রিয়া বললো- "আমি সেটা কাল থেকেই করেছি তমাল। আমি এখন জীবনকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছি। জানো সবসময় কেমন একটা দমবন্ধ লাগতো। মনে হতো এতো লেখাপড়া, এতো কিছু কিসের জন্য? সেই তো ধুমধাম করে বিয়ে দেবে। তারপর সারাজীবনের জন্য ওই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হবে স্বামীর কাছ থেকে। তাহলে সবার এতো ফুর্তি কেন? এখন বুঝতে পারছি, ফুর্তি কিসের! কেন সবাই বয়ফ্রেন্ড আর বিয়ের নাম শুনলেই হাওয়ায় ভাসতে থাকে!"
রিয়ার কথা শুনে আমরাও হাসতে লাগলাম। বৌদি বললো- "দুঃস্বপ্ন তো কেটে গেলো, তাহলে এবার তোর এই ট্যুরের অভিজ্ঞতা বল। তবে ভাই তোর ওই ছোটদের মতো দুদু নুনু বাদ দিয়ে বড়দের ভাষা বল। শুনে একটু আমরাও ভেজাই টেজাই?"
বৌদির কথা শুনে রিয়া জোরে চিমটি কাটলো তাকে। তারপর বললো- "ইসসসস্ যা সব ভাষা বলো তোমরা! ওসব আমি বলতে পারবো না, সরি!"
অঙ্কিতা বললো- "তাহলে বুঝবো কিভাবে তুই বড় হয়েছিস? ওই ভাষা না বললে আমরা তোকে দলেও নেবো না। আমরা ছোটদের সাথে মিশি না, কি বলো তমাল?"
আমি বললাম- "তা বটে, তবে আমার ভাষায় প্রবলেম নেই যদি যন্ত্রপাতি বড়দের হয়!"
এবার রিয়ার চিমটি পড়লো আমার হাতে। হাসতে হাসতে সে বললো- "আচ্ছা চেষ্টা করছি। ভুল করলে তোমরা শুধরে দিও। এই ভাষাটাও তো শেখা হয়নি তেমন!"
বৌদি বললো- "সে আর বলতে? এবারে এমন ভাষা শেখাবো তোকে যে বর শুনলে মাসে দশদিন অফিস কামাই করে তোর সেবায় লেগে যাবে! এমন জ্বালা উঠবে শরীরে যে জামাকাপড় গায়েই রাখতে পারবে না!"
আবার হেসে গড়িয়ে পড়লাম আমরা। রিয়া শুরু করতে যাবে, এমন সময় বাইরে তাকিয়ে বাধা দিলাম আমি। বললাম- "দাঁড়াও, গাড়ি স্লো হচ্ছে। মনে হয় কোনো সাইটে চলে এসেছি। আগে দেখেনি, তারপরে শুরু কোরো রিয়া।"
সত্যিই গাড়ি দাঁড়িয়ে গেলো। গাড়ি থেকে নেমে জানলাম জায়গাটার নাম 'চান্ডিল ওয়ানিগাম'। অনেকে 'চোখর পাহাড়'ও বলে। এই জায়গাটার শোভা এতো সুন্দর যে বর্ননা করতে শব্দ কম পড়ে যায়। এমনি এমনি কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ বলেনা, এই সব জায়গা দেখলেই বোঝা যায়। পাহাড়ের পাকদণ্ডী বেয়ে ঘুরে ঘুরে রাস্তা উঠে গেছে। উঁচুতে উঠে এই ভিউ পয়েন্ট। যেদিকে তাকাই শুধু পাহাড় আর পাহাড়। কোনোটা দূরে কোনোটা কাছে। দূরের গুলো সামান্য অস্পষ্ট, কাছের গুলো ঝকঝক করছে, সেই জন্যই দূরের গুলোকে মনে হয় কাছের গুলোর ছায়া। কেমন একটা থ্রিডাইমেনশনাল অপটিকাল ইল্যুশন তৈরি করছে যেন।
