গাড়ি বৈসারণের যতো কাছে পৌঁছাতে লাগলো, আমাদের মুখের ভাষা ততো দূরে সরে যেতে শুরু করলো। আগে দেখেই দারুণ কোনো জায়গা দেখবো বলে কল্পনা করে রেখেছিলাম। কিন্তু পৌঁছানোর পরে বুঝলাম কল্পনারও একটা সীমা থাকে। মানুষ কল্পনায় যা ভাবতে পারে, তার চেয়েও সুন্দর কিছু হতে পারে বৈসারণ উপত্যকা না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।
বিস্তীর্ণ সবুজ গালিচা পাতা মাঠ, ঘন সবুজ পাইনবন আর পিছনে বরফে ঢাকা পাহাড় যেন কোনো শিল্পী নিপুণ হাতে অসম্ভব সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে। কোথাও কোনো ত্রুটি নেই, কোনো ছন্দপতন নেই। যেখানে যেটুকু থাকলে বাহুল্য বর্জিত সৌন্দর্য তৈরি হয়, ঠিক সেটুকুই রয়েছে।
প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে চোখের এমন তৃপ্তি কোনোদিন পাইনি। চোখ ফেরাতেই ইচ্ছা করছে না। সবাই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছি শুধু। এখানে আমরা ঘন্টা তিনেক থাকবো, সেরকম নির্দেশ দিয়ে আমাদের নিজের মতো করে উপভোগ করতে বলা হলো। মা আর গায়েত্রী মাসিমাকে আর্মি সার্চ টাওয়ার থেকে একটু দূরে একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে দুটো চেয়ার ভাড়া করে বসিয়ে দেওয়া হলো। তারা হাঁটাহাঁটি করতে পারবেন না, তাই এখানে বসেই শোভা উপভোগ করবেন।
রিয়ার বাবা মা একটা ঘোড়া ভাড়া করে চারদিকটা ঘুরে দেখতে রওনা হয়ে গেলো। উমা বৌদিও অনেক্ষণ মৃণালদাকে টানাটানি করলো আলাদা করে ঘুরতে যাবার জন্য, কিন্তু মৃণালদা রাজি হলো না। সেও মা আর মাসীমার পাশে অন্য একটা চেয়ার নিয়ে বসে পড়লো। অগত্যা উমা বৌদি আমাদের দলে ভীড়ে গেলো আবার।
আমরা চারজন উত্তর দিকে একটা পাইন বন লক্ষ্য করে হাঁটতে লাগলাম। পিছনে একটা বিশাল পাহাড় মাথায় বরফের টুপি চাপিয়ে আমাদের হাতছানি দিচ্ছে। তার ডাক উপেক্ষা করতে পারলাম না আমরা।
সাধারণত বৈসারণের ভীড়টা সকালের দিকে বেশি হয়। এখন অধিকাংশ টুরিস্ট ফেরার তোড়জোড় করছে, তাই পাইন বনের দিকটা ফাঁকাই রয়েছে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়লাম বনের প্রান্তে। পাইন গাছের চিড়ল চিড়ল পাতার ফাঁক দিয়ে ধারালো বর্শা ফলার মতো রোদ এসে পড়ছে মাটিতে। বনের ভিতরে যতো ঢুকতে লাগলাম, ঘাসের গালিচা পাতলা হতে শুরু করলো।
কোথায় যেন শুনেছিলাম এই বনের পিছনে পাহাড়ের অপর দিকে অন্য দেশের সীমান্ত। সেখানে আর্মি পাহারা খুব জোরদার। উগ্রপন্থীদের আস্তানা থাকাও অসম্ভব নয়। তাই বনের যতো গভীরে যেতে লাগলাম কেমন একটা গা ছমছমে অনুভুতি হতে লাগলো। কিন্তু যেটুকু ভুগোলের জ্ঞান ছিলো তাতে অনুমান করলাম এই দিকটা ততো বিদপজনক নয়। বিপদ থাকলে সেটা পশ্চিম দিকেই হবে। উত্তর বা পূর্ব দিকটা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।
মন থেকে এসব আপদ বিপদের ভয় জোর করে তাড়িয়ে দিলাম কারণ সূর্য যতো পশ্চিমে ঢুলতে লাগলো, উপত্যকাটার রূপ ও ক্ষণে ক্ষণে বদলে যেতে লাগলো। সূর্য কিরণের কৌনিক পরিবর্তনের সাথে সাথে একই জায়গায় অন্য রূপ ফুটে উঠতে লাগলো।
