আমরা ট্রেনে যে ছ'জন এক সাথে ছিলাম তারা বাদে যারা ব্রীজ খেলছিল সেই রো'য়ের চারজন এবং আরও চারজন। এই চোদ্দোজনের একটা গাড়িতে ব্যবস্থা হলো। রিয়ারা অমৃতসর যাবে তাই তাদের অন্য গাড়িতে ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু রিয়া কিছুতে অঙ্কিতাকে ছাড়ল না, তাকে রিয়া তাদের গাড়িতে নিয়ে যাবে বলে জেদ করছে। শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো অঙ্কিতা রিয়াদের গাড়িতে যাবে আর ওদের গাড়ি থেকে এক বৃদ্ধ দম্পতিকে আমাদের গাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
গাড়িতে ওঠার তোড়জোড় যখন চলছে। অঙ্কিতা আমার কাছে এসে বললো- "সরি তমাল, রিয়া কিছুতেই ছাড়ছে না। আমার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু ও পাগলামি শুরু করেছে। কিছু মনে করো না প্লীজ।"
আমি বললাম- "ইট্স ওকে। তুমি রিয়ার সাথেই যাও। দশ ঘন্টার তো ব্যাপার। শ্রীনগরে তো আবার এক সাথে হব আমরা। আর তোমরাও বৈষ্ণো দেবী যাবে, তাই আমাদের রুম গুলোও পাশাপাশিই হবে। মন খারাপ করো না। শ্রীনগরে গিয়ে এই দশ ঘন্টার ক্ষতি পুষিয়ে নেব।"
অঙ্কিতার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটলো। আমাকে ছোট্ট একটা চড় মেরে বললো- "ফাজিল কোথাকার!" তারপর বললো- "মায়ের দিকে খেয়াল রেখো।"
আমি বললাম- "নিশ্চিন্তে থাকো তোমার মা আর আমার মা ফেবিকলের আঠার মতো চিপকে গেছে। ওরা নিজেরাই নিজেদের খেয়াল রাখবে। আর আমি তো রইলামই। নিশ্চিন্তে যাও।"
অঙ্কিতা খুশি মনে রিয়াদের গাড়িতে চলে গেল।
বোলেরো গাড়ি গুলো ভালই, বেশ জায়গা আছে ভিতরে। আরামদায়কও বটে। আমাদের গাড়িতে মোট পনেরো জন লোক উঠলো। গাড়িতে বাইশটা করে সীট আছে, তাই সাতটা সীট ফাঁকাই রইলো।
আর একটা ব্যাপার হলো আমাদের গাড়িতে সবাই প্রায় মাঝ বয়সী অথবা প্রৌঢ়ো বা বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। এর কারণ হয়তো ভ্রমনের সাথে সাথে এখানে তীর্থ-যাত্রী সব। যুবক যুবতীদের তীর্থ করার কোনো ইচ্ছা নেই। তাই ইয়াং ছেলে বলতে আমি একা, আর রয়েছে উমা বৌদি। এর একটা খারাপ আর একটা ভালো দিক আছে।
খারাপ দিক হলো দশ ঘন্টার জার্নিতে আড্ডা মারার লোক কম। ভালো দিক হলো গাড়ির পিছনের সীটটা একদম খালি। ইচ্ছা মতো স্মোকিং করা যাবে। অঙ্কিতা না আসাতে আমার মা আর গায়েত্রী মাসীমা পাশা-পাশি বসেছেন। আমি প্রথমেই পিছনের সীটের জানালার ধারটা দখল করলাম।
মাঝ বয়স পেরিয়ে যাওয়া কমজোরি কোমর নিয়ে ঝাঁকুনি সহ্য করার রিস্ক কেউ নিলো না। তাই পিছনের পাঁচটা সীট ফাঁকাই থাকলো। মৃণালদা আর উমা বৌদি একটা টু সীটারে বসেছে মাঝামাঝি জায়গায়। গাড়ি ছেড়ে দিলো শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে। রিয়া অঙ্কিতাদের গাড়িটা সবার আগে আমাদেরটা সবার পিছনে। তারও পিছনে মাল-বাহি ট্রাক।
