19-06-2026, 01:38 AM
অধ্যায় ২৫ : এক মাস পরে
হরিপদ মাস্টারের মৃত্যুর পর প্রায় এক মাস কেটে গেছে।
শীত আরও নেমেছে।
সকালে মাঠে কুয়াশা এমন ঘন হয় যে দশ হাত দূরের মানুষও স্পষ্ট দেখা যায় না।
⸻
কাশীপুর আবার নিজের ছন্দে ফিরেছে।
⸻
লোকজন কাজে যায়।
⸻
কলেজ বসে।
⸻
সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে আড্ডা হয়।
⸻
শুধু একটা জিনিস ধীরে ধীরে বদলেছে।
⸻
রতন।
⸻
আর মজার ব্যাপার হলো…
কেউ সেটা খেয়ালই করছে না।
⸻
কারণ পরিবর্তনটা এত ধীরে হয়েছে।
⸻
আজকাল রতন কম কথা বলে।
⸻
কিন্তু যখন বলে…
অদ্ভুতভাবে ঠিক কথা বলে।
⸻
প্রথম ঘটনা ঘটেছিল মঞ্জু কাকিমার বাড়িতে।
⸻
অনেকদিন ধরে একটা রুপোর পুরোনো মল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
⸻
ঘর তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে।
⸻
উঠোন খোঁজা হয়েছে।
⸻
পুকুরঘাটও।
⸻
কোথাও নেই।
⸻
রতন সেদিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
⸻
হঠাৎ বলল—
— চৌকিটার নিচে দেখেছেন?
⸻
মঞ্জু কাকিমা হেসে উঠলেন।
⸻
— ওখানে দশবার দেখা হয়েছে।
⸻
তবু আরেকবার দেখা হলো।
⸻
আর সেখানেই পাওয়া গেল।
⸻
সবাই অবাক।
⸻
রতনও।
⸻
কারণ সে নিজেও জানত না কেন কথাটা বলেছিল।
⸻
এরকম আরও দু-একটা ঘটনা ঘটল।
⸻
ছোটখাটো।
⸻
তেমন গুরুত্ব দেওয়ার মতো নয়।
⸻
তবু লোকজন বলতে শুরু করল—
— ছেলেটার মাথা ভালো।
⸻
— বুদ্ধি বেড়েছে।
⸻
— বাবার মতো হবে।
⸻
আর দূরে কোথাও…
কেউ যেন নিঃশব্দে হাসল।
⸻
কারণ এটাই তো দরকার ছিল।
⸻
ভয় না।
⸻
বিশ্বাস।
⸻
সেদিন সন্ধ্যায় রতন মাঠ থেকে ফিরছিল।
⸻
কার্তিক পাশে।
⸻
আকাশে লাল আলো।
⸻
পাখিরা বাসায় ফিরছে।
⸻
হঠাৎ রতন থেমে গেল।
⸻
রাস্তার ধারে একটা ভাঙা কুঁড়েঘরের দিকে তাকিয়ে।
⸻
কার্তিক বলল,
— কী হলো?
⸻
রতন উত্তর দিল না।
⸻
কয়েক সেকেন্ড পরে বলল,
— এখানে আগে একজন থাকত।
⸻
— থাকত তো।
⸻
— বাঁ পায়ে একটু খুঁড়িয়ে হাঁটত।
⸻
কার্তিক ভুরু কুঁচকাল।
⸻
— তুই জানলি কী করে?
⸻
রতন তাকাল।
⸻
তারপর বলল,
— জানি না।
⸻
সত্যিই জানত না।
⸻
কারণ লোকটাকে সে কখনও দেখেনি।
⸻
লোকটা মারা গেছে তার জন্মেরও আগে।
⸻
তবু…
তার মাথার ভেতর ছবিটার মতো ভেসে উঠেছিল।
⸻
যেন কোনো স্মৃতি।
⸻
কিন্তু স্মৃতিটা তার নয়।
⸻
সেই রাতে প্রতিমা প্রথমবার সত্যি সত্যি ভয় পেলেন।
⸻
খুব ছোট একটা কারণে।
⸻
রতন খাচ্ছিল।
⸻
ভাত।
ডাল।
আলুভাজা।
⸻
হঠাৎ সে খাওয়া থামিয়ে দিল।
⸻
মাথা তুলে তাকাল দরজার দিকে।
⸻
কয়েক সেকেন্ড।
⸻
তারপর আবার খেতে শুরু করল।
⸻
প্রতিমা বললেন,
— কী দেখলি?
⸻
— কিছু না।
⸻
— তাহলে তাকিয়ে ছিলি কেন?
⸻
রতন থেমে গেল।
⸻
সত্যিই তো।
⸻
সে তাকিয়ে ছিল কেন?
