19-06-2026, 01:30 AM
অধ্যায় ২০ : নামহীন অস্বস্তি
পরদিন ভোরে কাশীপুরের ওপর ঘন কুয়াশা নেমেছিল।
পুকুরের ওপারটা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না।
তালগাছের মাথাগুলো সাদা আবরণের ভেতর ভাসছে বলে মনে হচ্ছিল।
দূরে কারও গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, কিন্তু মানুষটাকে দেখা যাচ্ছে না।
শীতের গ্রামে এমন সকাল নতুন কিছু নয়।
তবু সেদিন রতনের কাছে সবকিছু একটু আলাদা লাগছিল।
⸻
ঘুম থেকে উঠে সে কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারেনি সে কোথায় আছে।
এটা নতুন।
আগে কখনও হয়নি।
চোখ খুলে সে সিলিংয়ের বাঁশগুলো দেখছিল।
দেয়ালের ক্যালেন্ডার।
জানলার কাঠ।
সবই চেনা।
তবু মনে হচ্ছিল, যেন অনেকদিন পরে এই ঘরে ফিরেছে।
⸻
— রতন!
প্রতিমার ডাক।
— চা ঠান্ডা হয়ে যাবে।
ডাকটা শুনে যেন হুঁশ ফিরল।
⸻
রান্নাঘরে ঢুকে সে দেখল প্রতিমা ভাঁড়ে চা ঢালছেন।
চুলোর আগুনে তার মুখে লালচে আভা।
কপালে সামান্য ঘাম।
সকালের এত কাজের মধ্যেও তিনি একসঙ্গে তিন-চারটা জিনিস সামলাচ্ছেন।
রতন চুপ করে তাকিয়ে রইল।
⸻
প্রতিমা হেসে বললেন,
— কী দেখছিস?
— কিছু না।
— আবার “কিছু না”?
⸻
রতন উত্তর দিল না।
কারণ সে নিজেও জানত না।
মায়ের মুখটা তার কাছে চেনা।
খুব চেনা।
তবু আজ সকালে কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল—
সে যেন এই মুখ আগে কোথাও দেখেছে।
অন্য কোনো সময়ে।
অন্য কোনো জায়গায়।
একটা অসম্ভব অনুভূতি।
⸻
কলেজে যাওয়ার পথে কার্তিক বলল,
— তোর কী হয়েছে রে?
— কিছু হয়নি।
— হয়েছে।
— কেন?
— আগের মতো কথা বলিস না।
⸻
রতন হেসে উড়িয়ে দিতে চাইল।
কিন্তু পারল না।
কারণ সে নিজেও জানত, কিছু একটা বদলাচ্ছে।
যদিও ঠিক কী, সেটা ধরতে পারছে না।
⸻
কলেজে ইতিহাস ক্লাস চলছিল।
মাস্টারমশাই বোর্ডে লিখছেন।
ছাত্ররা খাতায় নোট করছে।
⸻
হঠাৎ রতনের চোখ চলে গেল জানলার বাইরে।
দূরে একটা শিরীষ গাছ।
শুধু গাছ।
কিছুই অস্বাভাবিক না।
⸻
তবু এক মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
কারণ তার মনে হলো—
গাছটার নিচে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
⸻
সে চোখ পিটপিট করল।
আবার তাকাল।
⸻
কেউ নেই।
⸻
শুধু ছায়া।
⸻
সেদিন ফেরার পথে রমাপদ সাইকেলে করে তাকে নিয়ে ফিরছিলেন।
এমনটা মাঝে মাঝে হয়।
বিশেষ করে শীতকালে।
⸻
রতন পিছনের ক্যারিয়ারে বসেছিল।
রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে সে গ্রামের মানুষদের দেখছিল।
⸻
ভোলা ঘোষ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে কথা বলছেন।
⸻
মঞ্জু কাকিমা উঠোনে ধান ওলটাচ্ছেন।
⸻
নরুর দোকানে ধোঁয়া উঠছে।
⸻
সবই চেনা।
⸻
কিন্তু হঠাৎ একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।
খুব অল্প সময়ের জন্য।
⸻
সে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধকে দেখল।
⸻
মুখটা অস্পষ্ট।
⸻
এক ঝলক।
⸻
তারপর মানুষটা নেই।
⸻
রতনের বুকের ভেতর কেমন যেন হয়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে পেছনে তাকাল।
⸻
কেউ নেই।
⸻
রমাপদ টের পেলেন।
— কী হলো?
— কিছু না।
— শরীর খারাপ?
— না।
⸻
কথাটা সেখানেই শেষ।
⸻
কিন্তু রতন আর কিছু বলল না।
কারণ সে জানত না কী বলবে।
“একজন মানুষকে দেখলাম, তারপর নেই”?
