19-06-2026, 01:37 AM
অধ্যায় ২৪ : প্রতিমার অস্বস্তি
হরিপদ মাস্টারের মৃত্যুর পর তিন দিন কেটে গেছে।
গ্রামের জীবন আবার ধীরে ধীরে আগের ছন্দে ফিরছে।
⸻
নরুর দোকানে আবার আড্ডা বসছে।
⸻
পুকুরঘাটে আবার মহিলাদের হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
⸻
কলেজে ক্লাস চলছে।
⸻
মাঠে খেলাও হচ্ছে।
⸻
তবু…
কিছু কিছু ঘটনা গ্রামের স্মৃতি থেকে এত সহজে মুছে যায় না।
⸻
হরিপদ মাস্টারের নাম এখনও মাঝেমধ্যে উঠে আসে।
⸻
আর কার্তিক এখনও আগের মতো হয়নি।
⸻
রতনও সেটা বুঝতে পারে।
⸻
তবু সে নিজেও আজকাল নিজের মধ্যেই যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
⸻
সকালে প্রতিমা ডাকলেন,
— রতন!
⸻
কোনো উত্তর নেই।
⸻
— রে রতন!
⸻
তবুও না।
⸻
প্রতিমা ভাবলেন, হয়তো পড়ছে।
⸻
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখলেন, রতন উঠোনে বসে আছে।
⸻
চুপচাপ।
⸻
একদৃষ্টে তাকিয়ে।
⸻
সামনের আমগাছটার দিকে।
⸻
— ডাকছি, শুনতে পাচ্ছিস না?
⸻
রতন চমকে উঠল।
⸻
যেন অনেক দূর থেকে ফিরে এল।
⸻
— হ্যাঁ?
⸻
— কতক্ষণ ধরে ডাকছি।
⸻
— শুনিনি।
⸻
— কী ভাবছিলি?
⸻
রতন উত্তর দিল না।
⸻
কারণ সে নিজেও জানত না।
⸻
সে সত্যিই কী ভাবছিল?
⸻
মনে করার চেষ্টা করল।
⸻
পারল না।
⸻
শুধু মনে হলো…
কিছু একটা প্রায় মনে পড়ে গিয়েছিল।
⸻
তারপর আবার হারিয়ে গেছে।
⸻
সেদিন দুপুরে খাওয়ার সময় একটা ছোট ঘটনা ঘটল।
⸻
খুব ছোট।
⸻
কিন্তু প্রতিমার অস্বস্তি হলো।
⸻
কারণ তিনি রতনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
— ডাল দেব?
⸻
রতন মাথা না তুলেই বলল,
— আগে নুনটা সরাও।
⸻
প্রতিমা অবাক।
⸻
— কেন?
⸻
— নুনের বাটি ওইখানে থাকলে পড়ে যাবে।
⸻
প্রতিমা বাটিটার দিকে তাকালেন।
⸻
ভালোভাবেই রাখা।
⸻
পড়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
⸻
তিনি কিছু বললেন না।
⸻
কিন্তু ঠিক আধ মিনিট পরে…
তাকের ওপর বসে থাকা একটা বেড়াল লাফ দিল।
⸻
ধাক্কা খেল।
⸻
আর নুনের বাটিটা নিচে পড়ে গেল।
⸻
ঝনঝন শব্দ।
⸻
সাদা নুন ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।
⸻
প্রতিমা স্থির হয়ে গেলেন।
⸻
রতনও থেমে গেল।
⸻
কারণ সে নিজেও জানত না সে কথাটা কীভাবে বলেছিল।
⸻
একটা কাঁটা যেন তার বুকের ভেতর বিঁধল।
⸻
এটা কি আন্দাজ?
⸻
নাকি…
⸻
সে আর ভাবল না।
⸻
সন্ধ্যায় মাঠে গিয়ে খেলল।
⸻
সব ঠিক।
⸻
সব স্বাভাবিক।
⸻
কিন্তু কার্তিক হঠাৎ বলল,
— তুই ঠিক আছিস তো?
⸻
— কেন?
⸻
— জানি না।
⸻
রতন হেসে উড়িয়ে দিতে গেল।
⸻
কিন্তু পারল না।
⸻
কারণ একই প্রশ্ন সে নিজেকেও করছে।
⸻
রাতে খাওয়া শেষ করে রমাপদ হারিকেনের আলোয় খাতা দেখছিলেন।
⸻
প্রতিমা চাল বাছছিলেন।
⸻
রতন বই খুলে বসেছিল।
⸻
হঠাৎ সে বলল,
— বাবা।
⸻
— কী?
