Thread Rating:
  • 7 Vote(s) - 3.86 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
#38
৮।
ফেব্রুয়ারি মাসের ষোল তারিখের পর থেকে আমার জীবনের রুটিন, দর্শন এবং ব্যাংক ব্যালেন্স— এই তিনটিরই আমূল পরিবর্তন ঘটল। আমি সবসময় নিজেকে অতি হিসেবি, ম্যাড়ম্যাড়ে এবং রুটিন-বাঁধা মানুষ হিসেবে দাবি করে এসেছি। আমার কাছে জীবন একটা এক্সেল শিটের মতো। কোথায় কত খরচ হবে, কোথায় কতটুকু আবেগ দেখানো হবে, তার সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট ছক কাটা। কিন্তু আনিকা নাওহার নামের সেই ছত্রিশ বছর বয়সী, লন্ডন প্রবাসী, বিবাহিতা নারী আমার এক্সেল শিটে এমন  ভাইরাস ঢুকিয়ে দিলেন যে পুরো সিস্টেম ক্র্যাশ করে গেল। ১৬ তারিখ রাতের পর থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহ আমি প্রতিদিন বইমেলায় যাওয়া শুরু করলাম।


আমার অফিসের ডিউটি শেষ হয় সন্ধ্যা ছয়টায়। কারওয়ান বাজার থেকে শাহবাগ হয়ে টিএসসি— এই রাস্তার জ্যাম সম্পর্কে যার ন্যূনতম ধারণা আছে
, সে জানে সন্ধ্যা ছয়টায় অফিস থেকে বের হয়ে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ বইমেলায় যাওয়ার কথা ভাববে না। বইমেলা বন্ধ হয় রাত সাড়ে আটটায়। বাসে উঠলে আমি মেলায় পৌঁছাব মেলা বন্ধ হওয়ার ঠিক পনেরো মিনিট আগে। তখন বই দেখা তো দূরের কথা, মেলার ধুলো ওড়ার দৃশ্য দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকবে না। তাই আমি আমার পঁচিশ হাজার টাকা বাজেটের জীবনে এক চরম বিলাসী সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি বাসের বদলে উবার মোটো (Uber Moto) ব্যবহার করা শুরু করলাম।

উবার মোটো ঢাকা শহরের এক অদ্ভুত আবিষ্কার। এই সার্ভিসের বাইকাররা নিজেদেরকে ঢাকা শহরের রাস্তায় ভ্যালেন্টিনো রসি বা মার্ক মার্কেজ মনে করেন। তাদের কাছে ফুটপাত
, ডিভাইডার, উল্টোপথ বলে কিছু নেই; তাদের লক্ষ্য একটাই— যেকোনো মূল্যে গন্তব্যে পৌঁছানো। সন্ধ্যা ছয়টা বাজার সাথে সাথে আমি এহসান ভাইয়ের ডেস্কের সামনে দিয়ে প্রায় দৌড়ে বের হতাম। এহসান ভাই অবাক হয়ে বলতেন, "কী ব্যাপার রাশেদ? এত তাড়া কীসের? বউ তো নাই যে বাসায় গিয়ে জবাবদিহি করতে হবে!"

আমি হাসিমুখে বলতাম
, "বউ নাই ভাই, কিন্তু মেলা আছে। মেলা শেষ হয়ে যাচ্ছে।"

নিচে নেমে একটা উবার মোটো ডাকতাম। বাইকার এলে আমি পেছনে বসে বলতাম
, "ভাই, আমার খুব তাড়া। সাড়ে ছয়টার ভেতর আমাকে টিএসসি পৌঁছাতে হবে। আপনি পারলে রকেটের মতো উড়ান।"

বাইকাররাও আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারত কি না কে জানে, তারা কারওয়ান বাজারের জ্যাম এড়িয়ে, কখনো ফুটপাতের ওপর দিয়ে, কখনো রিকশার চাকার গা ঘেঁষে এমনভাবে বাইক চালাত যে, আমার মনে হতো মেলায় যাওয়ার আগে আমি হয়তো সোজা ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে গিয়ে পৌঁছাব।

