19-06-2026, 01:35 AM
অধ্যায় ২২ : শেষ সতর্কবার্তা
সারা রাত হরিপদ মাস্টারের চোখে ঘুম এল না।
পুরোনো খাতাটা তার সামনে খোলা।
হারিকেনের হলদে আলোয় পাতাগুলো আরও পুরোনো লাগছে।
বাইরে কুয়াশা।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
আর তার বুকের ভেতর অজানা এক আশঙ্কা।
⸻
দাদু আরও একটা কথা বলেছিলেন।
অনেক বছর আগে।
যেটা হরিপদ প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন।
⸻
সেই সময় যখন গ্রামে অশান্তি শুরু হয়েছিল, তখন কাশীপুরেই এসেছিলেন এক সন্ন্যাসী।
গ্রামের লোক নন।
তবে এই মাটির সঙ্গেই তার জন্মসূত্রের সম্পর্ক ছিল।
এখানেই তার পৈতৃক ভিটে।
অনেক বছর আগে সংসার ত্যাগ করেছিলেন।
তারপর দেশ ঘুরে সাধনা।
শেষমেশ কাশীতে আশ্রয়।
⸻
সেই মানুষটাই প্রথম বুঝেছিলেন—
বটগাছের নিচে থাকা লোকটা সাধারণ কেউ নয়।
⸻
আর তিনিই নাকি কাশীতে চিঠি লিখেছিলেন।
একটা না।
অনেকগুলো।
⸻
দাদু বলতেন,
“যারা পরে এসেছিল, তারা নিজেরা খবর পেয়ে আসেনি।
তাদের ডেকে আনা হয়েছিল।”
⸻
সেই সন্ন্যাসীর নাম এখন আর কেউ মনে রাখে না।
⸻
শুধু একটা কথা লোকমুখে রয়ে গেছে।
⸻
তান্ত্রিককে বন্দি করার সময় তিনিও উপস্থিত ছিলেন।
⸻
আর তিনি নাকি বলেছিলেন—
“একে মারা যাবে না।
এ যে শক্তির সঙ্গে খেলেছে, তা মৃত্যুর পরেও শেষ হয় না।”
⸻
সেই সংঘর্ষের কথা কেউ পুরো জানে না।
⸻
শুধু শোনা যায়—
সেদিন রাতভর ঝড় হয়েছিল।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকেছিল।
বটগাছের ডাল ভেঙেছিল।
আর ভোর হওয়ার আগে গণ্ডি সম্পূর্ণ হয়েছিল।
⸻
তার দুদিন পরই সেই সন্ন্যাসী আবার কাশীর উদ্দেশে রওনা দেন।
⸻
তারপর…
কোনো খবর নেই।
⸻
তিনি বেঁচে ছিলেন কি না।
কোথায় গিয়েছিলেন।
কেউ জানে না।
⸻
হরিপদ মাস্টার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
⸻
এত বছর হয়ে গেছে।
হয়তো মানুষটাও আর পৃথিবীতে নেই।
⸻
আর যদি সত্যিই না থাকেন…
তাহলে এখন গ্রামের মানুষকে কে বাঁচাবে?
