18-06-2026, 07:38 AM
অধ্যায় ১৩ : দেরি
শীতকালের বিকেলগুলো বড়ই বিশ্বাসঘাতক।
মনে হয় এখনও অনেক সময় আছে।
তারপর হঠাৎ দেখা যায় সূর্য নেমে গেছে, আলো ফুরিয়ে এসেছে।
কাশীপুরের মানুষ এই ব্যাপারটা ভালো করেই জানে।
তাই বিকেলের কাজগুলো সবাই একটু তাড়াতাড়িই সেরে ফেলার চেষ্টা করে।
⸻
সেদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে রতনরা রাস্তার ধারে একটা খেজুর গাছের নিচে দাঁড়িয়েছিল।
গাছের গায়ে বাঁধা মাটির ভাঁড় থেকে ফোঁটা ফোঁটা রস পড়ছে।
পল্টু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা দেখছিল।
— যদি একটু খেতে দিত!
— চুরি করে খাস।
বাপন বলল।
— তারপর ধরা পড়লে?
— তাহলে দৌড় দিবি।
পল্টু গভীর চিন্তার ভান করল।
— পরিকল্পনাটা খারাপ না।
শিবু হেসে ফেলল।
⸻
বাড়ি ফিরে রতন দেখল প্রতিমা একটা পুরোনো শার্টে বোতাম লাগাচ্ছেন।
জানলার পাশে বসে কাজ করছেন।
আলো ভালো পাওয়া যায় সেখানে।
সুঁইয়ে সুতো ঢোকাতে গিয়ে একবার চোখ ছোট করলেন।
তারপর আবার চেষ্টা করলেন।
— মা।
— কী?
— খেতে কী হবে?
— আগে হাতমুখ ধুয়ে আয়।
— সেটা তো হবেই।
— তাহলে প্রশ্ন কেন?
রতন হেসে বেরিয়ে গেল।
⸻
বিকেলের দিকে মাঠ যথারীতি জমে উঠল।
আজ একটু বেশি ঠান্ডা।
খেলার ফাঁকে ফাঁকে সবাই নিঃশ্বাসের ধোঁয়া বের করে দেখছে।
পল্টু সবচেয়ে বেশি।
সে বারবার মুখ দিয়ে বাতাস ছাড়ছে।
— দেখ! ধোঁয়া বেরোচ্ছে!
— তো?
— আমি ড্রাগন।
— তুই গাধা।
কার্তিক উত্তর দিল।
সবাই হেসে উঠল।
⸻
মাঠের একধারে কয়েকজন ছোট ছেলে ঘুড়ি ওড়ানোর চেষ্টা করছিল।
হাওয়া কম।
ঘুড়ি বারবার উঠছে, আবার নামছে।
একজন রেগে গিয়ে সুতোটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলল।
আরেকজন বলল,
— আরে ধৈর্য ধর!
এইসব ছোটখাটো ঘটনা মাঠজুড়ে ছড়িয়ে ছিল।
⸻
সূর্য একটু নিচে নামতেই লোকজনও কমতে শুরু করল।
গ্রামের মহিলারা কেউ কেউ মাথায় শুকনো ডালের বোঝা নিয়ে ফিরছেন।
কেউ পুকুরঘাট থেকে আসছেন।
কেউ দূর থেকে পরিচিত কাউকে দেখে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলে নিচ্ছেন।
কাশীপুর সন্ধ্যার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
⸻
ঠিক সেই সময় খবরটা প্রথম এল।
মধু ঘোষের ছোট ছাগলটা এখনও ফেরেনি।
খবরটা অবশ্য প্রথমে কেউ গুরুত্ব দিল না।
ছাগল মাঝেমধ্যে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়।
এ নতুন কিছু নয়।
নরুর দোকানে বসে ভোলা ঘোষ বললেন,
— একটু পরেই চলে আসবে।
গদাধর কাকা মাথা নাড়লেন।
— নিশ্চয়ই।
নরুও একই কথা বলল।
— ছাগল কি ট্রেনে চেপে কলকাতা যাবে নাকি?
হাসাহাসি হলো।
বিষয়টা সেখানেই শেষ হয়ে গেল।
⸻
কিন্তু সন্ধ্যা নামার পরও ছাগলটা ফিরল না।
এবার মধু ঘোষ নিজে বেরোলেন খুঁজতে।
দু-একজন প্রতিবেশীও গেল।
কারণ গ্রামে এমনটাই হয়।
একজনের সমস্যা মানে অনেক সময় সবার সমস্যা।
⸻
নরুর দোকানে তখন হারিকেন জ্বলছে।
কেটলির মুখ দিয়ে বাষ্প উঠছে।
বেঞ্চের নিচে একটা কুকুর কুঁকড়ে শুয়ে আছে।
ভোলা ঘোষ চায়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে বসেছিলেন।
ঠিক তখনই মধু ঘোষের ভাই এসে বলল,
— কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।
নরু বলল,
— ভালো করে দেখেছ?
