18-06-2026, 07:30 AM
অধ্যায় ৬ : ছোট ছোট চিন্তা
সেদিন রাতে খাওয়ার সময় মুখার্জী বাড়িতে তিনজনই একসঙ্গে বসেছিল।
কাশীপুরে এটা সবদিন হতো না।
রমাপদ কলেজ থেকে ফিরতে কখনও দেরি করতেন, কখনও আবার খাতা দেখতে বসে যেতেন।
কিন্তু শীতের রাতগুলোতে তিনি চেষ্টা করতেন পরিবারের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে।
প্রতিমা ভাত বেড়ে দিতে দিতে বললেন,
— রতন, আজ আবার অঙ্কের খাতায় কী লিখেছিস?
রতন মুখ নামিয়ে ভাত মাখতে লাগল।
রমাপদ হেসে বললেন,
— তা বল তো শুনি।
— কিছু না।
— “কিছু না” মানে?
— দুটো অঙ্ক ভুল হয়েছে।
প্রতিমা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
— দুটো?
— হ্যাঁ।
— মাস্টারমশাইয়ের ছেলে হয়ে এই অবস্থা!
রতন বিরক্ত হয়ে বলল,
— বাবা সব বিষয়ে ভালো ছিলেন নাকি?
রমাপদ হঠাৎ হেসে ফেললেন।
— না, আমি ভূগোলে বেশ কাঁচা ছিলাম।
প্রতিমা অবাক হয়ে তাকালেন।
— ওকে আবার সাহস দিচ্ছ?
— আরে, দুটো অঙ্ক ভুল হয়েছে, পৃথিবী শেষ হয়ে যায়নি।
রতনের মুখে একটু হাসি ফুটল।
এমন মুহূর্তগুলোই তার সবচেয়ে ভালো লাগত।
যখন বাবা শুধু শিক্ষক নন, বাবাই থাকেন।
⸻
খাওয়া শেষে রমাপদ বারান্দায় বসেছিলেন।
শীতের রাত নেমেছে।
দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
আকাশে অসংখ্য তারা।
বিদ্যুৎ থাকলেও আলো খুব উজ্জ্বল নয়।
গ্রামের রাত যেন শহরের চেয়ে অনেক বেশি অন্ধকার।
প্রতিমা পাশে এসে বসলেন।
— শুনছো?
— বলো।
— রতনটা দিনদিন শুধু খেলাধুলো নিয়েই আছে।
— বয়সটাই তো ওর এমন।
— তোমার কোনো চিন্তা হয় না?
রমাপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— হয়।
— তাহলে?
— কিন্তু সবসময় বকাঝকা করলে হবে?
প্রতিমা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— আমি শুধু চাই ছেলেটা মানুষ হোক।
— হবে।
— কী করে এত নিশ্চিন্ত থাকো?
রমাপদ দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— কারণ আমি ওকে চিনি।
ঘরের ভেতর তখন রতন বই খুলে বসেছে।
পড়ার চেয়ে জানলার বাইরে তাকানোতেই তার আগ্রহ বেশি।
মাঠে আগামীকালের ম্যাচটা নিয়ে সে ভাবছে।
বাপনকে হারাতে হবে।
এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটাই।
⸻
পরদিন দুপুর।
কলেজ ছুটি হওয়ার পর রতনদের দল প্রায় দৌড়েই মাঠে এল।
শীতের বিকেলের রোদ নরম।
মাঠে ইতিমধ্যে কয়েকজন ছোট ছেলে ক্রিকেট খেলছে।
দূরে দুটো গরু ঘাস খাচ্ছে।
পল্টু এসে বলল,
— আজ কিন্তু আমি ক্যাপ্টেন।
— কে বলেছে?
