এবারে অঙ্কিতা জানালার কাছে, তারপর আমি, রিয়া এবং উমা বৌদি। গাড়ি চলতে শুরু করলো। এরপরে গাড়ি আরো তিনটে জায়গায় খুব অল্প সময়ের জন্য থামলো কোকারনাগ, সিন্থান টপ আর ডাকসুমে। কোকারনাগে একটা উষ্ণপ্রস্রবণ রয়েছে। সিন্থান টপ আর ডাকসুম নির্ভেজাল ভিউ পয়েন্ট। সেগুলোতে থেমে আমরা প্রাণ ভরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করলাম।
এখানকার পরিবেশ এতোই মনোমুগ্ধকর যে প্রতিবারই জায়গাগুলো ঘুরে আসার পরে কিছুক্ষণের জন্য আমাদের মতো বাচাল ছেলেমেয়েকেও চুপ করিয়ে রাখে। আবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগে।
এর পরে গাড়ি এসে একটা ধ্বংসস্তুপের সামনে পৌঁছালো। যেভাবে পার্ক করলো, বুঝলাম এখানে বেশ খানিকটা সময় থাকবে। সম্ভবত সকালের জলখাবারও এখানেই দিয়ে দেওয়া হবে। সবাই নেমে এলাম গাড়ি থেকে। মা আর গায়েত্রী মাসিমা একটু হাঁটাহাঁটি করে পায়ের জড়তা ছাড়িয়ে নিয়ে আবারও গাড়িতে উঠে গেলো। মৃণালদা আর তার তাসের সঙ্গীদের দেখতে পেলাম না। সম্ভবত আড়ালে কোথাও জরুরী কাজে গেছে।
আমরা চারজন ভিতরে ঢুকে পড়লাম। আমাদের আগেই একটা গ্রুপ একজন গাইড নিয়েছে। তার হাবভাব বেশ আমির খান টাইপের। অনর্গল বকবক করে এই ধ্বংসস্তূপ সম্পর্কে তথ্য দিয়ে যাচ্ছে হিন্দিতে। আমরা একটু দূরত্ব বজায় রেখেই তাদের পিছু পিছু চলতে লাগলাম।
আমির খানের সস্তা ভার্সন বলে চলেছে- "নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি রাজা অবন্তীবর্মন এটা তৈরি করেন। সেই জন্যই এই জায়গার নাম অবন্তীপুর। রাজার রাজধানীও এটাই ছিলো। এখানে রাজা এই জোড়া মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। একটি বিষ্ণু মন্দির, অন্যটি শিব মন্দির। এই ছোট মন্দিরটি হলো বিষ্ণু মন্দির যার নাম অবন্তীস্বামী মন্দির আর ওই দূরের বড় মন্দিরটি হলো শিবের মন্দির, নাম অবন্তীশ্বর মন্দির।"
সমবেত সকলে কপালে হাত ছুঁইয়ে বিষ্ণু এবং শিবের ভাঙা বাড়ির উদ্দেশ্যে প্রণাম করলো। কুড়ি বাইশ জনের একটা দল। পোশাক দেখে মনে হলো হিন্দি বলয়ের কোনো রাজ্য থেকে এসেছে। বিভিন্ন বয়সের মানুষ রয়েছে দলে, আট থেকে আশি। তাদের কলরবে কান ঝালাপালা হবার যোগাড়!