কিন্তু এসব মৃত্যুভয় আমার মাথায় তখন কাজ করত না। আমার মাথায় শুধু একটা ছবি ঘুরত— আনিকা নাওহার। যতই জ্যাম থাকুক, বাইকারদের কল্যাণে আমি প্রতিদিন ছয়টা চল্লিশ থেকে ছয়টা পঞ্চাশের ভেতর মেলায় ঢুকে পড়তাম। প্রথম দুই দিনের কথা বলি। ১৭ এবং ১৮ তারিখ। এই দুই দিন আমি সম্পূর্ণ স্টকার (Stalker) মোডে ছিলাম। মেলায় ঢুকেই আমি আমার শিকারি চোখের দৃষ্টি জ্বেলে আনিকা নাওহারকে খুঁজতাম। মেলা প্রাঙ্গণের হাজার হাজার মানুষ, ধুলো, বইয়ের স্টল— সবকিছুর ভিড়ে আমি অত্যন্ত সন্তর্পণে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে ঘুরতাম। আমার উদ্দেশ্য বই কেনা নয়, আমার উদ্দেশ্য ছিল দূর থেকে উনাকে দেখা।

১৭ তারিখে উনাকে দেখলাম অন্য একটা প্রকাশনীর স্টলে দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে একটা গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি। সাথে একটা কালো শাল। শীতের আমেজ তখনো পুরোপুরি যায়নি। আমি ভিড়ের আড়ালে, একটা বড় স্টলের পিলারের পেছনে দাঁড়িয়ে উনাকে দেখছিলাম। উনি কয়েকজন তরুণের সাথে কথা বলছিলেন। উনার হাসির সময় গালে যে একটা ছোট টোল পড়ে, সেটা আমি দূর থেকেই খেয়াল করলাম।

১৮ তারিখে উনার পরনে ছিল একটা নীল সালোয়ার কামিজ। শাড়ির বাইরে উনাকে এই প্রথম দেখলাম। সালোয়ার কামিজে উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতি আরও বেশি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল। বুকের ওড়নাটা একপাশে আলতো করে রাখা। আমি সেদিন একটা লিটল ম্যাগের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে উনাকে দেখলাম। আমি দেখলাম উনি কীভাবে কথা বলার সময় হাত নাড়েন, কীভাবে মাথার চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দেন।

এই দুই দিন আমি উনার সামনে যাইনি। আমার ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত অপরাধবোধ আর সংকোচ কাজ করছিল। আমি তো উনার কেউ নই! আমি প্রতিদিন উনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে উনি কী ভাববেন? উনি তো আর বোকা নন। একজন নারী খুব সহজেই বুঝতে পারে কোন পুরুষ তাকে কোন দৃষ্টিতে দেখছে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, যদি আমার চোখের সেই আদিম ক্ষুধাটা উনি ধরে ফেলেন!

কিন্তু ১৯ তারিখে এসে আমার সব লজিক, সব লজ্জা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সেদিন মেলায় ঢুকে আমি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আর বাংলা একাডেমি চত্বর চষে ফেললাম, কিন্তু আনিকাকে কোথাও দেখলাম না। আমার বুকের ভেতর এক ধরনের অদ্ভুত শূন্যতা আর হাহাকার শুরু হলো। মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটাই বৃথা হয়ে গেল। ঢাকা শহরের এত জ্যাম ঠেলে, বাইকের পেছনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আসাটাই লস!

আমি আর পারলাম না। লজ্জার মাথা খেয়ে, আমার সেই অতি-ভদ্র, ম্যাড়ম্যাড়ে অনুবাদক সত্তাটাকে গলা টিপে মেরে আমি পকেট থেকে ফোন বের করলাম। উনার নাম্বারে ডায়াল করলাম। কয়েকবার রিং হওয়ার পর উনি ফোন ধরলেন। "হ্যালো?" উনার সেই মোহনীয় কণ্ঠস্বর। মেলা প্রাঙ্গণের কোলাহলের মাঝেও গলাটা খুব স্পষ্ট শোনাল। আমার গলা একটু শুকিয়ে গেল। আমি একটু কেশে বললাম

"হ্যালো আনিকা? আমি রাশেদ বলছিলাম।"