⸻
মনে করার চেষ্টা করল।
⸻
তারপর কাঁপা গলায় বলল—
— মনে হলো কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।
⸻
ঘরের ভেতর হঠাৎ নীরবতা নেমে এল।
⸻
রমাপদ হাসলেন।
⸻
— সন্ধ্যার আলোছায়া।
⸻
— হয়তো।
⸻
রতন মাথা নেড়ে আবার খেতে লাগল।
⸻
কিন্তু প্রতিমা খেয়াল করলেন—
ছেলের হাতটা সামান্য কাঁপছে।
⸻
সেই রাত।
⸻
গভীর রাত।
⸻
সবাই ঘুমিয়ে।
⸻
রতনও।
⸻
কিন্তু আজ স্বপ্নটা অন্যরকম।
⸻
এই প্রথম।
⸻
সে বটগাছটাকে কাছ থেকে দেখল।
⸻
খুব কাছ থেকে।
⸻
এত কাছে আগে কখনও না।
⸻
শিকড়।
⸻
অন্ধকার।
⸻
মাটির গন্ধ।
⸻
আর মাটির নিচে…
কিছু একটা।
⸻
লাল।
⸻
হলুদ।
⸻
পচে যাওয়া সুতো।
⸻
ভাঙা খুঁটি।
⸻
মাটির চাপে আধ ডুবে আছে।
⸻
তারপর সেই কণ্ঠস্বর।
⸻
আগের চেয়ে স্পষ্ট।
⸻
অনেক স্পষ্ট।
⸻
“দেখেছ?”
⸻
রতনের বুক ধক করে উঠল।
⸻
সে উত্তর দিল না।
⸻
দিতে চাইলও না।
⸻
কিন্তু তার মুখ নিজে থেকেই খুলে গেল।
⸻
“হ্যাঁ…”
⸻
তারপর সে নিজেই ভয় পেয়ে গেল।
⸻
কারণ সে জানত—
স্বপ্নের মধ্যে সে উত্তর দিয়েছে।
⸻
আর সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারের মধ্যে যেন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস শোনা গেল।
⸻
সন্তুষ্ট।
⸻
অপেক্ষমাণ।
⸻
“ভালো…”
⸻
এই একটুকু শব্দ।
⸻
তারপর সব মিলিয়ে গেল।
⸻
ভোরে ঘুম ভাঙার পর রতনের কিছুই মনে রইল না।
⸻
শুধু একটা অদ্ভুত অনুভূতি।
⸻
যেন সে কারও সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছে।
⸻
আর সেই কারও কাছে…
অজান্তেই একটা দরজা একটু বেশি খুলে দিয়েছে।
⸻
দূরে, বহুদিনের পুরোনো বটগাছটার শিকড়ের নিচে, মাটির গভীরে চাপা পড়ে থাকা ভাঙা বন্ধনের কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম ফাটল আরও একটু চওড়া হয়ে উঠল।
হরিপদ মাস্টারের মৃত্যুর পর প্রায় এক মাস কেটে গেছে।
শীত আরও নেমেছে।
সকালে মাঠে কুয়াশা এমন ঘন হয় যে দশ হাত দূরের মানুষও স্পষ্ট দেখা যায় না।
⸻
কাশীপুর আবার নিজের ছন্দে ফিরেছে।
⸻
লোকজন কাজে যায়।
⸻
কলেজ বসে।
⸻
সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে আড্ডা হয়।
⸻
শুধু একটা জিনিস ধীরে ধীরে বদলেছে।
⸻
রতন।
⸻
আর মজার ব্যাপার হলো…
কেউ সেটা খেয়ালই করছে না।
⸻
কারণ পরিবর্তনটা এত ধীরে হয়েছে।
⸻
আজকাল রতন কম কথা বলে।
⸻
কিন্তু যখন বলে…
অদ্ভুতভাবে ঠিক কথা বলে।
⸻
প্রথম ঘটনা ঘটেছিল মঞ্জু কাকিমার বাড়িতে।
⸻
অনেকদিন ধরে একটা রুপোর পুরোনো মল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
⸻
ঘর তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে।
⸻
উঠোন খোঁজা হয়েছে।
⸻
পুকুরঘাটও।
⸻
কোথাও নেই।
⸻
রতন সেদিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
⸻
হঠাৎ বলল—
— চৌকিটার নিচে দেখেছেন?
⸻
মঞ্জু কাকিমা হেসে উঠলেন।
⸻
— ওখানে দশবার দেখা হয়েছে।
⸻
তবু আরেকবার দেখা হলো।
⸻
আর সেখানেই পাওয়া গেল।
⸻
সবাই অবাক।
⸻
রতনও।
⸻
কারণ সে নিজেও জানত না কেন কথাটা বলেছিল।
⸻
এরকম আরও দু-একটা ঘটনা ঘটল।
⸻
ছোটখাটো।
⸻
তেমন গুরুত্ব দেওয়ার মতো নয়।
⸻
তবু লোকজন বলতে শুরু করল—
— ছেলেটার মাথা ভালো।
⸻
— বুদ্ধি বেড়েছে।
⸻
— বাবার মতো হবে।
⸻
আর দূরে কোথাও…
কেউ যেন নিঃশব্দে হাসল।
⸻
কারণ এটাই তো দরকার ছিল।
⸻
ভয় না।
⸻
বিশ্বাস।
⸻
সেদিন সন্ধ্যায় রতন মাঠ থেকে ফিরছিল।
⸻
কার্তিক পাশে।
⸻
আকাশে লাল আলো।
⸻
পাখিরা বাসায় ফিরছে।
⸻
হঠাৎ রতন থেমে গেল।
⸻
রাস্তার ধারে একটা ভাঙা কুঁড়েঘরের দিকে তাকিয়ে।
⸻
কার্তিক বলল,
— কী হলো?
