আমি বললাম- "এই মাত্র আমাদের একটা গ্রুপ তৈরী হলো। যারা কেউ কাউকে আপনি বলবে না। আর কিছু না লুকিয়েই সব কথা শেয়ার করতে হবে।"
বৌদি বললো- "ওয়াও! দারুন হবে, তা আমি কি গ্রুপের বাইরে?"
রিয়া বললো- "না না বৌদি, আপনিও গ্রুপে আছেন। আপনিই তো প্রথম শেয়ার করেছেন বৌদি। সরি, অঙ্কিতার কাছে কিন্তু আমি সব শুনেছি।"
অঙ্কিতা বললো- "সরি বৌদি আপনাকে না জানিয়েই সব কথা বলে ফেলেছি রিয়াকে। আসলে ওটা বড্ড শয়তান, কিছুই লুকানো যায় না ওর কাছে। ও আমার ফ্রক পড়া বয়সের বন্ধু তাই।"
উমা বৌদি বললো- "ফ্রক পড়া বয়সের? তাহলে ল্যাংটো পোঁদের বন্ধু না?"
রিয়া বললো- "ছিঃ! এ মা... বৌদি যাহ্! আপনি না!"
আমরা সবাই হেসে উঠলাম। তারপর উমা বৌদি বললো-
"আরে এত সাফাই দিতে হবে না, আমার আর লুকানোর কি আছে ভাই? সবই খোলা খাতা।"
গাড়ি হর্ন দিয়ে আমাদের উঠে পড়তে বললো। আমরা গাড়িতে উঠে দেখলাম শুধু মৃণালদা নয়, আরও বেশ কয়েকজন অনুপস্থিত। মৃণালদার তাসের বন্ধুরাও আসেনি। অত বড়ো মদের বোতলের অর্থ পরিস্কার হলো এবার। আজ উমা বৌদির ঘরে তাস জুয়ার আড্ডা বসবে মদ সহযোগে।
উমা বৌদিকে বললাম- "মৃণালদাকে নিয়ে ভাববেন না, দেখুন সেই চার মূর্তিমানও আসেনি।"
বৌদি চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললো- "হুমম।"
পিছনের সীটটা দখল করলাম আমরা চার জন।ট্যুর কোম্পানীর সাথে ঘুরতে এলে দুটো জিনিস ঘটে। সবার মধ্যে একটা পরিবার পরিবার ভাব যেমন আসে তেমনি কেউ কারো বিষয়ে মাথা গলানোর ব্যাপারটাও কমে যায়। একটু যেন প্রশ্রয়ও থাকে... আহা বাইরে এসেছে করুক না যা খুশি কয়েকটা দিন ! ট্রেনে ওঠা থেকে আমরা যা যা করছি, এটা যদি কলকাতায় হতো, এতক্ষণে কানাঘুষো আর মুখরোচক গল্প তৈরী হয়ে যেতো। কিন্তু এখানে যেন আমাদের কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না।
জানালার পাশে বসলো অঙ্কিতা তারপর রিয়া তারপর আমি, আমার পাশে উমা বৌদি। গাড়ি ছেড়ে দিলো। আমরা যেখানে আছি সেই জায়গাটার নাম ডাল গেট রোড। সেটা ধরে গাড়ি শহরের বাইরের দিকে ছুটলো।
যা সন্দেহ করেছিলাম সেটাই সত্যি। একটু পরে আসল ডাল লেককে দেখতে পেলাম। বিশাল! কূল দেখা যায় না। অপর পাড়ে পাহাড়ের অস্পষ্ট সীমারেখা আন্দাজ করা যায়। হঠাৎ দেখলে মনে হয় সমুদ্রের পাড়ে এসেছি।
রোড সাইডটা চমৎকার বাঁধানো, মাঝে মাঝে ফোয়ারা লাগানো আছে জলের ভিতরে। অল্প দুই একটা শিকারা ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিরাট একটা ভাসমান মেশিন জমে থাকা শ্যাওলা কাটছে। তার পিছনে দৈত্যাকার একটা ছাকনি-ওয়ালা মেশিন কেটে ফেলা শ্যাওলা গুলো তুলে নিয়ে নিজের পিঠে জমিয়ে রাখছে।
কাশ্মীর আসার আগে আমি ভ্রমণ সঙ্গী পড়ে আর নেট ঘেটে কাশ্মীর সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান অর্জন করে নিয়েছিলাম। তাই মিনিট দশেক চলার পরে যখন গাড়ি ডান দিকে বাঁক নিলো, আমি ওদের বললাম-
