4 hours ago
নবম অধ্যায়: শৈশবের চকোলেট
দিনকয়েক পর, আসিফ এক জরুরি ব্যবসায়িক ডিলের কাজে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে গেল। সে যাওয়ার পর এই বিশাল, কাঁচ ও মার্বেলে ঘেরা গুলশানের পেন্টহাউসটা যেন এক পরম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ঘরের ভেতরের সেই চটচটে, দমবন্ধ করা অদৃশ্য পুরুষতান্ত্রিক নজরদারিটা কয়েকদিনের জন্য উধাও হতেই চারপাশের বাতাসটা কিছুটা হালকা মনে হতে লাগল। ঘরে এখন শুধু জোয়া আর ফাতেমা। বাইরে তখন দুপুরের চড়া, অলস রোদ মাথার ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শহরের রাজপথের দূরবর্তী গাড়ির হর্নের আওয়াজ এই তেরো তলার কাঁচের দেওয়ালে এসে এক ম্লান প্রতিধ্বনি তৈরি করছিল।
শোবার ঘরের বারান্দার মস্ত বড় কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা আজ খোলাই ছিল। সেখান দিয়ে আসা হালকা একটা দখিনা বাতাস জোয়ার ঘরের রেশমি পর্দার ভাঁজে ভাঁজে খেলা করছিল। জোয়া মেঝের ওপর একটা নরম কুশন পেতে বসে ছিল, তার পরনে একটা ঢিলেঢালা সুতির কামিজ। তার পিঠের ওপর ছড়িয়ে ছিল একরাশ কুচকুচে কালো, ভারী আর রেশমি চুল। ফাতেমা জোয়ার ঠিক পেছনে মেঝেতে বসে একটা কাঠের চিরুনি দিয়ে পরম যত্নে জোয়ার চুলের জট ছাড়াচ্ছিল।
চিরুনির প্রতিটি টানে ফাতেমার হাত দুটো বড্ড নরম, বড্ড মায়াবী হয়ে উঠছিল। চরের সেই রুক্ষ বাতাসে যে হাত একদিন জীবনসংগ্রামে শক্ত হয়েছিল, আজ সেই হাতই এক শহুরে নারীর চুলে এক পরম যত্নে বিলি কাটছে। চিরুনি চালানোর খসখসে শব্দ আর দুপুরের একঘেয়ে নিস্তব্ধতা মিলে ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক অবশতার জন্ম দিল।
"বুজান, আফনের চুলগুলা এক্কেরে মেঘনার কালা জলের মতো সুন্দর," ফাতেমা আলতো করে জোয়ার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলল। "আমাগো চরের মেয়েছেলেদের চুল তো নোনা বাতাসে জট পাইক্কা তামাটে হয়া যায়। আফনের চুলে সুগন্ধি তেলের মিষ্টি গন্ধ।"
জোয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নায় নিজের আর ফাতেমার প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল। সে মৃদু হেসে বলল, "সুগন্ধি দিয়ে তো শুধু বাইরের গন্ধ ঢাকা যায় ফাতেমা, ভেতরের পচন কি ঢাকা যায়? এই সুন্দর চুলের নিচে যে মগজটা আছে, সেখানে কত অন্ধকার জমে আছে, তা তো কেউ দেখে না।"
ফাতেমা চিরুনিটা থামাল। সে জোয়ার কথার ভেতরের সেই চিরন্তন বিষাদটা টের পেল। সে আবার শান্ত লয়ে চুল বাঁধতে বাঁধতে বলল, "দুঃখ তো বুজান সবারই থাকে। এই দুপুরের রোদের দিকে তাকাইলে আমার খালি ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। যখন চরে কোনো চিন্তা আছিল না। গাঙের পাড়ে দৌড়াদৌড়ি করতাম, ফ্রক পইরা রোদে পুড়তাম। আফনের ছোটবেলা কেমন আছিল বুজান? অনেক আনন্দের, না?"
