19-06-2026, 01:25 AM
অধ্যায় ১৬ : সাহস
ছাগল হারানোর ঘটনার পর কয়েকদিন কেটে গেছে।
কাশীপুর আবার তার নিজের ছন্দে ফিরেছে।
অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হয়।
মানুষের জীবন থেমে থাকে না।
ধান শুকোয়।
কলেজ বসে।
চায়ের দোকানে আড্ডা হয়।
পুকুরঘাটে গল্প হয়।
শীতের রোদে বৃদ্ধরা বসে গা গরম করে।
সবকিছুই আগের মতো।
তবু কিছু কিছু ঘটনা গ্রামের মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকে।
চোখে দেখা যায় না।
কিন্তু পুরোপুরি হারিয়েও যায় না।
⸻
সেদিন শনিবার।
কলেজে অর্ধেক দিন ক্লাস হয়েছিল।
দুপুরের আগেই ছুটি।
ফেরার পথে পল্টুর হাতে একটা শুকনো আখের টুকরো ছিল।
সে হাঁটতে হাঁটতে সেটা চিবোচ্ছিল।
হঠাৎ বলে উঠল,
— শুনেছিস?
— কী?
— মধু কাকার ছাগলটা নাকি এখনও পাওয়া যায়নি।
বাপন বলল,
— একটা ছাগল নিয়ে এত কথা বলিস কেন?
— কারণ ব্যাপারটা রহস্যময়।
— তুই বেশি সিনেমা দেখিস।
⸻
কথা বলতে বলতে তারা গ্রামের শেষদিকের রাস্তার দিকে চলে এসেছিল।
এখানে লোকজন তুলনামূলক কম।
রাস্তার দুপাশে ঝোপঝাড়।
মাঝে মাঝে বড় বড় গাছ।
শীতের বিকেলের আলোও যেন একটু ফিকে।
⸻
কার্তিক হঠাৎ বলল,
— দাদু কাল আবার বলছিল।
— কী?
— কিছু জায়গা নাকি সন্ধ্যার পরে ফাঁকা রাখা ভালো।
পল্টু হেসে উঠল।
— আবার শুরু হলো।
— আমি বানাচ্ছি না।
— তা হলে দাদুকে নিয়ে একদিন মাঠে চল।
কার্তিক চুপ করে গেল।
⸻
রতন তখন রাস্তার ধারের একটা ছোট পাথর পা দিয়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল।
কিছু বলছিল না।
কিন্তু তার মনে পড়ছিল কয়েক রাত আগের স্বপ্নটার কথা।
স্বপ্নটা প্রায় ভুলে গেছে।
তবু পুরোপুরি নয়।
⸻
বিকেলে মাঠে লোকজন কম ছিল।
শীতের দিনে অনেকেই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যায়।
তবু রতনরা খেলা শুরু করল।
চিৎকার।
দৌড়ঝাঁপ।
হাসাহাসি।
সব আগের মতো।
⸻
খেলার মাঝখানে বলটা একবার অনেক দূরে চলে গেল।
মাঠের শেষের দিক নয়।
তবু স্বাভাবিক খেলার এলাকার বাইরে।
পল্টু বলল,
— নিয়ে আয়।
— তুই যা।
— আমি কেন?
— তুই সবচেয়ে কাছে।
— আমি ক্যাপ্টেন।
— কে বানিয়েছে?
— আমি নিজে।
সবাই হেসে উঠল।
শেষ পর্যন্ত রতনই গেল।
⸻
দৌড়ে গিয়ে বলটা তুলে নিল।
তারপর এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে রইল।
সামনে আরও কিছুটা খোলা জায়গা।
তারও পরে কুয়াশার মধ্যে গাছের অস্পষ্ট অবয়ব।
দূরে।
খুব দূরে।
দিনের আলোয় তেমন কিছু মনে হয় না।
তবু…
কেন জানি জায়গাটা তার চোখে আটকে গেল।
⸻
— এইইই!
