18-06-2026, 07:32 AM
অধ্যায় ৭ : অর্ধেক শোনা গল্প
শীতকালের সকালগুলোতে কাশীপুরের কলেজ যাওয়ার রাস্তার একটা আলাদা রূপ ছিল।
ধান কাটা প্রায় শেষ।
মাঠের ওপর হালকা কুয়াশা।
খেজুর গাছের মাথা থেকে টুপটাপ রস পড়ার শব্দ।
রতন, পল্টু, বাপন, কার্তিক আর শিবু প্রতিদিনের মতো দল বেঁধে কলেজে যাচ্ছিল।
পল্টু আজও যথারীতি সবচেয়ে বেশি কথা বলছে।
— শুনেছিস? আগামী রবিবার নাকি পাশের গ্রামের সঙ্গে ম্যাচ।
— কে বলল?
— সবাই বলছে।
— সবাই মানে?
— সবাই মানে… সবাই।
বাপন হেসে বলল,
— তোর “সবাই” কে, সেটা কোনোদিন জানলাম না।
ছেলেরা হেসে উঠল।
⸻
কলেজের দিনটা অন্য দিনের মতোই কাটল।
প্রথমে বাংলা।
তারপর ইতিহাস।
মাঝে টিফিন।
শেষে অঙ্ক।
অঙ্ক ক্লাসে রতনের অবস্থা যথারীতি করুণ।
কিন্তু মাঠে নামলে যে ছেলেটা এত আত্মবিশ্বাসী, খাতার সামনে বসলে সেই ছেলেটাই যেন অন্য মানুষ হয়ে যায়।
কলেজ ছুটি হতেই সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।
⸻
ফেরার পথে কার্তিক আজ অস্বাভাবিক চুপচাপ ছিল।
পল্টু প্রথম খেয়াল করল।
— কী রে? প্রেমে পড়েছিস নাকি?
— ধুর।
— তাহলে মুখ হাঁড়ির মতো কেন?
কার্তিক একটু ইতস্তত করল।
তারপর বলল,
— কাল রাতে দাদুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল।
— তারপর?
— একটা কথা বলছিল।
— কী কথা?
কার্তিক কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
যেন নিজেই বুঝতে পারছে না বলবে কি না।
তারপর বলল,
— মাঠ নিয়ে।
রতন মাথা তুলল।
— কোন মাঠ?
— আমাদের মাঠ।
— কী বলছিল?
— পুরোটা বলেনি।
— মানে?
— আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, হরিপদ মাস্টাররা ছোটবেলায় কোথায় খেলত।
দাদু বলল, তখনও ওই মাঠেই খেলত।
তারপর হঠাৎ বলল—
“তখন মাঠটা অন্যরকম ছিল।”
— অন্যরকম মানে?
— জানি না।
— তারপর?
— তারপর আর কিছু বলেনি।
⸻
পল্টু হো হো করে হেসে উঠল।
— এই নাকি তোর ভয়ংকর গল্প?
— ভয়ংকর বললাম কই?
— তোর দাদুদের সব গল্পই এমন। শুরু আছে, শেষ নেই।
বাপনও হেসে ফেলল।
কিন্তু রতন হাসল না।
কার্তিকের কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আসলে তেমন কিছুই নয়।
তবু কেন জানি না, তার মনে হলো বৃদ্ধরা যেন ইচ্ছে করেই কিছু কথা শেষ করতে চান না।
⸻
সেদিন বিকেলে মাঠে লোকজন একটু বেশি ছিল।
রবিবারের ম্যাচ নিয়ে সবাই উত্তেজিত।
একদল ছেলে প্র্যাকটিস করছে।
কয়েকজন ছোট ছেলেও বল কুড়োচ্ছে।
দূরে ভোলা ঘোষ দাঁড়িয়ে গল্প করছেন।
আরও দূরে দুজন কৃষক গরু নিয়ে ফিরছেন।
সবকিছু স্বাভাবিক।
খুবই স্বাভাবিক।
তবু রতনের মনে বারবার কার্তিকের কথাটা ফিরে আসছিল।
“তখন মাঠটা অন্যরকম ছিল।”
অন্যরকম কীভাবে?
