻
প্রতিমা টিফিনের ঢাকনা বন্ধ করতে করতে বললেন,
— দুপুরে যেন ঠিকমতো খাও।
⸻
— আচ্ছা।
⸻
— আর রতন, তুই টিফিন না খেয়ে ফিরবি না।
⸻
— জানি তো মা।
⸻
প্রতিমা মুচকি হাসলেন।
⸻
এমন কথাই তিনি প্রায় প্রতিদিন বলেন।
⸻
সবকিছু এত স্বাভাবিক।
⸻
এত পরিচিত।
⸻
যেন এই বাড়িতে কোনো অশুভ ছায়া কখনও প্রবেশই করেনি।
⸻
যেন সব আগের মতোই আছে।
⸻
কিন্তু উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নিমগাছটার ছায়া হঠাৎ বাতাস ছাড়াই একবার কেঁপে উঠল।
⸻
খুব সামান্য।
⸻
এতটাই সামান্য যে কেউ খেয়াল করল না।
⸻
কেউ না।
⸻
এমনকি রতনও না।
⸻
আর গ্রামের অন্য প্রান্তে…
শিবমন্দিরের চাতালে বসে হরিঠাকুমা আজও জপমালা ঘুরাচ্ছিলেন।
⸻
কিন্তু আজ তার মন বারবার অস্থির হয়ে উঠছে।
⸻
কারণ গতকালের সেই অনুভূতিটা এখনও তাকে ছাড়েনি।
⸻
তিনি জানেন না কী।
⸻
জানেন না কেন।
⸻
তবু মনে হচ্ছে—
কাশীপুরের বাতাসে যেন কিছু একটা বদলাতে শুরু করেছে।
⸻
খুব ধীরে।
⸻
খুব নিঃশব্দে।
⸻
আর সেই পরিবর্তনের শব্দ এখনও কেউ শুনতে পাচ্ছে না।
ভোরের কুয়াশা তখন ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে আসছে।
কাশীপুর গ্রামের ওপর নরম রোদ নামতে শুরু করেছে।
দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ।
আরও দূরে কারও উঠোনে ঝাড়ু দেওয়ার খসখস আওয়াজ।
⸻
মুখার্জী বাড়ির রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে।
⸻
প্রতিমা উনুনের সামনে দুই পা ভাঁজ করে বসে আছেন।
⸻
সামনে বাঁশের ছোট ঝুড়িতে আলু আর ভেন্ডি।
⸻
ধীরে ধীরে সবজি কেটে চলেছেন।
⸻
উনুনের আগুনে তার মুখের একপাশ লালচে হয়ে উঠেছে।
⸻
আজ তিনি হালকা হলুদ রঙের ওপর সবুজ ছাপা একটা শাড়ি পরেছেন।
সঙ্গে কালো ব্লাউজ।
⸻
উনুনের তাপের জন্য কপালের কাছে ছোট ছোট ঘামের বিন্দু জমেছে।
⸻
পাশেই হাঁড়িতে ভাত প্রায় হয়ে এসেছে।
⸻
ডাল ধোয়া আছে।
একটু পরেই চাপাবেন।
⸻
রতনের জন্য দুটো রুটি আর আলুভাজা আগেই বানিয়ে একটা স্টিলের টিফিন বক্সে ভরে রাখা হয়েছে।
⸻
প্রায় প্রতিদিনই ওই টিফিন নিয়েই কলেজে যায় সে।
⸻
উঠোনের দিকে মুখ করে বসে ছিলেন রমাপদ।
⸻
হাতে একটা পুরোনো খবরের কাগজ।
⸻
যদিও বেশিরভাগ সময়ই তিনি খবরের কাগজের চেয়ে আশেপাশের মানুষজনকেই বেশি লক্ষ করেন।
⸻
প্রতিমা বললেন,
— কাল বিকেলে হাটে গিয়েছিলে, বাঁধাকপি কত করে?
⸻
— কুড়ি টাকা।
⸻
— এত!
⸻
— এ বছর ফলন কম হয়েছে বোধহয়।
⸻
প্রতিমা মাথা নাড়লেন।
⸻
তারপর বললেন,
— সিবুর মায়ের শরীর কেমন?