পেছন থেকে পল্টুর চিৎকার।
— ঘুমিয়ে গেছিস নাকি?
রতন ফিরে তাকাল।
তারপর বল নিয়ে ফিরে এল।
⸻
খেলা শেষ হওয়ার পরে ছেলেরা মাঠের ধারে বসে গল্প করছিল।
কারও হাতে বাদাম।
কারও হাতে গুড়।
শীতের বিকেলের শেষ আলো তখন ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে।
⸻
পল্টু হঠাৎ বলল,
— একটা কথা বলি?
— বল।
— তোরা সবাই ভয়পাস।
— কিসের?
— ওইসব জায়গার।
কার্তিক সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— ভয় পাওয়ার কথা বলিনি।
— বলেছিস।
— বলিনি।
— বলেছিস।
⸻
তর্ক শুরু হলো।
স্বাভাবিক তর্ক।
কিশোরদের তর্ক।
কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা অন্যদিকে গেল।
⸻
— তাহলে সন্ধ্যার পরে যাবি?
পল্টু বলল।
— কোথায়?
— ওইদিকে।
সে মাথা নেড়ে দূরের অস্পষ্ট অংশটার দিকে ইশারা করল।
⸻
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ।
তারপর বাপন বলল,
— পাগল নাকি?
— কেন?
— দরকার কী?
— দরকার নেই বলেই তো মজা।
⸻
রতন কিছু বলল না।
শুধু শুনছিল।
⸻
পল্টু আবার বলল,
— দেখলি? কেউ যাবে না।
— না গেলেই ভয় পেয়েছি?
কার্তিক বিরক্ত।
— তাহলে যা।
— তুই যা।
— আমি কেন?
— তুই তো বড় সাহসী।
⸻
কথাগুলো মজার ছলে বলা।
হাসাহাসিও হচ্ছে।
কিন্তু রতনের ভেতরে অদ্ভুত কিছু নড়েচড়ে উঠল।
তেরো বছরের ছেলেদের একটা বয়স থাকে, যখন নিজেদের সাহস প্রমাণ করার ইচ্ছে খুব বেশি।
বিশেষ করে বন্ধুদের সামনে।
⸻
সে মাটির দিকে তাকাল।
তারপর দূরের দিকে।
আবার বন্ধুদের দিকে।
⸻
— গেলে কী হবে?
সে জিজ্ঞেস করল।
পল্টুর চোখ চকচক করে উঠল।
— তাহলে তুই কিংবদন্তি।
— ধুর।
— সত্যি।
⸻
সবাই হেসে ফেলল।
কথাটা মজার।
একেবারেই সিরিয়াস নয়।
⸻
কিন্তু সেদিন বাড়ি ফেরার পথে রতনের মাথায় কথাটা রয়ে গেল।
অকারণে।
⸻
রাতে খাওয়ার সময়ও।
অঙ্ক করতে বসার সময়ও।
ঘুমোতে যাওয়ার সময়ও।
⸻
বাইরে তখন শীতের হাওয়া।
দূরে কুকুর ডাকছে।
প্রতিমা মশারি গুঁজে দিচ্ছেন।
রমাপদ বই বন্ধ করে আলো কমিয়ে দিলেন।
⸻
রতন চোখ বন্ধ করল।
কিন্তু ঘুম আসার আগে শেষ যে চিন্তাটা তার মাথায় এল, সেটা অঙ্ক নয়।
কলেজ নয়।
ফুটবলও নয়।
⸻
তার মনে হলো—
সত্যিই যদি একদিন গিয়ে দেখা যায়?
সত্যিই যদি কিছু না থাকে?