"আরে রাশেদ! কেমন আছেন আপনি? উপন্যাসের ড্রাফট তো আর কিছু পাঠালাম না, আপনিও তো কোনো খোঁজ নিলেন না।"
"এই তো, আছি ভালোই। ড্রাফট পাঠান, আমি দেখে দেব। আপনি কি এখন মেলায় আছেন?" আমি খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করলাম।
"হ্যাঁ, মেলায় তো প্রতিদিনই আসি। এখন আছি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে। 'অক্ষরবৃত্ত' প্রকাশনীর স্টলের পেছনে যে কফি শপটা আছে, সেখানে বসে আছি। আপনি কি মেলায় নাকি?"
"জি, এইমাত্র এলাম। ভাবলাম আপনি থাকলে একটু দেখা করে যাই।"
"অফকোর্স! চলে আসুন এখানে। আমি আছি।"

ফোন রাখার পর আমার মনে হলো, আমি যেন এভারেস্ট জয় করে ফেলেছি। আমি দ্রুত পায়ে 'অক্ষরবৃত্ত' প্রকাশনীর স্টলের দিকে এগোলাম। পেছনে কফির দোকানে গিয়ে দেখলাম, আনিকা বসে আছেন। আজ উনার পরনে একটা ছাই রঙের শাড়ি, সাথে লাল ব্লাউজ। উনার সামনে টেবিলে কফির কাপ। আর উনার উল্টোদিকের চেয়ারে বসে আছে এক তরুণ। ছেলেটার চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, কবি বা সাহিত্য সমালোচক টাইপ কেউ হবে। আমি গিয়ে উনাদের টেবিলের সামনে দাঁড়ালাম। 

"আনিকা," আমি ডাকলাম।  আনিকা মুখ তুলে আমাকে দেখে খুব সুন্দর করে হাসলেন। "আসুন রাশেদ। বসুন।" 
উনি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললেন, "নিলয়, এ হচ্ছে রাশেদ। খুব ভালো একজন অনুবাদক। আর রাশেদ, এ হলো নিলয়। নতুন কবিতা লেখে।"  নিলয় আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি একটা অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। আমি সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আনিকার পাশের খালি চেয়ারটায় বসে পড়লাম। "তা রাশেদ, আজ কী বই কিনলেন?" আনিকা কফির কাপে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

আমি একটা মিথ্যা কথা বললাম। "তেমন কিছু না। আজকে মূলত হাঁটতে এসেছি।" নিলয় নামের ছেলেটা আবার তার সাহিত্যিক আলোচনা শুরু করল। "আনিকা আপা, আমি যেটা বলছিলাম, লাতিন আমেরিকান ম্যাজিক রিয়ালিজমের যে ধারাটা, সেটা কিন্তু আমাদের বাংলা সাহিত্যে ওভাবে আসেনি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ একটু চেষ্টা করেছিলেন..." আমি ছেলেটার ম্যাজিক রিয়ালিজম নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখালাম না। আমার ম্যাজিক রিয়ালিজম তখন আমার ঠিক পাশেই বসে আছে।

আমি আনিকার দিকে আড়চোখে তাকালাম। লাল রঙের স্লিভলেস ব্লাউজের হাতার কাছ দিয়ে উনার ফর্সা, মসৃণ বাহুটা উন্মুক্ত হয়ে আছে। শাড়ির আঁচলটা একটু সরে যাওয়ায় উনার কলারবোন বা কণ্ঠাস্থির নিখুঁত খাঁজটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমি আমার দৃষ্টিকে খুব সাবধানে উনার মুখের দিকে ধরে রাখার চেষ্টা করছি, কিন্তু আমার চোখ বারবার সেই গভীর খাঁজগুলোর দিকে পিছলে যাচ্ছে। আমি মুখে অত্যন্ত গম্ভীর একটা ভাব ধরে রাখলাম। যেন আমি নিলয়ের ম্যাজিক রিয়ালিজমের কথায় খুব মনোযোগ দিচ্ছি। "রাশেদ, আপনার কী মনে হয়?" আনিকা হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। "আসলে, ম্যাজিক রিয়ালিজম ব্যাপারটা তো আমাদের যাপিত জীবনের সাথেই মিশে আছে। এই যে আমরা ঢাকা শহরে এত যানজট, এত দূষণের মাঝেও বেঁচে আছি, স্বপ্ন দেখছি— এটাই তো সবচেয়ে বড় ম্যাজিক রিয়ালিজম।"

