17-06-2026, 03:49 AM
৭।
ফেব্রুয়ারি মাসের ষোলো তারিখ। সোমবার। আজ আমার ডে-অফ। সকাল থেকেই আমার ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত ছটফটানি কাজ করছিল। ব্যাচেলর মানুষদের ছুটির দিন সাধারণত কাটে ঘুমিয়ে, মেসের মিলের হিসাব কষে, অথবা সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে জীবনের উদ্দেশ্য হাতড়ে। কিন্তু আজ আমার রুটিন ভিন্ন। আমি আজ বইমেলায় যাব।
বইমেলায় যাওয়ার পেছনে একটা খুব শক্ত লজিক আমি নিজেকে দিয়েছি। আমি একজন অনুবাদক। আমাকে প্রচুর পড়তে হয়। আমার কিছু ডিকশনারি কেনা দরকার। বিশেষ করে একটা ভালো স্প্যানিশ-টু-ইংলিশ ডিকশনারি, আর গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কয়েকটা বইয়ের নতুন অনুবাদ। এই লজিকটা এতটাই শক্ত যে, আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে চোখ রেখে বললাম, “রাশেদ, তুমি নিতান্তই সাহিত্যের টানে মেলায় যাচ্ছ। এর বাইরে অন্য কোনো উদ্দেশ্য তোমার নেই।”
কিন্তু পাঠকদের কাছে আমি মিথ্যা বলতে চাই না। আমি জানি আমি কেন মেলায় যাচ্ছি। আমি মেলায় যাচ্ছি আনিকা নাওহারকে দেখতে। ব্যাপারটা আসলে হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনো সমাপতন নয়। গত কয়েকদিন ধরে আমি একটা অদ্ভুত রোগে ভুগছি। রোগের নাম— ‘ফেসবুক স্টকিং’। আনিকা নাওহার আমাকে উনার নাম্বার দিয়েছিলেন পাণ্ডুলিপি পাঠানোর জন্য। আমি অত্যন্ত স্মার্ট একটা ছেলের মতো সেই নাম্বারটা সেভ করেছিলাম, কিন্তু উনাকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর সাহস আমার হয়নি। ঢাকা শহরের পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের একজন অনুবাদক, ইংল্যান্ড প্রবাসী এক কোটিপতি আইটি ফার্মের মালকিনকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবে— এটা ভাবতেই আমার আঙুল কেঁপে যেত।
কিন্তু রিকোয়েস্ট না পাঠালেও, ফেসবুকের মার্ক জাকারবার্গ সাহেব স্টকিং করার চমৎকার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আনিকা নাওহারের প্রোফাইল লক করা নেই। পাবলিক প্রোফাইল। আমি দিনে অন্তত তিনবার সেই প্রোফাইলে ঢুঁ মারি। আজ সকালেই উনার প্রোফাইলে একটা পোস্ট দেখলাম। বাংলা একাডেমির বটতলার একটা ছবি দিয়ে উনি লিখেছেন— "আজকের বিকেলটা কাটবে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর স্টলে। প্রিয় পাঠকদের অপেক্ষায়।"
ব্যাস। আমার ডিকশনারি কেনার লজিকটা সাথে সাথেই জন্ম নিয়ে নিল। বিকেল চারটার দিকে আমি মেলায় পৌঁছালাম। বাংলা একাডেমি আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঝখানে যে ধুলাবালি আর মানুষের সমুদ্র, তার ভেতরে আমি নিজেকে সঁপে দিলাম। ঢাকা শহরের মানুষ এমনিতেই বই পড়ে কম, কিন্তু বইমেলায় আসে সবচেয়ে বেশি। মেলায় আসাটা আমাদের একটা বাৎসরিক তীর্থযাত্রার মতো হয়ে গেছে।