— যতদূর পারি দেখেছি।
ভোলা ঘোষের মুখের হাসিটা একটু মিলিয়ে গেল।
— কোথায় কোথায় খুঁজেছ?
লোকটা কয়েকটা জায়গার নাম বলল।
সবাই শুনল।
কেউ কিছু বলল না।
⸻
সেই সময় রতনও দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে লক্ষ্য করল, হরিপদ মাস্টার আজও এসেছেন।
কিন্তু আগের মতো গল্প করছেন না।
শুধু চুপচাপ শুনছেন।
মধু ঘোষের ভাই যখন বলল—
— মাঠের ওদিকটাও দেখে এসেছি…
তখন হরিপদ মাস্টারের আঙুল ভাঁড়ের গায়ে একবার থেমে গেল।
খুব ছোট্ট একটা ব্যাপার।
হয়তো কাকতালীয়।
হয়তো না।
রতন ঠিক বুঝতে পারল না।
⸻
— পাওয়া যাবে।
শেষমেশ গদাধর কাকা বললেন।
— ছাগল তো আর হাওয়া হয়ে যায় না।
কথাটা যুক্তিসঙ্গত।
সবাই মাথা নাড়ল।
ধীরে ধীরে আড্ডা অন্যদিকে চলে গেল।
কিন্তু আগের সেই হাসিঠাট্টা আর ফিরল না।
⸻
রাতে বাড়ি ফিরে রতন দেখল রমাপদ বই পড়ছেন।
প্রতিমা একটা পুরোনো চাদর গুছিয়ে রাখছেন।
ঘরটায় পরিচিত উষ্ণতা।
নিরাপত্তা।
স্বাভাবিকতা।
তবু রতনের মাথায় ঘুরছিল ছাগলটার কথা।
একটা ছাগল হারানোয় এত ভাবার কী আছে?
সে নিজেই বুঝতে পারছিল না।
⸻
ঘুমোতে যাওয়ার আগে সে জানলার কাছে দাঁড়াল।
বাইরে কুয়াশা।
দূরে একটা আলো।
সম্ভবত কারও উঠোনে হারিকেন।
তারও দূরে অন্ধকার।
অসীম অন্ধকার।
রতন কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর জানলা বন্ধ করে দিল।
সে জানত না, মধু ঘোষের ছাগলটার গল্প এখানেই শেষ হয়নি।
আর কাশীপুরের কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষ সেই রাতে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সময় জেগে ছিলেন।
শীতকালের বিকেলগুলো বড়ই বিশ্বাসঘাতক।
মনে হয় এখনও অনেক সময় আছে।
তারপর হঠাৎ দেখা যায় সূর্য নেমে গেছে, আলো ফুরিয়ে এসেছে।
কাশীপুরের মানুষ এই ব্যাপারটা ভালো করেই জানে।
তাই বিকেলের কাজগুলো সবাই একটু তাড়াতাড়িই সেরে ফেলার চেষ্টা করে।
⸻
সেদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে রতনরা রাস্তার ধারে একটা খেজুর গাছের নিচে দাঁড়িয়েছিল।
গাছের গায়ে বাঁধা মাটির ভাঁড় থেকে ফোঁটা ফোঁটা রস পড়ছে।
পল্টু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা দেখছিল।
— যদি একটু খেতে দিত!
— চুরি করে খাস।
বাপন বলল।
— তারপর ধরা পড়লে?
— তাহলে দৌড় দিবি।
পল্টু গভীর চিন্তার ভান করল।
— পরিকল্পনাটা খারাপ না।
শিবু হেসে ফেলল।
⸻
বাড়ি ফিরে রতন দেখল প্রতিমা একটা পুরোনো শার্টে বোতাম লাগাচ্ছেন।
জানলার পাশে বসে কাজ করছেন।
আলো ভালো পাওয়া যায় সেখানে।
সুঁইয়ে সুতো ঢোকাতে গিয়ে একবার চোখ ছোট করলেন।
তারপর আবার চেষ্টা করলেন।
— মা।
— কী?
— খেতে কী হবে?
— আগে হাতমুখ ধুয়ে আয়।
— সেটা তো হবেই।
— তাহলে প্রশ্ন কেন?
রতন হেসে বেরিয়ে গেল।
⸻
বিকেলের দিকে মাঠ যথারীতি জমে উঠল।
আজ একটু বেশি ঠান্ডা।
খেলার ফাঁকে ফাঁকে সবাই নিঃশ্বাসের ধোঁয়া বের করে দেখছে।
পল্টু সবচেয়ে বেশি।
সে বারবার মুখ দিয়ে বাতাস ছাড়ছে।
— দেখ! ধোঁয়া বেরোচ্ছে!
— তো?
