19-06-2026, 01:05 PM
অধ্যায় ৩৪ : অনুভূতি
পৌষের শেষ দিক।
বিকেলের রোদে আর তেমন তেজ নেই।
কাশীপুরের শিবমন্দিরের সামনে ধুলো উড়ছে হালকা হাওয়ায়।
⸻
মন্দিরটা খুব বড় নয়।
পুরোনো।
অনেক পুরোনো।
⸻
কত মানুষ এসেছে।
কত মানুষ চলে গেছে।
⸻
কিন্তু মন্দিরটা এখনও দাঁড়িয়ে।
নীরবে।
⸻
চাতালের এক কোণে বসে ছিলেন হরিমণি বুড়ি।
গ্রামের সবাই অবশ্য তাকে “হরিঠাকুমা” বলেই ডাকে।
⸻
বয়স আশির ওপর।
কেউ বলে পঁচাশি।
কেউ বলে নব্বই।
⸻
আসল বয়স তিনি নিজেও জানেন না।
⸻
চোখের দৃষ্টি ঝাপসা।
হাঁটতেও কষ্ট হয়।
⸻
তবু প্রতিদিন সকালে আর বিকেলে তিনি মন্দিরে আসেন।
⸻
বাবা মহাদেবের সামনে বসে জপ করেন।
⸻
আজও করছেন।
⸻
হাতে পুরোনো তুলসীর জপমালা।
⸻
ঠোঁট নড়ে।
শব্দ প্রায় শোনা যায় না।
⸻
চারপাশে কয়েকজন মহিলা ফুল দিয়ে পুজো সেরে ফিরছেন।
⸻
একটা কুকুর চাতালের নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে।
⸻
সবকিছু স্বাভাবিক।
⸻
ঠিক সেই সময় কলেজ থেকে ফেরার পথে রতন ওই রাস্তা দিয়ে আসছিল।
⸻
কাঁধে ব্যাগ।
⸻
মাথা নিচু।
⸻
বাইরে থেকে সাধারণ একটা গ্রামের ছেলে।
⸻
কেউ দ্বিতীয়বার তাকাবে না।
⸻
কিন্তু…
রতন মন্দিরের কাছাকাছি আসতেই হরিঠাকুমার আঙুল থেমে গেল।
⸻
জপমালার দানা আর এগোল না।
⸻
তিনি ভুরু কুঁচকালেন।
⸻
কেন?
⸻
তিনি জানেন না।
⸻
শুধু মনে হলো…
হাওয়ার মধ্যে কিছু একটা বদলে গেছে।
⸻
একটা ঠান্ডা ভাব।
⸻
খুব সূক্ষ্ম।
⸻
খুব অদ্ভুত।
⸻
তিনি ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।
⸻
চোখে পরিষ্কার দেখেন না।
⸻
তবু রাস্তার দিকে তাকালেন।
⸻
একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে যাচ্ছে।
⸻
কে?
⸻
রতন?
⸻
হতে পারে।
⸻
হরিঠাকুমা নিশ্চিত নন।
⸻
ঠিক তখনই…
রতনের পা থেমে গেল।
⸻
এক মুহূর্তের জন্য।
⸻
কোনো কারণ ছাড়াই।
⸻
তারপর খুব ধীরে…
সে ঘাড় ঘুরিয়ে মন্দিরের দিকে তাকাল।
⸻
মন্দির।
⸻
চাতাল।
⸻
বৃদ্ধা।
⸻
সবকিছু তার চোখে ধরা পড়ল।
⸻
আর তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটা অদ্ভুত হাসি।
⸻
খুব ক্ষীণ।
⸻
খুব ছোট।
⸻
কিন্তু সেই হাসির মধ্যে শিশুর সরলতা ছিল না।
⸻
ছিল অন্য কিছু।
⸻
অনেক পুরোনো।
⸻
অনেক অন্ধকার।
⸻
হরিঠাকুমা সেই হাসি দেখতে পেলেন না।
⸻
কিন্তু তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
⸻
হাত থেকে জপমালা পিছলে মাটিতে পড়ে গেল।
⸻
টুপ।
⸻
শব্দটা খুবই ছোট।
⸻
তবু তার শরীর কেঁপে উঠল।
⸻
চাতালের নিচে ঘুমিয়ে থাকা কুকুরটাও আচমকা মাথা তুলে চারদিকে তাকাল।
⸻
তারপর কুঁই কুঁই করে সরে গিয়ে অন্যদিকে চলে গেল।
⸻
হরিঠাকুমা ফিসফিস করে বললেন,
— এ কী…
⸻