⸻
— হরিপদ দাদু কি ভয় পেত?
⸻
রমাপদ চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।
⸻
— সবাই কিছু না কিছু ভয় পায়।
⸻
— উনি কী ভয় পেতেন?
⸻
প্রশ্নটা শুনে প্রতিমাও তাকালেন।
⸻
কারণ প্রশ্নটা অদ্ভুত।
⸻
রতন নিজেও জানে না কেন জিজ্ঞেস করল।
⸻
রমাপদ হেসে বললেন,
— মানুষ চলে গেলে এসব আর জানা যায় না।
⸻
রতন মাথা নেড়ে চুপ করে গেল।
⸻
কিন্তু তার ভেতরে যেন কেউ ফিসফিস করে বলল—
“জানা যায়…”
⸻
সে চমকে উঠল।
⸻
চারদিকে তাকাল।
⸻
কেউ না।
⸻
কিছু না।
⸻
শুধু নিজের হৃদস্পন্দন।
⸻
আর গভীর রাত।
⸻
সেই রাতে প্রতিমার ঘুম ভেঙে গেল।
⸻
কেন ভাঙল, তিনি বুঝতে পারলেন না।
⸻
হয়তো কোনো শব্দে।
⸻
হয়তো নিছকই।
⸻
তিনি চোখ খুললেন।
⸻
ঘর অন্ধকার।
⸻
রমাপদ ঘুমোচ্ছেন।
⸻
রতনের খাটও দেখা যাচ্ছে।
⸻
সব স্বাভাবিক।
⸻
তবু…
কিছু একটা যেন ঠিক নেই।
⸻
প্রতিমা ধীরে ধীরে উঠে বসলেন।
⸻
তারপর খেয়াল করলেন।
⸻
রতন ঘুমিয়ে আছে।
⸻
কিন্তু…
⸻
সে যেন কিছু বলছে।
⸻
খুব আস্তে।
⸻
ফিসফিস করে।
⸻
ঘুমের মধ্যেই।
⸻
প্রতিমা ভালো করে শোনার চেষ্টা করলেন।
⸻
শব্দগুলো স্পষ্ট না।
⸻
তবু মনে হলো—
রতন কারও সঙ্গে কথা বলছে।
⸻
একতরফা না।
⸻
যেন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।
⸻
তার বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
⸻
তিনি ধীরে ধীরে ছেলের কাছে এগিয়ে গেলেন।
⸻
আর ঠিক তখনই…
রতন খুব আস্তে একটা শব্দ উচ্চারণ করল।
⸻
একটা নাম।
⸻
এত আস্তে যে পুরোটা বোঝা গেল না।
⸻
শুধু প্রথম অক্ষরটা।
⸻
“নি…”
⸻
তারপর থেমে গেল।
⸻
আবার নীরবতা।
⸻
প্রতিমা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
⸻
তারপর ধীরে ধীরে ফিরে এলেন।
⸻
নিজেকে বোঝালেন—
স্বপ্ন দেখছে।
এর বেশি কিছু না।
⸻
তবু সেই রাতে আর তার ঘুম এল না।
⸻
আর গ্রামের অন্যপ্রান্তে…
কার্তিক তার দাদুর ভেজা খাতাটা আবার খুলেছিল।
⸻
বেশিরভাগ লেখা নষ্ট।
⸻
কালি ছড়িয়ে গেছে।
⸻
কিন্তু একটা পাতায় এখনও কয়েকটা শব্দ পড়া যায়।
⸻
খুব কষ্টে।
⸻
খুব অস্পষ্টভাবে।
⸻
“…গণ্ডি…”
“…বট…”
“…নিরঞ্জ…”
⸻
তারপর বাকিটা মুছে গেছে।
⸻
কার্তিক শব্দটার দিকে তাকিয়ে রইল।
⸻
“নিরঞ্জ…”
⸻
এটা কি কোনো নাম?
⸻
নাকি অন্য কিছু?
