বৌদি কৃতজ্ঞ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, "থ্যাংক ইউ তমাল। আর তোদের বলছি, আজকের ঘটনা আমরা চারজন ছাড়া আর কেউ যেন কখনো না জানে। মনে থাকবে তো?" রিয়া আর অঙ্কিতা মাথা নাড়লো।
আমার মাথাটা রাগে জ্বালা করতে শুরু করেছে। মাথার পিছনের ব্যাথাটা তো আছেই। একটা আলুর সাইজে ফুলে আছে জায়গাটা। হাত দিলেই যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ছে। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কাজ হলো না কিছুই। রাগটা ক্রমশ জমতে থাকলো আরও।
সিগারেট শেষ করে বৌদিকে বললো, "চলো বৌদি, কাজ আছে।" বৌদি জিজ্ঞেস করলো, "কোথায়?"
আমি বললাম, "দুটো নরকের কীট এমন জঘন্য অপরাধ করে পার পেয়ে যাবে? তাদের শাস্তি না দিলে সারাজীবন মুখ দেখবো কি করে নিজেকে? তাছাড়া যদি তোমার সন্তান আসে, তার জন্যও তো ব্যবস্থা করতে হবে কিছু?"
বৌদি কিছু বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। আমি তাড়া দিলাম, "চলো চলো, দেরি করে লাভ নেই।" বৌদি আর কোনো কথা না বলে আমার সঙ্গে রওনা দিলো। হ্যান্ডি ক্যামটা আমার হাতে ধরা।
আমাদের হোটেল থেকে কিছুটা দূরে 'পাখির ডানা'র স্টাফরা আছে অন্য একটা হোটেলে। সেদিকে চললাম আমরা। বৌদি আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো, "তমাল, যা হবার তা তো হয়ে গেছে। এখন লোক জানাজানি হলে সেটা কি ঠিক হবে? ভেবে দেখ ভাই!"
আমি কোনো উত্তর না দিয়ে হোটেলটায় ঢুকে রিসেপশনে তরুদার কথা জিজ্ঞেস করলাম। জানলাম সে তার ঘরেই আছে। দোতলার তিন নম্বর ঘরে। পাঁচু বা বসন্তকে কোথাও দেখা গেলো না। বৌদিকে নিয়ে উঠে এলাম দোতলায়। নক্ করতেই দরজা খুললো তরুদা। একাই আছে ঘরে। ট্যুর শেষ হয়ে এসেছে, তাই লাভের হিসাব করছে বিছানার উপরে কাগজপত্র ছড়িয়ে। আমাদের দেখে জিজ্ঞেস করলো, "কি ব্যাপার তমাল? উমা বৌদি? কোনো প্রবলেম? কিছু অসুবিধা হয়েছে?"
আমরা কোনো উত্তর না দিয়ে তাকে ঠেলে ঢুকে পড়লাম ঘরে। তারপর দরজায় ছিটকিনি তুলে দিলাম। আমাদের আচরণ দেখে অবাক হলো তরুদা। আবার জিজ্ঞেস করলো, "কি হয়েছে তমাল?" আমি বললাম, "বসুন, কথা আছে!" আমার গলা যে স্বাভাবিক নেই সেটা বুঝে চিন্তিত মুখে বিছানায় গিয়ে বসলো তরুদা।
আমরা দুজনে দুটো চেয়ার টেনে নিয়ে তার মুখোমুখি বসলাম। আমি ক্যামেরা অন করে নির্দিষ্ট ফাইলটা ওপেন করে তার হাতে ধরিয়ে দিলাম। বললাম, "আগে চুপচাপ পুরোটা দেখুন।"
ভিডিও চলতে শুরু করলো। দেখতে দেখতে তরুদার দু চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেলো। ঘন ঘন পরিবর্তন হতে লাগলো তার অভিব্যক্তিতে। আমি আর উমা বৌদি চুপচাপ তাকে লক্ষ্য করতে লাগলাম।
