19-06-2026, 01:34 AM
ফ্ল্যাশব্যাক : হরিপদ মাস্টারের দাদুর গল্প
সেই রাতেও ঘুম আসছিল না হরিপদ মাস্টারের।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনি জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
কুয়াশা।
নিঃশব্দ অন্ধকার।
আর দূরে কোথাও কুকুরের ডাক।
⸻
তারপর হঠাৎ মনে পড়ে গেল বহু বছরের পুরোনো একটা কথা।
একটা গল্প।
না…
গল্প নয়।
তার দাদুর মুখে শোনা একটা ঘটনা।
⸻
তখন হরিপদ ছোট।
দশ-এগারো বছরের বেশি নয়।
শীতের রাতে দাদুর গা ঘেঁষে বসে থাকত।
আর দাদু মাঝে মাঝে পুরোনো দিনের কথা বলতেন।
⸻
সেইসব গল্পের মধ্যে একটা গল্প ছিল।
যে গল্পের শেষ পর্যন্ত তিনি কোনোদিন শুনতে পারেননি।
⸻
দাদু বলতেন—
“তুই যে বটগাছটা দেখিস না মাঠের ওদিকটায়…
ওটা সবসময় এমন ছিল না।”
⸻
তখনও কাশীপুর এত বড় হয়নি।
বাড়িঘর কম।
জঙ্গল বেশি।
⸻
একদিন এক লোক এল।
কোথা থেকে এসেছে কেউ জানে না।
⸻
লম্বা মানুষ।
শুকনো চেহারা।
জট বাঁধা চুল।
কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে।
চোখ দুটো অদ্ভুত।
কখনও স্থির।
কখনও অস্বাভাবিক উজ্জ্বল।
⸻
লোকটা নিজেকে সাধক বলত।
⸻
প্রথমদিকে গ্রামের মানুষ তাকে সম্মানই করত।
⸻
কেউ দুধ দিত।
কেউ ভাত।
কেউ শীতের রাতে চাদর।
⸻
লোকটা সবসময় হেসে কথা বলত।
ধীরে ধীরে।
ভদ্রভাবে।
⸻
আর অদ্ভুতভাবে গ্রামের মানুষের কিছু কিছু ব্যাপার আগে থেকেই বলে দিতে পারত।
⸻
কারও গরু হারাবে।
কারও ফসল নষ্ট হবে।
কারও বাড়িতে অসুখ আসবে।
⸻
সব না।
তবু কয়েকটা এত নিখুঁতভাবে মিলেছিল যে গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে গিয়েছিল।
⸻
তারপর…
কিছু বদলাতে শুরু করল।
⸻
ধীরে।
খুব ধীরে।
⸻
কয়েকজন মহিলা তার নাম শুনলে মুখ গম্ভীর করে ফেলতেন।
⸻
কেউ কিছু বলতেন না।
কিন্তু অস্বস্তি ছিল।
⸻
কিছু একটা ঠিক ছিল না।
⸻
একদিন গ্রামের একজন বয়স্ক মহিলা বলেছিলেন—
“লোকটার চোখ ভালো না।”
⸻
কেউ গুরুত্ব দেয়নি।
⸻
তারপর আরও কয়েক মাস কেটে যায়।
⸻
হঠাৎ একদিন…
গ্রামের এক বিবাহিতা মহিলা নিখোঁজ হয়ে যান।
⸻
সারারাত খোঁজাখুঁজি।
⸻
ভোরের দিকে তাকে পাওয়া যায়।
গ্রামের বাইরে।
একটা ঝোপের কাছে।
⸻
তিনি তখনও কাঁপছিলেন।
⸻
চোখে আতঙ্ক।
⸻
লোকজন জিজ্ঞেস করেছিল—
— কী হয়েছিল?