নিজের কাছেই বোকা শোনাচ্ছিল।
⸻
সন্ধ্যায় প্রতিমা লুচি ভাজছিলেন।
রতনের খুব প্রিয়।
সাধারণ দিনে সে রান্নাঘরের আশেপাশে ঘুরঘুর করত।
আজ করল না।
⸻
সে বারান্দায় বসে ছিল।
চুপচাপ।
⸻
দূরে অন্ধকার নামছে।
⸻
একটা কুকুর রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেল।
⸻
একটা সাইকেলের ঘণ্টা শোনা গেল।
⸻
তারপর আবার নীরবতা।
⸻
হঠাৎ তার মনে হলো—
এই দৃশ্যটা সে আগে দেখেছে।
ঠিক এভাবেই।
ঠিক এই আলো।
ঠিক এই বাতাস।
ঠিক এই শব্দ।
⸻
কিন্তু কবে?
⸻
মনে পড়ল না।
⸻
সেই রাতে আবার স্বপ্ন এল।
আগের চেয়ে একটু স্পষ্ট।
⸻
আগুন।
⸻
ধোঁয়া।
⸻
মাটিতে আঁকা বৃত্ত।
⸻
কোনো একজন বসে আছে।
⸻
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
⸻
শুধু শুকনো, হাড়জিরজিরে হাত।
⸻
আঙুলে কালো কিছু লেগে আছে।
মাটি?
রক্ত?
ছাই?
বোঝা যায় না।
⸻
আর তারপর…
একটা কণ্ঠস্বর।
⸻
খুব নিচু।
⸻
খুব কর্কশ।
⸻
যেন শুকনো পাতার ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে।
⸻
কথাগুলো বোঝা গেল না।
⸻
শুধু একটা অনুভূতি।
⸻
কেউ তাকে ডাকছে।
⸻
নাম ধরে না।
⸻
তবু তাকে।
⸻
রতনের ঘুম ভাঙল।
⸻
এইবার সে চিৎকার করেনি।
হাঁপায়ওনি।
⸻
সে শুধু বিছানায় বসে রইল।
⸻
কারণ প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
স্বপ্নটা শুধু স্বপ্ন নয়।
⸻
আর একই রাতে, নিজের ঘরের জানালার সামনে বসে হরিপদ মাস্টার একটা পুরোনো কাগজের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
⸻
তার কাঁপা আঙুল এক জায়গায় থেমে ছিল।
⸻
একটা নামের ওপর।
⸻
বহু বছর আগের।
⸻
প্রায় ভুলে যাওয়া।
⸻
তিনি ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন।
⸻
তারপর খুব আস্তে বললেন—
“না…
আবার না…”
⸻
পরদিন ভোরে কাশীপুরের ওপর ঘন কুয়াশা নেমেছিল।
পুকুরের ওপারটা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না।
তালগাছের মাথাগুলো সাদা আবরণের ভেতর ভাসছে বলে মনে হচ্ছিল।
দূরে কারও গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, কিন্তু মানুষটাকে দেখা যাচ্ছে না।
শীতের গ্রামে এমন সকাল নতুন কিছু নয়।
তবু সেদিন রতনের কাছে সবকিছু একটু আলাদা লাগছিল।
⸻
ঘুম থেকে উঠে সে কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারেনি সে কোথায় আছে।
এটা নতুন।
আগে কখনও হয়নি।
চোখ খুলে সে সিলিংয়ের বাঁশগুলো দেখছিল।
দেয়ালের ক্যালেন্ডার।
জানলার কাঠ।
সবই চেনা।
তবু মনে হচ্ছিল, যেন অনেকদিন পরে এই ঘরে ফিরেছে।
⸻
— রতন!
প্রতিমার ডাক।
— চা ঠান্ডা হয়ে যাবে।
ডাকটা শুনে যেন হুঁশ ফিরল।
⸻
রান্নাঘরে ঢুকে সে দেখল প্রতিমা ভাঁড়ে চা ঢালছেন।
চুলোর আগুনে তার মুখে লালচে আভা।
কপালে সামান্য ঘাম।
সকালের এত কাজের মধ্যেও তিনি একসঙ্গে তিন-চারটা জিনিস সামলাচ্ছেন।
রতন চুপ করে তাকিয়ে রইল।
⸻
প্রতিমা হেসে বললেন,
— কী দেখছিস?
— কিছু না।
— আবার “কিছু না”?
⸻
রতন উত্তর দিল না।
কারণ সে নিজেও জানত না।
মায়ের মুখটা তার কাছে চেনা।
খুব চেনা।
তবু আজ সকালে কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল—
সে যেন এই মুখ আগে কোথাও দেখেছে।
অন্য কোনো সময়ে।
অন্য কোনো জায়গায়।
একটা অসম্ভব অনুভূতি।
⸻
কলেজে যাওয়ার পথে কার্তিক বলল,
— তোর কী হয়েছে রে?
— কিছু হয়নি।
— হয়েছে।
— কেন?
