কাশ্মীরে কেলেঙ্কারি
অধ্যায় - বারো
মিনিট পনেরো পরে সবাই মোটামুটি স্বাভাবিক অবস্থায় চলে এলাম। কিন্তু পরিতৃপ্তির ফুরফুরে ভাবটা দীর্ঘস্থায়ী হলো সবার মধ্যেই। ওরা তিনজন এমন ভাবে কথা বলছিলো যেন আকন্ঠ মদ খেয়েছে সবাই। একে একে বাথরুমের গরম জলে ফ্রেশ হয়ে এসে বসলাম বিছানার উপরে। আমি একটা সিগারেট জ্বালতেই সবাই কটমট করে তাকালো আমার দিকে। বললাম- "এটা আমার প্রথম প্রেম। প্রেমিকার চরিত্র ভালো নয় জানি, কিন্তু ছাড়তে পারবো না। প্লিজ কেউ জোর কোরোনা।" কেউ আর কোনো কথা বললো না।
আমি ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললাম- "কাল আমরা তিনজন ডাল লেকে শিকারা ভ্রমণ করেছি, কিন্তু বৌদি যেতে পারেনি। আমাদের উচিৎ বৌদিকে একবার ঘুরিয়ে আনা।"
অঙ্কিতা আমার সমর্থনে কিছু বলতে যাচ্ছিলো, বাধা দিলো বৌদি নিজেই। বললো- "না না, দরকার নেই। আমার জলে খুব ভয় করে। আমি নৌকা চড়তে পারি না। একটু হেঁটে লেকের ধারে ঘুরে এলেই হবে।"
আমি বললাম- "তাহলে আমার আর একটা প্রস্তাব আছে। এটাতে আপত্তি শুনবো না। কাশ্মীরে এসেও আমরা তরুদার রাঁধুনির হাতের দেশি রান্না খেয়ে যাচ্ছি। এখানকার লোকাল ফুড তো কিছু খাওয়াই হলো না। শ্রীনগরে স্ট্রীট ফুড আর ট্রাডিশনাল ফুড, দুটোই বিখ্যাত। ট্রেনে ওঠার পর থেকে তোমাদের সাথে এতো ভালো বন্ধুত্ব হওয়া স্বত্তেও তোমাদের জন্য কিছু করা হয়নি। আজ তরুদাকে বলে দিচ্ছি আমরা ডিনার বাইরে করবো। আমার পক্ষ থেকে নতুন বন্ধুদের ট্রিট দেবো আজ। তাছাড়াও রিয়ার বিশেষ দিনটা তোমরা সেলিব্রেট করলেও আমার পক্ষ থেকেও কিছু করা উচিৎ। সেটাও হয়ে যাবে।"
আপত্তি তুললো অঙ্কিতা। বললো- "না তমাল, শুনেছি কাশ্মীর খুব এক্সপেনশিভ জায়গা। এতোগুলো লোকের ডিনারে তোমার অনেক টাকা বেরিয়ে যাবে। প্রস্তাবে রাজী হতে পারি যদি তুমি আমাদেরও কনট্রিবিউট করতে দাও।"
রিয়া সাথে সাথে সমর্থন করলো অঙ্কিতাকে। কিন্তু বৌদি মন খারাপ করে বসে রইলো। আমরা জিজ্ঞেস করতে বললো- "তোমাদের মধ্যে বয়সে সব চেয়ে বড় আমি। আমারই ট্রিট দেওয়া উচিৎ তোমাদের। বিশেষ করে তমালকে। ওর সাথে দেখা না হলে অনেক কিছুই উপভোগ না করেই মরে যেতাম। কিন্তু তোমাদের দাদা খুব সাধারণ একটা চাকরি করে। তার উপর বাড়ি করার লোন আছে। আমার চাপে পড়ে টাকা জমিয়ে এই ট্যুরটায় এসেছে। এক্সট্রা টাকা আমার হাতে নেই। ট্রিট তো দূরের কথা, কনট্রিবিউট করার ক্ষমতাও আমাদের নেই।"
আমি বললাম- "বৌদি, তোমার কাছে এটা আশা করিনি। এতো কিছুর পরে এভাবে পর করে দিলে? তোমার এই দেওরের বয়স কম হতে পারে, কিন্তু চাকরিটা মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিতে করে। মাসের শেষে যেটা পাই তা একান্ত কম নয়। তোমাদের কাউকে কনট্রিবিউট করতে হবে না, আজকের ট্রিট আমার তরফ থেকে। অ্যান্ড দ্যাট ইজ ফাইনাল।"