"আমরা শঙ্করাচার্যের মন্দির দেখতে যাচ্ছি। পাহাড়ের উপর শিব মন্দির শঙ্করাচার্যের প্রতিষ্ঠা করা। দু'শ পঞ্চাশটার উপর সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠতে হবে।"
চেক পোস্টে আমাদের থামানো হলো। বৃদ্ধ বৃদ্ধা বাদে সবাইকে গাড়ি থেকে নামতে হলো। গাড়ি তল্লাশি হলো। আমরা মেটাল ডিটেক্টর লাগানো গেট দিয়ে হেঁটে গিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়েছিলাম। চেকিং শেষে গাড়ি এগিয়ে আসতে আমরা আবার উঠে পড়লাম। গাড়ি পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে লাগলো। পুরো পাহাড়টাকে পাঁক মেরে উঠছে আমাদের গাড়ি। খুব সুন্দর রাস্তা। তার চেয়ে অনেক বেশী সুন্দর রাস্তার পাশের নাম না জানা গাছেদের ভীড়। গাড়ি যতো উপরে উঠতে লাগলো, পুরো শ্রীনগরের একটা পরিস্কার ভিউ আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো।
রিয়া বললো- "এবার শুরু করা যাক! কে আগে শেয়ার করবে?"
উমা বৌদি প্রথমেই হাত তুলে দিলো। আমার বাবা আর কিছু গোপন নেই, সব বলে দিয়েছি। অঙ্কিতা বললো- "তমাল শেয়ার করবে।" রিয়া আর উমা বৌদি সঙ্গে সঙ্গে বললো- "হ্যাঁ হ্যাঁ সেই ভালো।"
আমি বললাম- "আমার কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা এতই বেশি যে শেয়ার করতে পুরো এক সপ্তাহ লেগে যাবে। অন্য একদিন না হয় শেয়ার করবো আমি। আজ অঙ্কিতা বা রিয়া শেয়ার করুক।"
রিয়া বললো- "আমার অভিজ্ঞতা এতই কম যে শুরু করার আগেই শেষ হয়ে যাবে। বরং অঙ্কিতা বলুক, যদিও আমি ওর সবই জানি।"
অঙ্কিতা বললো- "বেশ আমি শেয়ার করবো, কিন্তু আগে তমালকে তার অসংখ্য অভিজ্ঞতা থেকে যে কোনো একটা শেয়ার করতে হবে।"
উমা বৌদি আর রিয়া দুজনেই হইহই করে উঠলো-"হ্যাঁ হ্যাঁ তমাল, তোমার প্রথম অভিজ্ঞতা বলো।"
আমি বললাম- "বেশ তাই বলছি।"
আমি আমার আর পৃথার ঘটনাটা বলতে শুরু করলাম। (যারা গল্পটা জানেন না তাদের জন্য বলছি “পৃথা ও আমি” লিখে গুগলে সার্চ দিন, গল্পটা পেয়ে যাবেন ) গল্পের প্রথম পার্ট অর্থাৎ মাইথন থেকে আমরা ফিরে আসা পর্যন্তও বলা শেষ হতে হতেই মন্দির পৌঁছে গেলাম আমরা।
গাড়ি পার্ক করার পর আরও এক প্রস্থ চেকিং হলো। যার যার কাছে মোবাইল ছিল, জমা দিতে হলো। ক্যামেরা, মোবাইল, চামড়ার বেল্ট কিছুই নিয়ে যাওয়া যাবে না। তারপর আমরা মন্দিরে ওঠার সিঁড়ির কাছে পৌঁছলাম। পাথর বসানো উঁচু উঁচু সিড়ি উঠে গেছে মন্দির পর্যন্ত। সাউথে যেমন সুন্দর করে বাঁধানো সিঁড়ি থাকে মন্দির গুলোতে, এই সিঁড়ি মোটেও তেমন নয়। আদিম চেহারা আর বন্য রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। এতোই খাড়া যে চোখ তুলে উপরে তাকালে একটু ভয় ভয়ই করে। কালের প্রবাহে সিঁড়ির কিছু ধাপ ভেঙে গেছে। শ্যাওলাও জমেছে বিস্তর। মা আর গায়েত্রী মাসীমার কথা ভেবে দুশ্চিন্তা হলো বেশ।