আমার এই অত্যন্ত সস্তা এবং রেডিমেড দার্শনিক উত্তরে আনিকা বেশ ইমপ্রেসড হলেন বলে মনে হলো। উনি হাসলেন। নিলয় বুঝতে পারল যে তার একক আধিপত্যে ভাগ বসেছে। সে কিছুক্ষণ পর ঘড়ি দেখে উঠে পড়ল। নিলয় চলে যাওয়ার পর আনিকা আমার দিকে একটু ঝুঁকে এলেন। উনার পারফিউমের ঘ্রাণটা এবার আরও তীব্রভাবে আমাকে আঘাত করল।

"আপনার কিন্তু খুব সেন্স অফ হিউমার আছে রাশেদ। আপনি চুপচাপ থাকলেও, আপনার কথায় একটা তীক্ষ্ণতা থাকে," আনিকা বললেন।

আমি মনে মনে বললাম, আমার তীক্ষ্ণতা এখন আমার কথার চেয়ে আমার চোখের দৃষ্টিতে বেশি।"চলুন, মেলাটা একটু ঘুরি," আনিকা উঠে দাঁড়ালেন। সেই দিন থেকে শুরু হলো আমার জীবনের নতুন এক অধ্যায়। ১৯ তারিখ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত, মেলার শেষ দিনগুলোর প্রতিটা বিকেল এবং সন্ধ্যা আমি আনিকার সাথে কাটালাম। আমি অফিসে কাজ শেষ করেই উবার মোটোতে উড়ে মেলায় আসতাম। আনিকাকে খুঁজে বের করতাম। তারপর আমরা দুজন মিলে মেলায় হাঁটতাম।

এই চার-পাঁচ দিন আমি আনিকার সাথে প্রচুর কথা বলেছি। সাহিত্য, অনুবাদ, লন্ডন শহরের আবহাওয়া, উনার আইটি ফার্মের ব্যবসা, আমার অনুবাদক জীবনের হতাশা— সব কিছু। আনিকা খুব ভালো শ্রোতা। উনি যখন কথা শোনেন, তখন চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকেন। উনার সেই বাদামি চোখের দৃষ্টিতে এমন একটা কিছু আছে, যা যেকোনো পুরুষকে মুহূর্তের জন্য হলেও সম্মোহিত করে ফেলতে পারে। 

কিন্তু আমার ভেতরের অবস্থাটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা যখন লিটল ম্যাগ চত্বরের পাশ দিয়ে হাঁটতাম, আমি উনাকে মার্কেজের অনুবাদ নিয়ে কথা বলতাম, আর আমার চোখ পড়ে থাকত উনার হাঁটার সময় কোমরের সেই নিখুঁত দুলুনির দিকে। আমরা যখন চা খেতাম, আমি উনাকে বলতাম কীভাবে স্প্যানিশ ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে কালচারাল গ্যাপ তৈরি হয়, আর আমার মন তখন ব্যস্ত থাকত উনার ঠোঁটের লিপস্টিকের রঙ আর উনার বক্ষদেশের সেই সুডৌল গঠনের পরিমাপ করতে।

আমার এই দ্বৈত সত্তা আমাকে মাঝে মাঝে নিজের কাছেই খুব অদ্ভুত বানাত। বাইরে থেকে আমি একজন নিরাসক্ত, বুদ্ধিদীপ্ত অনুবাদক, যে সাহিত্যের গভীরে ডুব দিতে পারে। আর ভেতরে আমি একজন ক্ষুধার্ত নেকড়ে, যে সুযোগ পেলেই এই অপরূপা নারীকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে চায়। কী সুন্দর, কী অপরূপ, কী স্বর্গীয় কিছু হতে পারে এই নারীর শরীর! আমি মাঝে মাঝে উনার পাশে হাঁটতে হাঁটতে আনমনা হয়ে যেতাম। উনার শাড়ির কুঁচির নিচ দিয়ে যখন উনার হাইহিল পরা পায়ের গোড়ালিটা একটু দেখা যেত, আমার মনে হতো আমি বুঝি শ্বাস নিতে ভুলে গেছি।

