19-06-2026, 01:39 AM
অধ্যায় ২৬ : যে দৃষ্টি রতনের নয়
পৌষ মাস প্রায় শেষের দিকে।
শীত এখনও আছে।
তবে সকালের কুয়াশা আগের মতো ঘন নয়।
⸻
এক মাসে অনেক কিছু বদলেছে।
⸻
আবার অনেক কিছু একই রয়ে গেছে।
⸻
রতন এখনও কলেজে যায়।
⸻
বন্ধুদের সঙ্গে খেলে।
⸻
প্রতিমার বকা খায়।
⸻
রমাপদের সঙ্গে বসে পড়েও।
⸻
সবকিছু স্বাভাবিক।
⸻
অন্তত বাইরে থেকে।
⸻
সেদিন বিকেলে কলেজ ছুটি হওয়ার পর রতন একা ফিরছিল।
⸻
কার্তিক অন্যদিকে গেছে।
⸻
রাস্তার ধারে শুকনো ধানের খড়ের গাদা।
⸻
দূরে কয়েকজন মহিলা কাঁথা শুকোতে দিয়েছে।
⸻
একটা ছোট ছেলে বাঁশের লাঠি দিয়ে চাকা গড়িয়ে খেলছে।
⸻
সাধারণ গ্রাম।
⸻
সাধারণ বিকেল।
⸻
হঠাৎ…
রতনের পা থেমে গেল।
⸻
কোনো কারণ ছাড়াই।
⸻
সে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল।
⸻
তার চোখ ধীরে ধীরে চারপাশে ঘুরল।
⸻
মহিলারা।
⸻
ঘরগুলো।
⸻
মাটির রাস্তা।
⸻
পুকুর।
⸻
বটগাছের দিকে যাওয়া দূরের পথ।
⸻
আর ঠিক সেই মুহূর্তে…
তার মাথার ভেতর একটা চিন্তা ভেসে উঠল।
⸻
একটা চিন্তা…
যা তার হওয়ার কথা নয়।
⸻
“সব বদলে গেছে।”
⸻
রতনের বুক ধক করে উঠল।
⸻
সে চারদিকে তাকাল।
⸻
কে বলল?
⸻
কেউ না।
⸻
রাস্তায় সে একাই দাঁড়িয়ে।
⸻
তবু…
আরেকটা ভাবনা।
⸻
“এখানে আগে জঙ্গল ছিল।”
⸻
“ওখানে ঘর ছিল না।”
⸻
“ওই পুকুরটাও ছোট ছিল।”
⸻
রতনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল।
⸻
সে চোখ বন্ধ করল।
⸻
মাথা ঝাঁকাল।
⸻
সব মিলিয়ে গেল।
⸻
কিন্তু তার কপালে ঘাম জমল।
⸻
শীতের বিকেলে।
⸻
সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামে সরস্বতী পুজোর প্রস্তুতি চলছিল।
⸻
ছেলেরা বাঁশ বেঁধে মণ্ডপ বানাচ্ছে।
⸻
মহিলারা আলপনার কথা বলছে।
⸻
সবাই ব্যস্ত।
⸻
রতনও দাঁড়িয়ে দেখছিল।
⸻
হঠাৎ তার চোখ গিয়ে থামল মানুষের মুখের ওপর।
⸻
একজন।
⸻
দুজন।
⸻
পাঁচজন।
⸻
দশজন।
⸻
তারপর…
অদ্ভুত একটা অনুভূতি।
⸻
যেন সে তাদের দেখছে না।
⸻
যেন অন্য কেউ দেখছে।
⸻
আর সেই অন্য দৃষ্টিটা ছিল ঠান্ডা।
⸻
অনুভূতিহীন।
⸻
ধীরে ধীরে সেই অনুভূতি একটা চিন্তায় পরিণত হলো।
⸻
“এরা কেউ আমাকে মনে রাখেনি।”
⸻
রতনের বুকের ভেতর কেমন যেন করল।
⸻
তারপর…
আরেকটা।
⸻
“ভালোই হয়েছে।”
⸻
“ভুলে গেলে আবার শেখানো সহজ হয়।”
⸻
এইবার সে প্রায় ভয় পেয়ে গেল।
⸻
মাথা ঘুরে উঠল।
⸻
এক পা পিছিয়ে গেল।
⸻
কার্তিক পাশে এসে বলল,
— কী হয়েছে?
