19-06-2026, 01:31 AM
অধ্যায় ২১ : যে কথায় হাত কেঁপে উঠল
সেদিন সন্ধ্যায় কাশীপুরে কুয়াশা একটু আগেই নেমেছিল।
শীত যত বাড়ছে, দিন তত ছোট হয়ে আসছে।
সূর্য ডোবার পর যেন পুরো গ্রামটাকে ধীরে ধীরে একটা সাদা, নিঃশব্দ চাদর ঢেকে ফেলছে।
⸻
হরিপদ মাস্টার নিজের উঠোনে বসেছিলেন।
পুরোনো কাঠের চেয়ারে।
গায়ে ধূসর চাদর।
হাতে পিতলের গ্লাস।
চায়ের ধোঁয়া ধীরে ধীরে উঠছে।
⸻
বয়স হয়েছে।
আগের মতো হাঁটতে পারেন না।
তবু গ্রামের লোকজন এখনও তাকে “মাস্টারমশাই” বলেই ডাকে।
সম্মান করে।
পরামর্শ নেয়।
কোনো ঝামেলা হলে ডেকে আনে।
⸻
তার নাতি কার্তিক তখন উঠোনেই বসে ছিল।
কলেজের খাতা খুলে।
যদিও পড়ার চেয়ে গল্পেই তার বেশি মন।
⸻
— দাদু?
— হুঁ?
— একটা কথা বলি?
— বল।
⸻
কার্তিক কিছুক্ষণ ইতস্তত করল।
তারপর বলল,
— সেদিন যে জায়গার কথা বলছিলে…
হরিপদ মাস্টারের চোখ ধীরে ধীরে উঠল।
⸻
— কোন জায়গা?
— ওই মাঠের পরের দিকটা…
— হুঁ।
⸻
— রতন গিয়েছিল।
⸻
চায়ের গ্লাসটা হরিপদ মাস্টারের হাতে থেমে গেল।
⸻
এক মুহূর্ত।
দুই মুহূর্ত।
⸻
— কী বললি?
গলার স্বর বদলে গেছে।
কার্তিক নিজেও বুঝতে পারল।
⸻
— রতন গিয়েছিল।
— কোথায়?
— ওইদিকে।
⸻
হরিপদ মাস্টারের আঙুল শক্ত হয়ে উঠল।
পিতলের গ্লাসে টুং করে একটা শব্দ হলো।
⸻
— কে বলল?
— আমি নিজেই দেখেছি।
— কবে?
— কয়েকদিন আগে।
⸻
হরিপদ মাস্টারের মুখের রং যেন একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
⸻
— একা?
— হ্যাঁ।
— সন্ধ্যার আগে?
⸻
কার্তিক থেমে গেল।
⸻
— না…
— তাহলে?
— সূর্য প্রায় ডুবে গিয়েছিল।
⸻
হরিপদ মাস্টারের হাত কেঁপে উঠল।
সত্যিই কেঁপে উঠল।
এতটা যে গ্লাসের চা তার আঙুলে পড়ে গেল।
⸻
— দাদু!
কার্তিক উঠে দাঁড়াল।
— কী হলো?
⸻
হরিপদ মাস্টার শুনলেনই না।
⸻
তার চোখ যেন কোথাও দূরে চলে গেছে।
অনেক দূরে।
অনেক বছর আগে।
⸻
কুয়াশা।
আগুন।
মন্ত্র।
কালো ধোঁয়া।
আর সেই মানুষটা।
⸻
হঠাৎ তার বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা শীতলতা ছড়িয়ে পড়ল।
⸻
— না…
খুব আস্তে বললেন তিনি।
⸻
— দাদু?
⸻
— না…
⸻
— কী হয়েছে?
⸻
হরিপদ মাস্টার শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নিলেন।
⸻
তারপর প্রায় নিজের সঙ্গেই কথা বলার মতো করে বললেন—
“তাহলে কি…
আবার শুরু হবে সেই…”
⸻
কথাটা শেষ করলেন না।
পারলেন না।
⸻
ঠিক তখনই ভেতর থেকে কার্তিকের ঠাকুমা ডাকলেন—
— কার্তিক! খেতে আয়!