কিন্তু আমার এই স্বর্গীয় অনুভূতির একটা চড়া মূল্য আমাকে চোকাতে হচ্ছিল। এবং সেটা হলো আর্থিক মূল্য। আনিকা নাওহার লন্ডন প্রবাসী। উনার লাইফস্টাইল অনেক উঁচু। উনি মেলার ধুলোমাখা টং দোকানের চা খেতে পারেন না। উনাকে নিয়ে যেতে হয় মেলার বাইরের ভালো কোনো কফিশপে। সেখানে দুই কাপ কফি আর হালকা স্ন্যাকসের বিল আসে আটশ থেকে হাজার টাকা। শুধু তাই নয়। মেলা শেষে আনিকাকে রিকশায় তুলে দেওয়ার দায়িত্বটাও আমি নিজের কাঁধে নিয়ে নিলাম। আনিকা থাকেন উনার এক আত্মীয়ের বাসায়, ধানমন্ডিতে। আমি মেলার গেট থেকে রিকশা ডাকতাম।

"আমি দিয়ে আসছি আপনাকে," আমি বলতাম।

আনিকা প্রথম দিন একটু আপত্তি করেছিলেন। "আরে না না
, আপনি কেন যাবেন! আপনার তো মিরপুরে উল্টো রাস্তা।" আমি বীরদর্পে বলতাম, "তাতে কী? ঢাকা শহরে রাত আটটা আর রাত দশটা একই কথা। আমি নামিয়ে দিয়ে তারপর যাব।" রিকশায় আনিকার পাশে বসাটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমাঞ্চ। রিকশার ছোট্ট সিটে উনার শরীরের কিছুটা অংশ আমার শরীরের সাথে লেগে থাকত। ঢাকা শহরের স্পিডব্রেকার বা খানাখন্দে রিকশা যখন ঝাঁকুনি খেত, তখন উনার শরীরটা আরও একটু আমার দিকে হেলে পড়ত। আমি আমার বাম হাতটা রিকশার হুডের রড ধরে এমনভাবে রাখতাম, যেন আমার হাতের নিচেই আনিকার শরীরটা উত্তপ্ত আছে। উনার শ্যাম্পু করা চুলের ঘ্রাণ আর শ্যানেল পারফিউম মিলে রিকশার ভেতরের পরিবেশটাকে একটা স্বপ্নের মতো বানিয়ে দিত।

ধানমন্ডিতে উনাকে নামিয়ে দিয়ে, উনার রিকশা ভাড়া মিটিয়ে আমি যখন আরেকটা সিএনজি বা উবার নিয়ে মিরপুর ফিরতাম, তখন আমার পকেট কাঁদত। এই সাত দিনে আমার কী পরিমাণ খরচ হয়েছে, তার একটা হিসাব আমি মনে মনে করলাম। 

প্রতিদিন উবার মোটোতে কারওয়ান বাজার থেকে মেলায় যাওয়া— ২০০ টাকা।

আনিকাকে নিয়ে কফি শপে বসা— ১০০০ টাকা।
উনাকে ধানমন্ডি ড্রপ করার রিকশা ভাড়া— ১৫০ টাকা।
ধানমন্ডি থেকে আমার মিরপুর ফেরা— ৩০০ টাকা।
সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ষোলশো থেকে সতেরোশো টাকা।

সাত দিনে আমার খরচ হয়ে গেল প্রায় বারো হাজার টাকা! আমার সারা মাসের থাকা-খাওয়ার বাজেট পঁচিশ হাজার। আর আমি মাত্র সাত দিনে আমার বেতনের তিন ভাগের এক ভাগ একটা মেয়ের পেছনে উড়িয়ে দিলাম
, যে মেয়ে কোনোদিন আমার হবে না, যাকে আমি কোনোদিন ছুঁতেও পারব না! আমার সেই 'উমরাহ ফান্ড'-এর তিন লাখ টাকার স্বপ্নটা দূর থেকে আমাকে ভেঙচি কাটতে লাগল। বাবা-মায়ের পবিত্র উমরাহ ফান্ডের টাকা আমি একজন বিবাহিত নারীর সাথে কফি খেয়ে আর রিকশায় ঘুরে শেষ করে দিচ্ছি।

আমি কি পাগল হয়ে গেলাম?