প্রায় সবগুলোর পাহাড়ের চূড়া বরফে ঢাকা। মনে হচ্ছে প্রত্যেকটা পাহাড় মাথায় সাদা টুপি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর আগেই বলেছি, এই পাহাড় গুলোর উচ্চতা এতোটাই বেশি যে ভারতের অন্য জায়গার পাহাড়দের এগুলোর কাছে শিশু মনে হয়।
ডিজিটাল ক্যামেরায় কিছু ছবি তুললাম সবাই মিলে। সঙ্গের সুন্দরীরা এই অপরূপ ব্যাকগ্রাউন্ডে যেন আরো রূপসী হয়ে উঠেছে। ছবিগুলো ভীষন সুন্দর হলো। মা আর গায়েত্রী মাসীমা গাড়ি থেকে নামতে চায়নি। আমি ফিরে গিয়ে তাদের জোর করে নামিয়ে আনলাম। এই দৃশ্য না দেখলে কাশ্মীরে আসা কেন? শুধু পান খেতে হলে তো কলকাতায় বসেই খাওয়া যেতো। মৃণালদা কে কিছুতেই নামানো গেলো না। তার নাকি উঁচু জায়গা থেকে তাকালে বমি পায়।
আমার ক্যামেরার ব্যাগ সব সময় সাথেই থাকে। ভিতরের হ্যান্ডি-ক্যামটা খুব একটা ব্যবহার করিনা আমি। স্টিল ফটোই বেশি ভালো লাগে। কিন্তু এই জায়গার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতো বিশাল জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে আছে যে স্টিল ফোটোর ছোট্ট ফ্রেমে ধরা অসম্ভব। তাই গাড়ি থেকে হ্যান্ডি-ক্যামটা নামিয়ে এনে প্যান করে এক শটে পুরো জায়গাটায় ছবি তুললাম। তারপর কিছুক্ষণ অন্য সবার এবং আমার তিন বান্ধবীর নানান পোজের চলমান ছবি নিলাম। সবাই ক্যামেরার লেন্সে ঠোঁট ছুঁইয়ে চুমু দিলো আমাকে। উমা বৌদি তো এমন ভঙ্গী করেছে যে আমাকে অংশটা এডিট করে আলাদা ক্লিপে রাখতে হবে।
সবাই জায়গাটা দেখে এতো মুগ্ধ হয়ে গেছে যে অপলক তাকিয়ে আছে। গাড়িতে উঠতে দেরী করছে দেখে তরুদা তাড়া দিলো। আমরা উঠে পড়লাম গাড়িতে। একটু পরেই আবার একটা জায়গায় থামলাম। তরুদা বললো, ওই যে জলপ্রপাতটা দেখা যাচ্ছে ওটার নাম 'ড্রাং জলপ্রপাত'। জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে পুরো জলপ্রপাতটা জমে বরফ হয়ে যায়। তখন নাকি ভীষন সুন্দর লাগে। সূর্যের আলো জমা জলপ্রপাতের উপরে পড়ে অদ্ভুত মায়াময় আলোক বিচ্ছুরণ ঘটায়। এখনো জল জমেনি, আর দশটা জলপ্রপাত থেকে অন্য রকম কিছু মনে হলো না। তবে একটা তফাৎ হলো এটা অন্য প্রপাতের মতো শুধু উপর থেকে পড়েই শেষ হয়ে যায়নি। তার বহমান ধারা নীচে নামতে নামতে নদীর মতো বয়ে চলেছে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে। যেন একটা জলপ্রপাতের অনেকগুলো ধাপ তৈরি হয়েছে।
এখানেও সংক্ষিপ্ত ফটোসেশান শেষ করে গাড়ি রওনা দিলো গুলমার্গের দিকে। তরুদা বললো, আর কোথাও থামা হবেনা। এবারে সোজা গুলমার্গ। যেতে সময় লাগবে পঁচিশ মিনিট মতো।
গাড়িতে উঠেই উমা বৌদি বললো- "নে রিয়া শুরু কর, হাতে পঁচিশ মিনিট আছে, ধীরে সুস্থে গুছিয়ে বলে ফেল তোর এবারের অভিজ্ঞতা!"