⸻
তিনি উত্তর দেননি।
⸻
শুধু একবার বলেছিলেন—
“ওর চোখের দিকে তাকিয়ো না…”
⸻
তারপর আর কিছু বলেননি।
⸻
ঘটনার পরে পুরো গ্রাম অস্থির হয়ে উঠেছিল।
⸻
কিন্তু আসল ঘটনা ঘটল কয়েক সপ্তাহ পরে।
⸻
এক শীতের রাতে।
⸻
কুয়াশা নেমেছে।
⸻
বেশিরভাগ মানুষ ঘুমিয়ে।
⸻
ঠিক তখন গ্রামের কয়েকজন দূরে আগুনের আলো দেখতে পেল।
⸻
বটগাছের দিক থেকে।
⸻
প্রথমে ভাবল কেউ হয়তো আগুন জ্বালিয়েছে।
⸻
কিন্তু আলোটা স্বাভাবিক ছিল না।
⸻
স্থির না।
⸻
নাচছিল।
⸻
আর তার সঙ্গে ভেসে আসছিল মন্ত্রের মতো শব্দ।
⸻
নিচু।
⸻
অস্পষ্ট।
⸻
শুনলে শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।
⸻
গ্রামের কয়েকজন সাহসী লোক এগিয়ে গেল।
⸻
তারা ভেবেছিল চোর।
অথবা ডাকাত।
⸻
কিন্তু কাছে গিয়ে…
তারা যা দেখেছিল…
সেটা নিয়ে পরে কেউ স্পষ্ট করে কথা বলতে চাইত না।
⸻
শুধু দাদু একবার বলেছিলেন—
“সেদিন ওর আসল মুখ বেরিয়ে এসেছিল।”
⸻
ছোট হরিপদ জিজ্ঞেস করেছিল—
— কী দেখেছিলে?
⸻
দাদু অনেকক্ষণ চুপ ছিলেন।
⸻
তারপর বলেছিলেন—
“সব জানতে নেই।”
⸻
সেই ঘটনার পর আর কেউ লোকটাকে সাধু বলত না।
⸻
তার নামও মানুষ মুখে আনত না।
⸻
খবর ছড়িয়ে পড়ল আশপাশের গ্রামে।
⸻
তারপর আরও দূরে।
⸻
অবশেষে কয়েক মাস পরে…
কাশী থেকে কয়েকজন তপস্বী এলেন।
⸻
সাধারণ মানুষ না।
⸻
বৃদ্ধ।
গম্ভীর।
⸻
তাদের একজন বটগাছটা দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন।
⸻
তারপর বলেছিলেন—
“এখানে বহুদিন ধরে অশুভ সাধনা হয়েছে।”
⸻
আরেকজন মাটির দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন—
“যা জেগেছে, তাকে ধ্বংস করা যাবে না।
কেবল বেঁধে রাখা যাবে।”
⸻
তারপর শুরু হয়েছিল কয়েকদিনের এক অদ্ভুত আচার।
⸻
বটগাছের চারপাশে মাটি খোঁড়া হয়েছিল।
⸻
মন্ত্রপাঠ হয়েছিল।
⸻
লাল আর হলুদ সুতো টানা হয়েছিল।
⸻
খুঁটি পোঁতা হয়েছিল।
⸻
মাটির নিচে কিছু পুঁতে দেওয়া হয়েছিল।
⸻
সেই সময় গ্রামের কাউকে কাছে যেতে দেওয়া হয়নি।
⸻
শেষদিন সেই বৃদ্ধ তপস্বী গ্রামের মানুষদের বলেছিলেন—
“এই গণ্ডির ভেতরে কেউ যাবে না।”
⸻
— কেন?
লোকজন জিজ্ঞেস করেছিল।
⸻
বৃদ্ধ মানুষটা উত্তর দিয়েছিলেন—
“যে বন্দি আছে…
সে মুক্তি চাইবে।”
⸻
— আর যদি কেউ যায়?
⸻
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন।
⸻
তারপর বলেছিলেন—
“তাহলে সে হয়তো পথ খুঁজে পাবে।”
⸻
এতটুকুই দাদু বলেছিলেন।
⸻
এরপর যতবার হরিপদ প্রশ্ন করেছে—
ততবারই দাদু চুপ করে গেছেন।
⸻
আর এখন…
এত বছর পরে…
অন্ধকার ঘরে বসে হরিপদ মাস্টারের মনে হচ্ছিল—
রতন কি সেই পথটাই খুলে ফেলেছে?