হ্যাঁ
, আমি পাগলই হয়ে গিয়েছিলাম। লজিক, ভবিষ্যৎ, ব্যাংক ব্যালেন্স— কোনো কিছুই আমার এই উন্মাদনাকে আটকাতে পারছিল না। শুধু মেলায় দেখাই নয়, আমাদের যোগাযোগটা ভার্চুয়াল জগতেও ছড়িয়ে পড়ল। আমি মেসে ফিরে রাতে উনাকে মেসেজ দেওয়া শুরু করলাম। প্রথমে খুব প্রফেশনাল মেসেজ। 

আমি: "আজকের মেলাটা বেশ ভালো ছিল। আপনার নতুন বইয়ের রেসপন্স তো দেখলাম চমৎকার।" 
আনিকা: "সবই আপনাদের মতো পাঠকদের ভালোবাসা। আর হ্যাঁ
, থ্যাংকস ফর ড্রপিং মি হোম। আপনি না থাকলে রিকশা পাওয়াই মুশকিল হতো।"
আমি: "এটা কোনো ব্যাপার না। ঢাকা শহরের এই জ্যামে আপনাকে একা ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হতো না।"

ধীরে ধীরে মেসেজের ধরন পাল্টাতে লাগল।


আনিকা: "আপনার কি স্প্যানিশ সাহিত্য ছাড়া অন্য কিছু পড়তে ভালো লাগে না?"
আমি: "লাগে। তবে স্প্যানিশদের মতো প্যাশন অন্য সাহিত্যে কম। আচ্ছা, আপনি সব সময় এত পারফেক্ট শাড়ি পরেন কীভাবে? লন্ডনে তো নিশ্চয়ই শাড়ি পরার সুযোগ পান না।"
আনিকা (হাসির ইমোজি): "শাড়ি পরাটা একটা আর্ট রাশেদ। এটা প্র্যাকটিসের চেয়ে ভেতরের অনুভূতির ওপর নির্ভর করে। আর আপনাকে কে বলল আমি পারফেক্ট শাড়ি পরি?"
আমি: "আমার অনুবাদকের চোখ বলছে। আপনার আজকের নীল শাড়িটা আপনাকে খুব মানিয়েছিল।"

এই ধরনের টুকটাক প্রশংসামূলক কথা, একটু ফ্লার্ট, একটু বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ— এভাবেই আমাদের রাতের চ্যাটগুলো দীর্ঘ হতে লাগল। আনিকাও বেশ এনজয় করছিলেন বলে মনে হলো। হয়তো ইংল্যান্ডের যান্ত্রিক জীবনে উনার বোরিং স্বামীর সাথে উনার এমন কোনো সাহিত্যিক বা ফ্লার্টিংয়ের স্পেস ছিল না। আমি উনার সেই স্পেসটা পূরণ করছিলাম। কিন্তু আমার ভেতরের গল্পটা তো শুধু চ্যাটিংয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না।

রাত বারোটা বা একটার দিকে আনিকা যখন মেসেজ দিতেন, "গুড নাইট রাশেদ, কাল দেখা হবে," তখন আমার আসল রাত শুরু হতো। আমি আমার মেসের বিছানা ছেড়ে বাথরুমে যেতাম। দরজাটা ভেতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে আটকে দিতাম। তারপর আমার মোবাইলটা খুলতাম। আনিকা নাওহারের ফেসবুক প্রোফাইল। আমার চোখের সামনে ভাসত আজ বিকেলের সেই দৃশ্য। রিকশায় আমার পাশে বসা আনিকার শরীর। উনার সেই লাল ব্লাউজের হাতা, উনার উন্মুক্ত কলারবোন।

আমি বাথরুমের নিস্তব্ধতায় আমার ট্রাউজার খুলে ফেলতাম। আমার ডান হাতের আঙুলগুলো মোবাইলের স্ক্রিনে আনিকার ছবিগুলোর ওপর বুলিয়ে যেত, আর আমার বাম হাত আমার নিজের শরীরের সেই চরম উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঘর্ষণ তৈরি করত। আমার কল্পনার কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না। আমি কল্পনায় আনিকার সেই অফ-হোয়াইট শাড়িটা উনার শরীর থেকে খুলে ফেলতাম। উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর নিখুঁত শরীরটাকে আমি আমার দুই হাতের মুঠোয় পিষে ফেলতাম।