⸻
কার্তিক উঠে দাঁড়াল।
⸻
— আসছি!
⸻
তারপর দাদুর দিকে তাকাল।
— তুমি আসবে?
⸻
হরিপদ মাস্টার কোনো উত্তর দিলেন না।
⸻
তিনি তখনও একই জায়গায় তাকিয়ে।
একইভাবে।
⸻
কার্তিক ভেতরে চলে গেল।
⸻
উঠোনে একা বসে রইলেন হরিপদ মাস্টার।
⸻
কুয়াশা আরও ঘন হচ্ছে।
⸻
দূরে একটা পেঁচা ডেকে উঠল।
⸻
হঠাৎ মনে হলো চারপাশের শব্দগুলো যেন অনেক দূরে সরে গেছে।
⸻
তার বুকের ভেতর ধুকপুক করছে।
⸻
কারণ তিনি জানেন।
অথবা অন্তত মনে করেন তিনি জানেন।
⸻
সেই জায়গা শুধু একটা গাছ নয়।
কখনও ছিল না।
⸻
আর যে মানুষটার কথা এত বছর ধরে কেউ উচ্চারণ করে না…
তার নামও সময় পুরো মুছে ফেলতে পারেনি।
⸻
সেদিন রাতে বহু বছর পর তিনি আবার পুরোনো কাঠের বাক্সটা খুললেন।
⸻
ভেতর থেকে বের করলেন একটা পুরোনো খাতা।
⸻
পাতাগুলো হলুদ।
ধারে ধারে ছিঁড়ে গেছে।
⸻
কাঁপা হাতে তিনি পাতা উল্টাতে লাগলেন।
⸻
একটা জায়গায় এসে থামলেন।
⸻
তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
⸻
সেখানে কয়েকটা নাম লেখা।
কিছু তারিখ।
আর কিছু ঘটনা।
⸻
সবচেয়ে নিচে…
একটা নাম।
⸻
তিনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
⸻
তারপর খাতাটা বন্ধ করলেন।
⸻
আজ আর অপেক্ষা করা যাবে না।
⸻
কাল সকালেই রমাপদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
সব বলতে হবে।
⸻
হয়তো এতদিন বলা উচিত ছিল।
⸻
হয়তো অনেক আগেই।
⸻
বিছানায় শুয়েও সারা রাত ঘুম এল না।
⸻
বারবার মনে হচ্ছিল—
সময় ফুরিয়ে আসছে।
⸻
আর সেই একই রাতে…
রতন ঘুমের মধ্যে আবার স্বপ্ন দেখল।
⸻
এইবার আগুনটা আরও কাছে।
⸻
ধোঁয়াটা আরও ঘন।
⸻
আর অন্ধকারের মধ্যে বসে থাকা সেই ছায়ামূর্তিটা…
আগের চেয়ে স্পষ্ট।
⸻
মুখ এখনও দেখা যায় না।
⸻
কিন্তু এবার…
সে যেন ধীরে ধীরে মাথা তুলছে।
⸻
যেন বহুদিনের অপেক্ষার পর…
অবশেষে কেউ তার ডাক শুনেছে।
⸻
রতনের ঘুম ভাঙল হঠাৎ।
⸻
ঘর অন্ধকার।
⸻
চারপাশ নিস্তব্ধ।
⸻
কিন্তু কেন জানি তার মনে হলো—
সে ঘরে একা নেই।
⸻
একদম একা নয়।
⸻
সে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে জানলার দিকে তাকাল।
⸻
কিছুই নেই।
⸻
তবু…
তার বুকের ভেতর বরফের মতো ঠান্ডা একটা অনুভূতি জমে রইল।
⸻
আর দূরে কোথাও, কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশাল গাছটার শিকড়ের ফাঁকে, রাতের অন্ধকার যেন আগের চেয়ে একটু বেশি গভীর হয়ে উঠল।