গায়েত্রী মাসীমা আর মা ও বললো- "ওরে বাবা, এত উঁচুতে উঠব কিভাবে? তোরা যা, আমরা এখান থেকেই বাবাকে নমস্কার করি।"
আমি বললাম- "তা হয়না মাসীমা, মন্দির এর দোরগোড়ায় এসে বিগ্রহ দর্শন না করাটা অপরাধ। চলুন আমরা ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছি। কাশ্মীরের খুব বিখ্যাত আর জাগ্রত এই মন্দির। অবশ্য দর্শনীয় স্থানের একটা। না দেখে ফিরে গেলে আফসোস করবেন হয়তো। আর এখানে বৈষ্ণো দেবী দর্শনের জন্য পাহাড়ে চড়ার একটা রিহার্সেলও হয়ে যাবে।
আমি আর উমা বৌদি মায়ের দুই পাশে, রিয়া আর অঙ্কিতা গায়েত্রী মাসীমার দুই পাশে থেকে খুব ধীরে ধীরে ওদের নিয়ে উঠতে লাগলাম। এত খাড়া যে আমাদেরই হাঁপ ধরে যাচ্ছে তো ওদের যে কি অবস্থা অনুমান করতে পারছি।
এক সময় পৌঁছে গেলাম মন্দিরের চাতালে। খুব পুরনো ছোট্ট একটা মন্দির। এতো নিরাপত্তা পেরিয়ে, এতোটা সিঁড়ি ভেঙে উঠে এতো ছোট্ট একটা মন্দির দেখবো আশা করিনি। আসলে ভারতবর্ষের ঐতিহ্যই হচ্ছে কোনো স্থান মোটামুটি নাম করলেই সেটাকে ভেঙেচুরে তার নিজস্বতা ধবংস করে সাজিয়ে গুজিয়ে টিকিটের ব্যবস্থা ট্যাবস্থা করে একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলা। মন্দির হলে তো কথাই নেই, টাটা বিড়লারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেই স্থানকে আর তার নিজস্ব চেহারায় পাওয়া যায়না।
এই মন্দিরের বেলায় তা হয়নি। পাহাড়ের একদম চূড়ায় নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে। যেন একাকী নিভৃতে ধ্যানমগ্ন যোগীরাজ দেবাদিদেব মহাদেব! কোনো কোলাহল নেই, টুরিষ্টদের দৌড়ঝাঁপ নেই। বাচ্চাদের চিৎকার চেঁচামেচি নেই। শান্ত,নিঃশব্দ। এতোটাই উঁচুতে যে পাখিও এখানে খুব একটা আসে না। পরিবেশটা এমন যে, একটা সম্ভ্রম জাগানো ভক্তি আসে মনে আপনা থেকেই। মাথা নীচু হয়ে আসে প্রকৃতির মহানত্বের কাছে।
ভিতরে বহু প্রাচীন এক বিরাট শিব লিঙ্গ। মন্দিরের চাতাল থেকে শ্রীনগরের ভিউটাও অসাধরণ লাগছিল। একেই বোধহয় বলে বার্ডস আই ভিউ। পাখির চোখে দেখা! মা আর গায়েত্রী মাসীমা একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। সেই ফাঁকে আমরাও ঘুরে ঘুরে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে লাগলাম। মন্দির চত্ত্বরের লোহার রেলিং ঘেরা ব্যালকনি থেকে ডাল লেকের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে ছিলাম আমি। মুগ্ধতায় তন্ময় হয়ে ছিলাম। কখন অঙ্কিতা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করিনি। সে নিঃশব্দে তার একটা হাত আমার হাতে রাখলো। আমি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম। অঙ্কিতা আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে অস্ফুটে বললো- "অপূর্ব! তাই না?"

kingsuk25@ জিমেইল ডট কম


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)