আমি লিটল ম্যাগ চত্বর ঘুরে, এদিক-ওদিক ধাক্কা খেয়ে কয়েকটা বই কিনলাম। একটা স্প্যানিশ ডিকশনারি, আর দু-চারটে অনুবাদের বই। বইগুলো একটা পলিথিনের ব্যাগে ঝুলিয়ে আমি খুব ধীর পায়ে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর স্টলের দিকে এগোতে লাগলাম। স্টলের কাছাকাছি আসতেই আমার বুকের ভেতর ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। আমি দূর থেকে স্টলটা দেখতে পাচ্ছিলাম। বেশ বড় স্টল। সামনে অনেক মানুষের ভিড়। সেলসের দুজন ছেলে দাঁড়িয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বই বিক্রি করছে।
আমি চোখ ঘুরিয়ে আনিকা নাওহারকে খুঁজলাম। হ্যাঁ, উনি আছেন। স্টলের ভেতরের দিকে, যেখানে একটু বসার জায়গা করা হয়েছে, সেখানে উনি বসে আছেন। উনার পরনে আজ একটা অফ-হোয়াইট রঙের শাড়ি, সাথে কালো রঙের স্লিভলেস ব্লাউজ। উনার খোলা চুলগুলো কাঁধের এক পাশ দিয়ে সামনে এসে পড়েছে। উনার হাতে একটা কফির কাপ। কিন্তু আমার চোখ আটকে গেল উনার সামনের চেয়ারটায়। সেখানে বসে আছেন কবি সৈকত আমিন।
সৈকত আমিন এই প্রজন্মের একজন বেশ জনপ্রিয় কবি। উনার কবিতার চেয়ে উনার গলার স্বর, উনার চাপদাড়ি, আর উনার কাঁধে ঝোলানো খদ্দরের ঝোলাব্যাগটা বেশি জনপ্রিয়। উনি অত্যন্ত রোমান্টিক ভঙ্গিতে আনিকার দিকে ঝুঁকে পড়ে কথা বলছেন, আর আনিকা উনার কথায় হেসে উঠছেন। দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথে আমার পেটের ভেতর একটা অদ্ভুত মোচড় দিয়ে উঠল। অ্যাসিডিটি হলে মানুষের পেটে যেমন একটা জ্বালাপোড়া শুরু হয়, আমার ঠিক তেমন একটা জ্বালাপোড়া শুরু হলো। কিন্তু এটা গ্যাস্ট্রিকের জ্বালাপোড়া নয়, এটা জেলাসি। ঈর্ষা।
আমি অবাক হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলাম, আমি জেলাস ফিল করছি কেন? আনিকা নাওহার আমার কে? কেউ না। উনি একজন বিবাহিত নারী, ইংল্যান্ডে থাকেন। আমি উনার বইয়ের একজন সামান্য প্রুফরিডার মাত্র। সৈকত আমিনের মতো প্রতিষ্ঠিত কবি উনার সাথে বসে কফি খাবে, গল্প করবে— এটাই তো স্বাভাবিক। আমি কেন ঈর্ষায় জ্বলে যাচ্ছি? মানুষের মন বড়ই অদ্ভুত। লজিক দিয়ে ঈর্ষাকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। আমার মনে হচ্ছিল, আমি এক্ষুনি গিয়ে সৈকত আমিনের দাড়িগুলো ধরে টান দিই, আর বলি— "ভাই, আপনি কবিতা লেখেন ভালো কথা, কিন্তু এত কাছে ঘেঁষে কথা বলছেন কেন?"
কিন্তু আমি তো আর রাস্তার গুণ্ডা নই, আমি একজন ভদ্র অনুবাদক। আমি স্টলের সামনে গিয়ে এমন একটা ভাব ধরলাম যেন আমি এই পৃথিবীতে আনিকা নাওহার বা সৈকত আমিন নামের কাউকে চিনিই না। আমি সেলসের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বললাম, "ভাই, মার্কেজের 'হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচ্যুড'-এর নতুন অনুবাদটা কি আপনাদের এখানে বের হয়েছে?"
আমি আনিকাদের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগলাম। একটা লাইন আমি অন্তত পাঁচবার পড়লাম, কিন্তু মাথার ভেতর কিছুই ঢুকল না। আমার পুরো মনোযোগ আমার পিঠের পেছনে।
হঠাৎ একটা পরিচিত , মোহনীয় কণ্ঠস্বর আমার কানে ভেসে এল।"আরে, এই রাশেদ সাহেব না?" আমি এমনভাবে চমকে ওঠার ভান করলাম, যেন আমি মেলায় এসে আনিকা নাওহারকে দেখে রীতিমতো আকাশ থেকে পড়েছি। "ওহ! আনিকা আপা! আপনি এখানে?"
