কাশ্মীরে কেলেঙ্কারি
অধ্যায় - কুড়ি
প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে গেলাম পহেলগামের। আমার মতে কাশ্মীর ট্যুরের সেরা জায়গা এই পহেলগাম। তাকালে চোখ ফেরানো যায় না, তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা করে, এতোই মনোরম প্রকৃতির শোভা এখানে। ছোট্ট জায়গা, পাহাড় ঘেরা। রাস্তার পাশে ছোট ছোট অস্থায়ী দোকান। অবাক করা বিষয় হোলো রাস্তার পাশে একটা বাংলায় লেখা সাইনবোর্ডও চোখে পড়লো। পরে খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। রাস্তাটা এমন ভাবে একটা উঁচু পাহাড়ের চড়াই বেয়ে সোজা উঠে গেছে যে দেখলে মনে হয় চলতে চলতে লাফ দিয়ে চুড়ায় উঠে পড়েছে সেটা।
এখানে বড় হোটেল নেই বললেই চলে। দু তিনটে হোটেলে ভাগ হয়ে আমাদের জায়গা হলো। আমাদের ভাগ্য খুব ভালো যে আমাদের তিনটে পরিবারকে একটা ছোট্ট হোটেলে ব্যবস্থা করে দিলো তরুদা। রিয়ারা আলাদা হোটেলে উঠলো। এদের এই গ্রুপ করাটা আমার মনে হলো বৈষ্ণোদেবী যাওয়া আর না যাওয়া দল হিসাবেই করা। তাতে অবশ্য রিয়ার খুব একটা অসুবিধা হলো না, কিন্তু বিপদে পড়লো মৃণালদা।
তার তাসের বন্ধুরা একটু দূরের একটা হোটেলে জায়গা পেয়েছে। রাত বিরেতে সেখানে যাতায়াতের সমস্যা বলে তার ভারী মন খারাপ। সমাধান ও হয়ে গেলো অচিরেই। তাস পার্টিতে মৃণালদা যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সেটা বুঝলাম যখন তারা এসে মৃণালদা আর উমা বৌদিকে তাদের হোটেলে ঘর এক্সচেঞ্জ করে নিতে অনুরোধ করলো। তাদের প্রস্তাব শুনে মৃণালদা চাতক পাখির মতো উমা বৌদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো সম্মতির আশায়।
কিন্তু উমা বৌদি আমাদের ছেড়ে যেতে নারাজ। ওদিকে রিয়াও আমাদের দলে ভিড়তে চায়। শেষ পর্যন্ত সমাধান বের করলো বৌদিই। বললো, একটা ব্যবস্থা হতে পারে, যদি কথা দেন যে আপনারা ওর খেয়াল রাখবেন আর বেশি মদ খেতে দেবেন না। ও আপনাদের সাথে থাকতে পারে। তাহলে আমি মাসিমাদের রুমে থাকবো আর আমাদের রুমে অঙ্কিতা আর রিয়া থাকবে। তার মানে বৌদি কায়দা করে আমার রুমটা শ্রীনগরের মতো ফাঁকা রেখে দিলো, সেখানে থাকবো আমি একা।
তাসুড়েরা আনন্দে হৈ হৈ করে স্বাগতম জানালো প্রস্তাবটায়। রিয়ার চোখের তারাও দেখলাম জ্বলজ্বল করে উঠলো। সেও নিজের বাবা মায়ের দিকে প্রত্যাশা নিয়ে তাকালো। তাদের অবশ্য আপত্তি ছিলো না। এই বয়সে এসে সেকেন্ড হানিমুনে এরকম ফাঁকা ঘর তাদেরও বেশ রোমাঞ্চিত করে তুলছে, বুঝতে পারলাম।