ফাতেমার এই সরল প্রশ্নটা জোয়ার মনের এক অন্ধকার কুঠুরির তালাটা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে ফেলল। জোয়ার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। দুপুরের এই অলস আলোটা এক সেকেন্ডে মুছে গিয়ে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের এক ভ্যাপসা গরমের নিঝুম দুপুর।
জোয়া দুই হাঁটু বুকের কাছে টেনে এনে হাত দুটো দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার গলার স্বরটা হঠাৎ করেই বড্ড নিচু আর কাঁপাকাঁপা হয়ে গেল। সে সামনের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল,
"জানিস ফাতেমা, সবাই ভাবে বড়লোকের ঘরের বাচ্চাদের শৈশব বুঝি চকোলেট আর খেলনায় মোড়ানো আনন্দের দিন। কিন্তু কিছু কিছু স্মৃতির স্বাদ যে কতটা বিষাক্ত হতে পারে, তা শুধু সেই বাচ্চাটাই জানে। আমি তখন বড্ড ছোট, বড়জোর আট-নয় বছর বয়স হবে। শরীর কী, পুরুষের স্পর্শ কী, কাম বা লালসা কাকে বলে—তার কিছুই বুঝতাম না। ফ্রক পরে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াতাম।"
জোয়া একটু থামল। তার কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঠাণ্ডা ঘাম নেমে এলো। ফাতেমা চিরুনিটা একপাশে রেখে জোয়ার পিঠের ওপর নিজের একটা হাত রাখল। সেই খসখসে হাতের ওম পেয়ে জোয়া আবার বলতে লাগল,
"তখন আমাদের বাড়িতে এক দূর সম্পর্কের মামা আসত। দেখতে বড্ড সুশীল, পরিপাটি। বাড়ির সবাই তাকে বড্ড বিশ্বাস করত। সেই যৌথ পরিবারের দিনগুলোয় দুপুরের ভাত খাওয়ার পর যখন বাড়ির বড়রা সব ঘরের দরজা বন্ধ করে অঘোরে ঘুমাত, চারপাশটা যখন একদম নিঝুম হয়ে যেত, তখন শুরু হতো আমার সেই দমবন্ধ করা পরিবেশ।"
জোয়ার নিজের নখ দিয়ে নিজের হাঁটুর চামড়াটা খামচে ধরল। তার চোখের কোণে তখন এক তীব্র অপমানের আগুন।
"সে আমাকে চকোলেটের লোভ দেখিয়ে পেছনের ঘরে নিয়ে যেত। তারপর... সেই অন্ধকার নির্জন ঘরে সে আমাকে এমন এক অস্বস্তিকর ভয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিত, যা আমার বড্ড অদ্ভুত লাগত। আমি যখন বলতাম—‘মামা, আমি চলে যাব’, সে আমাকে চুপচাপ থাকতে বলত। সেই নোংরা ছোঁয়া আর ভয়ের অনুভূতিটা যে একটা জঘন্য অপরাধ ছিল, তা বুঝতে আমার লেগেছিল আরও দশটা বছর।"
জোয়ার শরীরটা রাগে আর ঘৃণায় কাঁপছিল। সে চোখ বন্ধ করে সেই দৃশ্যটা মাথা থেকে তাড়ানোর চেষ্টা করছিল।
"আমি যখন বড় হলাম, তখন বুঝতে পারলাম আমার নিজেরই এক পরম আত্মীয় আমার শৈশবের সেই পবিত্রতা, আমার সেই নিষ্পাপ সত্ত্বাটুকু চিরতরে লুণ্ঠিত করে নিয়েছে। সবচেয়ে বড় কপাল দেখিস ফাতেমা, আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি, একদিন সাহস করে আমার মাকে এই কথাটা বলেছিলাম। মা আমার কথা শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেয়নি, বরং আমার গালে একটা চড় কষিয়ে বলেছিল—‘চুপ কর! আত্মীয়স্বজনদের নামে এসব কুৎসিত কথা মুখে আনতে লজ্জা করে না? জানাজানি হলে তোর বিয়ে হবে না বাজারে।’ সমাজ এভাবেই মেয়েদের মুখ বন্ধ করে দেয় ফাতেমা। সেই থেকে আমি নিজেকে বড্ড অপরাধী ভাবতাম।"