⸻
— ভালোই শুনলাম।
⸻
— সেদিন দেখলাম কেমন ফ্যাকাশে লাগছিল।
⸻
রমাপদ কাঁধ ঝাঁকালেন।
⸻
গ্রামে এমন কথাবার্তাই হয়।
⸻
একজনের খবর আরেকজনের কাছে পৌঁছে যায়।
⸻
কখনও পুরোটা।
⸻
কখনও অর্ধেক।
⸻
হঠাৎ প্রতিমা বললেন,
— ওগো, রতনকে একবার ডাকো তো।
⸻
— এখনও ওঠেনি?
⸻
— না।
⸻
— কাল বোধহয় অনেক রাত পর্যন্ত পড়েছে।
⸻
রমাপদ উঠে দাঁড়ালেন।
⸻
তারপর ঘরের দিকে তাকিয়ে ডাকলেন,
— রতন!
⸻
কোনো উত্তর নেই।
⸻
আরেকবার ডাকলেন।
⸻
— ও রতন!
⸻
এইবার ভেতর থেকে শব্দ এল।
⸻
— উঠছি বাবা…
⸻
ঘুম জড়ানো গলা।
⸻
প্রতিমা হেসে ফেললেন।
⸻
— পড়াশোনা যতই করুক, সকালে উঠতে গেলে আর জোটে না।
⸻
রমাপদও হেসে মাথা নাড়লেন।
⸻
কয়েক মিনিট পরে রতন বেরিয়ে এল।
⸻
চুল এলোমেলো।
⸻
চোখে এখনও ঘুমের ছাপ।
⸻
প্রতিমা বললেন,
— আগে মুখ ধুয়ে আয়।
⸻
— হ্যাঁ।
⸻
রতন কলতলার দিকে চলে গেল।
⸻
শীতের সকালের জল বরাবরের মতো ঠান্ডা।
⸻
মুখে জল দিতেই তার ঘুম কেটে গেল।
⸻
কিন্তু…
ঠিক সেই সময়।
⸻
একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো।
⸻
খুব ক্ষণিকের জন্য।
⸻
যেন কেউ তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
⸻
রতন ঘুরে তাকাল।
⸻
কেউ নেই।
⸻
শুধু কলতলার পাশে কলাগাছ।
⸻
আর শিশির ভেজা মাটি।
⸻
সে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
⸻
তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে ফিরে এল।
⸻
খাওয়ার সময় রমাপদ নিজের টিফিন গুছিয়ে নিলেন।
⸻
আজও আটটা রুটি।
⸻
সঙ্গে আলুভাজা।
⸻
আর ছোট একটা ডিব্বায় ডাল।
⸻
কলেজে সারাদিন কাটাতে হয়।
⸻
তাই বাড়ি থেকেই সব নিয়ে যান।
⸻
প্রতিমা টিফিনের ঢাকনা বন্ধ করতে করতে বললেন,
— দুপুরে যেন ঠিকমতো খাও।
⸻
— আচ্ছা।
⸻
— আর রতন, তুই টিফিন না খেয়ে ফিরবি না।
⸻
— জানি তো মা।
⸻
প্রতিমা মুচকি হাসলেন।
⸻
এমন কথাই তিনি প্রায় প্রতিদিন বলেন।
⸻
সবকিছু এত স্বাভাবিক।
⸻
এত পরিচিত।
⸻
যেন এই বাড়িতে কোনো অশুভ ছায়া কখনও প্রবেশই করেনি।
⸻
যেন সব আগের মতোই আছে।
⸻
কিন্তু উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নিমগাছটার ছায়া হঠাৎ বাতাস ছাড়াই একবার কেঁপে উঠল।
⸻
খুব সামান্য।
⸻
এতটাই সামান্য যে কেউ খেয়াল করল না।
⸻
কেউ না।
⸻
এমনকি রতনও না।
⸻
আর গ্রামের অন্য প্রান্তে…
শিবমন্দিরের চাতালে বসে হরিঠাকুমা আজও জপমালা ঘুরাচ্ছিলেন।
⸻
কিন্তু আজ তার মন বারবার অস্থির হয়ে উঠছে।
⸻
কারণ গতকালের সেই অনুভূতিটা এখনও তাকে ছাড়েনি।
⸻
তিনি জানেন না কী।
⸻
জানেন না কেন।
⸻
তবু মনে হচ্ছে—
কাশীপুরের বাতাসে যেন কিছু একটা বদলাতে শুরু করেছে।
⸻
খুব ধীরে।
⸻
খুব নিঃশব্দে।
⸻
আর সেই পরিবর্তনের শব্দ এখনও কেউ শুনতে পাচ্ছে না।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)