ঘর বন্টন হয়ে যাবার পরে আমরা হোটেল রুমে এসে ঢুকলাম। এতো সুন্দর হোটেলে জীবনে থাকিনি আমি। হোটেলের বাহ্যিক চাকচিক্যের কথা বলছি না, সেটা তো খুবই সাধারণ, কিন্তু লোকেশন আর ছিমছাম পরিবেশের জন্য ভীষণ ভালো লাগছে। হোটেলটায় ঘর সাকুল্যে চারটে। নীচে দুটো আর দোতলায় দুটো। নীচের একটা ঘরে অফিস আর স্টাফরা থাকে। অন্য ঘরটা মা, গায়েত্রী মাসিমা আর উমা বৌদি নিলো, কারণ মা আর মাসিমার জন্য সিঁড়ি ভাঙা কষ্টকর।
সুতরাং দোতলার ঘর দুটো আমার অঙ্কিতার আর রিয়ার প্রাইভেট হানিমুন স্যুইটে পরিনত হলো। পাশাপাশি দুটো ঘর, পাশ দিয়ে কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে লিডার নদী। নদীর উপরে ঝুঁকে আছে দুই ঘরের একটা কমন ব্যালকনি। দুটো ঘর থেকেই দরজা খুলে ব্যলকনিতে যাওয়া যায়। সেখানে গদি মোড়া বেতের সোফা আর একটা ছোট্ট টেবিল রয়েছে।
নদীটা এখানে ছোট্ট। শীতকাল বলে জল ভীষণ কম। ছোট বড় পাথরের ফাঁক গলে বয়ে চলেছে বরফ গলা জল। কেউ চাইলে সেই পাথরগুলোর উপরে পা রেখে অনায়াসে পেরিয়ে যেতে পারে। ওপাশেই পাইনের ঘন জঙ্গল। ওদিকে লোক বসতি নেই, দেখলেই বোঝা যায়। এমনকি কেউ খুব একটা আসা যাওয়াও করে না হয়তো। করলে পায়ে চলা পথ তৈরি হতো। পাখির ডাকে একটা অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমরা ঘরে ব্যাগপত্র রেখে ব্যালকনিতে এসে বসলাম।
রিয়াই সবচেয়ে উৎফুল্ল হোটেল আর ব্যালকনি দেখে। বললো- "উফফ ভাবতেই পারছি না যে এরকম একটা হোটেল পাবো। আসলে হোটেল না বলে রিসর্ট বলাই উচিৎ।"
অঙ্কিতা ফোড়ন কাটলো- "হুম, একপাশে লিডার নদী অন্য পাশে আবার লাভার, খেলা জমে যাবে চারদিন, কি বলিস রিয়া?"
আমি ও মশলা যোগ করলাম ফোড়নে, "খেলা তো জমবেই সাথে যখন তিন তিনটে চিয়ার-লিডার!"
অঙ্কিতা বললো, "আচ্ছা এক কাজ করলে হয় না? রুম তো দুটো? তাহলে একদিন তুই সারারাত তমালকে নিয়ে শুবি, একদিন আমি। কেমন হবে?"
রিয়া পুরো লাল হয়ে গেলো শুনে। বললো- " ইসসসস্! চুপ কর! যা মুখে আসে বলিস!"
আমি হেসে বললাম- "অপরাধীর তো মনে হয়, নিজস্ব মতামত দেবার অধিকার নেই, তাই না?"
অঙ্কিতা বললো- "না, নেই। চুপ করে মাথা নীচু করে বসে থাকো জজ সাহেবাদের সামনে।"
"ছেলেটাকে বকছিস কেন রে এভাবে?" বলতে বলতে উমা বৌদি এসে দাঁড়ালো ব্যালকনিতে। তারপর চারপাশে তাকিয়ে মুখ দিয়ে একটা আনন্দসুচক শব্দ করলো। বললো- আমাদের নীচে ব্যালকনি নেই, তবে জানলা খুললেই নদী, হাতের নাগালে। উপরটা আরো সুন্দর। ছবির মতো! তা তোদের কি আলোচনা চলছিলো? নীল ছবি বানাবার প্ল্যান নয় তো?"
অঙ্কিতা একটু আগে রিয়াকে দেওয়া প্রস্তাবের কথা বেমালুম চেপে গেলো। শুনলে বৌদিও ভাগ বসাতে পারে ভেবেই হয়তো। বললো- "তোমার আইডিয়াটাও ভেবে দেখার মতো তবে তমালকে বলছিলাম, একটু চা হলে ভালো হতো এখন। বেশ ব্যালকনিতে বসে খেতাম!"
