18-06-2026, 07:36 AM
অধ্যায় ১১ : রবিবারের সকাল
রবিবার বলে কাশীপুরে কেউ দেরি করে ঘুমোয় না।
শহরের মতো এখানে ছুটির দিন মানে বিছানায় গড়াগড়ি নয়।
বরং অনেকের কাজ যেন আরও বেড়ে যায়।
ভোরের কুয়াশা তখনও পুরো কাটেনি।
দূরের তালগাছগুলো আবছা দেখা যাচ্ছে।
মোরগ ডেকেছে অনেকক্ষণ।
পুকুরের ধারে কয়েকজন মহিলা ইতিমধ্যেই জড়ো হয়ে গেছেন।
কারও হাতে কাপড়ের ঝুড়ি।
কারও হাতে পিতলের কলসি।
কারও হাতে বাসন।
⸻
প্রতিমা আজ একটু আগে বেরিয়েছেন।
গতকালের কিছু কাপড় ধোয়া বাকি ছিল।
পুকুরঘাটে পৌঁছাতেই কমলা বৌদি বললেন,
— এই যে, আজ সূর্য কোনদিকে উঠেছে?
— কেন?
— তুমি আমার আগে এসেছ!
মহিলাদের মধ্যে হাসির রোল উঠল।
প্রতিমাও হেসে ফেললেন।
পাশে মঞ্জু কাকিমা বাসন ধুচ্ছিলেন।
জল থেকে হাত তুলে বললেন,
— শুনেছ? কাল নাকি ম্যাচ আছে।
— শুনেছি।
— রতন খেলবে তো?
— খেলবে বলেই তো সকাল থেকে মাথা খাচ্ছে।
⸻
পুকুরের অন্যপ্রান্তে বাসন্তী পিসি কাপড় কাচছিলেন।
বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে।
চোখেমুখে বয়সের ছাপ আছে, কিন্তু কাজের সময় কাউকে টেক্কা দেওয়া কঠিন।
তিনি বললেন,
— ছেলেপুলে যত বড় হয়, তত চিন্তা বাড়ে।
কমলা বৌদি সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
— আমার ওদের বয়সে শুধু খাওয়া আর ঘুমের চিন্তা ছিল।
— এখনও তাই আছে।
আবার হাসাহাসি।
⸻
এই সময় সরস্বতী ঠাকুমা ধীরে ধীরে ঘাটে এসে বসলেন।
হাতে লাঠি।
চোখ কুঁচকে চারপাশ দেখলেন।
— কে রে? কমলা?
— হ্যাঁ ঠাকুমা।
— আর প্রতিমা?
— আমি আছি।
— ভালো ভালো।
বৃদ্ধা বসে রইলেন।
কিছুক্ষণ পরে পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— এই পুকুরটা আগে আরও বড় ছিল।
মঞ্জু কাকিমা হেসে বললেন,
— আপনার কাছে সবই আগে বড় ছিল।
— তা ছিলই তো।
— আচ্ছা আচ্ছা, মানলাম।
কথাটা হেসে উড়িয়ে দেওয়া হলো।
কিন্তু বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
যেন তিনি সত্যিই অন্য একটা কাশীপুর দেখেছেন।
⸻
এদিকে রতনের রবিবার মানেই মাঠ।
খাওয়া শেষ করেই সে বেরিয়ে পড়ল।
প্রতিমা পেছন থেকে ডাকলেন,
— দুপুরের আগে ফিরবি।
— চেষ্টা করব।
— “চেষ্টা করব” মানে?
— ফিরব।
বলেই সে দৌড় দিল।
⸻
রাস্তার ধারে শিবু দাঁড়িয়ে ছিল।
হাতে একটা কঞ্চি।
মাটিতে আঁকিবুঁকি কাটছে।
— চল।
— চল।
দুজন হাঁটতে শুরু করল।
পথে একটা আমগাছের নিচে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ রোদ পোহাচ্ছিলেন।
ভোলা ঘোষ, গদাধর কাকা আর আরও দু-একজন।
ভোলা ঘোষ ডাকলেন,
— আজ আবার ফুটবল?
— হ্যাঁ।
— পা ভেঙে আনিস না যেন।
পল্টু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— ভাঙলে মাস্টারমশাইকে বলব আপনিই বলেছেন।
সবাই হেসে উঠল।
⸻
মাঠে পৌঁছে দেখা গেল ইতিমধ্যেই বেশ ভিড়।
ছোটরা ক্রিকেট খেলছে।
কয়েকজন মেয়ে দূরে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।
দু-একজন ছোট্ট বাচ্চা ঘাসের মধ্যে প্রজাপতি ধরার চেষ্টা করছে।
নরুর ছেলে বাবাই আবার সেই পুরোনো টায়ার নিয়ে এসেছে।
টায়ারটা আজও সোজা চলছে না।
তবু সে হাল ছাড়েনি।
⸻
খেলা শুরু হওয়ার আগে রতন ঘাসে বসে জুতোর ফিতে বাঁধছিল।
তার পাশে কার্তিক একটা শুকনো ডাল দিয়ে মাটি খুঁটছিল।
পল্টু একটা ছোট পাথর তুলে দূরের ঝোপের দিকে ছুঁড়ে মারল।
ঝোপটা কেঁপে উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে একটা শালিক উড়ে বেরিয়ে এলো।
— আরে!
