18-06-2026, 07:35 AM
অধ্যায় ১০ : শীতের রাত, উষ্ণ ঘর
পৌষ মাস আরও একটু এগিয়ে এসেছে।
কাশীপুরে এখন সন্ধ্যা নামলেই ঠান্ডা হাওয়ার দাপট শুরু হয়।
দিনে রোদে বসলে আরাম লাগে, কিন্তু সূর্য ডুবলেই মানুষ গায়ে চাদর জড়াতে শুরু করে।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
বিকেলে মাঠ থেকে ফিরতে ফিরতে রতনের নাক লাল হয়ে গিয়েছিল।
পল্টু বলেছিল,
— তোর নাকটা ঠিক টমেটোর মতো হয়ে গেছে।
রতন সঙ্গে সঙ্গে একটা শুকনো আমপাতা ছুঁড়ে মেরেছিল।
অবশ্য পাতাটা মাঝপথেই মাটিতে পড়ে গিয়েছিল।
তবু বাকিরা হেসে কুটিকুটি।
⸻
বাড়ি ফিরে রতন দেখল উঠোনে ধোঁয়া উঠছে।
প্রতিমা শুকনো পাতা জ্বালিয়ে জল গরম করছেন।
চুলোর পাশে একটা সাদা-কালো বিড়াল গোল হয়ে বসে আছে।
আগুনের উষ্ণতা উপভোগ করছে।
রতন কাছে যেতেই বিড়ালটা একবার চোখ খুলে তাকাল।
তারপর আবার চোখ বন্ধ করল।
যেন রতনের অস্তিত্ব নিয়ে তার কোনো আগ্রহই নেই।
⸻
ঘরের ভেতরে রমাপদ খাতা দেখছেন।
টেবিলের ওপর কালি কলম।
একপাশে বইয়ের স্তূপ।
মাঝে মাঝে তিনি লাল কলম দিয়ে কিছু লিখছেন।
আবার ভুরু কুঁচকে চশমা একটু ওপরে তুলছেন।
হঠাৎ বললেন,
— রতন।
— হুঁ?
— অঙ্কের খাতা এনেছিস?
— এখন?
— না, আগামী বছর।
রতন মুখ বাঁকিয়ে ব্যাগের দিকে গেল।
প্রতিমার মুখে চাপা হাসি ফুটে উঠল।
⸻
রাতে খাওয়া হলো একটু দেরিতে।
প্রতিমা আলু-পোস্ত আর ডাল করেছিলেন।
রমাপদ খেতে খেতে বললেন,
— আলু-পোস্তটা আজ ভালো হয়েছে।
প্রতিমা স্বাভাবিক গলায় বললেন,
— রোজ খারাপ হয় নাকি?
— তা বলিনি।
— বললেও কিছু যায় আসে না।
রমাপদ হেসে ফেললেন।
রতন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই কথাগুলো প্রায়ই হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কখনও ঝগড়ায় গড়ায় না।
⸻
খাওয়ার পরে রতন পড়তে বসল।
যদিও পড়ার চেয়ে জানলার বাইরে তাকানোতেই তার আগ্রহ বেশি।
আজ আকাশ পরিষ্কার।
অনেক তারা দেখা যাচ্ছে।
দূরে কোথাও বাঁশঝাড়ে বাতাস ঢুকছে।
শৌ-শৌ শব্দ।
মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক।
আবার সব চুপ।
⸻
রতন যখন নিজের ঘরে, তখন বারান্দায় বসেছিলেন রমাপদ আর প্রতিমা।
হারিকেনের আলোটা খুব উজ্জ্বল নয়।
আলো আর ছায়ার মাঝামাঝি একটা আবহ।
প্রতিমা পুরোনো একটা শাল সেলাই করছিলেন।
রমাপদ খাতা গুছিয়ে রাখছিলেন।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বললেন না।
দীর্ঘদিনের সংসারে এমন নীরবতাও এক ধরনের কথা।
শেষে প্রতিমাই বললেন,
— মনে আছে?
— কী?
— বিয়ের পর প্রথম শীতে তোমার ওই একটাই সোয়েটার ছিল।
রমাপদ হেসে ফেললেন।
— আর তোমার ছিল ওই নীল শালটা।
— যেটা পরে ছিঁড়ে গিয়েছিল।
— আর তুমি এক সপ্তাহ আমার ওপর রাগ করেছিলে।
— কারণ তুমিই পেরেকে আটকে ছিঁড়েছিলে।
— ইচ্ছে করে নাকি?
প্রতিমা এবারও হাসলেন।
হাসলে এখনও তাকে বয়সের চেয়ে একটু কম লাগে।
রমাপদ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।
প্রতিমা সেটা টের পেয়ে বললেন,
— কী?
— কিছু না।
— কিছু না মানে?
