আমরা প্রথমেই এসে নামলাম সেই বরফের ব্রিজের পাশে। বছরের এই সময়টায় ব্রিজের বরফের আস্তরণ ততোটা মোটা নয়, তাই উপরে বেশি দাপাদাপি করা নিষেধ। মা, গায়েত্রী মাসিমা, মৃণালদা আর রিয়ার বাবা মা ব্রিজের ধারে এসে দাঁড়ালো। আমরা চারজন হেঁটে ব্রিজের উপর দিয়ে নদীর অপর পাড়ে চলে এলাম।
প্রকৃতির এই অদ্ভুত খেয়াল আমরা মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখতে লাগলাম। সাদা বরফের নীচ থেকে দুধের মতো ফেনা তৈরি করে সশব্দে বেরিয়ে আসছে জলধারা। তারপর ধীরে ধীরে সাদা রঙ হারিয়ে নিজের সরূপ ধরে নেমে যাচ্ছে ছোট বড় পাথরের মাঝখান দিয়ে পথ করে নিয়ে। উপরে জমাট বরফ, নীচে বহমান ধারা, অনেকটা মানুষের মনের মতো বিচিত্র এই বরফের ব্রিজ।
আমি যখন মানুষের মন নিয়ে ভাবছি, একই সময়ে আর একজন ভাবছে মানুষের শরীর নিয়ে। উমা বৌদি বেশিক্ষণ আদিরস থেকে দূরে থাকতে পারে না। আমার পাশে এসে সবার কান বাঁচিয়ে চুপি চুপি বললো, "তুমি কাছে এলেই আমার নীচ দিয়ে এরকম ফেনার মতো রস বেরিয়ে আসে!" বলেই চোখ টিপে ফাজিল হাসি দিতে লাগলো। আমি চোখ বড় করে ধমক দিলাম। ইশারায় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গুরুজনদের দেখালাম। আর কিছু বললো না বটে, তবে মুচকি মুচকি হাসতে লাগলো বৌদি।
বেশ কিছুক্ষণ বরফের ব্রিজের উপর ঘোরাঘুরি করে আমরা চলে এলাম একটা স্নো স্লেজিং সাইটে। সেখানে এখন খুব একটা বরফ নেই। মে জুন মাস নাগাদ ভরা সিজন। এখন কিছু কিছু স্পটে বরফ জমে আছে আর কিছু স্থানীয় মানুষ সেটাকেই স্কিয়িং সাইট বলে টাকা কামানোর চেষ্টা করছে। অনেকেই পা দিচ্ছে তাদের ফাঁদে। উঁচু জায়গা থেকে দু তিনশো ফুট স্কি করিয়েই টাকা নিয়ে নিচ্ছে। মানুষও দেখলাম নতুন অভিজ্ঞতা পাবার জন্য অকাতরে খরচাও করছে।
অঙ্কিতা পাশে এসে বললো, "ওহ্! গুলমার্গের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে তমাল!"
আমি বললাম, "আমারও! কিন্তু সেই স্মৃতির সাথে এই বরফের কঙ্কাল তুলনা করে হাসি পাচ্ছে খুব।"
অঙ্কিতা বললো, "সবাই হয়তো ওখানে যেতে পারেনি। অথবা বাজেট নেই অতো, তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছে।"
অঙ্কিতার কথায় যুক্তি আছে। আসলে চোখে দেখেই সবকিছু বিচার করা ঠিক না। পরিস্থিতি মানুষকে অনেক কিছুর সাথেই কম্প্রোমাইজ করতে বাধ্য করে। জায়গাটায় তেমন কিছু দেখার নেই বলে ফিরে এলাম আমরা।
এরপরে কয়েকটা উপত্যকা দেখিয়ে আমাদের নিয়ে এলো অমরনাথ বেস ক্যাম্পের কাছে। বরফে ঢাকা না হলেও এখনো ইতস্তত ভাবে ভালোই বরফ জমে আছে। অমরনাথ গুহায় পৌঁছানোর আরও কয়েকটা রুট আছে। কিন্তু চন্দনওয়ারি রুটটা বেশির ভাগ মানুষ পছন্দ করে তার একটা প্রধান কারণ হলো এখান থেকে রাস্তাটা ক্রমশ উঁচু হতে হতে চুড়ায় পৌঁছেছে। অনেকটা হসপিটাল না রেল স্টেশন গুলোর র্যাম্পের মতো। মাঝে কয়েকটা সমতল বিশ্রামের জায়গা আছে। তাই এটাই সবচেয়ে কম কষ্টসাধ্য রুট।
উমা বৌদি এখানে পৌঁছেই অন্য অনেকের দেখাদেখি উপরে পাহাড়চূড়ার দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে দেবাদিদেব মহাদেবের উদ্যেশ্যে প্রণাম করলো। তারপর আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, "আচ্ছা তমাল, অমরনাথ যেতে গেলে কতোটা উঠতে হয়? জায়গা গুলো সম্পর্কে জানো কিছু? একটু বলো না শুনি? আসা তো হবে না, একটু শুনেই পূণ্য অর্জন করি!"
