17-06-2026, 09:23 PM
অধ্যায় ১ : কাশীপুরের সকাল
বীরভূম জেলার কাশীপুর গ্রামটা খুব বড় ছিল না। আবার একেবারে ছোটও নয়। প্রায় দেড়-দুইশো ঘর মানুষ থাকবে। গ্রামের একদিকে ধানখেত, অন্যদিকে বিস্তীর্ণ মাঠ। বর্ষাকালে চারদিক সবুজে ঢেকে যেত, আর শীতকালে সকালের কুয়াশায় যেন পুরো গ্রামটা সাদা চাদরের নিচে হারিয়ে যেত।
সেই শীতেরই এক সকাল।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। কুয়াশার আস্তরণে গ্রামের মাটির রাস্তা ঝাপসা হয়ে আছে। দূরে কোথাও মোরগ ডেকে উঠল।
প্রতিমা মুখার্জী উঠোনে ঝাঁট দিচ্ছিলেন।
ঝাঁটের শব্দে উঠোনের এক কোণে বসে থাকা কয়েকটা চড়ুই হঠাৎ উড়ে গেল।
রান্নাঘরের উনুনে আগুন জ্বলছে। ভাতের হাঁড়ি চাপানো হয়েছে। ধোঁয়ার গন্ধ শীতের বাতাসে মিশে ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রতিমা একবার আকাশের দিকে তাকালেন।
সূর্য উঠতে এখনও কিছুটা সময় আছে।
বারান্দার খুঁটির পাশে নিজের পুরোনো সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে টায়ারে বাতাস দেখছিলেন রমাপদ মুখার্জী।
প্রায় পনেরো বছর ধরে তিনি পাশের গ্রামের উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন।
বাংলা শিক্ষক।
গ্রামের ছেলেমেয়েরা কেউ চাকরি পেলে, কেউ কলেজে ভর্তি হলে, কেউ ভালো ফল করলে রমাপদ মাস্টারমশাইয়ের নামও সঙ্গে উচ্চারণ করে।
এলাকার মানুষ তাঁকে সম্মান করত।
তবে সেই সম্মান নিয়ে তাঁর কোনো অহংকার ছিল না।
প্রতিদিনের মতো আজও সময়মতো কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
প্রতিমা রান্নাঘর থেকে ডাকলেন,
— শোনো, আজ ফিরতে বেশি দেরি কোরো না।
— কেন?
— বাজার প্রায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সর্ষের তেল শেষ।
— আচ্ছা, নিয়ে আসব।
প্রতিমা একটু থেমে আবার বললেন,
— আর তোমার ছেলেকে একবার ডাকো তো। এখনও উঠল না।
রমাপদ হেসে ফেললেন।
— আমি ডাকলে উঠবে?
— চেষ্টা করে দেখো।
রমাপদ বারান্দা থেকে ভেতরের ঘরের দিকে তাকালেন।
— রতন! ও রতন!
কোনো উত্তর নেই।
— ও রে, কলেজ যাবি না?
ঘরের ভেতর থেকে অস্পষ্ট একটা আওয়াজ এল।
— উঁ… উঠছি…
রমাপদ আর প্রতিমা দুজনেই হেসে ফেললেন।
প্রতিদিনের একই গল্প।
রতনের বয়স **।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।
যে কলেজে রমাপদ পড়ান, সেই কলেজেই।
তবে বাবা-ছেলে একসঙ্গে যায় না।
রমাপদ একটু আগে বের হন। পথে কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে কলেজে যান।
আর রতন যায় তার বন্ধুদের সঙ্গে।
গ্রামের প্রায় সব ছেলেই দল বেঁধে কলেজে যায়।
কেউ সাইকেলে, কেউ হেঁটে।
সকালে কলেজে যাওয়ার পথটাই যেন তাদের দিনের প্রথম আড্ডা।
অবশেষে প্রতিমার বকুনি খেয়ে রতন বিছানা ছাড়ল।
মুখ ধুয়ে, ইউনিফর্ম পরে, বইয়ের ব্যাগ কাঁধে তুলে বারান্দায় এল।
প্রতিমা একটা গরম রুটি হাতে দিয়ে বললেন,
— হাঁটতে হাঁটতে খেয়ে নিস।
— দেরি হয়ে গেছে মা।
— তাই বলে না খেয়ে যাবি?