এর পরে আর কাউকে কোনো কথা বলতে দিলাম না। ঠিক হলো এক ঘন্টার ভিতরে সবাই রেডি হয়ে নীচে চলে আসবে। প্রথমে ডাল লেকের পাড়ে ঘোরা হবে। তারপর ডিনার সেরে ফিরবো।
বৌদি নিজের ঘরে চলে গেলো। আমি আর অঙ্কিতা গেলাম রিয়ার বাবা মা'র কাছে পারমিশন নিতে। ওনারা ঘরেই ছিলেন। অঙ্কিতা গুছিয়ে ব্যাপারটা এদের বললো। তারা বললেন-
"তোমরা বড় হয়েছো, যা করবে বুঝে শুনে কোরো। আর তমালকে আমার ভালো লেগেছে। ও সাথে গেলে আমাদের আপত্তি নেই।"
আমি বললাম- "কাকু, এটা হলো অর্ধেক পারমিশন। আর একটা পারমিশন চাই। আপনাদের জন্য আমরা ডিনার নিয়ে আসবো। আপত্তি নেই তো?"
তারা বললেন- "আমাদের বয়স হয়েছে। রাতে বেশি কিছু খাই না। আনলেও খুব সামান্য এনো তমাল।"
এরপরে রিয়াকে রেডি হতে বলে আমি আর অঙ্কিতা এলাম মায়েদের ঘরে। সেখানে প্রথম পারমিশনটার দরকার ছিলো না। কিন্তু দুই পান-বোন আপত্তি করলো পরেরটাতে। মা বললো- "না না, আমার জন্য কিচ্ছু আনবি না। কে না কে রান্না করবে, আমি খাবো না ওসব ছাইপাশ।" গায়েত্রী মাসিমাও সুরে সুর তালে তাল মেলালেন। সব শিয়ালের এক রা কথাটা শুনেছিলাম, কিন্তু বেড়াতে এসে এই মা মাসীমার এক রা শুনতে শুনতে প্রায় প্রবাদে পরিনত হতে চলেছে ব্যাপারটা।
কে না কে বলতে মা যে '. বাবুর্চিদের মিন করছে সেটা বুঝতে পারলাম। বললাম- "কাশ্মীর মূঘলদের খাস জায়গা ছিলো। এখানে বিখ্যাত খাবার সবই মোঘলাই খানা। আর মোঘলাই খানা '. ছাড়া কেউ রাঁধতে জানে নাকি? খেলে জীবন ধন্য হয়ে যাবে।"
মা বললো- "দরকার নেই ধন্য হবার। আমরা খাচ্ছি না ওসব অখাদ্য! কি বলেন দিদি?"
দিদি যে কি বলবে সেটা জানতাম। তাই আর সময় নষ্ট না করে অঙ্কিতাকে রেডি হতে বলে আমি গেলাম উমা বৌদিদের ঘরে। ভাগ্যক্রমে মৃণালদাকে ঘরে পেলাম। তার অবশ্য আপত্তি নেই কোনো কিছুতেই। আর কাবাবের সাথে মাল ভালোই জমে এটা বিলক্ষণ জানে সে।
আমি তরুদাকে জানিয়ে এসে রেডি হতে গেলাম। গরম জলে স্নান সেরে জিন্সের প্যান্ট, হাই-নেক সোয়েটার আর উপরে জিন্সের জ্যাকেট চাপিয়ে নিলাম। দুদিন দাড়ি কাটা হয়নি। খোঁচাখোঁচা দাড়ির সাথে আউটফিটটা বেশ লাগছে। আয়নায় নিজেকে হলিউডের ওয়েস্টার্ন মুভির হিরো মনে হচ্ছে। মনে মনে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিলাম।
হঠাৎ পিছন থেকে একটা সিটি শুনে ঘুরে তাকিয়ে দেখি অঙ্কিতা দাঁড়িয়ে। মুখে তখনো দুটো আঙুল ঢোকানো। বললো- "কি লাগছে গুরু! ফাটিয়ে দিয়েছো তো! অ্যাই! প্রোগ্রামটা ক্যানসেল করা যায়না? তোমার এই লুক দেখার পর শরীর মে কুছ কুছ হোতা হ্যায়। চলো পালিয়ে যাই কোথাও!"
