কাশ্মীরে কেলেঙ্কারি
অধ্যায় - পনেরো
রিয়া থামার প্রায় সাথে সাথেই আমাদের গাড়িও থেমে গেলো। দেখলাম আমরা গুলমার্গ পোঁছে গেছি। প্রচুর গাড়ি দেখেই বুঝলাম এখানে বেশ ভিড় হবে। আমাদের নামিয়ে দিয়ে গাড়ি গুলো পার্কিং এরিয়াতে চলে গেলো। তরুদা বললো এখানে সারাদিন থাকবে। সময় বেশি দেবার কারণ যে যার মতো রাইড নিতে পারে। কেউ একাধিক রাইড নিলে ফিরতে দেরী হবে। গন্ডোলা রাইড তিনঘন্টার, কিন্তু টিকিটে প্রচুর লাইন থাকে বলে সাধারণত পাঁচ সাড়ে পাঁচ ঘন্টা লেগে যায়। এখান থেকে গাড়ি সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ছাড়বে। সেই মতো সবাইকে ঠিক এই জায়গাতেই উপস্থিত থাকতে হবে।
জায়গাটা ভীষণ ঘিঞ্জি। সারি সারি অস্থায়ী খাবারের দোকান আর হাকডাকে সরগরম। তবে সব চেয়ে জঘন্য হলো এখানকার দালাল চক্র। পিছনে পুরো জোঁকের মতো লেগে আছে। আমাদের পোষাক যথেষ্ট গরম হওয়া সত্ত্বেও তাদের কথায় ভয় পেয়ে ভাড়া করে মোটা জ্যাকেট আর জুতো নিতে হলো।
গন্ডোলা ছাড়ার স্টেশন গুলমার্গ রিসোর্ট এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে। আমাদের গাড়ির সেখানে যাবার পারমিশন নেই। অগত্যা লোকাল গাড়ি ভাড়া করতে হলো। টিকিট কাউন্টারে পৌঁছে দেখলাম প্রচুর ভীড়। মনটা দমে গেলো। এখানে লাইন দিলে অন্তত দু ঘন্টা লাগবে। সাইটে পৌঁছে তিন ঘন্টা। পাঁচ ঘন্টা এখানেই শেষ, অথচ আমার ফিরে এসে একটু ঘোড়ায় চড়ে জায়গাটা চক্কর দিয়ে আসার প্ল্যান ছিলো!
টিকিট কাউন্টারের সামনে ফেয়ার চার্টটা টাঙানো ছিলো। গন্ডোলা দুটো ধাপে যায়। প্রথম ধাপ হলো এখান থেকে ছাব্বিশ'শ মিটার উঁচুতে কংডুরি বা কন্দুরি। সেখান থেকে আরও উপরে উনচল্লিশ'শ পঞ্চাশ মিটার উঁচুতে আর একটা ধাপ আছে যেটা আফরওয়াত পর্বতের কাঁধের কাছে। নভেম্বরে কংডুরিতে খুব বেশি বরফ নেই কিন্তু আফরওয়াতে প্রচুর বরফ। সেখানে স্কি এবং স্নোমোবিল চড়ার ব্যবস্থা আছে। প্রথম স্তরের টিকিট মাথাপিছু সাড়ে চারশ টাকা এবং দ্বিতীয় স্তরের জন্য আবার সাড়ে ছ'শ টাকা। (বর্তমানে ওই ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি)।
ফেয়ার চার্টের দিকে তাকিয়ে উমা বৌদির মুখ শুকিয়ে গেলো। সে বললো- "তোমারা ঘুরে এসো তমাল। তোমার মৃণালদার তো ঠান্ডার ধাত, আমি বরং তাকে নিয়ে এখানেই অপেক্ষা করছি।"
আমি বললাম- "কি সব বলছো? এইটুকু উঁচুতে গেলে কিচ্ছু হবে না মৃণালদার। কাশ্মীর এসে গন্ডোলা না চড়েই চলে যাবে? তাই হয় নাকি?"
বৌদি বললো- "বোঝার চেষ্টা করো ভাই। ভাড়টাও আমাদের সাধ্যের বাইরে। বরফ তো দেখলাম, বাকীটা নাহয় তোমাদের মুখে শুনে নেবো? আমাদের বাদ দাও ভাই!"