আনিকা কফির কাপটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। "আমি তো থাকবই, আমার বইয়ের স্টল। কিন্তু আপনি মেলায়? আজকে তো আপনার অফিস থাকার কথা।" আমি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললাম, "আজ সোমবার। আমার ডে-অফ। ভাবলাম মেলা থেকে কিছু ডিকশনারি কিনে নিয়ে যাই।" আনিকা আমার দিকে এগিয়ে এলেন। উনার সেই চেনা দামি পারফিউমের গন্ধটা মেলা প্রাঙ্গণের ধুলাবালির গন্ধকে হারিয়ে দিয়ে আমার নাকে এসে ঢুকল।
সৈকত আমিনও উঠে দাঁড়ালেন। আনিকা আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। "সৈকত ভাই, এ হচ্ছে রাশেদ। আমার বইয়ের চমৎকার এডিটিং আর প্রুফরিডিংয়ের পেছনে এর অবদান অনেক।"
সৈকত আমিন আমার দিকে এমন একটা অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকালেন, যেন আমি মেলা প্রাঙ্গণের ঝাড়ুদার। উনি হাত মেলালেন না, শুধু মাথা নেড়ে বললেন, "ও আচ্ছা।"
তারপর আনিকার দিকে ফিরে বললেন, "আনিকা, আমি তাহলে উঠি। ওইদিকে আরেকটা স্টলে আমার পাঠকরা অপেক্ষা করছে। আমি কাল আপনাকে ফোন দেব।" আনিকা হাসিমুখে বিদায় দিলেন।
সৈকত আমিন চলে যাওয়ার পর আমার ভেতরের সেই অ্যাসিডিটিটা যেন জাদুর মতো গায়েব হয়ে গেল। আমার মনে হলো, আমি যেন কোনো অলিম্পিক গেমসে গোল্ড মেডেল জিতে গেছি।
আনিকা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "চলুন, মেলাটা একটু ঘুরে দেখি। এই স্টলে বসে থাকতে থাকতে আমার কোমরে ব্যথা হয়ে গেছে।" আমরা দুজন স্টল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম।
মেলায় প্রচুর ভিড়। আনিকা নাওহার আমার ঠিক পাশ ঘেঁষে হাঁটছেন। ভিড়ের কারণে মাঝে মাঝেই উনার শরীরের নরম স্পর্শ আমার বাহুতে এসে লাগছে। প্রতিটা স্পর্শে আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা বিদ্যুতের ঝটকা নেমে যাচ্ছে।
আমি খুব চেষ্টা করছি স্বাভাবিক থাকার। কিন্তু আমার চোখ বারবার অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। উনার অফ-হোয়াইট শাড়ির ফাঁক দিয়ে উনার ফর্সা, মেদহীন কোমরের একটা অংশ বারবার উঁকি দিচ্ছে। উনার হাঁটার ছন্দে উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতির নিখুঁত ঢেউগুলো এমনভাবে দুলছে যে, আমার মনে হচ্ছিল আমি যদি এখন অনুবাদ বাদ দিয়ে এই নারীকে নিয়ে কবিতা লিখতে বসতাম, তাহলে সৈকত আমিনকে দশ গোল দিয়ে দিতাম।
"রাশেদ, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?" আনিকার কথায় আমি চমকে উনার দিকে তাকালাম।
"জি, বলুন।"
"আপনি আমার সামনে এত জড়তা দেখাচ্ছেন কেন? আপনি তো খুব দারুণ কথা বলেন। সেদিন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে কী সুন্দর করে শূন্যতা, আইডেন্টিটি ক্রাইসিস নিয়ে কথা বললেন! তাহলে এখন এত কম কথা বলছেন কেন?"
আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। আমি উনাকে কীভাবে বোঝাব যে, উনার শারীরিক এই অদ্ভুত মোহনীয়তা আমাকে কথা বলতে দিচ্ছে না? আমার মাথার ভেতর শুধু একটাই চিন্তা— এই নারীর শরীরের প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি বাঁক এত নিখুঁত হয় কীভাবে? আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম, "আসলে আমি এমনিতেই কথা কম বলি। আর ঢাকা শহরের এই ভিড়ের মধ্যে কথা বলতে গেলে এনার্জি নষ্ট হয়। আমি বরং আপনার কথা শুনতে বেশি পছন্দ করছি।"
আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "আপনি খুব ডিপ্লোম্যাটিক আনসার দেন। এনিওয়ে, আপনি কী বই কিনলেন?" আমি আমার পলিথিনের ব্যাগটা উনার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। "কিছু ডিকশনারি আর অনুবাদের বই। আর হ্যাঁ... আমার নিজের একটা বইও ব্যাগে আছে। এটা আমার প্রথম দিকের একটা স্প্যানিশ অনুবাদ। খুব একটা চলেনি বাজারে। কপিটা মেলায় একটা পুরোনো স্টলে পেলাম, তাই নিজের জন্যই কিনে নিলাম।"
আনিকা বইটা আমার হাত থেকে নিলেন। বইটার নাম 'অন্ধকার গোলকধাঁধা'। উনি বইয়ের প্রচ্ছদটা হাত বুলিয়ে দেখলেন।"আমি এই বইটা নেব," আনিকা বললেন।
"আপনার পড়ে ভালো লাগবে না। অনুবাদ খুব কাঁচা।"
"তাতে কী? এটা আমার এডিটরের বই। আমি অবশ্যই পড়ব। দাঁড়ান, আমি একটা ছবি তুলি।"
আনিকা উনার আইফোনটা বের করলেন। "রাশেদ, বইটা আমাকে দেওয়ার মতো করে ধরে দাঁড়ান।" আমি উনার দিকে বইটা বাড়িয়ে ধরলাম। উনি এক হাতে বইটা ধরে, আরেক হাতে ক্যামেরা অন করে একটা ছবি তুললেন। ছবি তোলা শেষ করে উনি বললেন, "আমি এই ছবিটা ফেসবুকে আপলোড করে আপনার বইয়ের একটা সুন্দর বিজ্ঞাপন দিয়ে দেব। দেখবেন, আগামী বছর আপনার বইয়ের কাটতি বেড়ে গেছে।"
আমি হাসলাম।
"এবার বলুন," আনিকা আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, "আমার কাছ থেকে এত বড় একটা ফেভার পাচ্ছেন, বিনিময়ে আমাকে কী খাওয়াবেন?"
প্রশ্নটা শোনার সাথে সাথে আমার মাথার ভেতর আমার সেই বন্য, আদিম সত্তাটা চিৎকার করে উঠল— "আমার শরীর! আমি আমার শরীর খাওয়াতে চাই আপনাকে!"
কিন্তু আমি তো রাশেদ আহমেদ। আমাকে ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকতে হয়। আমি সেই আদিম চিৎকারটাকে গলার কাছে আটকে রেখে, অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং নিরীহ ভঙ্গিতে বললাম, "চলুন, আপনাকে মেলা প্রাঙ্গণের সবচেয়ে ভালো চা খাওয়াই। এখানে একটা স্টলে খুব চমৎকার মাল্টা চা বানায়।" আনিকা হাসলেন। "ডান। চলুন।"
আমরা চা খেলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমি আমার সেই মাস্টারস্ট্রোকটা খেললাম। আমি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললাম, "আনিকা আপা, আপনি যখন ফেসবুকে ছবিটা আপলোড করবেন, তখন আমাকে একটু ট্যাগ করে দিয়েন। তাহলে আমার বন্ধুরাও দেখতে পাবে।"
আনিকা চায়ের কাপ নামিয়ে একটু ভ্রু কুঁচকে বললেন, "ট্যাগ করব কীভাবে? আপনি তো আমার ফ্রেন্ডলিস্টেই নেই।" আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, "ওহ, তাই তো! খেয়ালই ছিল না। আপনি বরং আমাকে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিন। আমি অ্যাকসেপ্ট করে নেব।"
এটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম সেরা একটা ট্রিক। আমি নিজে রিকোয়েস্ট পাঠালে সেটা কেমন যেন ‘ডেসপারেট’ মনে হতো। কিন্তু আমি পরিস্থিতি এমনভাবে তৈরি করলাম যে উনি নিজেই আমাকে রিকোয়েস্ট পাঠাতে বাধ্য হলেন। আনিকা সাথে সাথেই ফোন বের করে আমার নাম সার্চ করলেন। "এই যে, রাশেদ আহমেদ। প্রোফাইল পিকচারে একটা কালো বিড়ালের ছবি। তাই না?"
