19-06-2026, 01:36 AM
অধ্যায় ২৩ : যে কথা রতনের ছিল না
হরিপদ মাস্টারের মৃত্যুর খবরটা কাশীপুরে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না।
সকালের কুয়াশা পুরো কাটার আগেই প্রায় সবাই জেনে গেল।
⸻
নরুর চায়ের দোকানে ভিড়।
⸻
— কাল বিকেলেও তো দেখলাম।
— একদম ভালোই ছিলেন।
— ভগবানের ডাকে কারও কিছু করার নেই।
⸻
কথা চলতেই থাকল।
চায়ের ভাঁড় থেকে ধোঁয়া উঠতে থাকল।
⸻
পুকুরঘাটেও একই আলোচনা।
⸻
মঞ্জু কাকিমা বললেন,
— এমন মানুষ আর হবে না।
⸻
পারুল পিসি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
⸻
— আমাদের ছেলেবেলায় কলেজে পড়িয়েছেন।
⸻
সবাই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
⸻
রমাপদও খবর শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
⸻
কলেজে যাওয়ার আগে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন।
⸻
হরিপদ মাস্টারের সঙ্গে তার খুব ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও গভীর শ্রদ্ধা ছিল।
⸻
কিন্তু একটা প্রশ্ন বারবার মাথায় আসছিল।
⸻
কাল সকালেই বা উনি কোথায় যাচ্ছিলেন?
⸻
কেন এত ভোরে বেরিয়েছিলেন?
⸻
কেউ জানে না।
⸻
আর ঠিক সেই সময়…
রতন উঠোনে বসে ছিল।
⸻
তার সামনে মাটির বাটিতে মুড়ি।
⸻
প্রতিমা রান্নাঘরে।
⸻
সাধারণ সকাল।
⸻
তবু আজ যেন সবকিছু একটু মলিন।
⸻
হরিপদ মাস্টারকে সে খুব কাছ থেকে চিনত না।
⸻
কিন্তু লোকটার মুখ মনে পড়ছিল।
⸻
আর আশ্চর্যভাবে…
তার মনে হচ্ছিল লোকটা যেন তাকে কিছু বলতে চাইছিল।
⸻
কিন্তু কী?
⸻
মনে পড়ছিল না।
⸻
একদম না।
⸻
সেদিন বিকেলে গ্রামের লোকজন যখন শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নিচ্ছিল…
রতনও কার্তিকদের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
⸻
অনেক মানুষ।
⸻
অনেক মুখ।
⸻
অনেক চাপা কথা।
⸻
কার্তিক চুপচাপ বসে ছিল।
⸻
চোখ লাল।
⸻
রতন তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
⸻
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
⸻
তারপর…
কোনো কারণ ছাড়াই…
রতনের মুখ থেকে একটা কথা বেরিয়ে এল।
⸻
— দাদু জানত।
⸻
কার্তিক চমকে তাকাল।
⸻
— কী?
⸻
রতনও থমকে গেল।
⸻
সে নিজেই বুঝতে পারল না কেন কথাটা বলল।
⸻
— কী জানত?
কার্তিক আবার জিজ্ঞেস করল।
⸻
রতন কিছুক্ষণ চুপ।
⸻
তার মাথার ভেতর যেন কুয়াশা।
⸻
— আমি…
⸻
— বল।
⸻
— জানি না।
⸻
সত্যিই জানত না।
⸻
সে কথা ঘুরিয়ে দিল।
⸻
কিন্তু কার্তিকের বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন যেন করে উঠল।
⸻
কারণ দাদু মারা যাওয়ার আগের সন্ধ্যাতেও এমন অদ্ভুত আচরণ করেছিলেন।
⸻
সেই স্মৃতি হঠাৎ আবার ফিরে এল।
⸻
সন্ধ্যা নামতে শুরু করল।
⸻
গ্রামের ওপর ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এল।
⸻
আর সেই রাতেই…
রতন আবার স্বপ্ন দেখল।
⸻
এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট।
⸻
আগুন।
⸻
বটগাছ।
⸻
শিকড়।
⸻