ভিডিও যখন শেষ হলো তরুদাকে চেনাই যাচ্ছিলো না। ভেঙে পড়া এক বিধ্বস্ত চেহারা। ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। আমি বললাম, "পুলিশের কাছে যাবার আগে আপনাকে দেখানো উচিৎ বলে মনে হলো, তাই দেখালাম।"
তরুদা কোনো রকমে ঢোক গিলে বললো, "পুলিশ! প্লিজ তমাল, পুলিশকে জানিও না। অনেক কষ্ট করে এই ট্যুর কোম্পানি দাঁড় করিয়েছি আমি। সাধারণ মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির ছেলে আমি। আমার মতো আরও চারজন মিলে সমস্ত পুঁজি ভেঙে তৈরি করা এই পাখির ডানা। আমাদের পাঁচটা সংসার এবং অনেক স্টাফের পরিবার এর উপর নির্ভরশীল। তাদের কি অপরাধ বলো? এই ঘটনা নিয়ে থানা পুলিশ হলে আমাদের রেপুটেশন শেষ হয়ে যাবে। লাইসেন্স ক্যান্সেল হয়ে যাবে। পথে বসে যাবো আমরা। প্লিজ তমাল, প্লিজ বৌদি, পুলিশের কাছে যাবেন না।"
তরুদার এমন করুন অনুনয় আমার উপর কোনো প্রভাব ফেললো না। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললাম, "পঞ্চাননের মতো একটা ঘেঁয়ো কুকুর সেই দলে আছে, এটাই আপনার অপরাধ। পুলিশের কাছে যাওয়া ছাড়া বিচার পাওয়ার আর তো কোনো পথ খোলা নেই তরুদা?" তারপর একটু মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বললাম, "ওই স্থানীয় ভদ্রলোকও একটু পরে থানায় আসবেন স্বাক্ষী দিতে। তার আগে জানিয়ে গেলাম শুধু। চলো বৌদি"
উমা বৌদি উঠে দাঁড়াতেই তরুদা এসে বৌদির হাঁটু জড়িয়ে ধরলো। সম্ভ্রান্ত অভিজাত চেহারার ফিটফাট তরুদাকে এই মুহুর্তে একজন ক্ষমাপ্রার্থী অপরাধীর মতো লাগছে। সে বললো, "বৌদি প্লিজ, আপনি একটু তমালকে বোঝান! আমরা শেষ হয়ে যাবো এই ঘটনা জানাজানি হলে। প্লিজ তমাল, একটু বোঝার চেষ্টা করো। আমার কথা একবার ভাবো! আমি অন্য বন্ধুদের অনেকবার বোঝাবার চেষ্টা করেছি যে পাঁচুকে তার অংশের টাকা মিটিয়ে দিয়ে পার্টনারশিপ থেকে বের করে দিতে। ওরা শোনেনি। আমি জানতাম এরকম কিছু হবে একদিন। আমাদের বাঁচাও তমাল। প্লিজ পুলিশের কাছে যেও না!"
আমি চেয়ারটা টেনে বসে পড়লাম আবার। বৌদিকেও বসতে ইঙ্গিত করলাম। তারপর তরুদাকে বললাম, "উঠুন! পায়ে পড়ে লাভ নেই তরুদা। আপনাদের ট্যুর কোম্পানি যে ক্ষতি উমা বৌদি আর রিয়ার সাথে করেছে, তার ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়! আমার শারীরিক আঘাতের কথা নাহয় বাদই দিলাম। পাঁচু যদি আপনাদের সাধারণ কর্মচারী হতো, তবু আপনার বাঁচার উপায় ছিলো, কিন্তু সে আপনাদের পার্টনার। এই জঘন্য অপরাধের দায় তাই আপনাদের উপরেও এসে পড়ে।"
তরুদা বললো, "তমাল, ক্ষতিপূরণ কি সম্ভব নয়? তুমি বলো, যে কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে আমি রাজি। শুধু পাখির ডানাটা বাঁচাও ভাই!"