⸻
ভোর হয়ে এল।
⸻
তিনি আর অপেক্ষা করলেন না।
⸻
আজই রমাপদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
আজই।
⸻
চাদর গায়ে জড়িয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন।
⸻
কুয়াশা তখনও পুরো কাটেনি।
রাস্তার ধারে ঘাসে শিশির।
দূরে কারও উঠোন থেকে ধোঁয়া উঠছে।
⸻
হাঁটতে হাঁটতে তিনি বারবার ভাবছিলেন—
রতনের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
দেরি করা যাবে না।
⸻
তার পা দ্রুত চলছিল।
যতটা দ্রুত তার বয়সে সম্ভব।
⸻
ঠিক তখনই…
তার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
⸻
তিনি থেমে গেলেন।
⸻
এক হাত বুকে।
অন্য হাতে খাতাটা শক্ত করে ধরা।
⸻
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
⸻
তিনি সামনে তাকালেন।
রমাপদদের বাড়ি আর খুব দূরে নয়।
⸻
আর একটু।
⸻
শুধু আর একটু।
⸻
কিন্তু পা আর এগোল না।
⸻
তার চোখের সামনে কুয়াশা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল।
⸻
হঠাৎ…
তার মনে হলো দূরে বটগাছটার ছায়া দেখতে পাচ্ছেন।
অসম্ভব।
এই দূরত্ব থেকে দেখা যাওয়ার কথা নয়।
⸻
তবু যেন দেখলেন।
⸻
আর সেই ছায়ার নিচে…
কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
⸻
একটা লম্বা অবয়ব।
স্থির।
অপেক্ষমাণ।
⸻
হরিপদ মাস্টার কিছু বলতে চাইলেন।
পারলেন না।
⸻
খাতাটা হাত থেকে পড়ে গেল।
⸻
মাটির ওপর।
⸻
শিশির ভেজা ঘাসের মধ্যে।
⸻
আর কয়েক মুহূর্ত পর রাস্তার ধারে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইলেন তিনি।
⸻
সকালে প্রথম তাকে দেখতে পায় এক দুধওয়ালা।
⸻
খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে।
⸻
লোকজন বলে—
“হৃদরোগ।”
“বয়স হয়েছিল।”
“ভাগ্যের লেখা।”
⸻
কেউ কোনো অস্বাভাবিকতা খুঁজে পায় না।
⸻
কিন্তু…
ভেজা মাটিতে পড়ে থাকা খাতার একটা পাতা বাতাসে উল্টে গিয়েছিল।
⸻
সেই পাতার ওপর কাঁপা হাতে লেখা ছিল মাত্র কয়েকটা শব্দ—
“গণ্ডি দুর্বল হলে…
সে পথ খুঁজে পাবে…”
⸻
আর সেই সময়, কাশীপুরের অন্যপ্রান্তে, রতন ঘুম থেকে উঠছিল।
সে জানত না—
গ্রামের একমাত্র মানুষ, যে হয়তো সবটা বুঝতে পেরেছিল, সে আর বেঁচে নেই।
সারা রাত হরিপদ মাস্টারের চোখে ঘুম এল না।
পুরোনো খাতাটা তার সামনে খোলা।
হারিকেনের হলদে আলোয় পাতাগুলো আরও পুরোনো লাগছে।
বাইরে কুয়াশা।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
আর তার বুকের ভেতর অজানা এক আশঙ্কা।
⸻
দাদু আরও একটা কথা বলেছিলেন।
অনেক বছর আগে।
যেটা হরিপদ প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন।
⸻
সেই সময় যখন গ্রামে অশান্তি শুরু হয়েছিল, তখন কাশীপুরেই এসেছিলেন এক সন্ন্যাসী।
গ্রামের লোক নন।
তবে এই মাটির সঙ্গেই তার জন্মসূত্রের সম্পর্ক ছিল।
এখানেই তার পৈতৃক ভিটে।
অনেক বছর আগে সংসার ত্যাগ করেছিলেন।
তারপর দেশ ঘুরে সাধনা।
শেষমেশ কাশীতে আশ্রয়।
⸻
সেই মানুষটাই প্রথম বুঝেছিলেন—
বটগাছের নিচে থাকা লোকটা সাধারণ কেউ নয়।
⸻
আর তিনিই নাকি কাশীতে চিঠি লিখেছিলেন।
একটা না।
অনেকগুলো।
⸻
দাদু বলতেন,
“যারা পরে এসেছিল, তারা নিজেরা খবর পেয়ে আসেনি।
তাদের ডেকে আনা হয়েছিল।”
⸻
সেই সন্ন্যাসীর নাম এখন আর কেউ মনে রাখে না।
⸻
শুধু একটা কথা লোকমুখে রয়ে গেছে।
⸻
তান্ত্রিককে বন্দি করার সময় তিনিও উপস্থিত ছিলেন।
⸻
আর তিনি নাকি বলেছিলেন—
“একে মারা যাবে না।
এ যে শক্তির সঙ্গে খেলেছে, তা মৃত্যুর পরেও শেষ হয় না।”
⸻
সেই সংঘর্ষের কথা কেউ পুরো জানে না।
⸻
শুধু শোনা যায়—
সেদিন রাতভর ঝড় হয়েছিল।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকেছিল।
বটগাছের ডাল ভেঙেছিল।
আর ভোর হওয়ার আগে গণ্ডি সম্পূর্ণ হয়েছিল।
⸻
তার দুদিন পরই সেই সন্ন্যাসী আবার কাশীর উদ্দেশে রওনা দেন।
⸻
তারপর…
কোনো খবর নেই।
⸻
তিনি বেঁচে ছিলেন কি না।
কোথায় গিয়েছিলেন।
কেউ জানে না।
⸻
হরিপদ মাস্টার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
⸻
এত বছর হয়ে গেছে।
হয়তো মানুষটাও আর পৃথিবীতে নেই।
⸻
আর যদি সত্যিই না থাকেন…
তাহলে এখন গ্রামের মানুষকে কে বাঁচাবে?