⸻
— কিছু না।
⸻
— তোর মুখ সাদা হয়ে গেছে।
⸻
রতন জোর করে হাসল।
⸻
— মাথা ঘুরেছিল।
⸻
কার্তিক বিশ্বাস করল।
⸻
রতনও চাইছিল বিশ্বাস করতে।
⸻
কিন্তু সে জানত…
কিছু একটা বদলাচ্ছে।
⸻
সেই রাত।
⸻
ঘরের সবাই ঘুমিয়ে।
⸻
বাইরে দূরে শেয়ালের ডাক।
⸻
হাওয়ায় শুকনো পাতার শব্দ।
⸻
রতন গভীর ঘুমে।
⸻
কিন্তু তার স্বপ্নে…
সে একা না।
⸻
সে দাঁড়িয়ে আছে।
⸻
বটগাছের সামনে।
⸻
এই প্রথম।
⸻
সে বুঝতে পারল—
সে নিজের চোখ দিয়ে দেখছে না।
⸻
কারও চোখ দিয়ে দেখছে।
⸻
অনেক উঁচু থেকে।
⸻
অনেক পুরোনো একটা দৃষ্টি।
⸻
সেই দৃষ্টিতে বটগাছটাকে দেখে মনে হলো না গাছ।
⸻
মনে হলো দুর্গ।
⸻
আশ্রয়।
⸻
অধিকার।
⸻
তারপর ধীরে ধীরে চারপাশে মানুষের মুখ ভেসে উঠল।
⸻
গ্রামের মানুষ।
⸻
একটার পর একটা।
⸻
কেউ মৃত।
⸻
কেউ জীবিত।
⸻
কেউ বহু আগেই মাটির নিচে।
⸻
তবু সেই দৃষ্টির মধ্যে ভয় নেই।
⸻
রাগও নেই।
⸻
বরং…
একটা বিকৃত অধিকারবোধ।
⸻
“আমার…”
⸻
রতনের শরীর কেঁপে উঠল।
⸻
“সব আমার…”
⸻
আরেকটা মুখ ভেসে উঠল।
⸻
এক বৃদ্ধ।
⸻
চোখে দৃঢ়তা।
⸻
সেই অচেনা সন্ন্যাসী?
⸻
নাকি অন্য কেউ?
⸻
স্বপ্নের মধ্যে বোঝা গেল না।
⸻
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেই কণ্ঠস্বর বদলে গেল।
⸻
প্রথমবার।
⸻
প্রথমবার সেখানে রাগ শোনা গেল।
⸻
খুব গভীর।
⸻
খুব পুরোনো।
⸻
“ওরা আমাকে বেঁধেছিল…”
⸻
“ওরা ভেবেছিল শেষ।”
⸻
অন্ধকার যেন কেঁপে উঠল।
⸻
“শেষ হয়নি।”
⸻
রতনের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
⸻
সে চিৎকার করতে চাইল।
⸻
পারল না।
⸻
নড়তে চাইল।
⸻
পারল না।
⸻
শুধু শুনতে থাকল।
⸻
আর সেই কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলতে থাকল—
⸻
“তারা ভুলে গেছে…”
⸻
“আমি ভুলিনি…”
⸻
ভোরের ঠিক আগে রতনের ঘুম ভাঙল।
⸻
সে বিছানায় উঠে বসল।
⸻
হাঁপাচ্ছে।
⸻
ঘর অন্ধকার।
⸻
সবাই ঘুমিয়ে।
⸻
তবু তার চোখ দুটো কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির রইল।
⸻
অস্বাভাবিকভাবে স্থির।
⸻
তারপর খুব আস্তে…
খুব নিচু গলায়…
সে একটা কথা বলল।
⸻
একটা কথা, যার অর্থ সে নিজেও জানে না।
⸻
“এবার মনে করাব…”
⸻
তারপর আবার শুয়ে পড়ল।
⸻
সকালে উঠে তার কিছুই মনে থাকবে না।
⸻
কিন্তু অন্ধকারে বলা সেই কথাগুলো…
সেগুলো রতনের ছিল না।
পৌষ মাস প্রায় শেষের দিকে।