তার গলা কাঁপছে।
⸻
কারণ বহু বছর পরে আজ আবার সেই পুরোনো অনুভূতিটা ফিরে এসেছে।
⸻
একটা অনুভূতি…
যেটা তিনি শেষবার পেয়েছিলেন ছোটবেলায়।
⸻
যখন তার ঠাকুমা রাতে দরজা বন্ধ করতে করতে বলতেন—
“সূর্য ডোবার পর বটতলার পথ মাড়াস না।”
⸻
তখন তিনি কারণ জানতেন না।
⸻
আজও জানেন না।
⸻
তবু বুকের ভেতর সেই একই অস্বস্তি।
⸻
রতন ইতিমধ্যে অনেকটা দূরে চলে গেছে।
⸻
তবু অদ্ভুতভাবে তার কানে যেন বৃদ্ধার কাঁপা নিঃশ্বাসের শব্দ পৌঁছে গেল।
⸻
সে থামল না।
⸻
পেছনেও তাকাল না।
⸻
কিন্তু তার ভেতরে কোথাও…
অন্ধকারের গভীরে…
একটা ভাবনা জেগে উঠল।
⸻
“কেউ একজন টের পেয়েছে…”
⸻
ভাবনাটা রতনের ছিল না।
⸻
কিন্তু সেটার সঙ্গে একটা ঠান্ডা সন্তুষ্টিও মিশে ছিল।
⸻
যেন দীর্ঘ নিদ্রা থেকে জেগে ওঠা কোনো সত্তা চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে।
⸻
কে অন্ধ।
⸻
কে সতর্ক।
⸻
আর কে এখনও মনে রাখতে পেরেছে।
⸻
সন্ধ্যার ঘণ্টা বেজে উঠল।
⸻
মন্দিরের ভেতর শঙ্খধ্বনি শোনা গেল।
⸻
হরিঠাকুমা কাঁপা হাতে জপমালা তুলে নিলেন।
⸻
তারপর শিবলিঙ্গের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বললেন—
“বাবা…
যদি কোনো ছায়া ফিরে এসে থাকে…
তবে আমায় ভুল দেখতে দিয়ো না।”
⸻
দূরে, পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে গেল।
⸻
আর কাশীপুর গ্রামের ওপর নেমে এল আরেকটা দীর্ঘ রাত।
পৌষের শেষ দিক।
বিকেলের রোদে আর তেমন তেজ নেই।
কাশীপুরের শিবমন্দিরের সামনে ধুলো উড়ছে হালকা হাওয়ায়।
⸻
মন্দিরটা খুব বড় নয়।
পুরোনো।
অনেক পুরোনো।
⸻
কত মানুষ এসেছে।
কত মানুষ চলে গেছে।
⸻
কিন্তু মন্দিরটা এখনও দাঁড়িয়ে।
নীরবে।
⸻
চাতালের এক কোণে বসে ছিলেন হরিমণি বুড়ি।
গ্রামের সবাই অবশ্য তাকে “হরিঠাকুমা” বলেই ডাকে।
⸻
বয়স আশির ওপর।
কেউ বলে পঁচাশি।
কেউ বলে নব্বই।
⸻
আসল বয়স তিনি নিজেও জানেন না।
⸻
চোখের দৃষ্টি ঝাপসা।
হাঁটতেও কষ্ট হয়।
⸻
তবু প্রতিদিন সকালে আর বিকেলে তিনি মন্দিরে আসেন।
⸻
বাবা মহাদেবের সামনে বসে জপ করেন।
⸻
আজও করছেন।
⸻
হাতে পুরোনো তুলসীর জপমালা।
⸻
ঠোঁট নড়ে।
শব্দ প্রায় শোনা যায় না।
⸻
চারপাশে কয়েকজন মহিলা ফুল দিয়ে পুজো সেরে ফিরছেন।
⸻
একটা কুকুর চাতালের নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে।
⸻
সবকিছু স্বাভাবিক।
⸻
ঠিক সেই সময় কলেজ থেকে ফেরার পথে রতন ওই রাস্তা দিয়ে আসছিল।
⸻
কাঁধে ব্যাগ।
⸻
মাথা নিচু।
⸻
বাইরে থেকে সাধারণ একটা গ্রামের ছেলে।
⸻
কেউ দ্বিতীয়বার তাকাবে না।
⸻
কিন্তু…
রতন মন্দিরের কাছাকাছি আসতেই হরিঠাকুমার আঙুল থেমে গেল।
⸻
জপমালার দানা আর এগোল না।
⸻
তিনি ভুরু কুঁচকালেন।
⸻
কেন?