⸻
সে জানত না।
⸻
কিন্তু বহু দূরে, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছটার শিকড়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা এক বিস্মৃত নাম যেন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
⸻
অনেকদিন পরে।
খুব অনেকদিন পরে।
কারও মুখে তার ছায়া আবার উচ্চারিত হয়েছে।
হরিপদ মাস্টারের মৃত্যুর পর তিন দিন কেটে গেছে।
গ্রামের জীবন আবার ধীরে ধীরে আগের ছন্দে ফিরছে।
⸻
নরুর দোকানে আবার আড্ডা বসছে।
⸻
পুকুরঘাটে আবার মহিলাদের হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
⸻
কলেজে ক্লাস চলছে।
⸻
মাঠে খেলাও হচ্ছে।
⸻
তবু…
কিছু কিছু ঘটনা গ্রামের স্মৃতি থেকে এত সহজে মুছে যায় না।
⸻
হরিপদ মাস্টারের নাম এখনও মাঝেমধ্যে উঠে আসে।
⸻
আর কার্তিক এখনও আগের মতো হয়নি।
⸻
রতনও সেটা বুঝতে পারে।
⸻
তবু সে নিজেও আজকাল নিজের মধ্যেই যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
⸻
সকালে প্রতিমা ডাকলেন,
— রতন!
⸻
কোনো উত্তর নেই।
⸻
— রে রতন!
⸻
তবুও না।
⸻
প্রতিমা ভাবলেন, হয়তো পড়ছে।
⸻
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখলেন, রতন উঠোনে বসে আছে।
⸻
চুপচাপ।
⸻
একদৃষ্টে তাকিয়ে।
⸻
সামনের আমগাছটার দিকে।
⸻
— ডাকছি, শুনতে পাচ্ছিস না?
⸻
রতন চমকে উঠল।
⸻
যেন অনেক দূর থেকে ফিরে এল।
⸻
— হ্যাঁ?
⸻
— কতক্ষণ ধরে ডাকছি।
⸻
— শুনিনি।
⸻
— কী ভাবছিলি?
⸻
রতন উত্তর দিল না।
⸻
কারণ সে নিজেও জানত না।
⸻
সে সত্যিই কী ভাবছিল?
⸻
মনে করার চেষ্টা করল।
⸻
পারল না।
⸻
শুধু মনে হলো…
কিছু একটা প্রায় মনে পড়ে গিয়েছিল।
⸻
তারপর আবার হারিয়ে গেছে।
⸻
সেদিন দুপুরে খাওয়ার সময় একটা ছোট ঘটনা ঘটল।
⸻
খুব ছোট।
⸻
কিন্তু প্রতিমার অস্বস্তি হলো।
⸻
কারণ তিনি রতনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
— ডাল দেব?
⸻
রতন মাথা না তুলেই বলল,
— আগে নুনটা সরাও।
⸻
প্রতিমা অবাক।
⸻
— কেন?
⸻
— নুনের বাটি ওইখানে থাকলে পড়ে যাবে।
⸻
প্রতিমা বাটিটার দিকে তাকালেন।
⸻
ভালোভাবেই রাখা।
⸻
পড়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
⸻
তিনি কিছু বললেন না।
⸻
কিন্তু ঠিক আধ মিনিট পরে…
তাকের ওপর বসে থাকা একটা বেড়াল লাফ দিল।
⸻
ধাক্কা খেল।
⸻
আর নুনের বাটিটা নিচে পড়ে গেল।
⸻
ঝনঝন শব্দ।
⸻
সাদা নুন ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।
⸻
প্রতিমা স্থির হয়ে গেলেন।
⸻
রতনও থেমে গেল।
⸻
কারণ সে নিজেও জানত না সে কথাটা কীভাবে বলেছিল।
⸻
একটা কাঁটা যেন তার বুকের ভেতর বিঁধল।
⸻
এটা কি আন্দাজ?
⸻
নাকি…
⸻
সে আর ভাবল না।
⸻
সন্ধ্যায় মাঠে গিয়ে খেলল।
⸻
সব ঠিক।
⸻
সব স্বাভাবিক।
⸻
কিন্তু কার্তিক হঠাৎ বলল,
— তুই ঠিক আছিস তো?
⸻
— কেন?
⸻
— জানি না।
⸻
রতন হেসে উড়িয়ে দিতে গেল।
⸻
কিন্তু পারল না।
⸻
কারণ একই প্রশ্ন সে নিজেকেও করছে।
⸻
রাতে খাওয়া শেষ করে রমাপদ হারিকেনের আলোয় খাতা দেখছিলেন।
⸻
প্রতিমা চাল বাছছিলেন।
⸻
রতন বই খুলে বসেছিল।
⸻
হঠাৎ সে বলল,
— বাবা।
⸻
— কী?
