Thread Rating:
  • 7 Vote(s) - 3.29 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Horror কাশীপুরের কান্ড
#17
অধ্যায় ১৭ : বাজি

শীতের বিকেলগুলো দ্রুত ফুরিয়ে যায়।

কলেজ ছুটি, দুপুরের খাওয়া, একটু পড়া, তারপর মাঠ—সবকিছু যেন চোখের পলকেই শেষ হয়ে আসে।

সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।



মাঠে পৌঁছে রতন দেখল পল্টু আগেই এসেছে।

হাতে ফুটবল।

পায়ে জুতো নেই।

ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে একা একা বল মারছে।

একবার বলটা বেশি জোরে মারতেই সেটা গিয়ে একটা ঝোপে ঢুকল।

পল্টু নিজেই গিয়ে তুলে আনল।

ফিরতে ফিরতে বিড়বিড় করছিল,

— একদিন এই বলটা আমায় মেরেই ফেলবে।



খেলা জমে উঠতে বেশি সময় লাগল না।

চিৎকার।

হাসাহাসি।

ঝগড়া।

আবার মিল।

কাশীপুরের মাঠে বিকেল মানেই এসব।



দূরে কয়েকজন মহিলা মাথায় কলসি নিয়ে পুকুর থেকে ফিরছিলেন।

কারও সঙ্গে ছোট্ট ছেলে।

কারও সঙ্গে মেয়ে।

কেউ হাঁটতে হাঁটতে গল্প করছে।

কেউ আবার হেসে উঠছে কোনো কথায়।

শীতের নরম রোদ তাদের গায়ের শালের ওপর পড়ে ঝলমল করছিল।



খেলা শেষে সবাই হাঁপাতে হাঁপাতে মাঠের ধারে বসে পড়ল।

ঘাস ভেজা।

হাতে ধরলে ঠান্ডা লাগে।

কার্তিক একটা শুকনো ঘাস ছিঁড়ে দাঁতে কাটছিল।

পল্টু মাটিতে কাঠি দিয়ে গোল গোল দাগ আঁকছিল।



কথা ঘুরতে ঘুরতে আবার সেই জায়গায় এল।

যে জায়গার নাম কেউ ঠিকমতো নেয় না।

শুধু বলে—

“ওইদিক।”



— রতন তো বলেছিল যাবে।

পল্টু বলল।

— কবে বললাম?

— সেদিন।

— আমি শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম।

— ভয় পেয়ে গেছিস?

পল্টুর মুখে সেই পরিচিত হাসি।

যে হাসি দেখে বোঝা যায় সে ইচ্ছে করেই খোঁচাচ্ছে।



রতন কিছু বলল না।

সে জানে পল্টুকে উত্তর দিলে পল্টু আরও খোঁচাবে।



— ভয় পেলে সমস্যা নেই।

পল্টু আবার বলল।

— সবাই সব পারে না।



বাপন হেসে ফেলল।

শিবুও।

কার্তিক অবশ্য হাসল না।

সে শুধু চুপ করে ছিল।



রতনের বুকের ভেতর হালকা একটা জেদ জেগে উঠল।

কারণ ভয় পাওয়ার জন্য নয়।

বরং তাকে ভয় পেয়েছে ভাবা হচ্ছে বলে।



— যাব।

সে শান্ত গলায় বলল।



কথাটা শুনে কয়েক সেকেন্ড সবাই চুপ।



— সত্যি?

পল্টুর চোখ বড় হয়ে গেল।

— হ্যাঁ।

— আজ?

— না।

— তাহলে?

— কাল।



কার্তিক সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল।

— পাগল নাকি?

— কেন?

— দরকার কী?

— কোনো দরকার নেই।

রতন কাঁধ ঝাঁকাল।

— তবু যাব।



বাপন হেসে বলল,

— গিয়ে যদি ভূত ধরে?

— তাহলে তোকে আগে ধরবে।

— কেন?