কাশ্মীরে প্রথমেই যে জিনিসটা নজর কাড়ে সেটা হলো রাস্তা। ঝকঝকে মসৃণ রাস্তা। দুটো গাড়ি পাশা পাশি স্পীড খুব না কমিয়েও অনায়াসে পাস করতে পারে। রাস্তার যে কোনো একটা দিকে পাহাড় তো থাকছেই, অপর দিকটা বড় বড় কংক্রিটের গার্ড বসানো রয়েছে তিন চার ফুট বাদে বাদে। তাই খুব বড়সড় অঘটন ছাড়া দুর্ঘটনা ঘটার চান্স কম। অন্য হিলি এরিয়াতে এত ভালো রাস্তা খুব একটা দেখা যায় না।
জম্মু থেকেই শুরু হয়ে গেল পাহাড়। এতদিন অনেক জায়গায় টিলা বাঁ মাঝারি সাইজের পাহাড় দেখেছি। এই বার বুঝলাম পাহাড় কাকে বলে।। প্রতিটা চূড়া যেন আকাশ ফুঁড়ে বেরিয়ে যেতে চায়। বুকে সবুজ পাইন গাছের চাদর জড়িয়ে স্পর্ধায় যেন মাথা উঁচু করে স্বদম্ভে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের গাড়ি গুলো এঁকেবেঁকে একবার এক একটা পাহাড় বেয়ে উঠছে, আবার পাহাড় অতিক্রম করে সর্পিল ভঙ্গীতে নেমে আসছে।
গাড়ির জানালা দিয়ে ফেলে আসা বা আতিক্রম করা রাস্তা গুলো দেখা যাচ্ছে। রাস্তা গুলোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন পাহাড় গুলোকে কেউ ফিতে দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে। অথবা কোনো বিশাল অজগর সাপ তার নিজস্ব ভঙিতে এগিয়ে চলেছে। রাস্তা গুলোতে অসংখ্য গাড়ির আনাগোনাও দেখা যাচ্ছে। পর্বতের বিশালত্ত সেই ব্যস্ততায় একটুও চঞ্চল নয়। যেন বিশালাকার কোনো হাতি স্ব-কৌতুকে তাকিয়ে দেখছে তার শরীর বেয়ে পিঁপড়ার সাড়ি উঠছে নামছে।
বৈষ্ণো দেবীর মন্দির জম্মু থেকে বেশি দূরে নয়। কাটরা থেকে যেতে হয়। জম্মু থেকে পয়তাল্লিশ কিলোমিটার মতো দূরত্ব। অনেকে কাশ্মীর ভ্রমণে না এসেও শুধু ভৈরব আর বৈষ্ণো দেবী দর্শন করতে আসে। তাই কাটরা পর্যন্ত গাড়ির আনাগোনা খুব বেশী। দেখলে মনে হয় আমরা কাশ্মীরে নয়,যে কোনো একটা ব্যস্ত ন্যাশনাল হাইওয়েতে আছি।
আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে জানালার বাইরে দেখতে লাগলাম। এখানে সব বাড়ি গুলোর মাথায় রংবেরঙের ঢেউ খেলানো টিনের শেড। আমাদের অঞ্চলের মতো সমতল ছাদ বিশিষ্ট বাড়ি একটাও চোখে পড়লো না। যদিও জম্মু কাশ্মীরের শীতকালীন রাজধানী, গ্রীষ্মকালে সেটা বদলে শ্রীনগর হয়ে যায় ঠান্ডার জন্য, তবুও বরফ সারা কাশ্মীর জুড়েই পড়ে। বাড়ির ঢালু ছাদগুলো বরফ থেকে বাঁচার কৌশল হয়তো। বেশী বরফ জমলে তার চাপে বাড়ি ভেঙে যেতে পারে, তাই ছাদগুলো ঢালু রাখা হয় যাতে জমা বরফ গড়িয়ে নীচে নেমে যেতে পারে। আর প্রতিটা বাড়ি ভীষণ কালারফুল। এতটাই ঝকমকে তাদের বর্ণ-বৈচিত্র মনে হয় বিশাল কোনো সবুজ শাড়িতে ঝলমলে নানা রংয়ের চুমকি বসানো অথবা মনে হয় কেউ সবুজ ক্যানভাসে রঙিন আলপনা এঁকেছে।