শীত এখনও আছে।
তবে সকালের কুয়াশা আগের মতো ঘন নয়।
⸻
এক মাসে অনেক কিছু বদলেছে।
⸻
আবার অনেক কিছু একই রয়ে গেছে।
⸻
রতন এখনও কলেজে যায়।
⸻
বন্ধুদের সঙ্গে খেলে।
⸻
প্রতিমার বকা খায়।
⸻
রমাপদের সঙ্গে বসে পড়েও।
⸻
সবকিছু স্বাভাবিক।
⸻
অন্তত বাইরে থেকে।
⸻
সেদিন বিকেলে কলেজ ছুটি হওয়ার পর রতন একা ফিরছিল।
⸻
কার্তিক অন্যদিকে গেছে।
⸻
রাস্তার ধারে শুকনো ধানের খড়ের গাদা।
⸻
দূরে কয়েকজন মহিলা কাঁথা শুকোতে দিয়েছে।
⸻
একটা ছোট ছেলে বাঁশের লাঠি দিয়ে চাকা গড়িয়ে খেলছে।
⸻
সাধারণ গ্রাম।
⸻
সাধারণ বিকেল।
⸻
হঠাৎ…
রতনের পা থেমে গেল।
⸻
কোনো কারণ ছাড়াই।
⸻
সে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল।
⸻
তার চোখ ধীরে ধীরে চারপাশে ঘুরল।
⸻
মহিলারা।
⸻
ঘরগুলো।
⸻
মাটির রাস্তা।
⸻
পুকুর।
⸻
বটগাছের দিকে যাওয়া দূরের পথ।
⸻
আর ঠিক সেই মুহূর্তে…
তার মাথার ভেতর একটা চিন্তা ভেসে উঠল।
⸻
একটা চিন্তা…
যা তার হওয়ার কথা নয়।
⸻
“সব বদলে গেছে।”
⸻
রতনের বুক ধক করে উঠল।
⸻
সে চারদিকে তাকাল।
⸻
কে বলল?
⸻
কেউ না।
⸻
রাস্তায় সে একাই দাঁড়িয়ে।
⸻
তবু…
আরেকটা ভাবনা।
⸻
“এখানে আগে জঙ্গল ছিল।”
⸻
“ওখানে ঘর ছিল না।”
⸻
“ওই পুকুরটাও ছোট ছিল।”
⸻
রতনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল।
⸻
সে চোখ বন্ধ করল।
⸻
মাথা ঝাঁকাল।
⸻
সব মিলিয়ে গেল।
⸻
কিন্তু তার কপালে ঘাম জমল।
⸻
শীতের বিকেলে।
⸻
সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামে সরস্বতী পুজোর প্রস্তুতি চলছিল।
⸻
ছেলেরা বাঁশ বেঁধে মণ্ডপ বানাচ্ছে।
⸻
মহিলারা আলপনার কথা বলছে।
⸻
সবাই ব্যস্ত।
⸻
রতনও দাঁড়িয়ে দেখছিল।
⸻
হঠাৎ তার চোখ গিয়ে থামল মানুষের মুখের ওপর।
⸻
একজন।
⸻
দুজন।
⸻
পাঁচজন।
⸻
দশজন।
⸻
তারপর…
অদ্ভুত একটা অনুভূতি।
⸻
যেন সে তাদের দেখছে না।
⸻
যেন অন্য কেউ দেখছে।
⸻
আর সেই অন্য দৃষ্টিটা ছিল ঠান্ডা।
⸻
অনুভূতিহীন।
⸻
ধীরে ধীরে সেই অনুভূতি একটা চিন্তায় পরিণত হলো।
⸻
“এরা কেউ আমাকে মনে রাখেনি।”
⸻
রতনের বুকের ভেতর কেমন যেন করল।
⸻
তারপর…
আরেকটা।
⸻
“ভালোই হয়েছে।”
⸻
“ভুলে গেলে আবার শেখানো সহজ হয়।”
⸻
এইবার সে প্রায় ভয় পেয়ে গেল।
⸻
মাথা ঘুরে উঠল।
⸻
এক পা পিছিয়ে গেল।
⸻
কার্তিক পাশে এসে বলল,
— কী হয়েছে?