আমি বললাম, "হ্যাঁ আসার আগে একটু পড়াশুনা করেই এসেছি বৌদি। বলছি শোনো।"
অমরনাথ পাহাড়ের দিকে ফিরে একটা বোল্ডারের উপরে বসলাম আমি। মা, মাসীমা, রিয়ার বাবা মা এমনকি মৃণালদা পর্যন্ত আমাকে ঘিরে দাঁড়ালো। আমি বলতে শুরু করলাম -
"জায়গা গুলোর নাম নিয়ে একটা প্রচলিত উপকথা শুনেছিলাম। পুরোটাই ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর গড়া। অমরনাথ হলো শিবের বিশ্রাম গুহা। তিনি থাকেন কৈলাশে কিন্তু এটা অনেকটা তার বাগান বাড়ির মতো, বিশ্রাম টিশ্রাম নিতে আসেন বোধহয়। তিনি যখন অমরনাথ যান, প্রথমে মাথার চাঁদকে চন্দনওয়ারিতে রেখে যান।
এখন আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেই জায়গাটা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৮৯৫ মিটার বা প্রায় ৯৫০০ ফুট উঁচুতে। এখান থেকে প্রথম ধাপ হলো ১১০০০ ফুট উঁচুতে পিসুটপ বলে একটা জায়গা। তিন কিলোমিটার পায়ে হেঁটে উঠতে হয়। পথটা যে খুব সুগম তেমন নয়। পাহাড় কেটে বানানো, অসংখ্য ছোট ছোট পাথর টুকরো ছড়ানো। হয়তো যাত্রার সময় পরিস্কার করা হয়, কিন্তু এখন এই রাস্তায় এক কিলোমিটার চলাও বেশ কঠিন।
পিসুটপ থেকে এগারো কিলোমিটার হেঁটে পৌঁছাতে হয় শেষনাগ হ্রদে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১১৭৩০ ফুট উঁচুতে। এখানেই নাকি মহাদেব তার গলায় জড়ানো সাপকে বিশ্রামের জন্য রেখে যান। তাই জায়গাটার নাম শেষনাগ!"
রিয়ার বাবা বললো, "এই শেষনাগ ঝিল নাকি অপূর্ব সুন্দর। আমার এক বন্ধু ঘুরে এসে বলেছিলো।"
আমি কোনো উত্তর না দিয়ে আবার বলতে শুরু করলাম, "শেষনাগ থেকে ৪.৬ কিলোমিটার হেঁটে উঠতে হয় এই যাত্রার সর্বোচ্চ উচ্চতায়। মহাগুনা টপ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪০০০ ফুট উচ্চতায়। আসল গন্তব্য অমরনাথ গুহার উচ্চতাও এর চেয়ে কম, অর্থাৎ এখান থেকে আবার নীচের দিকে নামতে হয়।
মহাগুনা টপ থেকে ৯.৪ কিলোমিটার চলে পৌঁছাতে হয় পঞ্চতারনি, ১২০০০ ফুট উঁচুতে। সেখান থেকে আবার উপরে ওঠা শুরু। তিন কিলোমিটার পায়ে হেঁটে ১৩০০০ ফুট উঁচুতে যেতে হয় সঙ্গমে। সঙ্গম থেকে আরও ৩ কিলোমিটার গেলে গন্তব্য অমরনাথ গুহায় পৌঁছানো যায়। ১৩৫০০ ফুট উঁচুতে। পুরো যাত্রাপথ অসম্ভব দুর্গম আর কষ্টসাধ্য। সবার পক্ষে অমরনাথ পৌঁছানো সম্ভব হয়না।"
উমা বৌদি বললো, "বাপরে! এতো পথ? আচ্ছা অসুস্থ হয়ে পড়লে কি করে মানুষ? খিদে পেলেই বা কি করে। সাথে তো আর এতো খাবার দাবার নিয়ে ওঠা যায় না এই পথে?"