আমি কল্পনায় দেখতাম , আনিকা আমার এই স্যাঁতস্যাঁতে বাথরুমের ফ্লোরে শুয়ে আছেন। উনার চোখে সেই শান্ত, বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টি নেই। সেখানে এখন বন্য কামনার আগুন। আমি উনার দুই পায়ের মাঝখানে নিজেকে স্থাপন করতাম। উনার ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে উনার শরীরের গভীরে প্রবেশ করতাম।"রাশেদ... উমমম..." কল্পনার আনিকা আমার কানের কাছে গোঙাতেন।

আমি আমার হাতের গতি আরও বাড়াতাম। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে যেত। আমার মনে হতো, আমি যেন আমার সমস্ত জমানো হতাশা, আমার পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের গ্লানি, আমার একঘেয়ে জীবনের বিরক্তি— সব কিছু উনার শরীরের ভেতর ঢেলে দিয়ে নিজেকে মুক্ত করছি। একটা তীব্র, বৈদ্যুতিক স্রোত আমার মেরুদণ্ড বেয়ে উঠত। আমি মাথা পেছনের দিকে হেলিয়ে একটা অস্ফুট শব্দ করতাম। এবং পরমুহূর্তেই আমার শরীরের সমস্ত জমানো উত্তেজনা একটা উষ্ণ, আঠালো স্খলনের মাধ্যমে বাথরুমের মেঝের ওপর আছড়ে পড়ত। তারপর আবার সেই নিস্তেজতা। সেই পোস্ট-কয়টাল বিষণ্ণতা।

আমি পানির ট্যাপ ছেড়ে নিজেকে পরিষ্কার করতাম। আয়নায় নিজের লাল হয়ে থাকা চোখগুলোর দিকে তাকাতাম। আমি জানতাম, আমি একটা ইল্যুশনের মধ্যে বাস করছি। আনিকা নাওহার আমার কাছে একটা অলীক ফ্যান্টাসি ছাড়া আর কিচ্ছু না। আমি আমার সারা মাসের জমানো টাকা খরচ করে উনাকে রিকশায় পৌঁছে দিচ্ছি, উনাকে কফি খাওয়াচ্ছি, উনার সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক কথা বলছি— আর তার বিনিময়ে আমি বাথরুমের মেঝেতে দাঁড়িয়ে মাস্টারবেট করে আমার অবৈধ্য সুখ খুঁজে নিচ্ছি। এর চেয়ে প্যাথলজিক্যাল, এর চেয়ে করুণ জীবন আর কী হতে পারে? কিন্তু তবুও আমি এই চক্র থেকে বের হতে পারছিলাম না। ড্রাগ অ্যাডিক্টরা যেমন জানে যে ড্রাগ তাদের ধ্বংস করে দিচ্ছে, তবুও তারা সেটা ছাড়ে না— আমার অবস্থাও ঠিক তেমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আনিকা নাওহার আমার কাছে একটা কোকেনের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। উনার শরীরের ওই অদ্ভুত মোহনীয়তা, উনার ওই আভিজাত্য আমাকে নেশাগ্রস্ত করে ফেলেছিল।

আমি রুমে ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়তাম। আগামীকাল আবার অফিস। আবার সেই বিকল্প বাস। আবার এহসান ভাই। কিন্তু সন্ধ্যা হলেই আমি আবার উবার মোটো ডাকব। আবার সেই রকেটের মতো উড়ে মেলায় যাব। আবার সেই আনিকা নাওহারের পাশে হাঁটব। কারণ, মানুষের জীবন তো মাত্র একটাই। আর এই একঘেয়ে জীবনে যদি কোনো রূপবতী নারী কিছুদিনের জন্য হলেও একটা মরিচীকার মতো এসে দাঁড়ায়, তবে সেই মরিচীকার পেছনে দৌড়াতেও এক ধরনের অদ্ভুত, ধ্বংসাত্মক আনন্দ আছে। আমি রাশেদ আহমেদ। আমার এই ধ্বংসের পথে হাঁটা কেবল শুরু হয়েছে।
[+] 4 users Like Orbachin's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস? - by Orbachin - 10 hours ago



Users browsing this thread: 2 Guest(s)