⸻
জানলার বাইরে কুয়াশা আরও ঘন হচ্ছিল।
⸻
আর বহু দূরে…
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশাল বটগাছটা যেন নিঃশব্দে অপেক্ষা করছিল।
সেই রাতেও ঘুম আসছিল না হরিপদ মাস্টারের।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনি জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
কুয়াশা।
নিঃশব্দ অন্ধকার।
আর দূরে কোথাও কুকুরের ডাক।
⸻
তারপর হঠাৎ মনে পড়ে গেল বহু বছরের পুরোনো একটা কথা।
একটা গল্প।
না…
গল্প নয়।
তার দাদুর মুখে শোনা একটা ঘটনা।
⸻
তখন হরিপদ ছোট।
দশ-এগারো বছরের বেশি নয়।
শীতের রাতে দাদুর গা ঘেঁষে বসে থাকত।
আর দাদু মাঝে মাঝে পুরোনো দিনের কথা বলতেন।
⸻
সেইসব গল্পের মধ্যে একটা গল্প ছিল।
যে গল্পের শেষ পর্যন্ত তিনি কোনোদিন শুনতে পারেননি।
⸻
দাদু বলতেন—
“তুই যে বটগাছটা দেখিস না মাঠের ওদিকটায়…
ওটা সবসময় এমন ছিল না।”
⸻
তখনও কাশীপুর এত বড় হয়নি।
বাড়িঘর কম।
জঙ্গল বেশি।
⸻
একদিন এক লোক এল।
কোথা থেকে এসেছে কেউ জানে না।
⸻
লম্বা মানুষ।
শুকনো চেহারা।
জট বাঁধা চুল।
কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে।
চোখ দুটো অদ্ভুত।
কখনও স্থির।
কখনও অস্বাভাবিক উজ্জ্বল।
⸻
লোকটা নিজেকে সাধক বলত।
⸻
প্রথমদিকে গ্রামের মানুষ তাকে সম্মানই করত।
⸻
কেউ দুধ দিত।
কেউ ভাত।
কেউ শীতের রাতে চাদর।
⸻
লোকটা সবসময় হেসে কথা বলত।
ধীরে ধীরে।
ভদ্রভাবে।
⸻
আর অদ্ভুতভাবে গ্রামের মানুষের কিছু কিছু ব্যাপার আগে থেকেই বলে দিতে পারত।
⸻
কারও গরু হারাবে।
কারও ফসল নষ্ট হবে।
কারও বাড়িতে অসুখ আসবে।
⸻
সব না।
তবু কয়েকটা এত নিখুঁতভাবে মিলেছিল যে গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে গিয়েছিল।
⸻
তারপর…
কিছু বদলাতে শুরু করল।
⸻
ধীরে।
খুব ধীরে।
⸻
কয়েকজন মহিলা তার নাম শুনলে মুখ গম্ভীর করে ফেলতেন।
⸻
কেউ কিছু বলতেন না।
কিন্তু অস্বস্তি ছিল।
⸻
কিছু একটা ঠিক ছিল না।
⸻
একদিন গ্রামের একজন বয়স্ক মহিলা বলেছিলেন—
“লোকটার চোখ ভালো না।”
⸻
কেউ গুরুত্ব দেয়নি।
⸻
তারপর আরও কয়েক মাস কেটে যায়।
⸻
হঠাৎ একদিন…
গ্রামের এক বিবাহিতা মহিলা নিখোঁজ হয়ে যান।
⸻
সারারাত খোঁজাখুঁজি।
⸻
ভোরের দিকে তাকে পাওয়া যায়।
গ্রামের বাইরে।
একটা ঝোপের কাছে।
⸻
তিনি তখনও কাঁপছিলেন।
⸻
চোখে আতঙ্ক।
⸻
লোকজন জিজ্ঞেস করেছিল—
— কী হয়েছিল?