রিয়া আবার সময় নিলো কথা গুছিয়ে নিতে। তারপর বললো- "একদিন বাবা অফিস থেকে ফিরেই সুসংবাদটা দিলো। বাবার এক বন্ধু এই ট্যুরটায় আসবে বলে বুকিং করেছিলো। কিন্তু শেষ মুহুর্তে কিছু অসুবিধা এসে পড়ায় বাবাকে বলে কথাটা। বাবা আমাদের না জানিয়েই বন্ধুর জায়গায় আমাদের নাম বুক করে দেয়। সেই জন্যই অঙ্কিতাকে জানানো সম্ভব হয়নি তাড়াহুড়োতে।
হাওড়া স্টেশনে আমরাও শেষ মুহুর্তে পৌঁছাই। শুনলাম অঙ্কিতাও সেভাবেই পৌঁছেছিলো। আমরা অবশ্য ফোন করেছিলাম। নিজেরাই খোঁজ করে সীটে এসে পৌঁছাই। ভীষন একঘেয়ে লাগছিলো দুদিন। চারপাশে সব বয়স্ক মানুষ, একটা সমবয়সী মেয়ে পর্যন্ত নেই। বাবাকে বলছিলাম যে সে এই তীর্থ যাত্রায় আমাকে কেন আনলো?
লুধিয়ানা স্টেশনে এসে ঈশ্বর আমার প্রতি সদয় হলেন। দেখা হয়ে গেলো অঙ্কিতার সাথে। হাতে যেন চাঁদ পেলাম। কিন্তু সাথে আবার ওই চাঁদের কলঙ্কটা কে? কলঙ্ক বললেও ছেলেটার দিকে তাকালে শরীরে তাৎক্ষণিক একটা অ্যাড্রিনালিন রাশ হয়। একটু ঈর্ষার খোঁচাও লাগলো বুকে অঙ্কিতার সৌভাগ্য দেখে। তবে আমার এই সব ফিলিংস বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না, অতীত এসে চোখ রাঙিয়ে বন্ধ করে দিয়ে যায়।
অঙ্কিতা রাগ করিস না, প্রথমে আমি ভেবেছিলাম তুই বাড়িতে মিথ্যা বলে নতুন বয়ফ্রেন্ডের সাথে মজা করতে এসেছিস। কারণ আমাকে তুই এই ট্যুরের কথা বলিসনি। সেই জন্য সন্দেহটা একটু বেশি হয়েছিলো। কিন্তু তুই যখন ছেলেটাকে আমার আর বাবার সাথে পরিচয় করাতে ডাকলি, তখন বুঝলাম, না এখানে অন্য গল্প আছে। লুকিয়ে এলে তুই ছেলেটাকেও লুকিয়ে রাখতি।
তারপর তো শুনলাম তোরাও পাখির ডানার যাত্রী। বুঝলাম ছেলেটা সহযাত্রী যাকে তুই পটিয়ে নিয়েছিস। গল্পটা শোনার জন্য মন ছটফট করছিলো, তাই তোকে আমাদের কামরায় নিয়ে গেলাম।
অঙ্কিতা মোটামুটি সব কথাই বললো। তবে রেখে ঢেকে। এতোই ভালো ভালো কথা বললো যে আমার পূর্ব অভিজ্ঞতায় ছেলেদের যে মাপকাঠি ছিলো, তার সাথে ম্যাচ করলো না, ভাবলাম বানিয়ে বলছে। তবে যেহেতু অঙ্কিতা বলেছে তাই একেবারে উড়িয়েও দিলাম না।
জম্মু থেকে শ্রীনগর যাবার পথে চায়ের দোকানে অঙ্কিতা জোর করে আলাপ করাতে নিয়ে গেলো। কথা বলে কিন্তু খুব একটা খারাপ লাগলো না। বেশ আকর্ষণীয় ছেলে, দেখতেও যেমন সুপুরুষ কথাতেও বেশ রসিক। কিন্তু মনে পড়লো আমার সেই কাকাও সুন্দর কথা বলতো, আর সেই ছেলেটাও দেখতে সুন্দর ছিলো। তাই পছন্দ হলেও একটু দূরত্ব রেখে চললাম।
শ্রীনগরে এসে অঙ্কিতাকে ভালো করে চেপে ধরলাম। আমি নিজের জন্য ছেলেটা সম্পর্কে জানতে চাইনি। আসলে আমার মনে হচ্ছিলো আমার প্রিয় বান্ধবীর সামনে বড় বিপদ। একবার রাতুলের কাছ থেকে ধাক্কা খেয়েছে। তখনো আমার বারণ শোনেনি। আবার জড়িয়েছে অচেনা ছেলেটার সাথে। কতোটুকু গভীর হয়েছে সম্পর্ক জানার জন্য খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম।

kingsuk25@ জিমেইল ডট কম


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)