আমি হেসে বললাম- "এখনো স্ট্যামিনা আছে শরীরে?"
অঙ্কিতা বললো- "ধুর ওই ভাগের মা তে কি তেষ্টা মেটে... থুড়ি ভাগের ঠাপে কি গুদের খিদে মেটে? আমার এই জিনিস ভাগ করে খেতে ভালো লাগে না। নেহাত বৌদি জোর করলো তাই।"
বললাম- "আরে তুমি আর আমি তো এই ঘর যখন খুশি ব্যবহার করতে পারি। চিন্তা কেন করছো? যেখানেই যাবো এরকম অ্যারেঞ্জমেন্ট করে নেবো ঘরের।"
মাথা ঝাঁকালো অঙ্কিতা। আমরা এর পর নীচে নেমে এসে বাকীদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। অঙ্কিতা জিজ্ঞেস করলো- "তমাল, রিয়াকে কেমন লাগলো?"
আমি বললাম- "খুব ভালো। তবে মেয়েটা এখনো সহজ হতে পারেনি, তাই পুরো মজা পাচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে ওর মনে কোথাও একটা বাঁধা আছে। তোমাকে হেল্প করতে হবে অঙ্কিতা, সেটা খুঁজে বের করতে।"
সে জিজ্ঞেস করলো- "কিভাবে?"
বললাম- "তুমি আমি আর রিয়া হলে ও হয়তো স্বচ্ছন্দ হবে। বৌদির সামনে ও গুটিয়ে যাচ্ছে। সেখানে মনের দ্বন্দ্ব নিয়ে কথা নাও বলতে পারে। কিন্তু আমরা তিনজন হলে আশাকরি সহজ হবে।"
অঙ্কিতা বললো- "আচ্ছা! ব্যবস্থা করছি।"
কথা বলতে বলতেই বৌদি নেমে এলো নীচে। বললো- "দুটিতে কি ফন্দী করছো শুনি? রিয়া কোথায়?"
"এই যে, এসে গেছি!" পিছনে ঘুরে দেখি রিয়াও চলে এসেছে। এরপরে আমরা চারজনে হোলেটের লবি থেকে বেরিয়ে ডাল লেকের দিকে হাঁটতে লাগলাম।
রাতের ডাল লেকের একটা অন্যই সৌন্দর্য। এখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা কিন্তু মনে হচ্ছে কতো রাত! ডাল লেকের হাউস বোট আর শিকারা গুলোর আলোতে ঝলমল করছে লেক। আমরা পাড় ধরে হাঁটতে লাগলাম। কিছুদূর এগিয়ে দেখি একটা স্টলের সামনে প্রচুর ভীড়। বেশ কিছু বাঙালির দেখা পেলাম। বাংলায় কথা বলতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম ভীড়টা কিসের? তারা জানালো এখানে কাশ্মীরের একটা ঐতিহ্যপূর্ণ পানীয় পাওয়া যাচ্ছে। 'নুন চা'। আমরাও দাঁড়িয়ে পড়লাম ভিড়ের সাথে। ছোট ছোট চিনামাটির বাটিতে গোপালি রঙের কোনো পানীয় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি বাটি কুড়ি টাকা করে। আমরা চার বাটি অর্ডার করলাম।
জিনিসটা খুব একটা খারাপ নয়। স্থানীয় লোকজন এটাকে 'শির চা' বলছে। তাদের একজনের সাথে কথা বলে জানলাম এটা গ্রীন টী, বেকিং সোডা, দুধ আর নুন ফুটিয়ে তৈরি করা হয়। গোলাপি রঙ আর নোনতা স্বাদ এর বৈশিষ্ট্য। তাই অনেকে এটাকে 'গোলাপী চা' বলেও ডাকে। আমার খেতে মন্দ লাগলো না, কিন্তু উমা বৌদি বললো- "বিচ্ছিরি খেতে!" তারপর গলা নামিয়ে বললো- "এর চেয়ে নুনু খেতে বেশি ভালো!"