মাঠ তো মাঠই।
মাটি, ঘাস, ধুলো।
এতে আবার আলাদা কী?
⸻
খেলা শেষ হতে হতে সূর্য নেমে এসেছে।
আকাশে লালচে আভা।
মন্দিরের ঘণ্টা বাজতে এখনও একটু দেরি।
রতন জুতো হাতে নিয়ে হাঁটছিল।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল হরিপদ মাস্টারকে।
বৃদ্ধ মানুষটা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
মাঠের দিকে তাকিয়ে।
একদৃষ্টে।
আজও।
গতকালের মতো।
তারপর খুব ধীরে মাথা নেড়ে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন।
কেউ কিছু বলল না।
কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করল না।
কিন্তু রতনের মনে হলো—
হরিপদ মাস্টার যেন মাঠটাকে শুধু দেখেন না।
মাঠটার মধ্যে অন্য কিছু খোঁজেন।
⸻
সেদিন রাতে কাশীপুরে লোডশেডিং হলো।
এটা নতুন কিছু নয়।
গ্রামের মানুষ অভ্যস্ত।
প্রতিমা হারিকেন জ্বালালেন।
রমাপদ খাতা দেখা বন্ধ করে চশমা খুললেন।
রতন জানলার পাশে বসে ছিল।
বাইরে অন্ধকার।
দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
আরও দূরে শেয়ালের ডাক শোনা গেল।
প্রতিমা বললেন,
— জানলাটা বন্ধ করে দে।
— কেন?
— ঠান্ডা ঢুকছে।
রতন উঠে জানলা বন্ধ করতে গেল।
বন্ধ করার আগে একবার বাইরে তাকাল।
অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যায় না।
তবু অদ্ভুতভাবে তার মনে হলো—
কাশীপুরের রাতের অন্ধকার যেন দিনের গ্রামের মতো নয়।
দিনে যে গ্রাম এত চেনা, রাতে সে যেন অন্য কেউ হয়ে যায়।
জানলাটা বন্ধ করে সে ভেতরে ফিরে এল।
আর বাইরে ধীরে ধীরে আরও ঘন হতে লাগল শীতের রাত।
শীতকালের সকালগুলোতে কাশীপুরের কলেজ যাওয়ার রাস্তার একটা আলাদা রূপ ছিল।
ধান কাটা প্রায় শেষ।
মাঠের ওপর হালকা কুয়াশা।
খেজুর গাছের মাথা থেকে টুপটাপ রস পড়ার শব্দ।
রতন, পল্টু, বাপন, কার্তিক আর শিবু প্রতিদিনের মতো দল বেঁধে কলেজে যাচ্ছিল।
পল্টু আজও যথারীতি সবচেয়ে বেশি কথা বলছে।
— শুনেছিস? আগামী রবিবার নাকি পাশের গ্রামের সঙ্গে ম্যাচ।
— কে বলল?
— সবাই বলছে।
— সবাই মানে?
— সবাই মানে… সবাই।
বাপন হেসে বলল,
— তোর “সবাই” কে, সেটা কোনোদিন জানলাম না।
ছেলেরা হেসে উঠল।
⸻
কলেজের দিনটা অন্য দিনের মতোই কাটল।
প্রথমে বাংলা।
তারপর ইতিহাস।
মাঝে টিফিন।
শেষে অঙ্ক।
অঙ্ক ক্লাসে রতনের অবস্থা যথারীতি করুণ।
কিন্তু মাঠে নামলে যে ছেলেটা এত আত্মবিশ্বাসী, খাতার সামনে বসলে সেই ছেলেটাই যেন অন্য মানুষ হয়ে যায়।
কলেজ ছুটি হতেই সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।
⸻
ফেরার পথে কার্তিক আজ অস্বাভাবিক চুপচাপ ছিল।
পল্টু প্রথম খেয়াল করল।
— কী রে? প্রেমে পড়েছিস নাকি?
— ধুর।
— তাহলে মুখ হাঁড়ির মতো কেন?
কার্তিক একটু ইতস্তত করল।
তারপর বলল,
— কাল রাতে দাদুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল।
— তারপর?
— একটা কথা বলছিল।
— কী কথা?