ফাতেমা জোয়ার পাশে এসে বসল। তার নিজের চোখের কোণ দিয়েও তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। সে জোয়ার সেই কাঁপা কাঁপা নরম হাত দুটো নিজের কর্দমাক্ত, খসখসে হাতের মুঠোয় তুলে নিল। এই পেন্টহাউসের বিলাসবহুল এসি ঘরের ভেতরে বসে আজ মেধা আর আভিজাত্যের সমস্ত মুখোশ খুলে পড়ে রইল মেঝের ওপর।
ফাতেমা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চরের আঞ্চলিক কিন্তু অত্যন্ত ভারী গলায় বলল, "আপা, আফনে তো তাও চকোলেট পাইছিলেন, আর শহরের দালানে আছিলেন। আমাগো চরের মেয়েছেলেদের শৈশব তো বুনো পশুর থাবার মতো। আমি যখন প্রাইমারি কলেজে পড়ি, বড়জোর ক্লাস থ্রি কি ফোরে ওঠি। বয়েস কত হইব? নয় কি দশ।"
ফাতেমা জানালার বাইরের তপ্ত আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল তার সেই গ্রামের খালের পাড়, যেখানে কচুরিপানা আর কাদার গন্ধ মিশে থাকত।
"আমারে এক দুফুরে মা কইল খালের ওপার থেইকা কাসেম মাতব্বরের বাড়ি থেইকা এক সের চাল চাহিয়া আনতে। আমি রোদের মধ্যে দৌড়ায়া গেলাম। মাতব্বরের বাড়িতে তখন কেউ আছিল না। মাতব্বর বুড়া মানুষ, প্রভাবশালী লোক। সে আমারে দেইখা ঘরের ভেতরে ডাকল। আমি ভেতরে যাওয়ার পর সে পিছন থেইকা দরজাডা লাগায়া দিল। আমি কিছু বোঝার আগেই হেই বুড়া শয়তানটা আমার মুখটা এমনভাবে চিপা ধরল যে আমার দম বন্ধ হয়া আসছিল। আমার চোখের সামনে তখন খালি অন্ধকার।"
ফাতেমা একটা ঢোক গিলল, তার চোখে তখন এক আদিম হিংসা কাজ করছিল।
"সেদিন মাতব্বরের হেই জোরজুলুম আর নোংরা আচরণ যখন আমার শরীরে এক তীব্র ভয়ের সাপের মতো কামড় বসাইল, আমি ব্যথায় আর ডরে নিজের চোখ দুইডা শক্ত কইরা বন্ধ কইরা দিছিলাম। আমার মনে হইতাছিল আমি বুঝি মইরা যামু। সে যখন আমারে ছাইড়া দিল, আমি কাঁদতে কাঁদতে খালের পাড় দিয়া দৌড়ায়া বাড়ি আইলাম।"
"তুমি তোমার মাকে বলোনি ফাতেমা?" জোয়া ফাতেমার চোখের জল মুছে দিতে দিতে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
"কইছিলাম বুজান," ফাতেমা এক কুৎসিত হাসি হেসে বলল। "মা আমার ছেঁড়া ফ্রক আর গায়ের কাদা দেইখা আমারে ঘরের খুঁটির লগে বাইন্ধা ছ্যাঁচা পিটুনি দিল। বলল—‘তুই নিশ্চয়ই খাসের পাড়ে কোনো ছেলের লগে ছেনালী করছস, নয়তো মাতব্বর তোর লগে এমন করব ক্যা? মাতব্বর তো বড় মানুষ!’ আমি সেদিন ঘরের কোণায় পইড়া পইড়া ভাবছিলাম, দোষটা বুঝি আমারই আছিল। আমি মেয়েছেলে হয়া জন্মাইছি, এইডাই বুঝি আমার সবচেয়ে বড় পাপ।"
দুপুরের রোদটা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় এখন দুই ভিন্ন পৃথিবীর নারী একে অপরের পাশাপাশি বসে আছে। তাদের জীবনের এই দুটি ভিন্ন গল্প এক সমান্তরাল লাইনে এসে মিশে যাচ্ছিল, যা এই উপমহাদেশের এক কুৎসিত, নির্মম সত্যকে নগ্ন করে দেয়।