আমি বললাম- "দাঁড়াও, বলে আসছি চায়ের কথা। তোমরা গল্প করো।"
চায়ের ব্যবস্থা এই হোটেল থেকেই করলাম। সাথে কিছু পাওয়া যাবে কি না জিজ্ঞেস করাতে বললো, মিনিট পনেরো অপেক্ষা করলে পেঁয়াজি ভেজে দিতে পারে। এই ভর দুপুরে পেঁয়াজি একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে ভেবে নাকচ করে দিলাম। কিন্তু সন্ধ্যে বেলার চায়ের সাথে ভালো পকৌড়ার অর্ডার দিয়ে দিলাম সবার জন্য। আমরা ট্যুর পার্টির সাথে এসেছি। খাওয়া দাওয়া থেকে এদের কোনো লাভ নেই সেটা জানে, তাই এই অর্ডারে বেশ খুশি হলো ছেলেগুলো উপরি কিছু ইনকাম হবে ভেবে। আমি ছ'কাপ চা আর বিস্কুট পাঠিয়ে দিতে বললাম। দুকাপ নীচের ঘরে পাঠাতে হবে, তাও বলে দিলাম।
অর্ডার দিয়ে মায়েদের ঘরে ঢুকে দেখি বেশ গুছিয়ে বসেছে দুজনে। নদীর দিকের জানলা খোলা। বৌদি যেমন বলেছিলো, সেভাবেই একদম হাতের নাগালে বয়ে চলেছে নদী। আমি মা আর গায়েত্রী মাসিমাকে জানালাম চা আসছে, পান পর্বটা একটু বিলম্বিত করতে।
দোতলার বারান্দায় ফিরে এসে দেখি জোর আলোচনা চলছে। বিষয়টা যে বেশ গোপনীয় সেটা তিনটে মাথা কাছাকাছি দেখে আর গলার চাপা স্বর শুনেই বুঝতে পারলাম। আমাকে আসতে দেখে তিনজনই চুপ করে গিয়ে সোজা হয়ে বসলো, যেন এই মাত্র ছাত্রীদের কোলাহলরত ক্লাসরুমে হেডমাস্টার ঢুকলো। আমি তিনজনের দিকেই একে একে তাকিয়ে ভুরু নাচিয়ে জানতে চাইলাম ব্যাপারটা কি? অন্য দুই ছাত্রী মনিটরের দিকে তাকালো ক্লাসের সমস্যা হেডস্যারকে জানাবার দায়িত্ব দিয়ে। মনিটর অর্থাৎ উমা বৌদি শব্দ করে গলাটা পরিস্কার করে নিলো।
তারপর বললো, "আমরা একটা জিনিস ভাবছি তমাল। এখন তোমার অনুমতি চাই!"
আমি বললাম," বাবা! অনুমতি? বেশ গুরুতর আবেদন মনে হচ্ছে?"
বৌদি বললো," গুরুতর না, কিন্তু সবার মতামত তো চাই? আমরা তিনজন রাজি আছি, এখন তুমি রাজি হলেই শুটিংয়ের ব্যবস্থা করা যায়।"
আমি একটু থতমত খেয়ে বললাম, "কিসের ব্যবস্থা? শুটিং?"
বৌদি বললো, "দেখো, এই ক'দিনে আমাদের ভিতরে গোপন তো আর কিছুই নেই। আর তিন চারদিন পরে আবার যে যার জীবনে ফিরে যাবো। এই দিনগুলো স্মৃতি হয়েই থেকে যাবে। আর সবাই জানি স্মৃতি সময়ের সাথে ফিকে হয়ে আসে। তাই আমরা চাই এই স্মৃতি গুলো সারাজীবন একই রকম থাকুক স্মৃতিচিহ্নের ভিতরে।"
বৌদি এই পর্যন্ত বলে একটু দম নেবার জন্য থামলো। ভনিতাটা কিসের ধরতে না পেরে আমি মজা করে বললাম, "অ্যাই, তোমরা তিনজন মিলে আমাকে বিয়ে করার প্ল্যান করোনি তো সারাজীবন থ্রিসাম করার জন্য? মোঘল আমল হলে অসুবিধা ছিলো না, হারেম বানিয়ে রোজ স্মৃতি রিচার্জ করা যেত, কিন্তু এই যুগে সেটা করতে হলে তো আমাকে ধর্ম বদলাতে হবে!"

kingsuk25@ জিমেইল ডট কম


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)