— কিছু না।
প্রতিমা চোখ ছোট করে তাকালেন।
— এত বছরেও মিথ্যে বলতে শিখলে না।
দুজনেই হেসে উঠলেন।
⸻
ভেতরের ঘর থেকে রতন এসব শুনতে পাচ্ছিল না।
সে তখন অঙ্কের খাতার দিকে তাকিয়ে যুদ্ধ করছে।
একটা অঙ্ক বারবার ভুল হচ্ছে।
শেষে বিরক্ত হয়ে পেন্সিলটা টেবিলে ছুঁড়ে রাখল।
পেন্সিলটা গড়িয়ে গিয়ে বইয়ের নিচে ঢুকে গেল।
এখন আবার সেটা খুঁজতে হবে।
— ধুর!
নিজের সঙ্গেই কথা বলল সে।
⸻
রাত আরও গভীর হলো।
এক এক করে কাশীপুরের আলো নিভে যেতে লাগল।
শুধু কোথাও কোথাও হারিকেনের ক্ষীণ আলো।
দূরে নরুর দোকানও বন্ধ হয়ে গেছে।
মন্দির নিঃশব্দ।
রাস্তাঘাট ফাঁকা।
শীতের রাত যেন পুরো গ্রামটাকে ধীরে ধীরে নিজের চাদরের নিচে ঢেকে ফেলল।
রমাপদ ঘুমোতে যাওয়ার আগে উঠোনে একবার বেরোলেন।
অভ্যাস।
সবকিছু ঠিক আছে কি না দেখে নেওয়া।
গোয়ালের দরজা বন্ধ।
টিউবওয়েলের পাশে বালতি উল্টে রাখা।
কাঠের গেট লাগানো।
সব ঠিক।
তিনি ফিরে আসতে যাচ্ছিলেন।
হঠাৎ দূরের মাঠের দিক থেকে ভেসে এল একটুকরো শব্দ।
খুব ক্ষীণ।
হয়তো কোনো রাতচরা পাখি।
হয়তো বাতাসে দুলে ওঠা ডাল।
হয়তো অন্য কিছু।
রমাপদ কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে শুনলেন।
তারপর মাথা নাড়িয়ে ঘরে ফিরে এলেন।
কারণ কাশীপুরে এমন শব্দ নতুন কিছু নয়।
আর মানুষ সাধারণত সেই জিনিসগুলো নিয়েই ভাবে না, যেগুলোকে সে প্রতিদিন শুনে অভ্যস্ত।
কিন্তু কখনও কখনও, সবচেয়ে পরিচিত শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অচেনা কিছুর প্রথম পদচিহ্ন।
পৌষ মাস আরও একটু এগিয়ে এসেছে।
কাশীপুরে এখন সন্ধ্যা নামলেই ঠান্ডা হাওয়ার দাপট শুরু হয়।
দিনে রোদে বসলে আরাম লাগে, কিন্তু সূর্য ডুবলেই মানুষ গায়ে চাদর জড়াতে শুরু করে।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
বিকেলে মাঠ থেকে ফিরতে ফিরতে রতনের নাক লাল হয়ে গিয়েছিল।
পল্টু বলেছিল,
— তোর নাকটা ঠিক টমেটোর মতো হয়ে গেছে।
রতন সঙ্গে সঙ্গে একটা শুকনো আমপাতা ছুঁড়ে মেরেছিল।
অবশ্য পাতাটা মাঝপথেই মাটিতে পড়ে গিয়েছিল।
তবু বাকিরা হেসে কুটিকুটি।
⸻
বাড়ি ফিরে রতন দেখল উঠোনে ধোঁয়া উঠছে।
প্রতিমা শুকনো পাতা জ্বালিয়ে জল গরম করছেন।
চুলোর পাশে একটা সাদা-কালো বিড়াল গোল হয়ে বসে আছে।
আগুনের উষ্ণতা উপভোগ করছে।
রতন কাছে যেতেই বিড়ালটা একবার চোখ খুলে তাকাল।
তারপর আবার চোখ বন্ধ করল।
যেন রতনের অস্তিত্ব নিয়ে তার কোনো আগ্রহই নেই।
⸻
ঘরের ভেতরে রমাপদ খাতা দেখছেন।
টেবিলের ওপর কালি কলম।
একপাশে বইয়ের স্তূপ।
মাঝে মাঝে তিনি লাল কলম দিয়ে কিছু লিখছেন।
আবার ভুরু কুঁচকে চশমা একটু ওপরে তুলছেন।
হঠাৎ বললেন,
— রতন।
— হুঁ?
— অঙ্কের খাতা এনেছিস?
— এখন?
— না, আগামী বছর।
রতন মুখ বাঁকিয়ে ব্যাগের দিকে গেল।
প্রতিমার মুখে চাপা হাসি ফুটে উঠল।
⸻
রাতে খাওয়া হলো একটু দেরিতে।
প্রতিমা আলু-পোস্ত আর ডাল করেছিলেন।
রমাপদ খেতে খেতে বললেন,
— আলু-পোস্তটা আজ ভালো হয়েছে।
প্রতিমা স্বাভাবিক গলায় বললেন,
— রোজ খারাপ হয় নাকি?