রতন মুখ বাঁকিয়ে রুটিটা হাতে নিল।
গেটের বাইরে তখনই শোনা গেল ডাকার শব্দ।
— রতন! ও রতন!
পল্টুর গলা।
রতন তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল।
প্রতিমা পিছন থেকে বললেন,
— ফিরে এসে আগে পড়তে বসবি!
— হ্যাঁ মা!
বলে ছুট দিল সে।
যদিও প্রতিমা জানতেন, কথাটা আজও রাখা হবে না।
কলেজে যাওয়ার রাস্তাটা গ্রামের ছেলেদের খুব প্রিয়।
মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে তারা কখন যে গল্পে মেতে উঠত, নিজেরাও বুঝত না।
রতনের সঙ্গে ছিল পল্টু, বাপন, কার্তিক আর শিবু।
পাঁচজন প্রায় সবসময় একসঙ্গেই থাকে।
কেউ ক্রিকেট নিয়ে কথা বলছে।
কেউ আগের দিনের ফুটবল ম্যাচ নিয়ে তর্ক করছে।
কেউ আবার বলছে বড় হয়ে সে কলকাতায় যাবে।
রাস্তার ধারে খেজুর গাছ থেকে রস নামানোর হাঁড়ি ঝুলছে।
এক জায়গায় দুজন কৃষক জমিতে জল দিচ্ছে।
আরেক জায়গায় একজন বৃদ্ধ গরু নিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছে।
সবাই সবাইকে চেনে।
কেউ রতনদের দেখে বলে উঠল,
— কিরে, আজও দেরি?
ছেলেরা হেসে দৌড়ে এগিয়ে গেল।
এই ছিল কাশীপুরের জীবন।
সাধারণ।
ধীর।
চেনা।
বীরভূম জেলার কাশীপুর গ্রামটা খুব বড় ছিল না। আবার একেবারে ছোটও নয়। প্রায় দেড়-দুইশো ঘর মানুষ থাকবে। গ্রামের একদিকে ধানখেত, অন্যদিকে বিস্তীর্ণ মাঠ। বর্ষাকালে চারদিক সবুজে ঢেকে যেত, আর শীতকালে সকালের কুয়াশায় যেন পুরো গ্রামটা সাদা চাদরের নিচে হারিয়ে যেত।
সেই শীতেরই এক সকাল।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। কুয়াশার আস্তরণে গ্রামের মাটির রাস্তা ঝাপসা হয়ে আছে। দূরে কোথাও মোরগ ডেকে উঠল।
প্রতিমা মুখার্জী উঠোনে ঝাঁট দিচ্ছিলেন।
ঝাঁটের শব্দে উঠোনের এক কোণে বসে থাকা কয়েকটা চড়ুই হঠাৎ উড়ে গেল।
রান্নাঘরের উনুনে আগুন জ্বলছে। ভাতের হাঁড়ি চাপানো হয়েছে। ধোঁয়ার গন্ধ শীতের বাতাসে মিশে ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রতিমা একবার আকাশের দিকে তাকালেন।
সূর্য উঠতে এখনও কিছুটা সময় আছে।
বারান্দার খুঁটির পাশে নিজের পুরোনো সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে টায়ারে বাতাস দেখছিলেন রমাপদ মুখার্জী।
প্রায় পনেরো বছর ধরে তিনি পাশের গ্রামের উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন।
বাংলা শিক্ষক।
গ্রামের ছেলেমেয়েরা কেউ চাকরি পেলে, কেউ কলেজে ভর্তি হলে, কেউ ভালো ফল করলে রমাপদ মাস্টারমশাইয়ের নামও সঙ্গে উচ্চারণ করে।
এলাকার মানুষ তাঁকে সম্মান করত।
তবে সেই সম্মান নিয়ে তাঁর কোনো অহংকার ছিল না।
প্রতিদিনের মতো আজও সময়মতো কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
প্রতিমা রান্নাঘর থেকে ডাকলেন,
— শোনো, আজ ফিরতে বেশি দেরি কোরো না।
— কেন?
