19-06-2026, 01:24 AM
অধ্যায় ১৫ : যে কথা বলা হয় না
পরদিন সকালে কাশীপুর আবার আগের মতোই ছিল।
সূর্য উঠেছে।
পুকুরঘাটে ভিড়।
নরুর দোকানে চায়ের কেটলি চাপানো।
মাঠে দু-একটা গরু চরছে।
দেখলে কেউ বলবে না, আগের রাতে গ্রামের কয়েকজন মানুষ কুয়াশার মধ্যে একটা হারানো ছাগল খুঁজতে বেরিয়েছিল।
আর দেখলে কেউ বলবে না, হরিপদ মাস্টার প্রায় সারারাত ঘুমোতে পারেননি।
⸻
রতনের অবশ্য এসব কিছুই জানা নেই।
সে তখন নিজের সমস্যা নিয়েই ব্যস্ত।
অঙ্কের হোমওয়ার্ক।
মাস্টারমশাইয়ের বকুনি।
আর রবিবারের ম্যাচ।
তেরো বছরের ছেলের পৃথিবী সাধারণত এতটুকুই।
তার চেয়ে বড় চিন্তা করার দরকার হয় না।
⸻
সকালে খেতে বসে রতন ভাতের সঙ্গে আলুভাজা মাখছিল।
প্রতিমা রান্নাঘর থেকে বললেন,
— ধীরে খা।
— দেরি হয়ে যাবে।
— প্রতিদিনই দেরি হয়, তবু বেঁচে আছিস।
রতন হেসে ফেলল।
⸻
আলোয় বসে থাকতে থাকতে প্রতিমার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
গায়ের রং খুব ফর্সা নয়, আবার চাপাও নয়।
বছরের পর বছর রোদ, ধোঁয়া আর সংসারের কাজের ছাপ আছে মুখে।
তবু চোখ দুটো শান্ত।
অদ্ভুতভাবে শান্ত।
গ্রামের অনেক মহিলার মতো তিনিও বেশি কথা বলেন না।
কিন্তু রতনের সামান্য জ্বর হলেও রাত জেগে বসে থাকতে পারেন।
⸻
রমাপদ তখন সাইকেল বের করছেন।
তার বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে।
একসময় বেশ রোগা ছিলেন।
এখন শরীর একটু ভরাট।
নাকের ওপর চশমা না থাকলে যেন তাকে অসম্পূর্ণ লাগে।
সাইকেলের চেনটা আবার একটু শব্দ করছে।
তিনি নিচু হয়ে দেখলেন।
তারপর মাথা নেড়ে বললেন,
— আবার তেল দিতে হবে।
এ কথাটা তিনি গত মাসেও বলেছিলেন।
তার আগের মাসেও।
⸻
কলেজে যাওয়ার পথে রতন একটা শুকনো কঞ্চি কুড়িয়ে নিল।
হাঁটতে হাঁটতে সেটা দিয়ে রাস্তার ধুলোয় দাগ কাটছিল।
কখনও ঝোপে ঠুকছিল।
কখনও পথের ধারে থাকা আগাছায়।
কার্তিক বলল,
— তুই পাঁচ বছরের বাচ্চা নাকি?
— চুপ কর।
— তাহলে এসব করছিস কেন?
— এমনি।
এই “এমনি”র কোনো উত্তর হয় না।
⸻
কলেজ ছুটি হওয়ার পরে ফেরার সময় রতন লক্ষ্য করল কার্তিক আজ অদ্ভুত চুপ।
পল্টুও খেয়াল করল।
— কী রে?
— কিছু না।
— কিছু না মানে?
কার্তিক একটু ইতস্তত করল।
তারপর বলল,
— কাল রাতে দাদু একটা কথা বলছিল।
রতন তাকাল।
— কী কথা?
— ওই ছাগল নিয়ে।
— তারপর?
কার্তিক গলা নামাল।
— বলছিল, আগে নাকি এমন একবার হয়েছিল।
— কী হয়েছিল?
— জানি না।
— দাদু বলল না?