— আমি বলেছি।
— তাহলে আমি বলছি, তুই ক্যাপ্টেন না।
বাপন বলতেই সবাই হেসে উঠল।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে তর্ক শুরু হয়ে গেল।
আর আরও পাঁচ মিনিট পরে সবাই মিলে খেলাও শুরু করে দিল।
যেন কিছুই হয়নি।
⸻
খেলার মাঝখানে একবার রতনের চোখ চলে গেল মাঠের দূরের দিকে।
অনেক দূরে।
যেখানে মাঠ শেষ হয়ে গেছে।
সেখানে কুয়াশার আবছা পর্দা নেমে আছে।
শীতের বিকেলে এমন দৃশ্য নতুন কিছু নয়।
তবু কয়েক সেকেন্ড সে তাকিয়ে রইল।
কেন, সে নিজেও জানত না।
— এই রতন!
পল্টুর চিৎকারে সে চমকে উঠল।
— কী দেখছিস?
— কিছু না।
— তাহলে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বলটা দে!
রতন মাথা ঝাঁকিয়ে আবার খেলায় মন দিল।
⸻
বিকেল গড়াতে লাগল।
হাসি, চিৎকার, দৌড়ঝাঁপে মাঠ সরগরম।
কিন্তু আজ একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।
খেলার ফাঁকে রতন লক্ষ্য করল, হরিপদ মাস্টার মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন।
এটা নতুন কিছু নয়।
বৃদ্ধ মানুষটি মাঝেমধ্যে ছেলেদের খেলা দেখতে আসেন।
কিন্তু আজ তিনি খেলার দিকে তাকিয়ে নেই।
তার দৃষ্টি যেন মাঠের আরও দূরে কোথাও।
অনেক দূরে।
রতন একবার তাকাল।
তারপর আবার।
হরিপদ মাস্টারের মুখে এমন একটা ভাব ছিল, যেন তিনি কিছু মনে করার চেষ্টা করছেন।
অথবা…
কিছু ভুলে যাওয়ার।
কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ ধীরে ধীরে ঘুরে হাঁটতে শুরু করলেন।
লাঠির শব্দ মাটিতে ঠক… ঠক… ঠক…
ক্রমশ দূরে মিলিয়ে গেল।
রতন কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
তারপর আবার খেলায় ফিরে গেল।
কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময়ও কেন জানি না, হরিপদ মাস্টারের সেই মুখটা বারবার তার মনে পড়ছিল।
সেদিন রাতে খাওয়ার সময় মুখার্জী বাড়িতে তিনজনই একসঙ্গে বসেছিল।
কাশীপুরে এটা সবদিন হতো না।
রমাপদ কলেজ থেকে ফিরতে কখনও দেরি করতেন, কখনও আবার খাতা দেখতে বসে যেতেন।
কিন্তু শীতের রাতগুলোতে তিনি চেষ্টা করতেন পরিবারের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে।
প্রতিমা ভাত বেড়ে দিতে দিতে বললেন,
— রতন, আজ আবার অঙ্কের খাতায় কী লিখেছিস?
রতন মুখ নামিয়ে ভাত মাখতে লাগল।
রমাপদ হেসে বললেন,
— তা বল তো শুনি।
— কিছু না।
— “কিছু না” মানে?
— দুটো অঙ্ক ভুল হয়েছে।
প্রতিমা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
— দুটো?
— হ্যাঁ।
— মাস্টারমশাইয়ের ছেলে হয়ে এই অবস্থা!
রতন বিরক্ত হয়ে বলল,
— বাবা সব বিষয়ে ভালো ছিলেন নাকি?
রমাপদ হঠাৎ হেসে ফেললেন।
— না, আমি ভূগোলে বেশ কাঁচা ছিলাম।
প্রতিমা অবাক হয়ে তাকালেন।
— ওকে আবার সাহস দিচ্ছ?
— আরে, দুটো অঙ্ক ভুল হয়েছে, পৃথিবী শেষ হয়ে যায়নি।
রতনের মুখে একটু হাসি ফুটল।
এমন মুহূর্তগুলোই তার সবচেয়ে ভালো লাগত।
যখন বাবা শুধু শিক্ষক নন, বাবাই থাকেন।
⸻
খাওয়া শেষে রমাপদ বারান্দায় বসেছিলেন।
শীতের রাত নেমেছে।
দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
আকাশে অসংখ্য তারা।
বিদ্যুৎ থাকলেও আলো খুব উজ্জ্বল নয়।
গ্রামের রাত যেন শহরের চেয়ে অনেক বেশি অন্ধকার।
প্রতিমা পাশে এসে বসলেন।
— শুনছো?