আমি বৌদিকে একটু সাইডে নিয়ে গিয়ে বললাম- "টাকার জন্য ভাবছো? ওসব তোমাকে ভাবত হবে না। ওটা তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও। তুমি এক কাজ করো, দেখো এখানে খাবার কিছু পাও কি না, কেক টেক কিছু হলেই হবে। আমি টিকিটের ব্যবস্থা করছি।"
বৌদি আপত্তি করে কিছু বলতে যাচ্ছিলো, এমন সময় রিয়ে এসে বললো- "বৌদি তুমি মিছেই এসব ভাবছো। আমার কাছেও বেশ কিছু টাকা আছে। তুমি চিন্তা করোনা। গেলে সবাই একসাথে যাবো নয়তো যাবো না।"
বৌদি আর কিছু বললো না। কিন্তু তার মুখটা হাসিতে ঝলমল করে উঠলো।
কখনো কখনো অনৈতিক পথও যে উপকারে আসে সেটা বুঝলাম একটু পরেই। টিকিটের বিশাল লাইনে দাঁড়াবো ঠিক করছি, সেই সময় স্থানীয় একজন কাশ্মীরি এসে জিজ্ঞাসা করলো গন্ডোলার টিকিট চাই কি না? অঙ্কিতা তাকে পত্রপাঠ বিদায় করে দিতে চাইলে সে বললো, তাকে কিছু টাকা দিলে সে ব্যবস্থা করে দিতে পারে। এখানে দালালের রেট অনেক বেশি। কিন্তু তার মা অসুস্থ, কিছু টাকার দরকার। তার ভাই ভোর বেলা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা পিছু পঞ্চাশ টাকা বেশি দিলে সে টিকিট কেটে দেবে। এমন কি গন্ডোলাতে উঠিয়েও দেবে।
আমার কিন্তু টাকাটা সামান্যই মনে হলো। কারণ দালালরা মাথাপিছু দু'শ টাকা বেশি চাইছে একই কাজের জন্য, আমি নিজের কানে শুনেছি। রাজি হয়ে গেলাম। ছেলেটা দশ মিনিটের ভিতরে টিকিট এনে আমাদের ভিতরে নিয়ে গেলো। সে যে গন্ডোলাতে উঠিয়ে দেবার কথা কেন বলেছিলো এখন বুঝতে পারছি। চরম অব্যবস্থা এখানে। কেবল কার এলেই হুড়োহুড়ি করে সবাই আগে উঠতে চাইছে।বয়স্ক মানুষরা যুবকদের সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
ছেলেটা আর তার ভাই হাতে হাত ধরে আমাদের ঘিরে একটা বলয় তৈরি করে দাঁড়িয়ে রইলো। আমিও যোগ দিলাম তাদের সাথে। একটা কারে ছ'জন করে চড়তে পারে। প্রথম কারটা এলে মা, মাসীমা, মৃণালদা, বৌদি আর রিয়ার বাবা মা চড়লেন। তাদের কার চলতে শুরু করলে পরের কারটা এলো। ছেলেটার হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে আমরা তিনজন উঠে পড়লাম। একদিকের বেঞ্চিতে পাশাপাশি বসলাম আমরা। অন্য বেঞ্চিতে অন্য তিনজন যাত্রী উঠলো।
কংডুরি উপত্যকায় পৌঁছাতে নয় মিনিট সময় লাগলো। রোপওয়ের পুরো রাস্তাটা পাইন বনের উপর দিয়ে উড়ে এলাম। কোথাও বরফ ঢাকা, কোথাও ঘাসে ছাওয়া জমি। কি অপূর্ব দৃশ্য, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। মনে হচ্ছিলো এটা ভারতবর্ষের কোনো জায়গা নয়, ইউরোপের টুরিস্ট স্পট। পুরো পাইন গাছ বরফে ঢাকা নয়, কিন্তু তাদের শাখা থেকে ঝুলে আছে সাদা সুতোর মতো। কয়েকবার সেই জমা বরফ কে পাইন শাখা থেকে খসে পড়তেও দেখলাম। ছবি তোলার জন্য কেবল কারের জানালা খুলে ক্যামেরা সহ হাত বের করেছিলাম বাইরে। কনকনে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা টের পেলাম।