একদিকে ছিল জোয়া—শহরের এসি ঘরের তথাকথিত শিক্ষিত উচ্চবিত্তের আত্মীয়ের শিকার। অন্যদিকে ফাতেমা—গ্রামের প্রভাবশালী গ্রামীণ মোড়লের লালসার শিকার। পরিণতিতে একজন পেয়েছিল মায়ের চড় আর ‘জানাজানি হলে বিয়ে হবে না’র সামাজিক ভয়; অন্যজন পেয়েছিল ঘরের খুঁটির সাথে বাঁধা চাবুকের মার আর ‘মেয়েছেলে হওয়ার আজন্ম পাপের’ গ্লানি।
এখানে ফ্রক পরার বয়স থেকেই মেয়েদের শরীরকে এক বৈষম্য আর লালসার চশমা দিয়ে দেখা হয়। সমাজও সবসময় অপরাধীকে আড়াল করে ভুক্তভোগী মেয়েটাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
জোয়া আর ফাতেমা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে রইল। কোনো আভিজাত্যের দেওয়াল, কোনো ভাষার দূরত্ব আজ তাদের মাঝে অবশিষ্ট নেই। তারা বুঝতে পারল, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের শৈশবটাকেই প্রথমে খুন করে দেয়, যাতে বড় হয়ে তারা কোনোদিন নিজেদের অধিকারের জন্য মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।
তাদের ভেতরের এই অবদমিত ট্রমা, এই গোপন ক্ষতগুলো আজ এক হয়ে এক নতুন ও ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের বারুদে রূপ নিল। জোয়া মনে মনে ভাবল, আসিফ চৌধুরী হোক আর মন্টু মাঝি হোক—এই পুরুষ জাতটা আসলে শৈশব থেকেই নারীদের লুণ্ঠন করে আসছে। ফাতেমা জোয়ার কাঁধে মাথা রেখে চরের বাঘিনীর মতো চোখ দুটো সরু করল। এই পেন্টহাউসের চার দেওয়ালে বসে আজ দুই নারী তাদের জীবনের সবচেয়ে গোপন ও বিষাক্ত ট্রমাটা ভাগ করে নিয়ে এক অপরাজেয় শক্তির জন্ম দিল। তারা আর শিকার হবে না; এবার সময় এসেছে শিকারীদের হিসাব চুকানোর।
দিনকয়েক পর, আসিফ এক জরুরি ব্যবসায়িক ডিলের কাজে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে গেল। সে যাওয়ার পর এই বিশাল, কাঁচ ও মার্বেলে ঘেরা গুলশানের পেন্টহাউসটা যেন এক পরম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ঘরের ভেতরের সেই চটচটে, দমবন্ধ করা অদৃশ্য পুরুষতান্ত্রিক নজরদারিটা কয়েকদিনের জন্য উধাও হতেই চারপাশের বাতাসটা কিছুটা হালকা মনে হতে লাগল। ঘরে এখন শুধু জোয়া আর ফাতেমা। বাইরে তখন দুপুরের চড়া, অলস রোদ মাথার ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শহরের রাজপথের দূরবর্তী গাড়ির হর্নের আওয়াজ এই তেরো তলার কাঁচের দেওয়ালে এসে এক ম্লান প্রতিধ্বনি তৈরি করছিল।
শোবার ঘরের বারান্দার মস্ত বড় কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা আজ খোলাই ছিল। সেখান দিয়ে আসা হালকা একটা দখিনা বাতাস জোয়ার ঘরের রেশমি পর্দার ভাঁজে ভাঁজে খেলা করছিল। জোয়া মেঝের ওপর একটা নরম কুশন পেতে বসে ছিল, তার পরনে একটা ঢিলেঢালা সুতির কামিজ। তার পিঠের ওপর ছড়িয়ে ছিল একরাশ কুচকুচে কালো, ভারী আর রেশমি চুল। ফাতেমা জোয়ার ঠিক পেছনে মেঝেতে বসে একটা কাঠের চিরুনি দিয়ে পরম যত্নে জোয়ার চুলের জট ছাড়াচ্ছিল।