⸻
ভোর হয়ে এল।
⸻
তিনি আর অপেক্ষা করলেন না।
⸻
আজই রমাপদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
আজই।
⸻
চাদর গায়ে জড়িয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন।
⸻
কুয়াশা তখনও পুরো কাটেনি।
রাস্তার ধারে ঘাসে শিশির।
দূরে কারও উঠোন থেকে ধোঁয়া উঠছে।
⸻
হাঁটতে হাঁটতে তিনি বারবার ভাবছিলেন—
রতনের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
দেরি করা যাবে না।
⸻
তার পা দ্রুত চলছিল।
যতটা দ্রুত তার বয়সে সম্ভব।
⸻
ঠিক তখনই…
তার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
⸻
তিনি থেমে গেলেন।
⸻
এক হাত বুকে।
অন্য হাতে খাতাটা শক্ত করে ধরা।
⸻
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
⸻
তিনি সামনে তাকালেন।
রমাপদদের বাড়ি আর খুব দূরে নয়।
⸻
আর একটু।
⸻
শুধু আর একটু।
⸻
কিন্তু পা আর এগোল না।
⸻
তার চোখের সামনে কুয়াশা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল।
⸻
হঠাৎ…
তার মনে হলো দূরে বটগাছটার ছায়া দেখতে পাচ্ছেন।
অসম্ভব।
এই দূরত্ব থেকে দেখা যাওয়ার কথা নয়।
⸻
তবু যেন দেখলেন।
⸻
আর সেই ছায়ার নিচে…
কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
⸻
একটা লম্বা অবয়ব।
স্থির।
অপেক্ষমাণ।
⸻
হরিপদ মাস্টার কিছু বলতে চাইলেন।
পারলেন না।
⸻
খাতাটা হাত থেকে পড়ে গেল।
⸻
মাটির ওপর।
⸻
শিশির ভেজা ঘাসের মধ্যে।
⸻
আর কয়েক মুহূর্ত পর রাস্তার ধারে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইলেন তিনি।
⸻
সকালে প্রথম তাকে দেখতে পায় এক দুধওয়ালা।
⸻
খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে।
⸻
লোকজন বলে—
“হৃদরোগ।”
“বয়স হয়েছিল।”
“ভাগ্যের লেখা।”
⸻
কেউ কোনো অস্বাভাবিকতা খুঁজে পায় না।
⸻
কিন্তু…
ভেজা মাটিতে পড়ে থাকা খাতার একটা পাতা বাতাসে উল্টে গিয়েছিল।
⸻
সেই পাতার ওপর কাঁপা হাতে লেখা ছিল মাত্র কয়েকটা শব্দ—
“গণ্ডি দুর্বল হলে…
সে পথ খুঁজে পাবে…”
⸻
আর সেই সময়, কাশীপুরের অন্যপ্রান্তে, রতন ঘুম থেকে উঠছিল।
সে জানত না—
গ্রামের একমাত্র মানুষ, যে হয়তো সবটা বুঝতে পেরেছিল, সে আর বেঁচে নেই।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)