সেদিন সন্ধ্যায় কাশীপুরে কুয়াশা একটু আগেই নেমেছিল।
শীত যত বাড়ছে, দিন তত ছোট হয়ে আসছে।
সূর্য ডোবার পর যেন পুরো গ্রামটাকে ধীরে ধীরে একটা সাদা, নিঃশব্দ চাদর ঢেকে ফেলছে।
⸻
হরিপদ মাস্টার নিজের উঠোনে বসেছিলেন।
পুরোনো কাঠের চেয়ারে।
গায়ে ধূসর চাদর।
হাতে পিতলের গ্লাস।
চায়ের ধোঁয়া ধীরে ধীরে উঠছে।
⸻
বয়স হয়েছে।
আগের মতো হাঁটতে পারেন না।
তবু গ্রামের লোকজন এখনও তাকে “মাস্টারমশাই” বলেই ডাকে।
সম্মান করে।
পরামর্শ নেয়।
কোনো ঝামেলা হলে ডেকে আনে।
⸻
তার নাতি কার্তিক তখন উঠোনেই বসে ছিল।
কলেজের খাতা খুলে।
যদিও পড়ার চেয়ে গল্পেই তার বেশি মন।
⸻
— দাদু?
— হুঁ?
— একটা কথা বলি?
— বল।
⸻
কার্তিক কিছুক্ষণ ইতস্তত করল।
তারপর বলল,
— সেদিন যে জায়গার কথা বলছিলে…
হরিপদ মাস্টারের চোখ ধীরে ধীরে উঠল।
⸻
— কোন জায়গা?
— ওই মাঠের পরের দিকটা…
— হুঁ।
⸻
— রতন গিয়েছিল।
⸻
চায়ের গ্লাসটা হরিপদ মাস্টারের হাতে থেমে গেল।
⸻
এক মুহূর্ত।
দুই মুহূর্ত।
⸻
— কী বললি?
গলার স্বর বদলে গেছে।
কার্তিক নিজেও বুঝতে পারল।
⸻
— রতন গিয়েছিল।
— কোথায়?
— ওইদিকে।
⸻
হরিপদ মাস্টারের আঙুল শক্ত হয়ে উঠল।
পিতলের গ্লাসে টুং করে একটা শব্দ হলো।
⸻
— কে বলল?
— আমি নিজেই দেখেছি।
— কবে?
— কয়েকদিন আগে।
⸻
হরিপদ মাস্টারের মুখের রং যেন একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
⸻
— একা?
— হ্যাঁ।
— সন্ধ্যার আগে?
⸻
কার্তিক থেমে গেল।
⸻
— না…
— তাহলে?
— সূর্য প্রায় ডুবে গিয়েছিল।
⸻
হরিপদ মাস্টারের হাত কেঁপে উঠল।
সত্যিই কেঁপে উঠল।
এতটা যে গ্লাসের চা তার আঙুলে পড়ে গেল।
⸻
— দাদু!
কার্তিক উঠে দাঁড়াল।
— কী হলো?
⸻
হরিপদ মাস্টার শুনলেনই না।
⸻
তার চোখ যেন কোথাও দূরে চলে গেছে।
অনেক দূরে।
অনেক বছর আগে।
⸻
কুয়াশা।
আগুন।
মন্ত্র।
কালো ধোঁয়া।
আর সেই মানুষটা।
⸻
হঠাৎ তার বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা শীতলতা ছড়িয়ে পড়ল।
⸻
— না…
খুব আস্তে বললেন তিনি।
⸻
— দাদু?
⸻
— না…
⸻
— কী হয়েছে?
⸻
হরিপদ মাস্টার শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নিলেন।
⸻
তারপর প্রায় নিজের সঙ্গেই কথা বলার মতো করে বললেন—
“তাহলে কি…
আবার শুরু হবে সেই…”
⸻
কথাটা শেষ করলেন না।
পারলেন না।
⸻
ঠিক তখনই ভেতর থেকে কার্তিকের ঠাকুমা ডাকলেন—
— কার্তিক! খেতে আয়!