লাল আর হলুদ কিছু একটা মাটির মধ্যে চাপা।
⸻
কেউ একজন মন্ত্র পড়ছে।
⸻
কিন্তু শব্দগুলো বোঝা যাচ্ছে না।
⸻
তারপর…
একটা কণ্ঠস্বর।
⸻
এই প্রথম।
⸻
একটা মাত্র শব্দ।
⸻
খুব নিচু স্বরে।
⸻
খুব কাছে থেকে।
⸻
যেন কানের পাশেই।
⸻
“রতন…”
⸻
সে চমকে উঠল।
⸻
স্বপ্নের মধ্যেই।
⸻
কারণ গলাটা তার নিজের না।
⸻
বাবার না।
⸻
মায়ের না।
⸻
কোনো পরিচিত মানুষের না।
⸻
গলাটা ছিল শুকনো।
⸻
পুরোনো।
⸻
যেন বহু বছর ধরে কেউ কথা বলেনি।
⸻
তারপর অন্ধকার।
⸻
সম্পূর্ণ অন্ধকার।
⸻
রতনের ঘুম ভাঙল।
⸻
সে হাঁপাচ্ছিল।
⸻
ঘর অন্ধকার।
⸻
জানলার ফাঁক দিয়ে সামান্য চাঁদের আলো ঢুকছে।
⸻
রমাপদ আর প্রতিমা ঘুমিয়ে।
⸻
সব ঠিক।
⸻
সব স্বাভাবিক।
⸻
তবু তার মনে হচ্ছিল…
ঘরে আরও একজন আছে।
⸻
ঠিক বিছানার পায়ের দিকে।
⸻
অন্ধকারে।
⸻
দাঁড়িয়ে।
⸻
সে তাকিয়ে রইল।
⸻
কিছু দেখা গেল না।
⸻
তবু অনুভূতিটা গেল না।
⸻
অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে আবার শুয়ে পড়ল।
⸻
সকালে উঠে সে রাতের বেশিরভাগ কথাই ভুলে যাবে।
⸻
কিন্তু একটা জিনিস ভুলবে না।
⸻
ঘুম ভাঙার ঠিক আগে…
সে যেন কারও ফিসফিসানি শুনেছিল।
⸻
খুব আস্তে।
⸻
খুব ধীরে।
⸻
“এখন আর কেউ নেই…”
⸻
আর বহু দূরে…
কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বটগাছটার চারপাশে, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা পুরোনো লাল-হলুদ বন্ধনের কোথাও যেন অদৃশ্য একটা টান আরও একটু শক্ত হয়ে উঠল।
হরিপদ মাস্টারের মৃত্যুর খবরটা কাশীপুরে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না।
সকালের কুয়াশা পুরো কাটার আগেই প্রায় সবাই জেনে গেল।
⸻
নরুর চায়ের দোকানে ভিড়।
⸻
— কাল বিকেলেও তো দেখলাম।
— একদম ভালোই ছিলেন।
— ভগবানের ডাকে কারও কিছু করার নেই।
⸻
কথা চলতেই থাকল।
চায়ের ভাঁড় থেকে ধোঁয়া উঠতে থাকল।
⸻
পুকুরঘাটেও একই আলোচনা।
⸻
মঞ্জু কাকিমা বললেন,
— এমন মানুষ আর হবে না।
⸻
পারুল পিসি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
⸻
— আমাদের ছেলেবেলায় কলেজে পড়িয়েছেন।
⸻
সবাই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
⸻
রমাপদও খবর শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
⸻
কলেজে যাওয়ার আগে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন।
⸻
হরিপদ মাস্টারের সঙ্গে তার খুব ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও গভীর শ্রদ্ধা ছিল।
⸻
কিন্তু একটা প্রশ্ন বারবার মাথায় আসছিল।
⸻
কাল সকালেই বা উনি কোথায় যাচ্ছিলেন?
⸻
কেন এত ভোরে বেরিয়েছিলেন?
⸻
কেউ জানে না।
⸻
আর ঠিক সেই সময়…
রতন উঠোনে বসে ছিল।
⸻
তার সামনে মাটির বাটিতে মুড়ি।
⸻
প্রতিমা রান্নাঘরে।
⸻
সাধারণ সকাল।
⸻
তবু আজ যেন সবকিছু একটু মলিন।
⸻
হরিপদ মাস্টারকে সে খুব কাছ থেকে চিনত না।
⸻
কিন্তু লোকটার মুখ মনে পড়ছিল।
⸻
আর আশ্চর্যভাবে…
তার মনে হচ্ছিল লোকটা যেন তাকে কিছু বলতে চাইছিল।
⸻
কিন্তু কী?