গাইড আবার বলতে শুরু করলো-"চতুর্দশ শতাব্দীতে . শাসনকালে এই মন্দির ভেঙে ফেলা হয়। এতোই মজবুত ছিলো এই মন্দির যে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলতে তাদের বৎসরকাল সময় লেগেছিলো। তারপরেও সম্পূর্ণ ধবংস করতে পারেনি।"
অবন্তীস্বামী মন্দিরের পরে দলটা চললো অবন্তীশ্বর মন্দিরের দিকে। আমরাও পিছু নিলাম। বিনা পয়সায় তথ্য সংগ্রহের সুযোগ ছাড়লাম না। এই মন্দিরটা তুলনামূলক অনেক বড়। গর্ভগৃহ, নাট মন্দির কিছুই অবশিষ্ট নেই আর। কিন্তু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ দেখে অনুমান করা যায়, কি বিশাল স্থাপত্য কীর্তি ছিলো এটা! . শাসকরা ভারতের প্রাচীণ স্থাপনার যে কি পরিমান ক্ষতি করেছিলো, ভাবলেই মেজাজ গরম হয়ে যায়।
ক্ষতি এখনকার মানুষও কম করছে না। সবাই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে ব্যস্ত, কিন্তু দলের দুই নবযৌবন যুবক যুবতীর গাইডের কথায় কোনো মনযোগ নেই। তারা নিজেদের মোহে মত্ত। ভীড় থেকে আলাদাই রয়েছে তারা। যেভাবে শরীরে শরীর ঘষছে তাতে স্পষ্ট যে নতুন প্রেমে পাগল তারা। দেখলাম চট্ করে মেয়েটাকে নিয়ে একটু আলাদা হয়ে গেলো ছেলেটা। তারপর পড়ে থাকা একটা ইটের টুকরো তুলে নিয়ে একটা থামের গায়ে জঘন্য হস্তাক্ষরে হিন্দিতে লিখে ফেললো "রাজেশ +লছমী!"
ছেলেটা প্রেমের এই মহান স্মারক রেখে যাবার পুরস্কার হিসাবে মেয়েটা তার গজিয়ে ওঠা ডাসা মাই দুটো ভালো করে রগড়ে দিলো ছেলেটার হাতে। এর বেশি কিছু করার সুযোগ পেলোনা এতো মানুষের উপস্থিতিতে। মেজাজ ভীষণ গরম হয়ে গেলেও কিছু বললাম না। ভারতের মহান স্থাপত্য গুলোর দেওয়ালে দেওয়ালে এই সব জোড়া নাম দেখলেই আমার রাগ আর দুঃখ ঘৃণায় পরিনত হয়।
এর পরে গাইড চলে এলো সারি সারি থাম ওয়ালা একটা লম্বা করিডোরে। এই জায়গাটা এখনো অনেকটাই বেঁচে আছে। গাইড বললো- "জায়গাটাকে বলে পাণ্ডব লরি, বা পাণ্ডবদের বাড়ি। এখানে পাণ্ডবরা থাকতো!" সবাই আবার কপালে হাত ঠেকালো।
আমি মনে মনে হেসে উঠলাম গাইডের কথা শুনে। যারা টাকা দিয়ে তাকে ভাড়া করেছে, তারা কেউ প্রশ্ন করলো না যে নবম শতাব্দীতে যা তৈরি হয়েছে তা পাণ্ডবদের বাড়ি কিভাবে হয়। এরা মানুষকে মুগ্ধ করতে এরকম বিভিন্ন মিথ্যা কথা বলেই থাকে। কেন এমন নাম হয়েছিলো জানিনা, কিন্তু এর ভিতরে যে ঐতিহাসিক সত্যতা বিন্দুমাত্র নেই, সেটা বোঝা গেলো।
এবারে গাইড একটা চমৎকার তথ্য দিলো। বললো- "এখানে আঁধি সিনেমার শুটিং হয়েছিলো। চাঁদনি রাতে সঞ্জীব কাপুর আর সুচিত্রা সেনের সেই বিখ্যাত গান, 'তেরে বিনা জিন্দেগীসে কোই শিকোয়া নেহি' এর শুটিং এখানেই হয়েছিলো।"
ভালো করে দেখে বুঝতে পারলাম, এটা মিথ্যা নয়। গানের দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। ভাঙা থামের সারির ভিতরে দুজনে ঘুরছে, আকাশ জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে। এতোক্ষন কেউ কোনো কথা বলিনি। এবারে কথা বললো উমা বৌদি। গাইড তখন দলটা নিয়ে গেটের দিকে চলেছে। দেখা শেষ তাদের। প্রেমিক যুগল আরও দু একটা জায়গায় তাদের নাম খোদাই করলো। আমি এগিয়ে গিয়ে নাম গুলো মোছার চেষ্টা করলাম হাত দিয়ে। কিন্তু নাম গুলো এবড়োখেবড়ো পাথরে বেশ পাকাপাকি ভাবেই বসে গেছে।
উমা বৌদি কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো- "কি করছো তমাল?" আমি উত্তর দিলাম না। বৌদি দেখে বললো- "থাক, মুছো না। বৃষ্টি একদিন মুছে দেবে। ততো দিন থাক না রাজেশ লছমীর সাথে জোড়া লেগে!"