— তুই বেশি কথা বলিস।



আবার হাসাহাসি।

কিন্তু কার্তিক হাসল না।



সূর্য তখন প্রায় ডুবে গেছে।

মাঠের ওপর লম্বা ছায়া পড়েছে।

দূরের গাছগুলোকে অদ্ভুত কালচে দেখাচ্ছে।



রতন একবার সেদিকে তাকাল।

অনেক দূরে।

কুয়াশার আবছা পর্দার ওপারে।



কিছুই দেখা যায় না।

তবু…

কী যেন আছে।

ঠিক কী, সে বলতে পারল না।



সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেই প্রতিমা বললেন,

— হাত ধুয়ে আয়।

— আসছি।

— “আসছি” মানে আধঘণ্টা না।

— পাঁচ মিনিট।

— তিন মিনিট।

— চার।

— তিন।

রতন হেসে ফেলল।



রান্নাঘর থেকে ভাজা জিরের গন্ধ আসছিল।

চুলোর আগুনে প্রতিমার মুখে লালচে আলো পড়েছে।

ঘরের এই উষ্ণতা, এই পরিচিত গন্ধ, এই ছোট ছোট কথাগুলো রতনের কাছে এতই স্বাভাবিক যে সে কখনও ভেবে দেখেনি এগুলো একদিন কত মূল্যবান মনে হতে পারে।



রমাপদ সেদিন একটু দেরিতে ফিরলেন।

সাইকেল বারান্দায় রেখে চশমা খুলে বললেন,

— আজ আবার রাস্তার মাঝে চেন খুলে গেল।

— ঠিক করাও না।

প্রতিমা বললেন।

— করাব।

— কবে?

— শিগগিরই।



প্রতিমা হেসে মাথা নাড়লেন।

এই “শিগগিরই” কথাটা তিনি বহুবার শুনেছেন।



রাতে খাওয়ার পর রতন পড়তে বসেছিল।

কিন্তু মন বসছিল না।

বারবার আগামীকালের কথা মনে পড়ছে।



অবশেষে বই বন্ধ করে জানলার কাছে গেল।

বাইরে ঠান্ডা বাতাস।

দূরে কুয়াশা।

আরও দূরে অন্ধকার।



হঠাৎ তার মনে হলো—

গ্রামের সব মানুষ কি সত্যিই শুধু কুসংস্কারের জন্য ওইদিকে যায় না?



তার বাবা তো কুসংস্কার মানেন না।

হরিপদ মাস্টারও শিক্ষিত মানুষ।

তবু সেদিন…

মধু ঘোষের ছাগলের কথা উঠতেই কেন তিনি এমন চুপ হয়ে গিয়েছিলেন?



প্রশ্নটা মাথায় এল।

তারপর আবার চলে গেল।

কারণ তেরো বছরের ছেলেরা সাধারণত প্রশ্নের চেয়ে অভিযানের কথা বেশি ভাবে।



সে ঠিক করল।

কাল যাবে।

অল্প একটু।

শুধু দেখে আসবে।

তার বেশি কিছু না।



আর সেই রাতে, বহুদিন পর, হরিপদ মাস্টার একটা স্বপ্ন দেখলেন।

খুব পুরোনো স্বপ্ন।

এত পুরোনো যে তিনি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন।

স্বপ্নে কুয়াশা ছিল।

একটা গাছ ছিল।

আর ছিল আগুনের ক্ষীণ আলো।



ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরও তিনি অনেকক্ষণ বিছানায় বসে রইলেন।

তারপর ফিসফিস করে বললেন,

— আবার নয়…

কিন্তু কাকে বললেন?

নিজেকে?

অতীতকে?

নাকি এমন কাউকে, যার নাম তিনি এখনও উচ্চারণ করতে চান না?

বাইরে তখন গভীর রাত।

আর কাশীপুরের ওপর নেমে এসেছে এমন এক নীরবতা, যা ঝড়ের আগের নীরবতার মতো লাগছিল।
Like Reply


Messages In This Thread
RE: কাশীপুরের কান্ড - by Toxic boy - 19-06-2026, 01:26 AM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)