আমি আরও একটা সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ টানলাম কিছুক্ষণ। আড় চোখে লক্ষ্য করলাম তরুদা উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার উদ্বেগ চরমে ওঠার পরে আমি বললাম, "শুনুন, আমার কতোগুলো শর্ত আছে। আমরা চারটে ফ্যামিলি আছি। আমাদের ট্যুরের জন্য নেওয়া পুরো টাকাটা পাখির ডানাকে ফেরত দিয়ে দিতে হবে। অঙ্কিতার টাকাটা ক্যাশে ফেরত হবে। রিয়াদের টাকাটা কোনো কায়দা করে ফেরত দেবার ব্যবস্থা করবেন। লটারি টটারি সাজিয়ে, লাকি মেম্বার বানিয়ে, যেভাবে খুশি করুন, কিন্তু আজ ডিনারের পরেই ফেরত দিতে হবে।
উমা বৌদি আর আমার টাকাটা তার ক্ষতিপূরণের দু'লক্ষ্য টাকার সাথে যোগ করে আমার অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেবেন, কারণ মৃণালদাকে কিছুই জানানো যাবে না। এখনি আমার নামে চেক কেটে দিতে হবে।"
তরুদা কয়েকবার ঢোক গিলে বললো, "দু লক্ষ্য টাকা! তমাল আমরা পথে বসে যাবো ভাই! একটু কম করো!"
আমি বললাম, "পাখির ডানা বেঁচে থাকলে টাকা কামাতে পারবেন। নাহলে ক্ষতিপূরণ তো আমরা কোর্টে গিয়েও আদায় করে নিতে পারবো!"
তরুদা বললো, "আ-আচ্ছা ঠিক আছে, তাই হবে।"
আমি বললাম, "আমার আরও শর্ত আছে। এতো গেলো ক্ষতিপূরণ, শাস্তি কোথায় হলো? আজ রাতেই আপনাকে পাঁচু আর বসন্তকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। কি অপরাধ সাজাবেন সেটা আপনার ব্যাপার। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই যা খুশি অভিযোগ করুন, কিন্তু আমি যদি আর একবারও ওই দুজনের মুখ দেখি কলকাতায় ফেরার আগে, অথবা চেক যদি বাউন্স করে, তাহলে পাখির ডানা কিভাবে কাটতে হয়, ভালো করে জানা আছে আমার।"
আমি উঠে গিয়ে বিছানায় ছড়ানো কাগজের থেকে একটা তুলে নিয়ে খসখস করে আমার অ্যাকাউন্ট নম্বর লিখে তরুদার হাতে ধরিয়ে দিলাম। বললাম, "চেকটা লিখে এখুনি আমার হাতে দিন।"
তরুদা কাঁপা কাঁপা হাতে চেকবইটা নিয়ে আমার নামে একটা অ্যাকাউন্ট পে-য়ী চেক লিখে দিলো। অ্যামাউন্ট, দু লাখ তিরিশ হাজার টাকা। পনেরো হাজার করে আমার আর উমা বৌদির ট্যুর প্যাকেজ কস্ট।
আমি বললাম, "ভিডিওটার একটা কপি আপনাকে পাঠিয়ে দেবো। আপনার পার্টনাদের দেখিয়ে পঞ্চানন বিদায় করতে সুবিধা হবে। কিন্তু ভুলবেন না, আসল কপিটা আমার কাছেই রইলো। আপনি চুক্তি ভঙ্গ না করলে এটার কথা কেউ জানবে না। চলি!"
চেকটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম আমরা। তরুদার দিকে একবারও না তাকিয়ে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। রাস্তায় এসে উমা বৌদি বললো, "তুই তো সাংঘাতিক ছেলে তমাল। সব দিক এতো গুছিয়ে ভাবলি কিভাবে? বাপ রে! আমার তো ভয়ে হাঁত পা কাঁপছিলো।"
আমি বললাম, "দুনিয়াটাই এমন বৌদি। শক্তের ভক্ত, নরমের যম! ওদের একটা শিক্ষা দেওয়া দরকার ছিলো। এই পাঁচু প্রথমদিন থেকে তোমাদের দিকে কু'নজর দিচ্ছিলো আমি খেয়াল করেছি। তোমাদের কারো সাথে বাইরে গেলে ও ফলো করতো। আমরা আমার ঘরে আলাদা থাকলেই সে কান পাততো। আমি অনেকবার কড়া বিড়ির গন্ধ টের পেয়েছি। অঙ্কিতা জানে। তোমাকে বা রিয়াকে কিছু বলিনি, ভয় পাবে বলে।"

kingsuk25@ জিমেইল ডট কম


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)