চিরুনির প্রতিটি টানে ফাতেমার হাত দুটো বড্ড নরম, বড্ড মায়াবী হয়ে উঠছিল। চরের সেই রুক্ষ বাতাসে যে হাত একদিন জীবনসংগ্রামে শক্ত হয়েছিল, আজ সেই হাতই এক শহুরে নারীর চুলে এক পরম যত্নে বিলি কাটছে। চিরুনি চালানোর খসখসে শব্দ আর দুপুরের একঘেয়ে নিস্তব্ধতা মিলে ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক অবশতার জন্ম দিল।
"বুজান, আফনের চুলগুলা এক্কেরে মেঘনার কালা জলের মতো সুন্দর," ফাতেমা আলতো করে জোয়ার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলল। "আমাগো চরের মেয়েছেলেদের চুল তো নোনা বাতাসে জট পাইক্কা তামাটে হয়া যায়। আফনের চুলে সুগন্ধি তেলের মিষ্টি গন্ধ।"
জোয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নায় নিজের আর ফাতেমার প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল। সে মৃদু হেসে বলল, "সুগন্ধি দিয়ে তো শুধু বাইরের গন্ধ ঢাকা যায় ফাতেমা, ভেতরের পচন কি ঢাকা যায়? এই সুন্দর চুলের নিচে যে মগজটা আছে, সেখানে কত অন্ধকার জমে আছে, তা তো কেউ দেখে না।"
ফাতেমা চিরুনিটা থামাল। সে জোয়ার কথার ভেতরের সেই চিরন্তন বিষাদটা টের পেল। সে আবার শান্ত লয়ে চুল বাঁধতে বাঁধতে বলল, "দুঃখ তো বুজান সবারই থাকে। এই দুপুরের রোদের দিকে তাকাইলে আমার খালি ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। যখন চরে কোনো চিন্তা আছিল না। গাঙের পাড়ে দৌড়াদৌড়ি করতাম, ফ্রক পইরা রোদে পুড়তাম। আফনের ছোটবেলা কেমন আছিল বুজান? অনেক আনন্দের, না?"
ফাতেমার এই সরল প্রশ্নটা জোয়ার মনের এক অন্ধকার কুঠুরির তালাটা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে ফেলল। জোয়ার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। দুপুরের এই অলস আলোটা এক সেকেন্ডে মুছে গিয়ে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের এক ভ্যাপসা গরমের নিঝুম দুপুর।
জোয়া দুই হাঁটু বুকের কাছে টেনে এনে হাত দুটো দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার গলার স্বরটা হঠাৎ করেই বড্ড নিচু আর কাঁপাকাঁপা হয়ে গেল। সে সামনের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল,
"জানিস ফাতেমা, সবাই ভাবে বড়লোকের ঘরের বাচ্চাদের শৈশব বুঝি চকোলেট আর খেলনায় মোড়ানো আনন্দের দিন। কিন্তু কিছু কিছু স্মৃতির স্বাদ যে কতটা বিষাক্ত হতে পারে, তা শুধু সেই বাচ্চাটাই জানে। আমি তখন বড্ড ছোট, বড়জোর আট-নয় বছর বয়স হবে। শরীর কী, পুরুষের স্পর্শ কী, কাম বা লালসা কাকে বলে—তার কিছুই বুঝতাম না। ফ্রক পরে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াতাম।"
জোয়া একটু থামল। তার কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঠাণ্ডা ঘাম নেমে এলো। ফাতেমা চিরুনিটা একপাশে রেখে জোয়ার পিঠের ওপর নিজের একটা হাত রাখল। সেই খসখসে হাতের ওম পেয়ে জোয়া আবার বলতে লাগল,
"তখন আমাদের বাড়িতে এক দূর সম্পর্কের মামা আসত। দেখতে বড্ড সুশীল, পরিপাটি। বাড়ির সবাই তাকে বড্ড বিশ্বাস করত। সেই যৌথ পরিবারের দিনগুলোয় দুপুরের ভাত খাওয়ার পর যখন বাড়ির বড়রা সব ঘরের দরজা বন্ধ করে অঘোরে ঘুমাত, চারপাশটা যখন একদম নিঝুম হয়ে যেত, তখন শুরু হতো আমার সেই দমবন্ধ করা পরিবেশ।"