কার্তিক কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
যেন নিজেই বুঝতে পারছে না বলবে কি না।
তারপর বলল,
— মাঠ নিয়ে।
রতন মাথা তুলল।
— কোন মাঠ?
— আমাদের মাঠ।
— কী বলছিল?
— পুরোটা বলেনি।
— মানে?
— আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, হরিপদ মাস্টাররা ছোটবেলায় কোথায় খেলত।
দাদু বলল, তখনও ওই মাঠেই খেলত।
তারপর হঠাৎ বলল—
“তখন মাঠটা অন্যরকম ছিল।”
— অন্যরকম মানে?
— জানি না।
— তারপর?
— তারপর আর কিছু বলেনি।
⸻
পল্টু হো হো করে হেসে উঠল।
— এই নাকি তোর ভয়ংকর গল্প?
— ভয়ংকর বললাম কই?
— তোর দাদুদের সব গল্পই এমন। শুরু আছে, শেষ নেই।
বাপনও হেসে ফেলল।
কিন্তু রতন হাসল না।
কার্তিকের কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আসলে তেমন কিছুই নয়।
তবু কেন জানি না, তার মনে হলো বৃদ্ধরা যেন ইচ্ছে করেই কিছু কথা শেষ করতে চান না।
⸻
সেদিন বিকেলে মাঠে লোকজন একটু বেশি ছিল।
রবিবারের ম্যাচ নিয়ে সবাই উত্তেজিত।
একদল ছেলে প্র্যাকটিস করছে।
কয়েকজন ছোট ছেলেও বল কুড়োচ্ছে।
দূরে ভোলা ঘোষ দাঁড়িয়ে গল্প করছেন।
আরও দূরে দুজন কৃষক গরু নিয়ে ফিরছেন।
সবকিছু স্বাভাবিক।
খুবই স্বাভাবিক।
তবু রতনের মনে বারবার কার্তিকের কথাটা ফিরে আসছিল।
“তখন মাঠটা অন্যরকম ছিল।”
অন্যরকম কীভাবে?
মাঠ তো মাঠই।
মাটি, ঘাস, ধুলো।
এতে আবার আলাদা কী?
⸻
খেলা শেষ হতে হতে সূর্য নেমে এসেছে।
আকাশে লালচে আভা।
মন্দিরের ঘণ্টা বাজতে এখনও একটু দেরি।
রতন জুতো হাতে নিয়ে হাঁটছিল।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল হরিপদ মাস্টারকে।
বৃদ্ধ মানুষটা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
মাঠের দিকে তাকিয়ে।
একদৃষ্টে।
আজও।
গতকালের মতো।
তারপর খুব ধীরে মাথা নেড়ে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন।
কেউ কিছু বলল না।
কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করল না।
কিন্তু রতনের মনে হলো—
হরিপদ মাস্টার যেন মাঠটাকে শুধু দেখেন না।
মাঠটার মধ্যে অন্য কিছু খোঁজেন।
⸻
সেদিন রাতে কাশীপুরে লোডশেডিং হলো।
এটা নতুন কিছু নয়।
গ্রামের মানুষ অভ্যস্ত।
প্রতিমা হারিকেন জ্বালালেন।
রমাপদ খাতা দেখা বন্ধ করে চশমা খুললেন।
রতন জানলার পাশে বসে ছিল।
বাইরে অন্ধকার।
দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
আরও দূরে শেয়ালের ডাক শোনা গেল।
প্রতিমা বললেন,
— জানলাটা বন্ধ করে দে।
— কেন?
— ঠান্ডা ঢুকছে।
রতন উঠে জানলা বন্ধ করতে গেল।
বন্ধ করার আগে একবার বাইরে তাকাল।
অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যায় না।
তবু অদ্ভুতভাবে তার মনে হলো—
কাশীপুরের রাতের অন্ধকার যেন দিনের গ্রামের মতো নয়।
দিনে যে গ্রাম এত চেনা, রাতে সে যেন অন্য কেউ হয়ে যায়।
জানলাটা বন্ধ করে সে ভেতরে ফিরে এল।
আর বাইরে ধীরে ধীরে আরও ঘন হতে লাগল শীতের রাত।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)