নুন চা শেষ করে আমরা আবার হাঁটতে লাগলাম। উমা বৌদি জিজ্ঞেস করলো- "আচ্ছা তমাল, হাউস বোটের ভিতরটা কেমন দেখতে হয়, বলতে পারো? অনেক সিনেমায় দেখি, তাই কৌতুহল হচ্ছে।"
আমি বললাম- "আমিও জানি না বৌদি। আচ্ছা চলুন দেখি কিছু ব্যবস্থা করা যায় কি না?
বৌদি হা হা করে উঠলো- "না না, থাক ভাই, হয়তো অনেক খরচা পড়ে যাবে। কাজ নেই, বাদ দাও।"
আমি বললাম- "আরে বেশি টাকা লাগলে যাবো না। চিন্তা করছেন কেন? দেখাই যাক কি হয়?"
আমরা হাঁটতে হাঁটতে কালকের সেই গেট নম্বর এগারোর কাছে চলে এলাম। আমাদের সেই শিকারাওয়ালার দেখাও পেলাম। কালই নামটা জিজ্ঞাসা করেছিলাম তাকে। তার নাম ওসমান গনি। আমি ওসমান ভাই বলে ডাকতেই সেও চিনতে পারলো আমাকে। তাকে আমাদের ইচ্ছাটা বললাম। সে হেসে বললো- "ইয়ে কই বড়ি বাৎ হুয়ি কেয়া সাব? চলিয়ে হাম দিখা দেঙে।"
আমরা একটু ইতস্তত করছি দেখে সে আবার কাশ্মীরী আর উর্দু মিশিয়ে যা বললো, তার বাংলা করলে দাঁড়ায় যে তার বন্ধুর হাউসবোট আছে। কোনো চিন্তা করতে হবে না, সে দেখিয়ে দেবে। আমি বললাম- "কিন্তু এটা তো তোমার ধান্ধার সময়, আমাদের জন্য সময় নষ্ট করবে কেন?"
তার উত্তর শুনে অবাক হয়ে গেলাম। সে বললো, টুরিস্ট হলো মেহমান! তাদের খাতির যত্ন করা ওদের কর্তব্যের ভিতরে পড়ে, কারণ টুরিস্টদের জন্যই পেট চলে। টাকা পয়সা তো আসতেই থাকবে, অতিথি আপ্যায়নের এই সুযোগ সে ছাড়বে না।
তার শিকারা ঘাটেই বাঁধা ছিলো। আমরা সবাই তাতে উঠলাম। উমা বৌদি কিন্তু ভীষণ ভয় পেলো উঠতে গিয়ে। এক রকম কোমর জড়িয়ে ধরে নতুন বৌয়ের মতো প্রায় কোলে করেই তুললাম শিকারায়। তারপরও আমার কোলেই বসে রইলো আড়ষ্ট হয়ে। শিকারা আমাদের বাংলার নৌকার মতো দোলে না। কিছুক্ষণ চলার পরে বৌদির ভয় কেটে গেলো। স্বাভাবিক ভাবেই গল্প করতে লাগলো বৌদি।
ওসমানের বন্ধুর হাউসবোটটা এগারো নম্বর গেট থেকে বেশ খানিকটা দূরে। মিনিট দশেক শিকারা ভ্রমণ হয়ে গেলো আমাদের। তারপর সেটা একটা আলো ঝলমলে সুন্দর দেখতে হাউসবোটে গিয়ে ভিড়লো। ওসমান বন্ধুর নাম ধরে ডাকলো। তার নাম ইসমাইল। ইসমাইল এলে বিশুদ্ধ কাশ্মীরী ভাষায় তাকে কিছু বললো ওসমান, যার বিন্দুবিসর্গও বুঝলাম না আমরা।

kingsuk25@ জিমেইল ডট কম


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)