পল্টু নিজেই চমকে উঠল।
সবাই হেসে গড়াগড়ি।
⸻
মাঠের চারপাশে তখন শীতের নরম রোদ।
দূরে কয়েকজন মহিলা মাথায় শুকনো ডাল নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।
কারও শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে।
কারও সঙ্গে ছোট্ট ছেলে হাঁটছে।
কেউ আবার রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পরিচিত কাউকে ডেকে কথা বলছে।
এইসব দৃশ্য এত সাধারণ যে কেউ আলাদা করে খেয়াল করে না।
কিন্তু কাশীপুরকে কাশীপুর বানায় এইসব মানুষই।
⸻
সেদিন বিকেলে হরিপদ মাস্টার মাঠে আসেননি।
ভোলা ঘোষও না।
এটা খুব অস্বাভাবিক নয়।
তবু কার্তিক একবার বলল,
— আজ দাদুকেও দেখলাম না।
— হয়তো ঘুমোচ্ছে।
— হতে পারে।
কথা সেখানেই শেষ হয়ে গেল।
⸻
সন্ধ্যায় প্রতিমা যখন রান্নাঘরে রুটি বেলছিলেন, তখন বাইরে থেকে কমলা বৌদির গলা শোনা গেল।
— প্রতিমা!
— আসছি!
প্রতিমা হাত মুছে বেরোলেন।
কমলা বৌদি এসে দাঁড়িয়ে আছেন।
মুখে সেই চিরচেনা হাসি।
— কিছু না, ভাবলাম একটু গল্প করি।
গ্রামে এভাবেই মানুষ একে অপরের ঘরে ঢুকে পড়ে।
আগে থেকে খবর দিতে হয় না।
দরজা বন্ধ থাকে না।
মানুষও একা থাকে না।
কাশীপুর এখনও সেই পুরোনো অভ্যাস আঁকড়ে ধরে আছে।
আর হয়তো সেই কারণেই, গ্রামের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো পুরোনো গোপন কথা এতদিন মানুষের চোখ এড়িয়ে থাকতে পেরেছে।
রবিবার বলে কাশীপুরে কেউ দেরি করে ঘুমোয় না।
শহরের মতো এখানে ছুটির দিন মানে বিছানায় গড়াগড়ি নয়।
বরং অনেকের কাজ যেন আরও বেড়ে যায়।
ভোরের কুয়াশা তখনও পুরো কাটেনি।
দূরের তালগাছগুলো আবছা দেখা যাচ্ছে।
মোরগ ডেকেছে অনেকক্ষণ।
পুকুরের ধারে কয়েকজন মহিলা ইতিমধ্যেই জড়ো হয়ে গেছেন।
কারও হাতে কাপড়ের ঝুড়ি।
কারও হাতে পিতলের কলসি।
কারও হাতে বাসন।
⸻
প্রতিমা আজ একটু আগে বেরিয়েছেন।
গতকালের কিছু কাপড় ধোয়া বাকি ছিল।
পুকুরঘাটে পৌঁছাতেই কমলা বৌদি বললেন,
— এই যে, আজ সূর্য কোনদিকে উঠেছে?
— কেন?
— তুমি আমার আগে এসেছ!
মহিলাদের মধ্যে হাসির রোল উঠল।
প্রতিমাও হেসে ফেললেন।
পাশে মঞ্জু কাকিমা বাসন ধুচ্ছিলেন।
জল থেকে হাত তুলে বললেন,
— শুনেছ? কাল নাকি ম্যাচ আছে।
— শুনেছি।
— রতন খেলবে তো?
— খেলবে বলেই তো সকাল থেকে মাথা খাচ্ছে।
⸻
পুকুরের অন্যপ্রান্তে বাসন্তী পিসি কাপড় কাচছিলেন।
বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে।
চোখেমুখে বয়সের ছাপ আছে, কিন্তু কাজের সময় কাউকে টেক্কা দেওয়া কঠিন।
তিনি বললেন,
— ছেলেপুলে যত বড় হয়, তত চিন্তা বাড়ে।
কমলা বৌদি সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
— আমার ওদের বয়সে শুধু খাওয়া আর ঘুমের চিন্তা ছিল।
— এখনও তাই আছে।
আবার হাসাহাসি।
⸻
এই সময় সরস্বতী ঠাকুমা ধীরে ধীরে ঘাটে এসে বসলেন।
হাতে লাঠি।
চোখ কুঁচকে চারপাশ দেখলেন।
— কে রে? কমলা?