— বলছিল… তারপর হঠাৎ থেমে গেল।
⸻
সন্ধ্যার আগে রতন মাঠে গেল।
খেলা হলো।
হাসাহাসি হলো।
ঝগড়াও হলো।
সবই স্বাভাবিক।
তবু আজ কেন জানি মাঠটাকে একটু অন্যরকম লাগছিল।
মাঠ বদলায়নি।
আকাশও না।
বন্ধুরাও না।
তবু…
কখনও কখনও কোনো কারণ ছাড়াই একটা জায়গাকে আলাদা লাগে।
⸻
সূর্য নামার সময় রতন বলটা কুড়িয়ে আনতে একটু দূরে গিয়েছিল।
মাঠের শেষদিকে নয়।
তার অনেক আগেই।
তবু বাকিদের চেয়ে একটু দূরে।
সে নিচু হয়ে বলটা তুলল।
ঠিক তখনই…
তার মনে হলো কেউ যেন তাকিয়ে আছে।
⸻
সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল।
কেউ না।
শুধু কুয়াশা।
ঘাস।
দূরের গাছ।
আর সন্ধ্যার আলো।
⸻
কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল সে।
তারপর নিজেই হেসে ফেলল।
— ধুর।
বলটা বগলে নিয়ে ফিরে এল।
⸻
কিন্তু সেই রাতে…
ঘুমের মধ্যে রতন একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল।
স্বপ্নে সে মাঠে দাঁড়িয়ে।
একাই।
চারপাশে কেউ নেই।
কোনো শব্দ নেই।
শুধু দূরে একটা খুব বড় ছায়া।
গাছও হতে পারে।
আবার নাও হতে পারে।
স্বপ্নে সে সেটা দেখার চেষ্টা করছিল।
বারবার।
কিন্তু যতই তাকায়, কুয়াশা ততই ঘন হয়ে যায়।
⸻
ভোরের দিকে তার ঘুম ভাঙল।
ঘাম হয়নি।
ভয়ও লাগেনি।
স্বপ্নটা প্রায় মনেই নেই।
শুধু একটা অনুভূতি রয়ে গেছে।
যেন সে কাউকে মনে করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু মনে করতে পারছে না।
আর গ্রামের অন্যপ্রান্তে, নিজের ঘরের অন্ধকারে বসে হরিপদ মাস্টার জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
তার সামনে খোলা একটা পুরোনো খাতা।
হলুদ হয়ে যাওয়া পাতা।
আর পাতার এক কোণে কাঁপা হাতে লেখা একটা নাম।
একটা নাম, যেটা তিনি বহু বছর উচ্চারণ করেননি।
তিনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে খাতাটা বন্ধ করে দিলেন।
বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে।
কিন্তু হরিপদ মাস্টারের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, তার মনে এখনও রাত কাটেনি।
পরদিন সকালে কাশীপুর আবার আগের মতোই ছিল।
সূর্য উঠেছে।
পুকুরঘাটে ভিড়।
নরুর দোকানে চায়ের কেটলি চাপানো।
মাঠে দু-একটা গরু চরছে।
দেখলে কেউ বলবে না, আগের রাতে গ্রামের কয়েকজন মানুষ কুয়াশার মধ্যে একটা হারানো ছাগল খুঁজতে বেরিয়েছিল।
আর দেখলে কেউ বলবে না, হরিপদ মাস্টার প্রায় সারারাত ঘুমোতে পারেননি।
⸻
রতনের অবশ্য এসব কিছুই জানা নেই।
সে তখন নিজের সমস্যা নিয়েই ব্যস্ত।
অঙ্কের হোমওয়ার্ক।
মাস্টারমশাইয়ের বকুনি।
আর রবিবারের ম্যাচ।
তেরো বছরের ছেলের পৃথিবী সাধারণত এতটুকুই।
তার চেয়ে বড় চিন্তা করার দরকার হয় না।
⸻
সকালে খেতে বসে রতন ভাতের সঙ্গে আলুভাজা মাখছিল।
প্রতিমা রান্নাঘর থেকে বললেন,
— ধীরে খা।
— দেরি হয়ে যাবে।
— প্রতিদিনই দেরি হয়, তবু বেঁচে আছিস।
রতন হেসে ফেলল।
⸻
আলোয় বসে থাকতে থাকতে প্রতিমার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
গায়ের রং খুব ফর্সা নয়, আবার চাপাও নয়।
বছরের পর বছর রোদ, ধোঁয়া আর সংসারের কাজের ছাপ আছে মুখে।
তবু চোখ দুটো শান্ত।
অদ্ভুতভাবে শান্ত।
গ্রামের অনেক মহিলার মতো তিনিও বেশি কথা বলেন না।
কিন্তু রতনের সামান্য জ্বর হলেও রাত জেগে বসে থাকতে পারেন।
⸻
রমাপদ তখন সাইকেল বের করছেন।
তার বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে।
একসময় বেশ রোগা ছিলেন।
এখন শরীর একটু ভরাট।
নাকের ওপর চশমা না থাকলে যেন তাকে অসম্পূর্ণ লাগে।
সাইকেলের চেনটা আবার একটু শব্দ করছে।
তিনি নিচু হয়ে দেখলেন।
তারপর মাথা নেড়ে বললেন,
— আবার তেল দিতে হবে।
এ কথাটা তিনি গত মাসেও বলেছিলেন।
তার আগের মাসেও।
⸻
কলেজে যাওয়ার পথে রতন একটা শুকনো কঞ্চি কুড়িয়ে নিল।
হাঁটতে হাঁটতে সেটা দিয়ে রাস্তার ধুলোয় দাগ কাটছিল।
কখনও ঝোপে ঠুকছিল।
কখনও পথের ধারে থাকা আগাছায়।
কার্তিক বলল,
— তুই পাঁচ বছরের বাচ্চা নাকি?