কংডুরি পৌঁছে দেখলাম মায়েরা গন্ডোলা থেকে নেমে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে? একটা বেঞ্চিতে মৃণালদা গুটিসুটি মেরে বসে আছে। আমরা প্ল্যাটফর্ম থেকে নীচে নামলাম। কারের জানালা খুলে যতো ঠান্ডা মনে হয়েছিলো, এখানে কিন্তু পরিবশ সম্পূর্ণ বিপরীত। মোটা জ্যাকেট চাপানোর জন্য রীতিমতো গরম লাগছে। আমি ভাড়া করা জ্যাকেট খুলে হাতে নিলাম। আমার দেখাদেখি সবাই তাই করলো মৃণালদা বাদে। বুঝলাম পোশাক ওয়ালা ঠকিয়ে এগুলো গছিয়ে দিয়েছে আমাদের।
একজন স্থানীয় বিক্রেতা একধরনের গোল গোল রুটি আর কাহওয়া চা বিক্রি করছে। সবার জন্যই নেওয়া হলো। তখন দালাল ছেলেটাকে পেয়ে যাবার জন্য বৌদি কিছু যোগাড় করতে পারেনি। চা বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলাম কংডুরি উপত্যকাটা পুরোপুরি বরফে ঢাকা নয় কেন? সে জানালো যে নভেম্বরে এই স্তরটা এমনই থাকে। আরও একমাস পরে পুরোটা বরফে ঢেকে যাবে। এখন পুরো বরফ দেখতে হলে দ্বিতীয় স্তর আফরওয়াতে যেতে হবে। সে আঙুল দিয়ে উঁচুতে একটা পাহাড় শৃঙ্গ দেখালো আমাদের।
আমরা আপাতত আফরওয়াতের কথা বাদ দিয়ে কংডুরি এক্সপ্লোর করতে লেগে গেলাম। বেশিরভাগ টুরিস্টই কংডুরির টিকিট কেটেছে দুটো কারণে। এক- পরের ধাপের উচ্চতা অনেক বেশি, বয়স্কদের শ্বাসকষ্ট হতে পারে, দুই- আবার ছ'শ টাকা দিয়ে টিকিট কাটার মতো পকেটের জোর সবার নেই।
কংডুরি জায়গাটাও অপূর্ব সুন্দর। জায়গাটা অনেকটা বাটির শেপের। বিশাল এক সাদা চাদরের উপর অসংখ্য রঙবেরঙের পোকা কিলবিল করছে মনে হলো মানুষজনের লাফালাফি দেখে। সবাই বরফের গোলা বানিয়ে এ-ওর গায়ে ছুঁড়ছে। বাচ্চারা হাঁটু মুড়ে বসে স্নো ম্যান বানাচ্ছে। কেউ বা ঝুরো বরফে গড়াগড়ি খেয়ে অকারণে হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। এখানে এসে সবাই যেন জীবনযুদ্ধের ক্লেশ কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেছে। আমরাও লেগে পড়লাম হুটোপাটি করতে।
আমি ছোট্ট একটা বরফের বল বানিয়ে জামা টেনে ধরে রিয়ার বুকের উপর ছেড়ে দিলাম। রিয়া এমন ভাবে লাফালাফি শুরু করলো যেন কাঁকড়া বিছা ঢুকে পড়েছে তার বুকে। আমি বললাম সোনমার্গের বদলা নিলাম। রিয়া অনেক কষ্টে বরফের বলটা বের করেই তাড়া করলো আমাকে। দৌড়াতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়লাম আমি, রিয়া এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার গায়ে। শুরু হয়ে গেলো দুজনের মল্লযুদ্ধ। বৌদি আর অঙ্কিতা দুপাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দিতে লাগলো রিয়েকে। রিয়া আমার বুকের উপর উঠে বসলো। আমি দুদিকে হাত ছড়িয়ে বললাম- আচ্ছা আচ্ছা আমি হার মেনে নিলাম।"

kingsuk25@ জিমেইল ডট কম


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)