বনের ভিতরে ঢুকে কোন দিকে যাবো বুঝতে না পেরে আমরা পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগলাম। রিয়া বললো, ওই দিকটায় যাই বরং, পাহাড়টা ওপাশেই, বন বেশি ঘন হবে না। আমরা সম্মত হয়ে সেদিকেই চললাম। রিয়ার কথা সত্যি করে সত্যিই বন পাতলা হয়ে এলো। কিছুক্ষণ পর পর পায়েচলা পথের দাগ দেখে বুঝলাম লোক বসতি আছে এদিকে।
আরও একটু এগিয়ে বন থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা। সেখান থেকেই শুরু হয়েছে পাহাড়ের উত্থান। একটু একটু করে উঠে গেছে আকাশের কাছাকাছি। কি অপূর্ব সেই দৃশ্য, বলে বোঝানো যাবে না। সেই পাহাড়ের ঢালে ছোট ছোট করেকটা বাড়ি দেখতে পেলাম, কাঠের তৈরি। ছাউনিটাও কাঠ দিয়েই বানানো। সবুজ জামায় সাদা চিকন কলকার মতো একটা ঝর্ণা নেমে এসে বয়ে চলেছে একটা বাড়ির পাশ দিয়ে। কিছু ভেড়া ইতস্তত চড়ে বেড়াচ্ছে। কয়েকটা ঘোড়া সেই ঝর্নার পাশে জল খেতে ব্যস্ত। দেখেই মনে হলো ঘোড়া কি সারাদিন শুধু খাবার আর জলই খায়? শরীরে তো একফোঁটাও মেদ নেই!
সব কিছুই ছবির মতো সাজানো হলেও আমরা কোনো মানুষজনের নড়াচড়া লক্ষ্য করলাম না। আগেও খেয়াল করে দেখেছি এখানে গ্রাম্য বাড়ি দেখা যায়, কিন্তু বাড়ির বাসিন্দাদের দেখা যায়না তেমন। মনে হয় রূপকথার মতো কেউ সোনার কাঠি ছুঁইয়ে তাদের ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে।
সবাই চুপচাপই ছিলাম, হঠাৎ নিরবতা ভাঙলো উমা বৌদি। বললো, "এখানে এসে আমার ভীষণ প্রেম করতে ইচ্ছা করছে! খিদে পেয়েছে খুব, শরীরের। কাকে যে খাই!"
অঙ্কিতা বললো, "খাবার জিনিস তো একটাই আছে এখানে। চলো ছিঁড়ে খাই তিনজনে মিলে!"
আমি ওদের কথা শুনে আঁতকে ওঠার ভান করে বললাম, " ভালো হবেনা কিন্তু। তিন তিনটে মেয়ে মিলে একটা ছেলের শ্লীলতাহানি করতে চাইছো, লজ্জা করে না?"
উমা বৌদি বললো, "তোমার শ্লীলতাই একটু চেখে দেখি তাহলে?"
বলেই জড়িয়ে ধরলো আমাকে। কিছু বলার আগেই আমার মাথাটা টেনে নামিয়ে ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে চুমু খেতে শুরু করলো। বৌদি যে গরম হয়ে আছে সেটা তার চুমুর আগ্রাসন দেখেই বুঝতে পারছি। পাগলের মতো চুষছে আমার ঠোঁট! আমারও ইচ্ছা করছিলো বৌদিকে একটু টিপতে, কিন্তু এসব জড়িয়ে এই সুন্দর নৈসর্গিক শোভা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে মন চাইলো না। তবে মনে মনে ঠিক করলাম, হোটেলে ফিরে বৌদিকে একটু ঠান্ডা করতে হবে।
মিনিট খানেক পরে নিজেকে বৌদির থেকে আলাদা করলাম। বৌদি নিজের হাতের উলটো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে কামুক চোখে তাকালো আমার দিকে। আমি মুখ ঘুরিয়ে দেখি অঙ্কিতা আর রিয়া আমার অবস্থা দেখে হাসছে আর একে অপরকে খোঁচা দিচ্ছে।
রিয়া বললো, " আর একটু হলেই একটা অজগর একটা হরিণছানা গিলে ফেলছিলো প্রায়!"
