18-06-2026, 07:37 AM
অধ্যায় ১২ : কাশীপুরের রাত
দিনের বেলায় কাশীপুরকে দেখে কেউ ভয় পেত না।
কাঁচা রাস্তা।
পুকুর।
মাঠ।
টিনের চালের ঘর।
মন্দিরের ঘণ্টা।
চায়ের দোকানের আড্ডা।
সব মিলিয়ে আর পাঁচটা গ্রামের মতোই।
কিন্তু রাতের কাশীপুর…
রাতের কাশীপুরকে সবাই সমানভাবে চিনত না।
⸻
সেদিন রাতেও খাওয়া শেষ হতে হতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল।
প্রতিমা রান্নাঘর গুছিয়ে নিচ্ছিলেন।
পিতলের থালা ধোয়া হয়েছে।
চুলোর আগুন প্রায় নিভে এসেছে।
এক কোণে রাখা কলসির গায়ে হারিকেনের আলো পড়ে চিকচিক করছে।
তিনি অভ্যাসমতো চালের ডিব্বার ঢাকনা একবার দেখে নিলেন।
তারপর মশলার কৌটোগুলো ঠিক জায়গায় রাখলেন।
এসব কাজ তিনি প্রায় চোখ বন্ধ করেও করতে পারেন।
তবু প্রতিদিন করেন।
একইভাবে।
একই ক্রমে।
⸻
রতন পড়ার টেবিলে বসেছিল।
অঙ্কের খাতা খোলা।
পেন্সিলটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরছে।
পড়ার চেয়ে তার মন জানলার বাইরে বেশি।
দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল।
আরেকটা উত্তর দিল।
তারপর আবার সব চুপ।
⸻
রমাপদ বারান্দায় বসে ছিলেন।
চশমা খুলে চোখ মুছলেন।
আজ খাতা দেখার ইচ্ছে করছে না।
সারাদিন কলেজে কাটিয়ে মাথাটা একটু ভারী লাগছে।
তিনি উঠোনের দিকে তাকালেন।
তুলসীতলার পাশে ছায়া পড়ে আছে।
টিউবওয়েলের হাতলটা অন্ধকারে কেবল আবছা বোঝা যাচ্ছে।
দড়িতে শুকোতে দেওয়া একটা গামছা হাওয়ায় হালকা দুলে উঠল।
এইসব দৃশ্য তিনি হাজারবার দেখেছেন।
তবু রাতে জিনিসগুলোকে একটু আলাদা লাগে।
⸻
এদিকে কাশীপুরের পুকুরটাও নিশ্চুপ।
দিনভর যেখানে কাপড় কাচা, বাসন ধোয়া, গল্পগুজব লেগে থাকে, সেই ঘাট এখন ফাঁকা।
জলের ওপর আকাশের তারাগুলো কাঁপতে কাঁপতে ভেসে আছে।
মাঝে মাঝে কোনো মাছ জলের তলা থেকে উঠে এসে ছোট্ট একটা বৃত্ত তৈরি করে।
তারপর আবার অন্ধকার।
⸻
গ্রামের শেষের দিকের মাটির রাস্তা প্রায় জনমানবশূন্য।
দিনে এখান দিয়ে গরু যায়।
সাইকেল যায়।
ছেলেরা দৌড়ায়।
কিন্তু রাতে রাস্তার ওপর শুধু কুয়াশা নামে।
কোথাও কোথাও শুকনো পাতা জমে থাকে।
বাতাস এলেই সেগুলো একটু সরে যায়।
দূর থেকে শুনলে মনে হয় কেউ হাঁটছে।
কাছে গেলে বোঝা যায়, কেউ না।
⸻
বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে বাতাস ঢুকল।
শোঁ-শোঁ।
তারপর খসখস।
আবার শোঁ-শোঁ।
কাশীপুরের মানুষ এই শব্দে অভ্যস্ত।
ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে।
তবু গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে অনেকেই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে শোনে।
তারপর নিজেকে বোঝায়—
বাতাস ছাড়া আর কিছু না।
⸻
মাঠটাও এখন খালি।
বিকেলে যেখানে রতনদের চিৎকারে আকাশ মাথায় ওঠে, সেখানে এখন কুয়াশার পাতলা চাদর।
ঘাসের ডগায় শিশির জমছে।
এদিক-ওদিক দু-একটা জোনাকি জ্বলছে।
দিনের পরিচিত মাঠটাকে যেন চিনতেই কষ্ট হয়।
⸻
নরুর দোকান বন্ধ।
কাঠের ঝাঁপ নামানো।
বেঞ্চ দুটো ফাঁকা।