— বাজার প্রায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সর্ষের তেল শেষ।
— আচ্ছা, নিয়ে আসব।
প্রতিমা একটু থেমে আবার বললেন,
— আর তোমার ছেলেকে একবার ডাকো তো। এখনও উঠল না।
রমাপদ হেসে ফেললেন।
— আমি ডাকলে উঠবে?
— চেষ্টা করে দেখো।
রমাপদ বারান্দা থেকে ভেতরের ঘরের দিকে তাকালেন।
— রতন! ও রতন!
কোনো উত্তর নেই।
— ও রে, কলেজ যাবি না?
ঘরের ভেতর থেকে অস্পষ্ট একটা আওয়াজ এল।
— উঁ… উঠছি…
রমাপদ আর প্রতিমা দুজনেই হেসে ফেললেন।
প্রতিদিনের একই গল্প।
রতনের বয়স **।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।
যে কলেজে রমাপদ পড়ান, সেই কলেজেই।
তবে বাবা-ছেলে একসঙ্গে যায় না।
রমাপদ একটু আগে বের হন। পথে কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে কলেজে যান।
আর রতন যায় তার বন্ধুদের সঙ্গে।
গ্রামের প্রায় সব ছেলেই দল বেঁধে কলেজে যায়।
কেউ সাইকেলে, কেউ হেঁটে।
সকালে কলেজে যাওয়ার পথটাই যেন তাদের দিনের প্রথম আড্ডা।
অবশেষে প্রতিমার বকুনি খেয়ে রতন বিছানা ছাড়ল।
মুখ ধুয়ে, ইউনিফর্ম পরে, বইয়ের ব্যাগ কাঁধে তুলে বারান্দায় এল।
প্রতিমা একটা গরম রুটি হাতে দিয়ে বললেন,
— হাঁটতে হাঁটতে খেয়ে নিস।
— দেরি হয়ে গেছে মা।
— তাই বলে না খেয়ে যাবি?
রতন মুখ বাঁকিয়ে রুটিটা হাতে নিল।
গেটের বাইরে তখনই শোনা গেল ডাকার শব্দ।
— রতন! ও রতন!
পল্টুর গলা।
রতন তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল।
প্রতিমা পিছন থেকে বললেন,
— ফিরে এসে আগে পড়তে বসবি!
— হ্যাঁ মা!
বলে ছুট দিল সে।
যদিও প্রতিমা জানতেন, কথাটা আজও রাখা হবে না।
কলেজে যাওয়ার রাস্তাটা গ্রামের ছেলেদের খুব প্রিয়।
মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে তারা কখন যে গল্পে মেতে উঠত, নিজেরাও বুঝত না।
রতনের সঙ্গে ছিল পল্টু, বাপন, কার্তিক আর শিবু।
পাঁচজন প্রায় সবসময় একসঙ্গেই থাকে।
কেউ ক্রিকেট নিয়ে কথা বলছে।
কেউ আগের দিনের ফুটবল ম্যাচ নিয়ে তর্ক করছে।
কেউ আবার বলছে বড় হয়ে সে কলকাতায় যাবে।
রাস্তার ধারে খেজুর গাছ থেকে রস নামানোর হাঁড়ি ঝুলছে।
এক জায়গায় দুজন কৃষক জমিতে জল দিচ্ছে।
আরেক জায়গায় একজন বৃদ্ধ গরু নিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছে।
সবাই সবাইকে চেনে।
কেউ রতনদের দেখে বলে উঠল,
— কিরে, আজও দেরি?
ছেলেরা হেসে দৌড়ে এগিয়ে গেল।
এই ছিল কাশীপুরের জীবন।
সাধারণ।
ধীর।
চেনা।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)