কিছু বাড়ি দেখে অদ্ভুত লাগলো। সেগুলোর বেশির ভাগটা পাহাড় কেটে ভিতরে ঢোকানো। শুধু বের হবার পথটা বাইরে বেরিয়ে আছে টিনের টুপি মাথায় দিয়ে। এত উঁচুতে নিঃসঙ্গ কিছু বাড়ি দেখলাম যে মনে হলো এখানে এরা একা একা থাকে কিভাবে? অতিথি আসতে গেলে যে পরিশ্রম করতে হবে সেটা কল্পনা করলেও শিউরে উঠতে হয়। পাশে ধাপ কেটে কেটে নিজস্ব চাষাবাদের জায়গা তৈরি করে নিয়েছে তারা।
লাঞ্চ প্যাকেট গাড়িতে ওঠার আগেই দিয়ে দিয়েছিল। তাই আপাতত দাঁড়াবার দরকার নেই। আমাদের গাড়ি কাটরা ক্রস করলো। দূর থেকে বৈষ্ণো দেবী পাহাড়টা দর্শন করলাম আর মনে মনে প্রণাম জানলাম মাই-জি কে। ফেরার পথে এখানেই আমাদের আসতে হবে। তাই জায়গাটা একটু খেয়াল করে নজর করলাম। কাটরা ছাড়িয়ে গাড়ি উধমপুরের দিকে ছুটে চলেছে। গাড়ি যতো এগিয়ে চলেছে পাহাড়ের গায়ে সবুজ তত বাড়ছে। কিন্তু এখনও পাহাড়ের চূড়ায় কোথাও বরফ দেখলাম না। আর এখানে ঠান্ডাও তেমন নেই। কলকাতার নভেম্বরেরের ঠান্ডার মতই লাগছে। বরফের রাজ্যে এসেছি বলে এখনও তেমন কোনো অনুভুতি হচ্ছে না। তবে যাত্রীবাহী গাড়ির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গেছে। কিছু কিছু ট্যুরিস্ট গাড়ি আর বেশিরভাগ সেনাবাহিনীর জলপাই রঙা ট্রাকই চলাচল করছে। উধমপুর আমাদের সেনাবাহিনীর একটা অন্যতম প্রধান বেস। এছাড়া সোনমার্গ সহ বর্ডার এরিয়াতে প্রচুর সেনা মোতায়েন করা আছে। তাদের রসদও কম প্রয়োজন হয় না।
ঘন্টা দুই চলার পর গাড়ি একটা ধাবার পাশে দাঁড়ালো। ধাপাটা পাহাড়ের একটা ঝুলন্ত অংশে তৈরি। অদ্ভুত মনোরম পরিবেশ আর অপূর্ব প্রাকৃতিক শোভা মন এবং চোখ কেড়ে নিলো। কেউ বাথরুম করলে যেতে পারে আর ফাঁকে একটু চাও খেয়ে নেয়া যাবে। শ্রীনগর পৌঁছাতে প্রায় মধ্য রাত হয়ে যাবে। পাহাড়ী রাস্তায় চলার একটা ধকল আছে। সেটা সবার চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপের মধ্যে ফুটে উঠেছে, দেখেই বোঝা যায়।
ধাবাতে বসে চা খাচ্ছি, পিছনে কখন রিয়া আর অঙ্কিতা এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি। রিয়ার গলা শুনে পিছনে তাকালাম।
"দেখ অঙ্কিতা খুব তো তমাল, তমাল করছিলি। তিনিতো বেশ একা একা চা খাচ্ছেন তোকে ফেলে।"
আমি হেসে বললাম- "বোসো।"
রিয়া আর অঙ্কিতা সামনের চেয়ারে বসলো।
বললাম- "তোমরা তো এখন অন্য গাড়ির যাত্রী তোমাদের সেবা করার সৌভাগ্য আমার কিভাবে হবে?"
রিয়া বললো- "ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয় মশাই।"
আমি বললাম- "তাই? আচ্ছা বোসো এখনি চা খাওয়াচ্ছি।"
আরও দুই কাপ চায়ের অর্ডার দিলাম। রিয়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে দেখছে। তারপর অঙ্কিতাকে বললো- "হ্যাঁ, সত্যিই হ্যান্ডসাম রে।"
আমি হেসে ফেলতে রিয়া বললো- "আর বলবেন না মশাই। বন্ধুকে নিজের কাছে তুলে নিলাম পুরানো গল্প করবো বলে। তা সে তো তমালের গল্প বলেই শেষ করতে পারছে না।"

kingsuk25@ জিমেইল ডট কম


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)