— আগের মতো কথা বলিস না।
⸻
রতন হেসে উড়িয়ে দিতে চাইল।
কিন্তু পারল না।
কারণ সে নিজেও জানত, কিছু একটা বদলাচ্ছে।
যদিও ঠিক কী, সেটা ধরতে পারছে না।
⸻
কলেজে ইতিহাস ক্লাস চলছিল।
মাস্টারমশাই বোর্ডে লিখছেন।
ছাত্ররা খাতায় নোট করছে।
⸻
হঠাৎ রতনের চোখ চলে গেল জানলার বাইরে।
দূরে একটা শিরীষ গাছ।
শুধু গাছ।
কিছুই অস্বাভাবিক না।
⸻
তবু এক মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
কারণ তার মনে হলো—
গাছটার নিচে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
⸻
সে চোখ পিটপিট করল।
আবার তাকাল।
⸻
কেউ নেই।
⸻
শুধু ছায়া।
⸻
সেদিন ফেরার পথে রমাপদ সাইকেলে করে তাকে নিয়ে ফিরছিলেন।
এমনটা মাঝে মাঝে হয়।
বিশেষ করে শীতকালে।
⸻
রতন পিছনের ক্যারিয়ারে বসেছিল।
রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে সে গ্রামের মানুষদের দেখছিল।
⸻
ভোলা ঘোষ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে কথা বলছেন।
⸻
মঞ্জু কাকিমা উঠোনে ধান ওলটাচ্ছেন।
⸻
নরুর দোকানে ধোঁয়া উঠছে।
⸻
সবই চেনা।
⸻
কিন্তু হঠাৎ একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।
খুব অল্প সময়ের জন্য।
⸻
সে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধকে দেখল।
⸻
মুখটা অস্পষ্ট।
⸻
এক ঝলক।
⸻
তারপর মানুষটা নেই।
⸻
রতনের বুকের ভেতর কেমন যেন হয়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে পেছনে তাকাল।
⸻
কেউ নেই।
⸻
রমাপদ টের পেলেন।
— কী হলো?
— কিছু না।
— শরীর খারাপ?
— না।
⸻
কথাটা সেখানেই শেষ।
⸻
কিন্তু রতন আর কিছু বলল না।
কারণ সে জানত না কী বলবে।
“একজন মানুষকে দেখলাম, তারপর নেই”?
নিজের কাছেই বোকা শোনাচ্ছিল।
⸻
সন্ধ্যায় প্রতিমা লুচি ভাজছিলেন।
রতনের খুব প্রিয়।
সাধারণ দিনে সে রান্নাঘরের আশেপাশে ঘুরঘুর করত।
আজ করল না।
⸻
সে বারান্দায় বসে ছিল।
চুপচাপ।
⸻
দূরে অন্ধকার নামছে।
⸻
একটা কুকুর রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেল।
⸻
একটা সাইকেলের ঘণ্টা শোনা গেল।
⸻
তারপর আবার নীরবতা।
⸻
হঠাৎ তার মনে হলো—
এই দৃশ্যটা সে আগে দেখেছে।
ঠিক এভাবেই।
ঠিক এই আলো।
ঠিক এই বাতাস।
ঠিক এই শব্দ।
⸻
কিন্তু কবে?
⸻
মনে পড়ল না।
⸻
সেই রাতে আবার স্বপ্ন এল।
আগের চেয়ে একটু স্পষ্ট।
⸻
আগুন।
⸻
ধোঁয়া।
⸻
মাটিতে আঁকা বৃত্ত।
⸻
কোনো একজন বসে আছে।
⸻
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
⸻
শুধু শুকনো, হাড়জিরজিরে হাত।
⸻
আঙুলে কালো কিছু লেগে আছে।
মাটি?
রক্ত?
ছাই?
বোঝা যায় না।
⸻
আর তারপর…
একটা কণ্ঠস্বর।
⸻
খুব নিচু।
⸻
খুব কর্কশ।
⸻
যেন শুকনো পাতার ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে।
⸻
কথাগুলো বোঝা গেল না।
⸻
শুধু একটা অনুভূতি।
⸻
কেউ তাকে ডাকছে।
⸻
নাম ধরে না।
⸻
তবু তাকে।
⸻
রতনের ঘুম ভাঙল।
⸻
এইবার সে চিৎকার করেনি।
হাঁপায়ওনি।
⸻
সে শুধু বিছানায় বসে রইল।
⸻
কারণ প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
স্বপ্নটা শুধু স্বপ্ন নয়।
⸻
আর একই রাতে, নিজের ঘরের জানালার সামনে বসে হরিপদ মাস্টার একটা পুরোনো কাগজের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
⸻
তার কাঁপা আঙুল এক জায়গায় থেমে ছিল।
⸻
একটা নামের ওপর।
⸻
বহু বছর আগের।
⸻
প্রায় ভুলে যাওয়া।
⸻
তিনি ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন।
⸻
তারপর খুব আস্তে বললেন—
“না…
আবার না…”
⸻


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)