⸻
তিনি উত্তর দেননি।
⸻
শুধু একবার বলেছিলেন—
“ওর চোখের দিকে তাকিয়ো না…”
⸻
তারপর আর কিছু বলেননি।
⸻
ঘটনার পরে পুরো গ্রাম অস্থির হয়ে উঠেছিল।
⸻
কিন্তু আসল ঘটনা ঘটল কয়েক সপ্তাহ পরে।
⸻
এক শীতের রাতে।
⸻
কুয়াশা নেমেছে।
⸻
বেশিরভাগ মানুষ ঘুমিয়ে।
⸻
ঠিক তখন গ্রামের কয়েকজন দূরে আগুনের আলো দেখতে পেল।
⸻
বটগাছের দিক থেকে।
⸻
প্রথমে ভাবল কেউ হয়তো আগুন জ্বালিয়েছে।
⸻
কিন্তু আলোটা স্বাভাবিক ছিল না।
⸻
স্থির না।
⸻
নাচছিল।
⸻
আর তার সঙ্গে ভেসে আসছিল মন্ত্রের মতো শব্দ।
⸻
নিচু।
⸻
অস্পষ্ট।
⸻
শুনলে শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।
⸻
গ্রামের কয়েকজন সাহসী লোক এগিয়ে গেল।
⸻
তারা ভেবেছিল চোর।
অথবা ডাকাত।
⸻
কিন্তু কাছে গিয়ে…
তারা যা দেখেছিল…
সেটা নিয়ে পরে কেউ স্পষ্ট করে কথা বলতে চাইত না।
⸻
শুধু দাদু একবার বলেছিলেন—
“সেদিন ওর আসল মুখ বেরিয়ে এসেছিল।”
⸻
ছোট হরিপদ জিজ্ঞেস করেছিল—
— কী দেখেছিলে?
⸻
দাদু অনেকক্ষণ চুপ ছিলেন।
⸻
তারপর বলেছিলেন—
“সব জানতে নেই।”
⸻
সেই ঘটনার পর আর কেউ লোকটাকে সাধু বলত না।
⸻
তার নামও মানুষ মুখে আনত না।
⸻
খবর ছড়িয়ে পড়ল আশপাশের গ্রামে।
⸻
তারপর আরও দূরে।
⸻
অবশেষে কয়েক মাস পরে…
কাশী থেকে কয়েকজন তপস্বী এলেন।
⸻
সাধারণ মানুষ না।
⸻
বৃদ্ধ।
গম্ভীর।
⸻
তাদের একজন বটগাছটা দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন।
⸻
তারপর বলেছিলেন—
“এখানে বহুদিন ধরে অশুভ সাধনা হয়েছে।”
⸻
আরেকজন মাটির দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন—
“যা জেগেছে, তাকে ধ্বংস করা যাবে না।
কেবল বেঁধে রাখা যাবে।”
⸻
তারপর শুরু হয়েছিল কয়েকদিনের এক অদ্ভুত আচার।
⸻
বটগাছের চারপাশে মাটি খোঁড়া হয়েছিল।
⸻
মন্ত্রপাঠ হয়েছিল।
⸻
লাল আর হলুদ সুতো টানা হয়েছিল।
⸻
খুঁটি পোঁতা হয়েছিল।
⸻
মাটির নিচে কিছু পুঁতে দেওয়া হয়েছিল।
⸻
সেই সময় গ্রামের কাউকে কাছে যেতে দেওয়া হয়নি।
⸻
শেষদিন সেই বৃদ্ধ তপস্বী গ্রামের মানুষদের বলেছিলেন—
“এই গণ্ডির ভেতরে কেউ যাবে না।”
⸻
— কেন?
লোকজন জিজ্ঞেস করেছিল।
⸻
বৃদ্ধ মানুষটা উত্তর দিয়েছিলেন—
“যে বন্দি আছে…
সে মুক্তি চাইবে।”
⸻
— আর যদি কেউ যায়?
⸻
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন।
⸻
তারপর বলেছিলেন—
“তাহলে সে হয়তো পথ খুঁজে পাবে।”
⸻
এতটুকুই দাদু বলেছিলেন।
⸻
এরপর যতবার হরিপদ প্রশ্ন করেছে—
ততবারই দাদু চুপ করে গেছেন।
⸻
আর এখন…
এত বছর পরে…
অন্ধকার ঘরে বসে হরিপদ মাস্টারের মনে হচ্ছিল—
রতন কি সেই পথটাই খুলে ফেলেছে?
⸻
জানলার বাইরে কুয়াশা আরও ঘন হচ্ছিল।
⸻
আর বহু দূরে…
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশাল বটগাছটা যেন নিঃশব্দে অপেক্ষা করছিল।



![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)