⸻
মনে পড়ছিল না।
⸻
একদম না।
⸻
সেদিন বিকেলে গ্রামের লোকজন যখন শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নিচ্ছিল…
রতনও কার্তিকদের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
⸻
অনেক মানুষ।
⸻
অনেক মুখ।
⸻
অনেক চাপা কথা।
⸻
কার্তিক চুপচাপ বসে ছিল।
⸻
চোখ লাল।
⸻
রতন তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
⸻
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
⸻
তারপর…
কোনো কারণ ছাড়াই…
রতনের মুখ থেকে একটা কথা বেরিয়ে এল।
⸻
— দাদু জানত।
⸻
কার্তিক চমকে তাকাল।
⸻
— কী?
⸻
রতনও থমকে গেল।
⸻
সে নিজেই বুঝতে পারল না কেন কথাটা বলল।
⸻
— কী জানত?
কার্তিক আবার জিজ্ঞেস করল।
⸻
রতন কিছুক্ষণ চুপ।
⸻
তার মাথার ভেতর যেন কুয়াশা।
⸻
— আমি…
⸻
— বল।
⸻
— জানি না।
⸻
সত্যিই জানত না।
⸻
সে কথা ঘুরিয়ে দিল।
⸻
কিন্তু কার্তিকের বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন যেন করে উঠল।
⸻
কারণ দাদু মারা যাওয়ার আগের সন্ধ্যাতেও এমন অদ্ভুত আচরণ করেছিলেন।
⸻
সেই স্মৃতি হঠাৎ আবার ফিরে এল।
⸻
সন্ধ্যা নামতে শুরু করল।
⸻
গ্রামের ওপর ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এল।
⸻
আর সেই রাতেই…
রতন আবার স্বপ্ন দেখল।
⸻
এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট।
⸻
আগুন।
⸻
বটগাছ।
⸻
শিকড়।
⸻
লাল আর হলুদ কিছু একটা মাটির মধ্যে চাপা।
⸻
কেউ একজন মন্ত্র পড়ছে।
⸻
কিন্তু শব্দগুলো বোঝা যাচ্ছে না।
⸻
তারপর…
একটা কণ্ঠস্বর।
⸻
এই প্রথম।
⸻
একটা মাত্র শব্দ।
⸻
খুব নিচু স্বরে।
⸻
খুব কাছে থেকে।
⸻
যেন কানের পাশেই।
⸻
“রতন…”
⸻
সে চমকে উঠল।
⸻
স্বপ্নের মধ্যেই।
⸻
কারণ গলাটা তার নিজের না।
⸻
বাবার না।
⸻
মায়ের না।
⸻
কোনো পরিচিত মানুষের না।
⸻
গলাটা ছিল শুকনো।
⸻
পুরোনো।
⸻
যেন বহু বছর ধরে কেউ কথা বলেনি।
⸻
তারপর অন্ধকার।
⸻
সম্পূর্ণ অন্ধকার।
⸻
রতনের ঘুম ভাঙল।
⸻
সে হাঁপাচ্ছিল।
⸻
ঘর অন্ধকার।
⸻
জানলার ফাঁক দিয়ে সামান্য চাঁদের আলো ঢুকছে।
⸻
রমাপদ আর প্রতিমা ঘুমিয়ে।
⸻
সব ঠিক।
⸻
সব স্বাভাবিক।
⸻
তবু তার মনে হচ্ছিল…
ঘরে আরও একজন আছে।
⸻
ঠিক বিছানার পায়ের দিকে।
⸻
অন্ধকারে।
⸻
দাঁড়িয়ে।
⸻
সে তাকিয়ে রইল।
⸻
কিছু দেখা গেল না।
⸻
তবু অনুভূতিটা গেল না।
⸻
অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে আবার শুয়ে পড়ল।
⸻
সকালে উঠে সে রাতের বেশিরভাগ কথাই ভুলে যাবে।
⸻
কিন্তু একটা জিনিস ভুলবে না।
⸻
ঘুম ভাঙার ঠিক আগে…
সে যেন কারও ফিসফিসানি শুনেছিল।
⸻
খুব আস্তে।
⸻
খুব ধীরে।
⸻
“এখন আর কেউ নেই…”
⸻
আর বহু দূরে…
কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বটগাছটার চারপাশে, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা পুরোনো লাল-হলুদ বন্ধনের কোথাও যেন অদৃশ্য একটা টান আরও একটু শক্ত হয়ে উঠল।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)