জোয়ার নিজের নখ দিয়ে নিজের হাঁটুর চামড়াটা খামচে ধরল। তার চোখের কোণে তখন এক তীব্র অপমানের আগুন।
"সে আমাকে চকোলেটের লোভ দেখিয়ে পেছনের ঘরে নিয়ে যেত। তারপর... সেই অন্ধকার নির্জন ঘরে সে আমাকে এমন এক অস্বস্তিকর ভয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিত, যা আমার বড্ড অদ্ভুত লাগত। আমি যখন বলতাম—‘মামা, আমি চলে যাব’, সে আমাকে চুপচাপ থাকতে বলত। সেই নোংরা ছোঁয়া আর ভয়ের অনুভূতিটা যে একটা জঘন্য অপরাধ ছিল, তা বুঝতে আমার লেগেছিল আরও দশটা বছর।"
জোয়ার শরীরটা রাগে আর ঘৃণায় কাঁপছিল। সে চোখ বন্ধ করে সেই দৃশ্যটা মাথা থেকে তাড়ানোর চেষ্টা করছিল।
"আমি যখন বড় হলাম, তখন বুঝতে পারলাম আমার নিজেরই এক পরম আত্মীয় আমার শৈশবের সেই পবিত্রতা, আমার সেই নিষ্পাপ সত্ত্বাটুকু চিরতরে লুণ্ঠিত করে নিয়েছে। সবচেয়ে বড় কপাল দেখিস ফাতেমা, আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি, একদিন সাহস করে আমার মাকে এই কথাটা বলেছিলাম। মা আমার কথা শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেয়নি, বরং আমার গালে একটা চড় কষিয়ে বলেছিল—‘চুপ কর! আত্মীয়স্বজনদের নামে এসব কুৎসিত কথা মুখে আনতে লজ্জা করে না? জানাজানি হলে তোর বিয়ে হবে না বাজারে।’ সমাজ এভাবেই মেয়েদের মুখ বন্ধ করে দেয় ফাতেমা। সেই থেকে আমি নিজেকে বড্ড অপরাধী ভাবতাম।"
ফাতেমা জোয়ার পাশে এসে বসল। তার নিজের চোখের কোণ দিয়েও তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। সে জোয়ার সেই কাঁপা কাঁপা নরম হাত দুটো নিজের কর্দমাক্ত, খসখসে হাতের মুঠোয় তুলে নিল। এই পেন্টহাউসের বিলাসবহুল এসি ঘরের ভেতরে বসে আজ মেধা আর আভিজাত্যের সমস্ত মুখোশ খুলে পড়ে রইল মেঝের ওপর।
ফাতেমা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চরের আঞ্চলিক কিন্তু অত্যন্ত ভারী গলায় বলল, "আপা, আফনে তো তাও চকোলেট পাইছিলেন, আর শহরের দালানে আছিলেন। আমাগো চরের মেয়েছেলেদের শৈশব তো বুনো পশুর থাবার মতো। আমি যখন প্রাইমারি কলেজে পড়ি, বড়জোর ক্লাস থ্রি কি ফোরে ওঠি। বয়েস কত হইব? নয় কি দশ।"
ফাতেমা জানালার বাইরের তপ্ত আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল তার সেই গ্রামের খালের পাড়, যেখানে কচুরিপানা আর কাদার গন্ধ মিশে থাকত।
"আমারে এক দুফুরে মা কইল খালের ওপার থেইকা কাসেম মাতব্বরের বাড়ি থেইকা এক সের চাল চাহিয়া আনতে। আমি রোদের মধ্যে দৌড়ায়া গেলাম। মাতব্বরের বাড়িতে তখন কেউ আছিল না। মাতব্বর বুড়া মানুষ, প্রভাবশালী লোক। সে আমারে দেইখা ঘরের ভেতরে ডাকল। আমি ভেতরে যাওয়ার পর সে পিছন থেইকা দরজাডা লাগায়া দিল। আমি কিছু বোঝার আগেই হেই বুড়া শয়তানটা আমার মুখটা এমনভাবে চিপা ধরল যে আমার দম বন্ধ হয়া আসছিল। আমার চোখের সামনে তখন খালি অন্ধকার।"
ফাতেমা একটা ঢোক গিলল, তার চোখে তখন এক আদিম হিংসা কাজ করছিল।