দিনভর চায়ের গন্ধ, হাসাহাসি, তর্কের পর এখন সেখানে শুধু নীরবতা।
দোকানের সামনে একটা কুকুর গোল হয়ে শুয়ে আছে।
মাঝে মাঝে কান নেড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ছে।
⸻
রাত আরও গভীর হলো।
কাশীপুরের বেশিরভাগ মানুষ তখন ঘুমিয়ে।
কারও স্বপ্নে ফসল।
কারও স্বপ্নে শহরে থাকা ছেলে।
কারও স্বপ্নে আগামীকালের কাজ।
সবকিছু যেন স্বাভাবিক।
একেবারে স্বাভাবিক।
⸻
কিন্তু কিছু জায়গা আছে, যেগুলোকে রাত অন্যভাবে ছুঁয়ে যায়।
কাশীপুরের কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষ এটা জানেন।
তারা কাউকে বোঝানোর চেষ্টা করেন না।
কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন।
হয়তো অসম্ভবও।
তারা শুধু জানেন—
কিছু কিছু জায়গা দিনের আলোয় যেমন দেখায়, অন্ধকারে ঠিক তেমন থাকে না।
আর সেই কারণেই হয়তো, অনেক পুরোনো অভ্যাস আজও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
কেউ কেউ এখনও অকারণে কিছু রাস্তা এড়িয়ে চলে।
কেউ কেউ এখনও সন্ধ্যার পরে বাড়ি ফিরতে দেরি করতে চায় না।
আর কেউ কেউ কোনো কোনো প্রসঙ্গ উঠলেই চুপ করে যায়।
⸻
সেই রাতেও কাশীপুর ঘুমিয়ে ছিল।
শীতের কুয়াশা ধীরে ধীরে নামছিল।
একটা রাতচরা পাখি ডেকে উঠল দূরে কোথাও।
তারপর আবার নীরবতা।
এমন নীরবতা, যার ভেতরে কোনো রহস্য আছে কি না, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।
তবু…
কিছু কিছু মানুষ মনে মনে বিশ্বাস করে—
সব নীরবতা একরকম নয়।
দিনের বেলায় কাশীপুরকে দেখে কেউ ভয় পেত না।
কাঁচা রাস্তা।
পুকুর।
মাঠ।
টিনের চালের ঘর।
মন্দিরের ঘণ্টা।
চায়ের দোকানের আড্ডা।
সব মিলিয়ে আর পাঁচটা গ্রামের মতোই।
কিন্তু রাতের কাশীপুর…
রাতের কাশীপুরকে সবাই সমানভাবে চিনত না।
⸻
সেদিন রাতেও খাওয়া শেষ হতে হতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল।
প্রতিমা রান্নাঘর গুছিয়ে নিচ্ছিলেন।
পিতলের থালা ধোয়া হয়েছে।
চুলোর আগুন প্রায় নিভে এসেছে।
এক কোণে রাখা কলসির গায়ে হারিকেনের আলো পড়ে চিকচিক করছে।
তিনি অভ্যাসমতো চালের ডিব্বার ঢাকনা একবার দেখে নিলেন।
তারপর মশলার কৌটোগুলো ঠিক জায়গায় রাখলেন।
এসব কাজ তিনি প্রায় চোখ বন্ধ করেও করতে পারেন।
তবু প্রতিদিন করেন।
একইভাবে।
একই ক্রমে।
⸻
রতন পড়ার টেবিলে বসেছিল।
অঙ্কের খাতা খোলা।
পেন্সিলটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরছে।
পড়ার চেয়ে তার মন জানলার বাইরে বেশি।
দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল।
আরেকটা উত্তর দিল।
তারপর আবার সব চুপ।
⸻
রমাপদ বারান্দায় বসে ছিলেন।
চশমা খুলে চোখ মুছলেন।
আজ খাতা দেখার ইচ্ছে করছে না।
সারাদিন কলেজে কাটিয়ে মাথাটা একটু ভারী লাগছে।
তিনি উঠোনের দিকে তাকালেন।
তুলসীতলার পাশে ছায়া পড়ে আছে।
টিউবওয়েলের হাতলটা অন্ধকারে কেবল আবছা বোঝা যাচ্ছে।
দড়িতে শুকোতে দেওয়া একটা গামছা হাওয়ায় হালকা দুলে উঠল।
এইসব দৃশ্য তিনি হাজারবার দেখেছেন।