আমি চমকে উঠলাম। উমা বৌদি আমাকে অবাক করেই চলেছে। এভাবে ভেবে দেখিনি আমি। সত্যিই তো, ছেলে মেয়ে দুটো হয়তো সদ্য প্রেমে পড়েছে। রাজেশ শাহজাহান তো নয় যে লছমীর জন্য তাজমহল গড়িয়ে দেবে? কিন্তু মানুষ মাত্রেই চায় তাদের প্রেম অমর হয়ে থাক। এই ভাঙা মন্দির অনেকদিন টিকে আছে। রাজেশও চেষ্টা করেছে সেখানে ইটের টুকরো দিয়ে লিখে নিজেদের প্রেম কথা অমর করতে, সারা পৃথিবীকে তাদের ভালোবাসার কথা জানাতে! থাক্, খোদাই তো করেনি? একদিন প্রকৃতিই তার নিজস্ব নিয়মে মুছে দিয়ে বুঝিয়ে দেবে কোনো কিছুই অমর হয়না। মৃত্যু হবেই, মানুষ হোক বা প্রেম।
উমা বৌদি আরও একটু কাছে সরে এসে বললো- "জানো তমাল, আঁধি সিনেমার গানটা যখন প্রথম দেখেছিলাম, তখন ইচ্ছা হয়েছিলো, ইসস যদি প্রেমিকের হাত ধরে এখানে চাঁদনি রাতে এভাবে ঘুরে বেড়াতে পারতাম!"
আমি ইয়ার্কি মেরে বললাম- "শুধু ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছা হয়েছিলো? রোমান্টিক রাতে জায়গাটা কিন্তু অন্য কাজের জন্যও পারফেক্ট!" বলে একটা চোখ মারলাম বৌদির দিকে তাকিয়ে।
ব্যাস! পাগলকে সাঁকো নাড়ানোর কথা মনে করিয়ে দিলাম। এমনিতেই গরম কথার স্রোত বয় মুখে, তারপর যদি প্রসঙ্গ তুলি তাহলে তো কথাই নেই। বৌদি লুফে নিলো কথাটা। বললো- "করেনি আবার! কিন্তু বলতে একটু লজ্জা পাচ্ছিলাম। কতোবার চোখ বন্ধ করে এই থামের আড়ালে মারাচ্ছি ভেবে আঙুল দিয়েছি গুনে শেষ করা যাবে না।"
বৌদি উত্তেজিত হয়ে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো, এমন সময় ট্যুর কোম্পানির একটা ছেলে এসে জানিয়ে গেলো যে জলখাবার রেডি। গরম গরম লুচি তরকারি কিভাবে এতো অল্প সময়ে এরা বানিয়ে ফেললো জানি না, তবে বেশ মজা করেই সারা হলো প্রাতরাশ।
সবাই ফিরলে গাড়ি ছেড়ে দিলো। পথে আর কোথাও থামা হলো না। এই রাস্তাটা একসময় গিয়ে চুয়াল্লিশ নম্বর জাতীয় সড়কে মিশলো, তারপর সোজা পহেলগাম।

kingsuk25@ জিমেইল ডট কম


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)