18-06-2026, 07:29 AM
অধ্যায় ৫ : পুকুরঘাটের গল্প
কাশীপুরে শীত যতই পড়ুক, গ্রামের জীবন থেমে থাকত না।
ভোর হতেই আবার শুরু হয়ে যেত একই ব্যস্ততা।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
সকালের কুয়াশা ধীরে ধীরে পাতলা হচ্ছে। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশির সূর্যের আলোয় চকচক করছে।
প্রতিমা উঠোনে ধান শুকোতে দিয়েছেন।
রান্নাঘরে ডাল ফুটছে।
রমাপদ কলেজে চলে গেছেন অনেকক্ষণ।
রতনও বন্ধুদের সঙ্গে কলেজে গেছে।
বাড়ির কাজ সেরে প্রতিমা একটা কাপড়ের ঝুড়ি হাতে বেরোলেন।
পুকুরঘাটে কাপড় কাচতে যাবেন।
⸻
কাশীপুরের বড় পুকুরটা গ্রামের প্রায় মাঝখানেই।
পুকুরের একদিকে বাঁধানো ঘাট।
অন্যদিকে কচুরিপানা আর ঝোপঝাড়।
শীতের সকালেও সেখানে মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে।
কেউ কাপড় কাচছে।
কেউ বাসন মাজছে।
কেউ জল তুলছে।
কেউ শুধু গল্প করতে এসেছে।
প্রতিমা পৌঁছতেই কমলা বৌদি দূর থেকে ডাক দিলেন,
— এই যে, আজ এত দেরি?
— আর বোলো না। সকালের কাজ শেষই হচ্ছিল না।
কমলা বৌদির বয়স তেত্রিশ-চৌত্রিশ হবে।
গোলগাল মুখ।
সবসময় হাসিখুশি।
গ্রামের কোনো খবর তার অজানা থাকে না।
তার পাশে বসে ছিলেন মঞ্জু কাকিমা।
তিনি হেসে বললেন,
— শুনেছিস? রতনদের কলেজে নাকি আবার ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হবে।
প্রতিমা কাপড় ভেজাতে ভেজাতে বললেন,
— রতন তো এখন থেকেই উত্তেজিত।
— ও তো দৌড়ঝাঁপ ছাড়া কিছু বোঝে না।
তিনজনেই হেসে উঠলেন।
⸻
ঘাটের একটু দূরে সরস্বতী ঠাকুমা বসেছিলেন।
বয়স আশির বেশি।
মাথাভর্তি সাদা চুল।
হাতে একটা পুরোনো লাঠি।
চোখে কম দেখেন, কিন্তু গ্রামের কার বাড়িতে কী হচ্ছে, সে খবর অনেক সময় অন্যদের আগেই জেনে যান।
তিনি চুপচাপ পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
কমলা বৌদি বললেন,
— ঠাকুমা, কী এত ভাবছেন?
বৃদ্ধা ধীরে মাথা তুললেন।
— ভাবার বয়স গেছে রে মা। এখন শুধু দেখি।
— কী দেখেন?
— মানুষ বদলায়। গ্রাম বদলায়। কিন্তু কিছু জিনিস বদলায় না।
মঞ্জু কাকিমা হেসে বললেন,
— আবার শুরু হল।
সরস্বতী ঠাকুমাও হালকা হাসলেন।
আর কিছু বললেন না।
⸻
দুপুরের দিকে কলেজ ছুটি হল।
রতন, পল্টু, বাপন, কার্তিক আর শিবু ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ফিরছিল।
শীতের রোদ তখন নরম হয়ে এসেছে।
পথে একটা পুকুরের ধারে এসে সবাই থামল।
পল্টু বলল,
— চল, পাঁচ মিনিট বসে যাই।
— বাড়ি গিয়ে মার খাবি।
— সে পরে দেখা যাবে।
ছেলেরা পুকুরপাড়ে বসে গল্প করতে লাগল।
একটা মাছরাঙা আচমকা জলে ঝাঁপ দিল।
বাপন বলল,
— দেখলি?
— উফ্, কী দ্রুত!
শিবু হেসে বলল,
— তোদের চেয়ে বেশি দ্রুত।
আবার হাসাহাসি।
⸻
সন্ধ্যার আগে কাশীপুর আবার নিজের চেনা ছন্দে ফিরল।
মন্দিরে ঘণ্টা বাজল।
গরুগুলো গোয়ালে ফিরল।
চুলোর ধোঁয়া উঠতে শুরু করল।
নরুর দোকানে হারিকেন জ্বলে উঠল।
সবকিছু যেন প্রতিদিনের মতোই।
তবু হরিপদ মাস্টার সেদিন সন্ধ্যায় নরুর দোকানে বসে ছিলেন অস্বাভাবিক চুপচাপ।
নরু জিজ্ঞেসও করেছিল,
— শরীর খারাপ নাকি মাস্টারমশাই?
হরিপদ মাথা নাড়লেন।
— না রে।
— তাহলে এত চুপ কেন?
বৃদ্ধ শিক্ষক কিছুক্ষণ চায়ের ভাঁড়টার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
— এমনিই। পুরোনো কথা মনে পড়ছিল।
— কী কথা?