⸻
— হরিপদ দাদু কি ভয় পেত?
⸻
রমাপদ চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।
⸻
— সবাই কিছু না কিছু ভয় পায়।
⸻
— উনি কী ভয় পেতেন?
⸻
প্রশ্নটা শুনে প্রতিমাও তাকালেন।
⸻
কারণ প্রশ্নটা অদ্ভুত।
⸻
রতন নিজেও জানে না কেন জিজ্ঞেস করল।
⸻
রমাপদ হেসে বললেন,
— মানুষ চলে গেলে এসব আর জানা যায় না।
⸻
রতন মাথা নেড়ে চুপ করে গেল।
⸻
কিন্তু তার ভেতরে যেন কেউ ফিসফিস করে বলল—
“জানা যায়…”
⸻
সে চমকে উঠল।
⸻
চারদিকে তাকাল।
⸻
কেউ না।
⸻
কিছু না।
⸻
শুধু নিজের হৃদস্পন্দন।
⸻
আর গভীর রাত।
⸻
সেই রাতে প্রতিমার ঘুম ভেঙে গেল।
⸻
কেন ভাঙল, তিনি বুঝতে পারলেন না।
⸻
হয়তো কোনো শব্দে।
⸻
হয়তো নিছকই।
⸻
তিনি চোখ খুললেন।
⸻
ঘর অন্ধকার।
⸻
রমাপদ ঘুমোচ্ছেন।
⸻
রতনের খাটও দেখা যাচ্ছে।
⸻
সব স্বাভাবিক।
⸻
তবু…
কিছু একটা যেন ঠিক নেই।
⸻
প্রতিমা ধীরে ধীরে উঠে বসলেন।
⸻
তারপর খেয়াল করলেন।
⸻
রতন ঘুমিয়ে আছে।
⸻
কিন্তু…
⸻
সে যেন কিছু বলছে।
⸻
খুব আস্তে।
⸻
ফিসফিস করে।
⸻
ঘুমের মধ্যেই।
⸻
প্রতিমা ভালো করে শোনার চেষ্টা করলেন।
⸻
শব্দগুলো স্পষ্ট না।
⸻
তবু মনে হলো—
রতন কারও সঙ্গে কথা বলছে।
⸻
একতরফা না।
⸻
যেন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।
⸻
তার বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
⸻
তিনি ধীরে ধীরে ছেলের কাছে এগিয়ে গেলেন।
⸻
আর ঠিক তখনই…
রতন খুব আস্তে একটা শব্দ উচ্চারণ করল।
⸻
একটা নাম।
⸻
এত আস্তে যে পুরোটা বোঝা গেল না।
⸻
শুধু প্রথম অক্ষরটা।
⸻
“নি…”
⸻
তারপর থেমে গেল।
⸻
আবার নীরবতা।
⸻
প্রতিমা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
⸻
তারপর ধীরে ধীরে ফিরে এলেন।
⸻
নিজেকে বোঝালেন—
স্বপ্ন দেখছে।
এর বেশি কিছু না।
⸻
তবু সেই রাতে আর তার ঘুম এল না।
⸻
আর গ্রামের অন্যপ্রান্তে…
কার্তিক তার দাদুর ভেজা খাতাটা আবার খুলেছিল।
⸻
বেশিরভাগ লেখা নষ্ট।
⸻
কালি ছড়িয়ে গেছে।
⸻
কিন্তু একটা পাতায় এখনও কয়েকটা শব্দ পড়া যায়।
⸻
খুব কষ্টে।
⸻
খুব অস্পষ্টভাবে।
⸻
“…গণ্ডি…”
“…বট…”
“…নিরঞ্জ…”
⸻
তারপর বাকিটা মুছে গেছে।
⸻
কার্তিক শব্দটার দিকে তাকিয়ে রইল।
⸻
“নিরঞ্জ…”
⸻
এটা কি কোনো নাম?
⸻
নাকি অন্য কিছু?
⸻
সে জানত না।
⸻
কিন্তু বহু দূরে, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছটার শিকড়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা এক বিস্মৃত নাম যেন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
⸻
অনেকদিন পরে।
খুব অনেকদিন পরে।
কারও মুখে তার ছায়া আবার উচ্চারিত হয়েছে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)