— হ্যাঁ ঠাকুমা।
— আর প্রতিমা?
— আমি আছি।
— ভালো ভালো।
বৃদ্ধা বসে রইলেন।
কিছুক্ষণ পরে পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— এই পুকুরটা আগে আরও বড় ছিল।
মঞ্জু কাকিমা হেসে বললেন,
— আপনার কাছে সবই আগে বড় ছিল।
— তা ছিলই তো।
— আচ্ছা আচ্ছা, মানলাম।
কথাটা হেসে উড়িয়ে দেওয়া হলো।
কিন্তু বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
যেন তিনি সত্যিই অন্য একটা কাশীপুর দেখেছেন।
⸻
এদিকে রতনের রবিবার মানেই মাঠ।
খাওয়া শেষ করেই সে বেরিয়ে পড়ল।
প্রতিমা পেছন থেকে ডাকলেন,
— দুপুরের আগে ফিরবি।
— চেষ্টা করব।
— “চেষ্টা করব” মানে?
— ফিরব।
বলেই সে দৌড় দিল।
⸻
রাস্তার ধারে শিবু দাঁড়িয়ে ছিল।
হাতে একটা কঞ্চি।
মাটিতে আঁকিবুঁকি কাটছে।
— চল।
— চল।
দুজন হাঁটতে শুরু করল।
পথে একটা আমগাছের নিচে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ রোদ পোহাচ্ছিলেন।
ভোলা ঘোষ, গদাধর কাকা আর আরও দু-একজন।
ভোলা ঘোষ ডাকলেন,
— আজ আবার ফুটবল?
— হ্যাঁ।
— পা ভেঙে আনিস না যেন।
পল্টু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— ভাঙলে মাস্টারমশাইকে বলব আপনিই বলেছেন।
সবাই হেসে উঠল।
⸻
মাঠে পৌঁছে দেখা গেল ইতিমধ্যেই বেশ ভিড়।
ছোটরা ক্রিকেট খেলছে।
কয়েকজন মেয়ে দূরে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।
দু-একজন ছোট্ট বাচ্চা ঘাসের মধ্যে প্রজাপতি ধরার চেষ্টা করছে।
নরুর ছেলে বাবাই আবার সেই পুরোনো টায়ার নিয়ে এসেছে।
টায়ারটা আজও সোজা চলছে না।
তবু সে হাল ছাড়েনি।
⸻
খেলা শুরু হওয়ার আগে রতন ঘাসে বসে জুতোর ফিতে বাঁধছিল।
তার পাশে কার্তিক একটা শুকনো ডাল দিয়ে মাটি খুঁটছিল।
পল্টু একটা ছোট পাথর তুলে দূরের ঝোপের দিকে ছুঁড়ে মারল।
ঝোপটা কেঁপে উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে একটা শালিক উড়ে বেরিয়ে এলো।
— আরে!
পল্টু নিজেই চমকে উঠল।
সবাই হেসে গড়াগড়ি।
⸻
মাঠের চারপাশে তখন শীতের নরম রোদ।
দূরে কয়েকজন মহিলা মাথায় শুকনো ডাল নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।
কারও শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে।
কারও সঙ্গে ছোট্ট ছেলে হাঁটছে।
কেউ আবার রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পরিচিত কাউকে ডেকে কথা বলছে।
এইসব দৃশ্য এত সাধারণ যে কেউ আলাদা করে খেয়াল করে না।
কিন্তু কাশীপুরকে কাশীপুর বানায় এইসব মানুষই।
⸻
সেদিন বিকেলে হরিপদ মাস্টার মাঠে আসেননি।
ভোলা ঘোষও না।
এটা খুব অস্বাভাবিক নয়।
তবু কার্তিক একবার বলল,
— আজ দাদুকেও দেখলাম না।
— হয়তো ঘুমোচ্ছে।
— হতে পারে।
কথা সেখানেই শেষ হয়ে গেল।
⸻
সন্ধ্যায় প্রতিমা যখন রান্নাঘরে রুটি বেলছিলেন, তখন বাইরে থেকে কমলা বৌদির গলা শোনা গেল।
— প্রতিমা!
— আসছি!
প্রতিমা হাত মুছে বেরোলেন।
কমলা বৌদি এসে দাঁড়িয়ে আছেন।
মুখে সেই চিরচেনা হাসি।
— কিছু না, ভাবলাম একটু গল্প করি।
গ্রামে এভাবেই মানুষ একে অপরের ঘরে ঢুকে পড়ে।
আগে থেকে খবর দিতে হয় না।
দরজা বন্ধ থাকে না।
মানুষও একা থাকে না।
কাশীপুর এখনও সেই পুরোনো অভ্যাস আঁকড়ে ধরে আছে।
আর হয়তো সেই কারণেই, গ্রামের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো পুরোনো গোপন কথা এতদিন মানুষের চোখ এড়িয়ে থাকতে পেরেছে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)