⸻
— কিছু না।
⸻
— তোর মুখ সাদা হয়ে গেছে।
⸻
রতন জোর করে হাসল।
⸻
— মাথা ঘুরেছিল।
⸻
কার্তিক বিশ্বাস করল।
⸻
রতনও চাইছিল বিশ্বাস করতে।
⸻
কিন্তু সে জানত…
কিছু একটা বদলাচ্ছে।
⸻
সেই রাত।
⸻
ঘরের সবাই ঘুমিয়ে।
⸻
বাইরে দূরে শেয়ালের ডাক।
⸻
হাওয়ায় শুকনো পাতার শব্দ।
⸻
রতন গভীর ঘুমে।
⸻
কিন্তু তার স্বপ্নে…
সে একা না।
⸻
সে দাঁড়িয়ে আছে।
⸻
বটগাছের সামনে।
⸻
এই প্রথম।
⸻
সে বুঝতে পারল—
সে নিজের চোখ দিয়ে দেখছে না।
⸻
কারও চোখ দিয়ে দেখছে।
⸻
অনেক উঁচু থেকে।
⸻
অনেক পুরোনো একটা দৃষ্টি।
⸻
সেই দৃষ্টিতে বটগাছটাকে দেখে মনে হলো না গাছ।
⸻
মনে হলো দুর্গ।
⸻
আশ্রয়।
⸻
অধিকার।
⸻
তারপর ধীরে ধীরে চারপাশে মানুষের মুখ ভেসে উঠল।
⸻
গ্রামের মানুষ।
⸻
একটার পর একটা।
⸻
কেউ মৃত।
⸻
কেউ জীবিত।
⸻
কেউ বহু আগেই মাটির নিচে।
⸻
তবু সেই দৃষ্টির মধ্যে ভয় নেই।
⸻
রাগও নেই।
⸻
বরং…
একটা বিকৃত অধিকারবোধ।
⸻
“আমার…”
⸻
রতনের শরীর কেঁপে উঠল।
⸻
“সব আমার…”
⸻
আরেকটা মুখ ভেসে উঠল।
⸻
এক বৃদ্ধ।
⸻
চোখে দৃঢ়তা।
⸻
সেই অচেনা সন্ন্যাসী?
⸻
নাকি অন্য কেউ?
⸻
স্বপ্নের মধ্যে বোঝা গেল না।
⸻
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেই কণ্ঠস্বর বদলে গেল।
⸻
প্রথমবার।
⸻
প্রথমবার সেখানে রাগ শোনা গেল।
⸻
খুব গভীর।
⸻
খুব পুরোনো।
⸻
“ওরা আমাকে বেঁধেছিল…”
⸻
“ওরা ভেবেছিল শেষ।”
⸻
অন্ধকার যেন কেঁপে উঠল।
⸻
“শেষ হয়নি।”
⸻
রতনের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
⸻
সে চিৎকার করতে চাইল।
⸻
পারল না।
⸻
নড়তে চাইল।
⸻
পারল না।
⸻
শুধু শুনতে থাকল।
⸻
আর সেই কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলতে থাকল—
⸻
“তারা ভুলে গেছে…”
⸻
“আমি ভুলিনি…”
⸻
ভোরের ঠিক আগে রতনের ঘুম ভাঙল।
⸻
সে বিছানায় উঠে বসল।
⸻
হাঁপাচ্ছে।
⸻
ঘর অন্ধকার।
⸻
সবাই ঘুমিয়ে।
⸻
তবু তার চোখ দুটো কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির রইল।
⸻
অস্বাভাবিকভাবে স্থির।
⸻
তারপর খুব আস্তে…
খুব নিচু গলায়…
সে একটা কথা বলল।
⸻
একটা কথা, যার অর্থ সে নিজেও জানে না।
⸻
“এবার মনে করাব…”
⸻
তারপর আবার শুয়ে পড়ল।
⸻
সকালে উঠে তার কিছুই মনে থাকবে না।
⸻
কিন্তু অন্ধকারে বলা সেই কথাগুলো…
সেগুলো রতনের ছিল না।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)