— তা বলিনি।
— বললেও কিছু যায় আসে না।
রমাপদ হেসে ফেললেন।
রতন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই কথাগুলো প্রায়ই হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কখনও ঝগড়ায় গড়ায় না।
⸻
খাওয়ার পরে রতন পড়তে বসল।
যদিও পড়ার চেয়ে জানলার বাইরে তাকানোতেই তার আগ্রহ বেশি।
আজ আকাশ পরিষ্কার।
অনেক তারা দেখা যাচ্ছে।
দূরে কোথাও বাঁশঝাড়ে বাতাস ঢুকছে।
শৌ-শৌ শব্দ।
মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক।
আবার সব চুপ।
⸻
রতন যখন নিজের ঘরে, তখন বারান্দায় বসেছিলেন রমাপদ আর প্রতিমা।
হারিকেনের আলোটা খুব উজ্জ্বল নয়।
আলো আর ছায়ার মাঝামাঝি একটা আবহ।
প্রতিমা পুরোনো একটা শাল সেলাই করছিলেন।
রমাপদ খাতা গুছিয়ে রাখছিলেন।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বললেন না।
দীর্ঘদিনের সংসারে এমন নীরবতাও এক ধরনের কথা।
শেষে প্রতিমাই বললেন,
— মনে আছে?
— কী?
— বিয়ের পর প্রথম শীতে তোমার ওই একটাই সোয়েটার ছিল।
রমাপদ হেসে ফেললেন।
— আর তোমার ছিল ওই নীল শালটা।
— যেটা পরে ছিঁড়ে গিয়েছিল।
— আর তুমি এক সপ্তাহ আমার ওপর রাগ করেছিলে।
— কারণ তুমিই পেরেকে আটকে ছিঁড়েছিলে।
— ইচ্ছে করে নাকি?
প্রতিমা এবারও হাসলেন।
হাসলে এখনও তাকে বয়সের চেয়ে একটু কম লাগে।
রমাপদ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।
প্রতিমা সেটা টের পেয়ে বললেন,
— কী?
— কিছু না।
— কিছু না মানে?
— কিছু না।
প্রতিমা চোখ ছোট করে তাকালেন।
— এত বছরেও মিথ্যে বলতে শিখলে না।
দুজনেই হেসে উঠলেন।
⸻
ভেতরের ঘর থেকে রতন এসব শুনতে পাচ্ছিল না।
সে তখন অঙ্কের খাতার দিকে তাকিয়ে যুদ্ধ করছে।
একটা অঙ্ক বারবার ভুল হচ্ছে।
শেষে বিরক্ত হয়ে পেন্সিলটা টেবিলে ছুঁড়ে রাখল।
পেন্সিলটা গড়িয়ে গিয়ে বইয়ের নিচে ঢুকে গেল।
এখন আবার সেটা খুঁজতে হবে।
— ধুর!
নিজের সঙ্গেই কথা বলল সে।
⸻
রাত আরও গভীর হলো।
এক এক করে কাশীপুরের আলো নিভে যেতে লাগল।
শুধু কোথাও কোথাও হারিকেনের ক্ষীণ আলো।
দূরে নরুর দোকানও বন্ধ হয়ে গেছে।
মন্দির নিঃশব্দ।
রাস্তাঘাট ফাঁকা।
শীতের রাত যেন পুরো গ্রামটাকে ধীরে ধীরে নিজের চাদরের নিচে ঢেকে ফেলল।
রমাপদ ঘুমোতে যাওয়ার আগে উঠোনে একবার বেরোলেন।
অভ্যাস।
সবকিছু ঠিক আছে কি না দেখে নেওয়া।
গোয়ালের দরজা বন্ধ।
টিউবওয়েলের পাশে বালতি উল্টে রাখা।
কাঠের গেট লাগানো।
সব ঠিক।
তিনি ফিরে আসতে যাচ্ছিলেন।
হঠাৎ দূরের মাঠের দিক থেকে ভেসে এল একটুকরো শব্দ।
খুব ক্ষীণ।
হয়তো কোনো রাতচরা পাখি।
হয়তো বাতাসে দুলে ওঠা ডাল।
হয়তো অন্য কিছু।
রমাপদ কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে শুনলেন।
তারপর মাথা নাড়িয়ে ঘরে ফিরে এলেন।
কারণ কাশীপুরে এমন শব্দ নতুন কিছু নয়।
আর মানুষ সাধারণত সেই জিনিসগুলো নিয়েই ভাবে না, যেগুলোকে সে প্রতিদিন শুনে অভ্যস্ত।
কিন্তু কখনও কখনও, সবচেয়ে পরিচিত শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অচেনা কিছুর প্রথম পদচিহ্ন।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)