বললাম, "পথে সরকার থেকে চিকিৎসা এবং ভান্ডারার ব্যবস্থা করা হয় যাতে অসুস্থ এবং ক্ষুদার্ত মানুষকে সাহায্য করা যায়। অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও একই কাজ করে। খুব অসুস্থ হলে হেলিকপ্টারে করেও হাসপাতাল নিয়ে যাবার ব্যবস্থা আছে।"
যাত্রা পথের বিবরণ শুনেই বোধহয় মৃণালদা হাঁপিয়ে উঠলো। একটা বড়সড় কাপড়ের পুঁটুলির মতো মৃণালদা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে নিজের মনেই বললো, " ওরে বাপরে! এ সম্ভব না, কিছুতেই সম্ভব না!"
আর যায় কোথায়! ঝাঁঝিয়ে উঠলো উমা বৌদি! "চুপ করো তুমি! তোমার দ্বারা কিছুই সম্ভব না। বাড়ির পাশে অমরাবতী পার্কে নিয়ে গেলে না কোনোদিন, তো আবার অমরনাথ! সেই কপাল করে কি এসেছি!"
এতো লোকের সামনে কথা গুলো শুনে মৃণালদা লজ্জায়, অপমানে কুঁকড়ে গেলো। মুখটা শুকিয়ে পাংশু হয়ে গেলো।
আমার খুব খারাপ লাগলো ব্যাপারটা। আমি প্রতিবাদ করে বললাম, " বৌদি, আপনি থামুন তো! প্রথমদিন থেকেই দেখছি আপনি মৃণালদাকে যখন তখন অপমান করে যাচ্ছেন। সবাই এক রকম হয়না বৌদি। এখানে আমরা যারা আছি, তারা কেউই অমরনাথ যাত্রার জন্য ফিট নই। আপনি আমি রিয়া অঙ্কিতা পর্যন্ত কেউ পৌঁছাতে পারবো কিনা সন্দেহ। কেন শুধু শুধু মৃণালদাকে দোষ দিচ্ছেন? উনি আপনাকে এই পর্যন্ত এনেছেন তো? এটাও ক'জন করে শুনি?"
আমার কথা শেষ হতেই মা, গায়েত্রী মাসিমা, রিয়ার মা'ও নানা ভাবে বৌদিকে বোঝাতে লাগলো। আমি উঠে চলে এলাম সেখান থেকে। হাঁটতে হাঁটতে একটু আড়ালে এসে একটা সিগারেট ধরিয়ে তাকিয়ে রইলাম নীচে উপত্যকার দিকে। দূরে পাথরের মাঝে একটা চঞ্চলা কিশোরীর মতো লিডার নদী লাফিয়ে চলেছে নিজের খেয়ালে!
কিছুক্ষণ পরে টের পেলাম রিয়া অঙ্কিতা আর উমা বৌদি এসে দাঁড়ালো আমার দুপাশে। উমা বৌদি আমার হাতটা ধরে বললো, "সরি তমাল! আমার ওভাবে বলা উচিৎ হয়নি!"
আমি তার দিকে ফিরে বললাম, " সরিটা আমাকে নয়, মৃণালদাকে বলুন বৌদি। সবারই মান সম্মান আছে। আপনি বন্ধ ঘরে তাকে যা খুশি বলুন, কিন্তু এতোগুলো মানুষের সামনে তাকে অপমান করার অধিকার কে দিয়েছে আপনাকে? আপনি তো আপনার অতৃপ্তি তাও আমার কাছে মিটিয়ে নিচ্ছেন অল্প হলেও, কিন্তু ওই লোকটার কথা একবার ভেবে দেখেছেন? নিজের শারীরিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক অক্ষমতা নিয়ে কি সাংঘাতিক মানসিক যন্ত্রণা বয়ে চলেছে দিনের পর দিন? আর কিছু না হোক একটু সহানুভূতি দেখিয়ে বাকী জীবনটা তাকে শান্তি দিন। আপনার কোনো কাজেই তিনি বাঁধা দেন না, তাহলে আর তাকে অপরাধী নাই বা করলেন বৌদি!"

kingsuk25@ জিমেইল ডট কম


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)