তবু রাতে জিনিসগুলোকে একটু আলাদা লাগে।
⸻
এদিকে কাশীপুরের পুকুরটাও নিশ্চুপ।
দিনভর যেখানে কাপড় কাচা, বাসন ধোয়া, গল্পগুজব লেগে থাকে, সেই ঘাট এখন ফাঁকা।
জলের ওপর আকাশের তারাগুলো কাঁপতে কাঁপতে ভেসে আছে।
মাঝে মাঝে কোনো মাছ জলের তলা থেকে উঠে এসে ছোট্ট একটা বৃত্ত তৈরি করে।
তারপর আবার অন্ধকার।
⸻
গ্রামের শেষের দিকের মাটির রাস্তা প্রায় জনমানবশূন্য।
দিনে এখান দিয়ে গরু যায়।
সাইকেল যায়।
ছেলেরা দৌড়ায়।
কিন্তু রাতে রাস্তার ওপর শুধু কুয়াশা নামে।
কোথাও কোথাও শুকনো পাতা জমে থাকে।
বাতাস এলেই সেগুলো একটু সরে যায়।
দূর থেকে শুনলে মনে হয় কেউ হাঁটছে।
কাছে গেলে বোঝা যায়, কেউ না।
⸻
বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে বাতাস ঢুকল।
শোঁ-শোঁ।
তারপর খসখস।
আবার শোঁ-শোঁ।
কাশীপুরের মানুষ এই শব্দে অভ্যস্ত।
ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে।
তবু গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে অনেকেই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে শোনে।
তারপর নিজেকে বোঝায়—
বাতাস ছাড়া আর কিছু না।
⸻
মাঠটাও এখন খালি।
বিকেলে যেখানে রতনদের চিৎকারে আকাশ মাথায় ওঠে, সেখানে এখন কুয়াশার পাতলা চাদর।
ঘাসের ডগায় শিশির জমছে।
এদিক-ওদিক দু-একটা জোনাকি জ্বলছে।
দিনের পরিচিত মাঠটাকে যেন চিনতেই কষ্ট হয়।
⸻
নরুর দোকান বন্ধ।
কাঠের ঝাঁপ নামানো।
বেঞ্চ দুটো ফাঁকা।
দিনভর চায়ের গন্ধ, হাসাহাসি, তর্কের পর এখন সেখানে শুধু নীরবতা।
দোকানের সামনে একটা কুকুর গোল হয়ে শুয়ে আছে।
মাঝে মাঝে কান নেড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ছে।
⸻
রাত আরও গভীর হলো।
কাশীপুরের বেশিরভাগ মানুষ তখন ঘুমিয়ে।
কারও স্বপ্নে ফসল।
কারও স্বপ্নে শহরে থাকা ছেলে।
কারও স্বপ্নে আগামীকালের কাজ।
সবকিছু যেন স্বাভাবিক।
একেবারে স্বাভাবিক।
⸻
কিন্তু কিছু জায়গা আছে, যেগুলোকে রাত অন্যভাবে ছুঁয়ে যায়।
কাশীপুরের কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষ এটা জানেন।
তারা কাউকে বোঝানোর চেষ্টা করেন না।
কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন।
হয়তো অসম্ভবও।
তারা শুধু জানেন—
কিছু কিছু জায়গা দিনের আলোয় যেমন দেখায়, অন্ধকারে ঠিক তেমন থাকে না।
আর সেই কারণেই হয়তো, অনেক পুরোনো অভ্যাস আজও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
কেউ কেউ এখনও অকারণে কিছু রাস্তা এড়িয়ে চলে।
কেউ কেউ এখনও সন্ধ্যার পরে বাড়ি ফিরতে দেরি করতে চায় না।
আর কেউ কেউ কোনো কোনো প্রসঙ্গ উঠলেই চুপ করে যায়।
⸻
সেই রাতেও কাশীপুর ঘুমিয়ে ছিল।
শীতের কুয়াশা ধীরে ধীরে নামছিল।
একটা রাতচরা পাখি ডেকে উঠল দূরে কোথাও।
তারপর আবার নীরবতা।
এমন নীরবতা, যার ভেতরে কোনো রহস্য আছে কি না, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।
তবু…
কিছু কিছু মানুষ মনে মনে বিশ্বাস করে—
সব নীরবতা একরকম নয়।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)