⸻
রতন উত্তর দিল না।
⸻
কয়েক সেকেন্ড পরে বলল,
— এখানে আগে একজন থাকত।
⸻
— থাকত তো।
⸻
— বাঁ পায়ে একটু খুঁড়িয়ে হাঁটত।
⸻
কার্তিক ভুরু কুঁচকাল।
⸻
— তুই জানলি কী করে?
⸻
রতন তাকাল।
⸻
তারপর বলল,
— জানি না।
⸻
সত্যিই জানত না।
⸻
কারণ লোকটাকে সে কখনও দেখেনি।
⸻
লোকটা মারা গেছে তার জন্মেরও আগে।
⸻
তবু…
তার মাথার ভেতর ছবিটার মতো ভেসে উঠেছিল।
⸻
যেন কোনো স্মৃতি।
⸻
কিন্তু স্মৃতিটা তার নয়।
⸻
সেই রাতে প্রতিমা প্রথমবার সত্যি সত্যি ভয় পেলেন।
⸻
খুব ছোট একটা কারণে।
⸻
রতন খাচ্ছিল।
⸻
ভাত।
ডাল।
আলুভাজা।
⸻
হঠাৎ সে খাওয়া থামিয়ে দিল।
⸻
মাথা তুলে তাকাল দরজার দিকে।
⸻
কয়েক সেকেন্ড।
⸻
তারপর আবার খেতে শুরু করল।
⸻
প্রতিমা বললেন,
— কী দেখলি?
⸻
— কিছু না।
⸻
— তাহলে তাকিয়ে ছিলি কেন?
⸻
রতন থেমে গেল।
⸻
সত্যিই তো।
⸻
সে তাকিয়ে ছিল কেন?
⸻
মনে করার চেষ্টা করল।
⸻
তারপর কাঁপা গলায় বলল—
— মনে হলো কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।
⸻
ঘরের ভেতর হঠাৎ নীরবতা নেমে এল।
⸻
রমাপদ হাসলেন।
⸻
— সন্ধ্যার আলোছায়া।
⸻
— হয়তো।
⸻
রতন মাথা নেড়ে আবার খেতে লাগল।
⸻
কিন্তু প্রতিমা খেয়াল করলেন—
ছেলের হাতটা সামান্য কাঁপছে।
⸻
সেই রাত।
⸻
গভীর রাত।
⸻
সবাই ঘুমিয়ে।
⸻
রতনও।
⸻
কিন্তু আজ স্বপ্নটা অন্যরকম।
⸻
এই প্রথম।
⸻
সে বটগাছটাকে কাছ থেকে দেখল।
⸻
খুব কাছ থেকে।
⸻
এত কাছে আগে কখনও না।
⸻
শিকড়।
⸻
অন্ধকার।
⸻
মাটির গন্ধ।
⸻
আর মাটির নিচে…
কিছু একটা।
⸻
লাল।
⸻
হলুদ।
⸻
পচে যাওয়া সুতো।
⸻
ভাঙা খুঁটি।
⸻
মাটির চাপে আধ ডুবে আছে।
⸻
তারপর সেই কণ্ঠস্বর।
⸻
আগের চেয়ে স্পষ্ট।
⸻
অনেক স্পষ্ট।
⸻
“দেখেছ?”
⸻
রতনের বুক ধক করে উঠল।
⸻
সে উত্তর দিল না।
⸻
দিতে চাইলও না।
⸻
কিন্তু তার মুখ নিজে থেকেই খুলে গেল।
⸻
“হ্যাঁ…”
⸻
তারপর সে নিজেই ভয় পেয়ে গেল।
⸻
কারণ সে জানত—
স্বপ্নের মধ্যে সে উত্তর দিয়েছে।
⸻
আর সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারের মধ্যে যেন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস শোনা গেল।
⸻
সন্তুষ্ট।
⸻
অপেক্ষমাণ।
⸻
“ভালো…”
⸻
এই একটুকু শব্দ।
⸻
তারপর সব মিলিয়ে গেল।
⸻
ভোরে ঘুম ভাঙার পর রতনের কিছুই মনে রইল না।
⸻
শুধু একটা অদ্ভুত অনুভূতি।
⸻
যেন সে কারও সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছে।
⸻
আর সেই কারও কাছে…
অজান্তেই একটা দরজা একটু বেশি খুলে দিয়েছে।
⸻
দূরে, বহুদিনের পুরোনো বটগাছটার শিকড়ের নিচে, মাটির গভীরে চাপা পড়ে থাকা ভাঙা বন্ধনের কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম ফাটল আরও একটু চওড়া হয়ে উঠল।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)