— চুপ কর।
— তাহলে এসব করছিস কেন?
— এমনি।
এই “এমনি”র কোনো উত্তর হয় না।
⸻
কলেজ ছুটি হওয়ার পরে ফেরার সময় রতন লক্ষ্য করল কার্তিক আজ অদ্ভুত চুপ।
পল্টুও খেয়াল করল।
— কী রে?
— কিছু না।
— কিছু না মানে?
কার্তিক একটু ইতস্তত করল।
তারপর বলল,
— কাল রাতে দাদু একটা কথা বলছিল।
রতন তাকাল।
— কী কথা?
— ওই ছাগল নিয়ে।
— তারপর?
কার্তিক গলা নামাল।
— বলছিল, আগে নাকি এমন একবার হয়েছিল।
— কী হয়েছিল?
— জানি না।
— দাদু বলল না?
— বলছিল… তারপর হঠাৎ থেমে গেল।
⸻
সন্ধ্যার আগে রতন মাঠে গেল।
খেলা হলো।
হাসাহাসি হলো।
ঝগড়াও হলো।
সবই স্বাভাবিক।
তবু আজ কেন জানি মাঠটাকে একটু অন্যরকম লাগছিল।
মাঠ বদলায়নি।
আকাশও না।
বন্ধুরাও না।
তবু…
কখনও কখনও কোনো কারণ ছাড়াই একটা জায়গাকে আলাদা লাগে।
⸻
সূর্য নামার সময় রতন বলটা কুড়িয়ে আনতে একটু দূরে গিয়েছিল।
মাঠের শেষদিকে নয়।
তার অনেক আগেই।
তবু বাকিদের চেয়ে একটু দূরে।
সে নিচু হয়ে বলটা তুলল।
ঠিক তখনই…
তার মনে হলো কেউ যেন তাকিয়ে আছে।
⸻
সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল।
কেউ না।
শুধু কুয়াশা।
ঘাস।
দূরের গাছ।
আর সন্ধ্যার আলো।
⸻
কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল সে।
তারপর নিজেই হেসে ফেলল।
— ধুর।
বলটা বগলে নিয়ে ফিরে এল।
⸻
কিন্তু সেই রাতে…
ঘুমের মধ্যে রতন একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল।
স্বপ্নে সে মাঠে দাঁড়িয়ে।
একাই।
চারপাশে কেউ নেই।
কোনো শব্দ নেই।
শুধু দূরে একটা খুব বড় ছায়া।
গাছও হতে পারে।
আবার নাও হতে পারে।
স্বপ্নে সে সেটা দেখার চেষ্টা করছিল।
বারবার।
কিন্তু যতই তাকায়, কুয়াশা ততই ঘন হয়ে যায়।
⸻
ভোরের দিকে তার ঘুম ভাঙল।
ঘাম হয়নি।
ভয়ও লাগেনি।
স্বপ্নটা প্রায় মনেই নেই।
শুধু একটা অনুভূতি রয়ে গেছে।
যেন সে কাউকে মনে করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু মনে করতে পারছে না।
আর গ্রামের অন্যপ্রান্তে, নিজের ঘরের অন্ধকারে বসে হরিপদ মাস্টার জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
তার সামনে খোলা একটা পুরোনো খাতা।
হলুদ হয়ে যাওয়া পাতা।
আর পাতার এক কোণে কাঁপা হাতে লেখা একটা নাম।
একটা নাম, যেটা তিনি বহু বছর উচ্চারণ করেননি।
তিনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে খাতাটা বন্ধ করে দিলেন।
বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে।
কিন্তু হরিপদ মাস্টারের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, তার মনে এখনও রাত কাটেনি।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)