⸻
আর সেই একই সময়ে, কাশীপুরের অন্যপ্রান্তে, হরিপদ মাস্টার নিজের উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে।
অনেকক্ষণ।
খুব অনেকক্ষণ।
তারপর প্রায় ফিসফিস করে বললেন,
— আর যেন কেউ না যায়…
কথাটা শুনবার মতো কেউ ছিল না।
শুধু শীতের বাতাস।
আর নীরব রাত।
ছাগল হারানোর ঘটনার পর কয়েকদিন কেটে গেছে।
কাশীপুর আবার তার নিজের ছন্দে ফিরেছে।
অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হয়।
মানুষের জীবন থেমে থাকে না।
ধান শুকোয়।
কলেজ বসে।
চায়ের দোকানে আড্ডা হয়।
পুকুরঘাটে গল্প হয়।
শীতের রোদে বৃদ্ধরা বসে গা গরম করে।
সবকিছুই আগের মতো।
তবু কিছু কিছু ঘটনা গ্রামের মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকে।
চোখে দেখা যায় না।
কিন্তু পুরোপুরি হারিয়েও যায় না।
⸻
সেদিন শনিবার।
কলেজে অর্ধেক দিন ক্লাস হয়েছিল।
দুপুরের আগেই ছুটি।
ফেরার পথে পল্টুর হাতে একটা শুকনো আখের টুকরো ছিল।
সে হাঁটতে হাঁটতে সেটা চিবোচ্ছিল।
হঠাৎ বলে উঠল,
— শুনেছিস?
— কী?
— মধু কাকার ছাগলটা নাকি এখনও পাওয়া যায়নি।
বাপন বলল,
— একটা ছাগল নিয়ে এত কথা বলিস কেন?
— কারণ ব্যাপারটা রহস্যময়।
— তুই বেশি সিনেমা দেখিস।
⸻
কথা বলতে বলতে তারা গ্রামের শেষদিকের রাস্তার দিকে চলে এসেছিল।
এখানে লোকজন তুলনামূলক কম।
রাস্তার দুপাশে ঝোপঝাড়।
মাঝে মাঝে বড় বড় গাছ।
শীতের বিকেলের আলোও যেন একটু ফিকে।
⸻
কার্তিক হঠাৎ বলল,
— দাদু কাল আবার বলছিল।
— কী?
— কিছু জায়গা নাকি সন্ধ্যার পরে ফাঁকা রাখা ভালো।
পল্টু হেসে উঠল।
— আবার শুরু হলো।
— আমি বানাচ্ছি না।
— তা হলে দাদুকে নিয়ে একদিন মাঠে চল।
কার্তিক চুপ করে গেল।
⸻
রতন তখন রাস্তার ধারের একটা ছোট পাথর পা দিয়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল।
কিছু বলছিল না।
কিন্তু তার মনে পড়ছিল কয়েক রাত আগের স্বপ্নটার কথা।
স্বপ্নটা প্রায় ভুলে গেছে।
তবু পুরোপুরি নয়।
⸻
বিকেলে মাঠে লোকজন কম ছিল।
শীতের দিনে অনেকেই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যায়।
তবু রতনরা খেলা শুরু করল।
চিৎকার।
দৌড়ঝাঁপ।
হাসাহাসি।
সব আগের মতো।
⸻
খেলার মাঝখানে বলটা একবার অনেক দূরে চলে গেল।
মাঠের শেষের দিক নয়।
তবু স্বাভাবিক খেলার এলাকার বাইরে।
পল্টু বলল,
— নিয়ে আয়।
— তুই যা।
— আমি কেন?
— তুই সবচেয়ে কাছে।
— আমি ক্যাপ্টেন।
— কে বানিয়েছে?
— আমি নিজে।
সবাই হেসে উঠল।
শেষ পর্যন্ত রতনই গেল।
⸻
দৌড়ে গিয়ে বলটা তুলে নিল।
তারপর এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে রইল।
সামনে আরও কিছুটা খোলা জায়গা।
তারও পরে কুয়াশার মধ্যে গাছের অস্পষ্ট অবয়ব।
দূরে।
খুব দূরে।
দিনের আলোয় তেমন কিছু মনে হয় না।
তবু…
কেন জানি জায়গাটা তার চোখে আটকে গেল।
⸻
— এইইই!
পেছন থেকে পল্টুর চিৎকার।
— ঘুমিয়ে গেছিস নাকি?