হরিপদ মাস্টার উত্তর দিলেন না।
শুধু দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
নরুও আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
কাশীপুরের বয়স্ক মানুষদের কিছু কিছু নীরবতা ছিল, যেগুলোকে সবাই সম্মান করত।
সেই নীরবতার ভেতরে কী লুকিয়ে আছে, তা জানার চেষ্টা খুব কম মানুষই করত।
কাশীপুরে শীত যতই পড়ুক, গ্রামের জীবন থেমে থাকত না।
ভোর হতেই আবার শুরু হয়ে যেত একই ব্যস্ততা।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
সকালের কুয়াশা ধীরে ধীরে পাতলা হচ্ছে। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশির সূর্যের আলোয় চকচক করছে।
প্রতিমা উঠোনে ধান শুকোতে দিয়েছেন।
রান্নাঘরে ডাল ফুটছে।
রমাপদ কলেজে চলে গেছেন অনেকক্ষণ।
রতনও বন্ধুদের সঙ্গে কলেজে গেছে।
বাড়ির কাজ সেরে প্রতিমা একটা কাপড়ের ঝুড়ি হাতে বেরোলেন।
পুকুরঘাটে কাপড় কাচতে যাবেন।
⸻
কাশীপুরের বড় পুকুরটা গ্রামের প্রায় মাঝখানেই।
পুকুরের একদিকে বাঁধানো ঘাট।
অন্যদিকে কচুরিপানা আর ঝোপঝাড়।
শীতের সকালেও সেখানে মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে।
কেউ কাপড় কাচছে।
কেউ বাসন মাজছে।
কেউ জল তুলছে।
কেউ শুধু গল্প করতে এসেছে।
প্রতিমা পৌঁছতেই কমলা বৌদি দূর থেকে ডাক দিলেন,
— এই যে, আজ এত দেরি?
— আর বোলো না। সকালের কাজ শেষই হচ্ছিল না।
কমলা বৌদির বয়স তেত্রিশ-চৌত্রিশ হবে।
গোলগাল মুখ।
সবসময় হাসিখুশি।
গ্রামের কোনো খবর তার অজানা থাকে না।
তার পাশে বসে ছিলেন মঞ্জু কাকিমা।
তিনি হেসে বললেন,
— শুনেছিস? রতনদের কলেজে নাকি আবার ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হবে।
প্রতিমা কাপড় ভেজাতে ভেজাতে বললেন,
— রতন তো এখন থেকেই উত্তেজিত।
— ও তো দৌড়ঝাঁপ ছাড়া কিছু বোঝে না।
তিনজনেই হেসে উঠলেন।
⸻
ঘাটের একটু দূরে সরস্বতী ঠাকুমা বসেছিলেন।
বয়স আশির বেশি।
মাথাভর্তি সাদা চুল।
হাতে একটা পুরোনো লাঠি।
চোখে কম দেখেন, কিন্তু গ্রামের কার বাড়িতে কী হচ্ছে, সে খবর অনেক সময় অন্যদের আগেই জেনে যান।
তিনি চুপচাপ পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
কমলা বৌদি বললেন,
— ঠাকুমা, কী এত ভাবছেন?
বৃদ্ধা ধীরে মাথা তুললেন।
— ভাবার বয়স গেছে রে মা। এখন শুধু দেখি।
— কী দেখেন?
— মানুষ বদলায়। গ্রাম বদলায়। কিন্তু কিছু জিনিস বদলায় না।
মঞ্জু কাকিমা হেসে বললেন,
— আবার শুরু হল।
সরস্বতী ঠাকুমাও হালকা হাসলেন।
আর কিছু বললেন না।
⸻
দুপুরের দিকে কলেজ ছুটি হল।
রতন, পল্টু, বাপন, কার্তিক আর শিবু ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ফিরছিল।
শীতের রোদ তখন নরম হয়ে এসেছে।
পথে একটা পুকুরের ধারে এসে সবাই থামল।
পল্টু বলল,
— চল, পাঁচ মিনিট বসে যাই।
— বাড়ি গিয়ে মার খাবি।
— সে পরে দেখা যাবে।
ছেলেরা পুকুরপাড়ে বসে গল্প করতে লাগল।
একটা মাছরাঙা আচমকা জলে ঝাঁপ দিল।
বাপন বলল,
— দেখলি?
— উফ্, কী দ্রুত!
শিবু হেসে বলল,
— তোদের চেয়ে বেশি দ্রুত।
আবার হাসাহাসি।
⸻
সন্ধ্যার আগে কাশীপুর আবার নিজের চেনা ছন্দে ফিরল।
মন্দিরে ঘণ্টা বাজল।
গরুগুলো গোয়ালে ফিরল।
চুলোর ধোঁয়া উঠতে শুরু করল।
নরুর দোকানে হারিকেন জ্বলে উঠল।
সবকিছু যেন প্রতিদিনের মতোই।
তবু হরিপদ মাস্টার সেদিন সন্ধ্যায় নরুর দোকানে বসে ছিলেন অস্বাভাবিক চুপচাপ।
নরু জিজ্ঞেসও করেছিল,
— শরীর খারাপ নাকি মাস্টারমশাই?
হরিপদ মাথা নাড়লেন।
— না রে।
— তাহলে এত চুপ কেন?
বৃদ্ধ শিক্ষক কিছুক্ষণ চায়ের ভাঁড়টার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
— এমনিই। পুরোনো কথা মনে পড়ছিল।
— কী কথা?
হরিপদ মাস্টার উত্তর দিলেন না।
শুধু দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
নরুও আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
কাশীপুরের বয়স্ক মানুষদের কিছু কিছু নীরবতা ছিল, যেগুলোকে সবাই সম্মান করত।
সেই নীরবতার ভেতরে কী লুকিয়ে আছে, তা জানার চেষ্টা খুব কম মানুষই করত।



![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)