— আমি ড্রাগন।
— তুই গাধা।
কার্তিক উত্তর দিল।
সবাই হেসে উঠল।
⸻
মাঠের একধারে কয়েকজন ছোট ছেলে ঘুড়ি ওড়ানোর চেষ্টা করছিল।
হাওয়া কম।
ঘুড়ি বারবার উঠছে, আবার নামছে।
একজন রেগে গিয়ে সুতোটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলল।
আরেকজন বলল,
— আরে ধৈর্য ধর!
এইসব ছোটখাটো ঘটনা মাঠজুড়ে ছড়িয়ে ছিল।
⸻
সূর্য একটু নিচে নামতেই লোকজনও কমতে শুরু করল।
গ্রামের মহিলারা কেউ কেউ মাথায় শুকনো ডালের বোঝা নিয়ে ফিরছেন।
কেউ পুকুরঘাট থেকে আসছেন।
কেউ দূর থেকে পরিচিত কাউকে দেখে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলে নিচ্ছেন।
কাশীপুর সন্ধ্যার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
⸻
ঠিক সেই সময় খবরটা প্রথম এল।
মধু ঘোষের ছোট ছাগলটা এখনও ফেরেনি।
খবরটা অবশ্য প্রথমে কেউ গুরুত্ব দিল না।
ছাগল মাঝেমধ্যে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়।
এ নতুন কিছু নয়।
নরুর দোকানে বসে ভোলা ঘোষ বললেন,
— একটু পরেই চলে আসবে।
গদাধর কাকা মাথা নাড়লেন।
— নিশ্চয়ই।
নরুও একই কথা বলল।
— ছাগল কি ট্রেনে চেপে কলকাতা যাবে নাকি?
হাসাহাসি হলো।
বিষয়টা সেখানেই শেষ হয়ে গেল।
⸻
কিন্তু সন্ধ্যা নামার পরও ছাগলটা ফিরল না।
এবার মধু ঘোষ নিজে বেরোলেন খুঁজতে।
দু-একজন প্রতিবেশীও গেল।
কারণ গ্রামে এমনটাই হয়।
একজনের সমস্যা মানে অনেক সময় সবার সমস্যা।
⸻
নরুর দোকানে তখন হারিকেন জ্বলছে।
কেটলির মুখ দিয়ে বাষ্প উঠছে।
বেঞ্চের নিচে একটা কুকুর কুঁকড়ে শুয়ে আছে।
ভোলা ঘোষ চায়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে বসেছিলেন।
ঠিক তখনই মধু ঘোষের ভাই এসে বলল,
— কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।
নরু বলল,
— ভালো করে দেখেছ?
— যতদূর পারি দেখেছি।
ভোলা ঘোষের মুখের হাসিটা একটু মিলিয়ে গেল।
— কোথায় কোথায় খুঁজেছ?
লোকটা কয়েকটা জায়গার নাম বলল।
সবাই শুনল।
কেউ কিছু বলল না।
⸻
সেই সময় রতনও দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে লক্ষ্য করল, হরিপদ মাস্টার আজও এসেছেন।
কিন্তু আগের মতো গল্প করছেন না।
শুধু চুপচাপ শুনছেন।
মধু ঘোষের ভাই যখন বলল—
— মাঠের ওদিকটাও দেখে এসেছি…
তখন হরিপদ মাস্টারের আঙুল ভাঁড়ের গায়ে একবার থেমে গেল।
খুব ছোট্ট একটা ব্যাপার।
হয়তো কাকতালীয়।
হয়তো না।
রতন ঠিক বুঝতে পারল না।
⸻
— পাওয়া যাবে।
শেষমেশ গদাধর কাকা বললেন।
— ছাগল তো আর হাওয়া হয়ে যায় না।
কথাটা যুক্তিসঙ্গত।
সবাই মাথা নাড়ল।
ধীরে ধীরে আড্ডা অন্যদিকে চলে গেল।
কিন্তু আগের সেই হাসিঠাট্টা আর ফিরল না।
⸻
রাতে বাড়ি ফিরে রতন দেখল রমাপদ বই পড়ছেন।
প্রতিমা একটা পুরোনো চাদর গুছিয়ে রাখছেন।
ঘরটায় পরিচিত উষ্ণতা।
নিরাপত্তা।
স্বাভাবিকতা।
তবু রতনের মাথায় ঘুরছিল ছাগলটার কথা।
একটা ছাগল হারানোয় এত ভাবার কী আছে?
সে নিজেই বুঝতে পারছিল না।
⸻
ঘুমোতে যাওয়ার আগে সে জানলার কাছে দাঁড়াল।
বাইরে কুয়াশা।
দূরে একটা আলো।
সম্ভবত কারও উঠোনে হারিকেন।
তারও দূরে অন্ধকার।
অসীম অন্ধকার।
রতন কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর জানলা বন্ধ করে দিল।
সে জানত না, মধু ঘোষের ছাগলটার গল্প এখানেই শেষ হয়নি।
আর কাশীপুরের কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষ সেই রাতে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সময় জেগে ছিলেন।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)