⸻
তিনি জানেন না।
⸻
শুধু মনে হলো…
হাওয়ার মধ্যে কিছু একটা বদলে গেছে।
⸻
একটা ঠান্ডা ভাব।
⸻
খুব সূক্ষ্ম।
⸻
খুব অদ্ভুত।
⸻
তিনি ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।
⸻
চোখে পরিষ্কার দেখেন না।
⸻
তবু রাস্তার দিকে তাকালেন।
⸻
একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে যাচ্ছে।
⸻
কে?
⸻
রতন?
⸻
হতে পারে।
⸻
হরিঠাকুমা নিশ্চিত নন।
⸻
ঠিক তখনই…
রতনের পা থেমে গেল।
⸻
এক মুহূর্তের জন্য।
⸻
কোনো কারণ ছাড়াই।
⸻
তারপর খুব ধীরে…
সে ঘাড় ঘুরিয়ে মন্দিরের দিকে তাকাল।
⸻
মন্দির।
⸻
চাতাল।
⸻
বৃদ্ধা।
⸻
সবকিছু তার চোখে ধরা পড়ল।
⸻
আর তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটা অদ্ভুত হাসি।
⸻
খুব ক্ষীণ।
⸻
খুব ছোট।
⸻
কিন্তু সেই হাসির মধ্যে শিশুর সরলতা ছিল না।
⸻
ছিল অন্য কিছু।
⸻
অনেক পুরোনো।
⸻
অনেক অন্ধকার।
⸻
হরিঠাকুমা সেই হাসি দেখতে পেলেন না।
⸻
কিন্তু তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
⸻
হাত থেকে জপমালা পিছলে মাটিতে পড়ে গেল।
⸻
টুপ।
⸻
শব্দটা খুবই ছোট।
⸻
তবু তার শরীর কেঁপে উঠল।
⸻
চাতালের নিচে ঘুমিয়ে থাকা কুকুরটাও আচমকা মাথা তুলে চারদিকে তাকাল।
⸻
তারপর কুঁই কুঁই করে সরে গিয়ে অন্যদিকে চলে গেল।
⸻
হরিঠাকুমা ফিসফিস করে বললেন,
— এ কী…
⸻
তার গলা কাঁপছে।
⸻
কারণ বহু বছর পরে আজ আবার সেই পুরোনো অনুভূতিটা ফিরে এসেছে।
⸻
একটা অনুভূতি…
যেটা তিনি শেষবার পেয়েছিলেন ছোটবেলায়।
⸻
যখন তার ঠাকুমা রাতে দরজা বন্ধ করতে করতে বলতেন—
“সূর্য ডোবার পর বটতলার পথ মাড়াস না।”
⸻
তখন তিনি কারণ জানতেন না।
⸻
আজও জানেন না।
⸻
তবু বুকের ভেতর সেই একই অস্বস্তি।
⸻
রতন ইতিমধ্যে অনেকটা দূরে চলে গেছে।
⸻
তবু অদ্ভুতভাবে তার কানে যেন বৃদ্ধার কাঁপা নিঃশ্বাসের শব্দ পৌঁছে গেল।
⸻
সে থামল না।
⸻
পেছনেও তাকাল না।
⸻
কিন্তু তার ভেতরে কোথাও…
অন্ধকারের গভীরে…
একটা ভাবনা জেগে উঠল।
⸻
“কেউ একজন টের পেয়েছে…”
⸻
ভাবনাটা রতনের ছিল না।
⸻
কিন্তু সেটার সঙ্গে একটা ঠান্ডা সন্তুষ্টিও মিশে ছিল।
⸻
যেন দীর্ঘ নিদ্রা থেকে জেগে ওঠা কোনো সত্তা চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে।
⸻
কে অন্ধ।
⸻
কে সতর্ক।
⸻
আর কে এখনও মনে রাখতে পেরেছে।
⸻
সন্ধ্যার ঘণ্টা বেজে উঠল।
⸻
মন্দিরের ভেতর শঙ্খধ্বনি শোনা গেল।
⸻
হরিঠাকুমা কাঁপা হাতে জপমালা তুলে নিলেন।
⸻
তারপর শিবলিঙ্গের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বললেন—
“বাবা…
যদি কোনো ছায়া ফিরে এসে থাকে…
তবে আমায় ভুল দেখতে দিয়ো না।”
⸻
দূরে, পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে গেল।
⸻
আর কাশীপুর গ্রামের ওপর নেমে এল আরেকটা দীর্ঘ রাত।



![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)