আমি বললাম, " কি! আমি হরিণ?" বলেই তার দিকে এগোতে গেলে সে দৌড়ে দূরে সরে গিয়ে একটা পাইন গাছের পিছনে লুকানো।
এরকম খুনসুটি করতে করতে বেশ কিছু সময় কেটে গেলো। আমি বললাম, চলো এবার ফেরা যাক্। আলাদা হয়ে বেশিক্ষণ থাকলে ওরা দুশ্চিন্তা করবেন। আমরা চারজনে ফেরার পথ ধরলাম। পিছনে তাকিয়ে দেখি ঝর্ণা তখনো একই ভাবে বয়ে চলেছে, ঘোড়াগুলো যেন আজ ঝর্ণার জল শেষ না করে থামবে না ঠিক করেছে, ভেড়াগুলো এখনো উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, শুধু সূর্য আরও একটু নেমে আসার জন্য ছায়াগুলো দীর্ঘতর হয়েছে। ফিরে আসতে মন চাইছিলো না, কিন্তু ফিরতে তো হবেই।
ফিরে এসে দেখি বড়রা বসে সেই দোকান থেকে পদ্মপাতার বাটিতে ঘুঘনি খাচ্ছে। আমাদের আসতে দেখে রিয়ার বাবা বললো, " খেয়ে দেখো, দারুণ করেছে ঘুঘনিটা। ভেড়ার মাংসের কিমা দিয়ে বানিয়েছে। অপূর্ব খেতে!" আমাদের চারজনের জন্য অর্ডার দেওয়া হলো। সত্যিই দারুণ খেতে ছিলো ঘুঘনিটা। তারপরে ঘন দুধের সর দেওয়া চা খেলাম সবাই মিলে।
হাতে তখনও ঘন্টাখানেক সময় ছিলো। বেলা বেশ পড়ে এসেছে। এখন দূরের পাইন বনগুলোকে কালো মনে হচ্ছে। বলা ভালো ধুসর লাগছে, কারণ কালো রঙের উপরে কুয়াশার একটা সাদা আস্তরণ পড়ে গভীরতা কমিয়ে দিয়েছে। পাহাড়ের চুড়ার বরফের রঙেও পরিবর্তন হয়েছে। সেগুলো আর রজতশুভ্র নেই, তাতে হালকা লাল আভা ফুটে উঠেছে। জায়গাটার ছবিটা যেন হঠাৎ কোনো ম্যাজিশিয়ান এসে বদলে দিয়েছে!
ওদের রেখে আমরা তিনজন আবার অন্য একটা দিকে গেলাম, কারণ এবারে আর উমা বৌদি মৃণালদাকে ছাড়েনি। জোর করে টেনে তুলে দুজনে আলাদা হয়ে গেলো। আমি রিয়া আর অঙ্কিতা মাঠের মধ্যেই বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরে আমি সেখানে শুয়ে আকাশ দেখতে লাগলাম।
রিয়া বললো, "মন খারাপ লাগছে তমালদা। কাল আমরা আলাদা হয়ে যাবো। আবার দেখা হবে নিশ্চিত, কিন্তু এমন পরিবেশে আর হয়তো দেখা হবে না। ভাবতেই কান্না পাচ্ছে আমার!"
তার হাতটা ধরে বললাম, "আমারও খারাপ লাগছে খুব। কাশ্মীরে এসে এতো ভালো লাগতো না, যদি তোমাদের না পেতাম। ভাবছি আমরা এই ক'টা ফ্যামিলি মিলে একটা গ্রুপ করলে কেমন হয়? মাঝে মাঝে কোথাও ঘুরতে যাবো একসাথে!"
এবারে অঙ্কিতাও মুখ খুললো। বললো, " ঠিক এই কথাটাই আমিও কয়েকদিন ধরে ভাবছি। মা আর মাসিমার যা ভাব হয়েছে, তাদের আর আলাদা করা যাবে বলে তো।মনে হয়না। আর আমিও তোমার থেকে আলাদা থাকতে পারবো না বেশিদিন। আর তোমার ওই জিনিসের গুঁতো ছাড়া যে কিভাবে কাটবে, জানি না!"

kingsuk25@ জিমেইল ডট কম


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)