"সেদিন মাতব্বরের হেই জোরজুলুম আর নোংরা আচরণ যখন আমার শরীরে এক তীব্র ভয়ের সাপের মতো কামড় বসাইল, আমি ব্যথায় আর ডরে নিজের চোখ দুইডা শক্ত কইরা বন্ধ কইরা দিছিলাম। আমার মনে হইতাছিল আমি বুঝি মইরা যামু। সে যখন আমারে ছাইড়া দিল, আমি কাঁদতে কাঁদতে খালের পাড় দিয়া দৌড়ায়া বাড়ি আইলাম।"
"তুমি তোমার মাকে বলোনি ফাতেমা?" জোয়া ফাতেমার চোখের জল মুছে দিতে দিতে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
"কইছিলাম বুজান," ফাতেমা এক কুৎসিত হাসি হেসে বলল। "মা আমার ছেঁড়া ফ্রক আর গায়ের কাদা দেইখা আমারে ঘরের খুঁটির লগে বাইন্ধা ছ্যাঁচা পিটুনি দিল। বলল—‘তুই নিশ্চয়ই খাসের পাড়ে কোনো ছেলের লগে ছেনালী করছস, নয়তো মাতব্বর তোর লগে এমন করব ক্যা? মাতব্বর তো বড় মানুষ!’ আমি সেদিন ঘরের কোণায় পইড়া পইড়া ভাবছিলাম, দোষটা বুঝি আমারই আছিল। আমি মেয়েছেলে হয়া জন্মাইছি, এইডাই বুঝি আমার সবচেয়ে বড় পাপ।"
দুপুরের রোদটা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় এখন দুই ভিন্ন পৃথিবীর নারী একে অপরের পাশাপাশি বসে আছে। তাদের জীবনের এই দুটি ভিন্ন গল্প এক সমান্তরাল লাইনে এসে মিশে যাচ্ছিল, যা এই উপমহাদেশের এক কুৎসিত, নির্মম সত্যকে নগ্ন করে দেয়।
একদিকে ছিল জোয়া—শহরের এসি ঘরের তথাকথিত শিক্ষিত উচ্চবিত্তের আত্মীয়ের শিকার। অন্যদিকে ফাতেমা—গ্রামের প্রভাবশালী গ্রামীণ মোড়লের লালসার শিকার। পরিণতিতে একজন পেয়েছিল মায়ের চড় আর ‘জানাজানি হলে বিয়ে হবে না’র সামাজিক ভয়; অন্যজন পেয়েছিল ঘরের খুঁটির সাথে বাঁধা চাবুকের মার আর ‘মেয়েছেলে হওয়ার আজন্ম পাপের’ গ্লানি।
এখানে ফ্রক পরার বয়স থেকেই মেয়েদের শরীরকে এক বৈষম্য আর লালসার চশমা দিয়ে দেখা হয়। সমাজও সবসময় অপরাধীকে আড়াল করে ভুক্তভোগী মেয়েটাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
জোয়া আর ফাতেমা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে রইল। কোনো আভিজাত্যের দেওয়াল, কোনো ভাষার দূরত্ব আজ তাদের মাঝে অবশিষ্ট নেই। তারা বুঝতে পারল, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের শৈশবটাকেই প্রথমে খুন করে দেয়, যাতে বড় হয়ে তারা কোনোদিন নিজেদের অধিকারের জন্য মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।
তাদের ভেতরের এই অবদমিত ট্রমা, এই গোপন ক্ষতগুলো আজ এক হয়ে এক নতুন ও ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের বারুদে রূপ নিল। জোয়া মনে মনে ভাবল, আসিফ চৌধুরী হোক আর মন্টু মাঝি হোক—এই পুরুষ জাতটা আসলে শৈশব থেকেই নারীদের লুণ্ঠন করে আসছে। ফাতেমা জোয়ার কাঁধে মাথা রেখে চরের বাঘিনীর মতো চোখ দুটো সরু করল। এই পেন্টহাউসের চার দেওয়ালে বসে আজ দুই নারী তাদের জীবনের সবচেয়ে গোপন ও বিষাক্ত ট্রমাটা ভাগ করে নিয়ে এক অপরাজেয় শক্তির জন্ম দিল। তারা আর শিকার হবে না; এবার সময় এসেছে শিকারীদের হিসাব চুকানোর।



![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)