— বলো।
— রতনটা দিনদিন শুধু খেলাধুলো নিয়েই আছে।
— বয়সটাই তো ওর এমন।
— তোমার কোনো চিন্তা হয় না?
রমাপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— হয়।
— তাহলে?
— কিন্তু সবসময় বকাঝকা করলে হবে?
প্রতিমা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— আমি শুধু চাই ছেলেটা মানুষ হোক।
— হবে।
— কী করে এত নিশ্চিন্ত থাকো?
রমাপদ দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— কারণ আমি ওকে চিনি।
ঘরের ভেতর তখন রতন বই খুলে বসেছে।
পড়ার চেয়ে জানলার বাইরে তাকানোতেই তার আগ্রহ বেশি।
মাঠে আগামীকালের ম্যাচটা নিয়ে সে ভাবছে।
বাপনকে হারাতে হবে।
এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটাই।
⸻
পরদিন দুপুর।
কলেজ ছুটি হওয়ার পর রতনদের দল প্রায় দৌড়েই মাঠে এল।
শীতের বিকেলের রোদ নরম।
মাঠে ইতিমধ্যে কয়েকজন ছোট ছেলে ক্রিকেট খেলছে।
দূরে দুটো গরু ঘাস খাচ্ছে।
পল্টু এসে বলল,
— আজ কিন্তু আমি ক্যাপ্টেন।
— কে বলেছে?
— আমি বলেছি।
— তাহলে আমি বলছি, তুই ক্যাপ্টেন না।
বাপন বলতেই সবাই হেসে উঠল।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে তর্ক শুরু হয়ে গেল।
আর আরও পাঁচ মিনিট পরে সবাই মিলে খেলাও শুরু করে দিল।
যেন কিছুই হয়নি।
⸻
খেলার মাঝখানে একবার রতনের চোখ চলে গেল মাঠের দূরের দিকে।
অনেক দূরে।
যেখানে মাঠ শেষ হয়ে গেছে।
সেখানে কুয়াশার আবছা পর্দা নেমে আছে।
শীতের বিকেলে এমন দৃশ্য নতুন কিছু নয়।
তবু কয়েক সেকেন্ড সে তাকিয়ে রইল।
কেন, সে নিজেও জানত না।
— এই রতন!
পল্টুর চিৎকারে সে চমকে উঠল।
— কী দেখছিস?
— কিছু না।
— তাহলে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বলটা দে!
রতন মাথা ঝাঁকিয়ে আবার খেলায় মন দিল।
⸻
বিকেল গড়াতে লাগল।
হাসি, চিৎকার, দৌড়ঝাঁপে মাঠ সরগরম।
কিন্তু আজ একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।
খেলার ফাঁকে রতন লক্ষ্য করল, হরিপদ মাস্টার মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন।
এটা নতুন কিছু নয়।
বৃদ্ধ মানুষটি মাঝেমধ্যে ছেলেদের খেলা দেখতে আসেন।
কিন্তু আজ তিনি খেলার দিকে তাকিয়ে নেই।
তার দৃষ্টি যেন মাঠের আরও দূরে কোথাও।
অনেক দূরে।
রতন একবার তাকাল।
তারপর আবার।
হরিপদ মাস্টারের মুখে এমন একটা ভাব ছিল, যেন তিনি কিছু মনে করার চেষ্টা করছেন।
অথবা…
কিছু ভুলে যাওয়ার।
কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ ধীরে ধীরে ঘুরে হাঁটতে শুরু করলেন।
লাঠির শব্দ মাটিতে ঠক… ঠক… ঠক…
ক্রমশ দূরে মিলিয়ে গেল।
রতন কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
তারপর আবার খেলায় ফিরে গেল।
কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময়ও কেন জানি না, হরিপদ মাস্টারের সেই মুখটা বারবার তার মনে পড়ছিল।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)