রতন ফিরে তাকাল।
তারপর বল নিয়ে ফিরে এল।
⸻
খেলা শেষ হওয়ার পরে ছেলেরা মাঠের ধারে বসে গল্প করছিল।
কারও হাতে বাদাম।
কারও হাতে গুড়।
শীতের বিকেলের শেষ আলো তখন ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে।
⸻
পল্টু হঠাৎ বলল,
— একটা কথা বলি?
— বল।
— তোরা সবাই ভয়পাস।
— কিসের?
— ওইসব জায়গার।
কার্তিক সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— ভয় পাওয়ার কথা বলিনি।
— বলেছিস।
— বলিনি।
— বলেছিস।
⸻
তর্ক শুরু হলো।
স্বাভাবিক তর্ক।
কিশোরদের তর্ক।
কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা অন্যদিকে গেল।
⸻
— তাহলে সন্ধ্যার পরে যাবি?
পল্টু বলল।
— কোথায়?
— ওইদিকে।
সে মাথা নেড়ে দূরের অস্পষ্ট অংশটার দিকে ইশারা করল।
⸻
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ।
তারপর বাপন বলল,
— পাগল নাকি?
— কেন?
— দরকার কী?
— দরকার নেই বলেই তো মজা।
⸻
রতন কিছু বলল না।
শুধু শুনছিল।
⸻
পল্টু আবার বলল,
— দেখলি? কেউ যাবে না।
— না গেলেই ভয় পেয়েছি?
কার্তিক বিরক্ত।
— তাহলে যা।
— তুই যা।
— আমি কেন?
— তুই তো বড় সাহসী।
⸻
কথাগুলো মজার ছলে বলা।
হাসাহাসিও হচ্ছে।
কিন্তু রতনের ভেতরে অদ্ভুত কিছু নড়েচড়ে উঠল।
তেরো বছরের ছেলেদের একটা বয়স থাকে, যখন নিজেদের সাহস প্রমাণ করার ইচ্ছে খুব বেশি।
বিশেষ করে বন্ধুদের সামনে।
⸻
সে মাটির দিকে তাকাল।
তারপর দূরের দিকে।
আবার বন্ধুদের দিকে।
⸻
— গেলে কী হবে?
সে জিজ্ঞেস করল।
পল্টুর চোখ চকচক করে উঠল।
— তাহলে তুই কিংবদন্তি।
— ধুর।
— সত্যি।
⸻
সবাই হেসে ফেলল।
কথাটা মজার।
একেবারেই সিরিয়াস নয়।
⸻
কিন্তু সেদিন বাড়ি ফেরার পথে রতনের মাথায় কথাটা রয়ে গেল।
অকারণে।
⸻
রাতে খাওয়ার সময়ও।
অঙ্ক করতে বসার সময়ও।
ঘুমোতে যাওয়ার সময়ও।
⸻
বাইরে তখন শীতের হাওয়া।
দূরে কুকুর ডাকছে।
প্রতিমা মশারি গুঁজে দিচ্ছেন।
রমাপদ বই বন্ধ করে আলো কমিয়ে দিলেন।
⸻
রতন চোখ বন্ধ করল।
কিন্তু ঘুম আসার আগে শেষ যে চিন্তাটা তার মাথায় এল, সেটা অঙ্ক নয়।
কলেজ নয়।
ফুটবলও নয়।
⸻
তার মনে হলো—
সত্যিই যদি একদিন গিয়ে দেখা যায়?
সত্যিই যদি কিছু না থাকে?
⸻
আর সেই একই সময়ে, কাশীপুরের অন্যপ্রান্তে, হরিপদ মাস্টার নিজের উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে।
অনেকক্ষণ।
খুব অনেকক্ষণ।
তারপর প্রায় ফিসফিস করে বললেন,
— আর যেন কেউ না যায়…
কথাটা শুনবার মতো কেউ ছিল না।
শুধু শীতের বাতাস।
আর নীরব রাত।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)