⸻
কার্তিক উঠে দাঁড়াল।
⸻
— আসছি!
⸻
তারপর দাদুর দিকে তাকাল।
— তুমি আসবে?
⸻
হরিপদ মাস্টার কোনো উত্তর দিলেন না।
⸻
তিনি তখনও একই জায়গায় তাকিয়ে।
একইভাবে।
⸻
কার্তিক ভেতরে চলে গেল।
⸻
উঠোনে একা বসে রইলেন হরিপদ মাস্টার।
⸻
কুয়াশা আরও ঘন হচ্ছে।
⸻
দূরে একটা পেঁচা ডেকে উঠল।
⸻
হঠাৎ মনে হলো চারপাশের শব্দগুলো যেন অনেক দূরে সরে গেছে।
⸻
তার বুকের ভেতর ধুকপুক করছে।
⸻
কারণ তিনি জানেন।
অথবা অন্তত মনে করেন তিনি জানেন।
⸻
সেই জায়গা শুধু একটা গাছ নয়।
কখনও ছিল না।
⸻
আর যে মানুষটার কথা এত বছর ধরে কেউ উচ্চারণ করে না…
তার নামও সময় পুরো মুছে ফেলতে পারেনি।
⸻
সেদিন রাতে বহু বছর পর তিনি আবার পুরোনো কাঠের বাক্সটা খুললেন।
⸻
ভেতর থেকে বের করলেন একটা পুরোনো খাতা।
⸻
পাতাগুলো হলুদ।
ধারে ধারে ছিঁড়ে গেছে।
⸻
কাঁপা হাতে তিনি পাতা উল্টাতে লাগলেন।
⸻
একটা জায়গায় এসে থামলেন।
⸻
তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
⸻
সেখানে কয়েকটা নাম লেখা।
কিছু তারিখ।
আর কিছু ঘটনা।
⸻
সবচেয়ে নিচে…
একটা নাম।
⸻
তিনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
⸻
তারপর খাতাটা বন্ধ করলেন।
⸻
আজ আর অপেক্ষা করা যাবে না।
⸻
কাল সকালেই রমাপদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
সব বলতে হবে।
⸻
হয়তো এতদিন বলা উচিত ছিল।
⸻
হয়তো অনেক আগেই।
⸻
বিছানায় শুয়েও সারা রাত ঘুম এল না।
⸻
বারবার মনে হচ্ছিল—
সময় ফুরিয়ে আসছে।
⸻
আর সেই একই রাতে…
রতন ঘুমের মধ্যে আবার স্বপ্ন দেখল।
⸻
এইবার আগুনটা আরও কাছে।
⸻
ধোঁয়াটা আরও ঘন।
⸻
আর অন্ধকারের মধ্যে বসে থাকা সেই ছায়ামূর্তিটা…
আগের চেয়ে স্পষ্ট।
⸻
মুখ এখনও দেখা যায় না।
⸻
কিন্তু এবার…
সে যেন ধীরে ধীরে মাথা তুলছে।
⸻
যেন বহুদিনের অপেক্ষার পর…
অবশেষে কেউ তার ডাক শুনেছে।
⸻
রতনের ঘুম ভাঙল হঠাৎ।
⸻
ঘর অন্ধকার।
⸻
চারপাশ নিস্তব্ধ।
⸻
কিন্তু কেন জানি তার মনে হলো—
সে ঘরে একা নেই।
⸻
একদম একা নয়।
⸻
সে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে জানলার দিকে তাকাল।
⸻
কিছুই নেই।
⸻
তবু…
তার বুকের ভেতর বরফের মতো ঠান্ডা একটা অনুভূতি জমে রইল।
⸻
আর দূরে কোথাও, কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশাল গাছটার শিকড়ের ফাঁকে, রাতের অন্ধকার যেন আগের চেয়ে একটু বেশি গভীর হয়ে উঠল।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)