"জি।"
"পাঠিয়ে দিয়েছি। অ্যাকসেপ্ট করুন।"
আমি ফোন বের করে রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করলাম। আমার ভেতরে তখন একটা দামামা বাজছে। আমি আনিকা নাওহারের ফ্রেন্ডলিস্টে ঢুকে গেছি। মেলা থেকে মেসে ফিরতে ফিরতে রাত নয়টা বেজে গেল।
আজ মেসে রহিমা খালা আসেননি। রাজু আর তুহিন মিলে বাইরে থেকে তেহারি কিনে এনেছে। আমি কোনোমতে একটু তেহারি মুখে গুঁজে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। সারাটা দিন আমার বেশ ভালো কেটেছে। কিন্তু রুমে ঢোকার পর থেকেই আমার ভেতর এক ধরনের অদ্ভুত, অস্বস্তিকর নেশার টান পড়তে শুরু করল। আমার মনে হচ্ছে আমার শরীরে অক্সিজেনের অভাব হচ্ছে। আমার হাতের তালু ঘামছে।
আমি জানি এই নেশাটা কীসের। আমি লাইটটা বন্ধ করে দিলাম। শুধু আমার টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে। আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হতে শুরু করেছে। আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে বাথরুমের দিকে পা বাড়ালাম। ব্যাচেলরদের মেসে বাথরুম হলো একমাত্র পবিত্র এবং একান্ত নিজস্ব জায়গা। যেখানে পৃথিবীর কেউ আপনাকে ডিস্টার্ব করবে না।
আমি বাথরুমের দরজা ভেতর থেকে ছিটকিনি আটকে দিলাম। কমোডের ঢাকনাটা ফেলে তার ওপর বসলাম। বাথরুমের ভেতরের সাদা টাইলসগুলো একটু স্যাঁতস্যাঁতে, একটা ফিনাইলের গন্ধ ভাসছে বাতাসে। আমার আঙুলগুলো কাঁপছে। আমি ফেসবুক অ্যাপটা ওপেন করলাম। সোজা চলে গেলাম আনিকা নাওহারের প্রোফাইলে। আজ মেলায় তোলা সেই ছবিটা উনি আপলোড করেছেন। ক্যাপশনে লিখেছেন— "আমার প্রিয় প্রুফরিডার এবং চমৎকার একজন অনুবাদক রাশেদের সাথে বইমেলার এক পড়ন্ত বিকেল।" আমাকে ট্যাগ করা হয়েছে। ছবিতে শত শত লাইক আর কমেন্ট পড়ছে।
কিন্তু আমি ওই ছবির দিকে তাকালাম না। আমার উদ্দেশ্য ভিন্ন।
আমি উনার 'ফটোস' সেকশনে গেলাম। 'অ্যালবামস'-এ ক্লিক করলাম। উনার অনেকগুলো অ্যালবাম। 'লন্ডন ডায়েরিজ', 'বইমেলা ২০২৩', 'প্যারিস ভ্যাকেশন'। আমি স্ক্রল করতে করতে নিচের দিকে নামতে লাগলাম। আমার চোখ খুঁজছে এমন কিছু, যা আমার ভেতরের এই আদিম, বন্য নেশাটাকে শান্ত করতে পারে।
হঠাৎ একটা অ্যালবামে এসে আমার আঙুল থেমে গেল। অ্যালবামের নাম— 'বালি গেটঅ্যাওয়ে - ২০২১'। আমি অ্যালবামটা ওপেন করলাম। প্রথম ছবিটা দেখেই আমার মস্তিষ্কে যেন একটা শর্টসার্কিট হয়ে গেল। আমার চোখের তারা বড় হয়ে এল। ছবিটা একটা সুইমিংপুলের। আনিকা নাওহার পুলের নীল জলের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন। উনার পরনে একটা কালো রঙের টু-পিস সুইমস্যুট।
আমি আমার ট্রাউজারের বোতামটা খুলে ফেললাম। আমার ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা মোবাইলের স্ক্রিনের ওপর, আর আমার বাম হাত চলে গেল আমার ট্রাউজারের ভেতর। আমার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক জায়গায় এসে জমা হয়েছে। আমার সেই সুখের দণ্ডটি এখন চরম উত্তেজনায় পাথরের মতো কঠিন হয়ে আছে। আমি বাম হাত দিয়ে আমার সুখের দণ্ডটিকে মুঠি করে ধরলাম। আর ডান হাত দিয়ে ছবিগুলো একটা একটা করে সুইপ করতে লাগলাম।
দ্বিতীয় ছবি। আনিকা পুলের পাড়ে একটা ডেকচেয়ারে শুয়ে আছেন। উনার শরীর সম্পূর্ণ শুকনো। সূর্যের আলো উনার ফর্সা, মসৃণ ত্বকের ওপর ঠিকরে পড়ছে। কালো সুইমস্যুটের ওপরের অংশটা উনার ভরাট বক্ষদেশকে কোনোমতে আটকে রেখেছে। উনার দুই বক্ষের মাঝখানের সেই গভীর খাঁজটা আমার চোখের সামনে উন্মুক্ত। আমি চোখ বন্ধ করলাম। বাম হাতের মুঠিটা আরও শক্ত করে আমার সুখের দণ্ডের ওপর ওপর-নিচ করতে লাগলাম। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস বাথরুমের দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে।
আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, আমি সেই বালির সুইমিংপুলে আনিকার ওপর ঝুঁকে আছি। উনার সেই ফর্সা, রোদ-পোহানো শরীরটা আমার নিচে। আমি উনার কালো সুইমস্যুটের ফিতেগুলো দাঁত দিয়ে টেনে খুলে ফেলছি। উনার সেই উন্মুক্ত, উদ্ধত বক্ষচূড়া দুটো আমার ঠোঁটের নিচে। ডান হাতে আমি আরেকটা ছবি সুইপ করলাম।
এবার আনিকা পুলের জলের ভেতর থেকে অর্ধেক শরীর তুলে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। উনার চুলগুলো ভিজে গলার কাছে লেপ্টে আছে। পানির কারণে সুইমস্যুটের কাপড়টা উনার শরীরের সাথে একদম মিশে গেছে, যার ফলে উনার নাভির গভীরতা এবং কোমরের নিচের সেই নিখুঁত বাঁকটা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে। আমি কল্পনার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেলাম। আমার বাম হাতের গতি এখন একটা যন্ত্রের মতো হয়ে গেছে। ঘর্ষণের ফলে আমার হাতের তালুতে এক ধরনের উত্তাপ তৈরি হয়েছে।
আমি কল্পনায় আনিকাকে পুলের পানির ভেতরে জড়িয়ে ধরলাম। উনার ভেজা , পিচ্ছিল শরীরটা আমার শরীরের সাথে ঘষা খাচ্ছে। আমি উনার মসৃণ ঊরু দুটোর মাঝখানে আমার শরীরটাকে স্থাপন করেছি। উনার দুই হাত আমার গলা জড়িয়ে ধরে আছে। আমি পাগলের মতো উনার ঘাড়, উনার বুক, উনার ভেজা ঠোঁট চুম্বন করছি।"আনিকা..." আমি বাথরুমের নিস্তব্ধতায় ফিসফিস করে উনার নাম উচ্চারণ করলাম।
আমার কল্পনায় আনিকার চোখ দুটো কামনায় বুজে আসছে। উনি আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলছেন, "রাশেদ... আরও... আরও..." আমার শরীরের সমস্ত স্নায়ু টানটান হয়ে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আমার তলপেটের নিচে একটা প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে। আমি জানি, আমি আর বেশিক্ষণ এই উত্তেজনা ধরে রাখতে পারব না। আমি আরেকটা ছবি সুইপ করলাম। এই ছবিতে আনিকা পুলের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছেন। পেছন থেকে তোলা ছবি। উনার সেই সুডৌল, আকর্ষণীয় নিতম্বের গঠনটা সম্পূর্ণ অনাবৃত প্রায়।
ছবিটা দেখার সাথে সাথেই আমার ভেতরের সেই বাঁধ ভেঙে গেল। একটা তীব্র, বৈদ্যুতিক স্রোত আমার মেরুদণ্ড বেয়ে ওপরে উঠে এল। আমি মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিলাম। আমার মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট, বন্য গোঙানি বের হয়ে এল। এবং সেই মুহূর্তেই আমার সুখের দণ্ড থেকে এক প্রচণ্ড, উষ্ণ স্খলনের মাধ্যমে আমার সমস্ত জমানো উত্তেজনা, সমস্ত নেশা, সমস্ত ফ্যান্টাসি ছিটকে বেরিয়ে এল বাথরুমের মেঝের ওপর।
আমি হাঁপাতে লাগলাম। আমার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। হাতের মুঠোটা শিথিল হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গেল। কোনো ছবি নেই, কোনো কল্পনা নেই। আনিকা নাওহার নেই। তারপর ধীরে ধীরে সেই পরিচিত, তীব্র নিস্তেজতা এবং অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করতে শুরু করল।
পোস্ট-নাট ক্ল্যারিটি (Post-nut clarity)।
আমি মোবাইলটা লক করে কমোডের ওপর রাখলাম। আমার বাম হাতে এবং বাথরুমের ফ্লোরে আমার কামনার চিহ্নগুলো একটা সাদা, আঠালো তরল হয়ে পড়ে আছে। আমি বাথরুমের আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। চোখগুলো লাল হয়ে আছে। চুল উষ্কখুষ্ক। আমি রাশেদ আহমেদ। একজন অনুবাদক। আমি একটু আগে বইমেলায় গিয়েছিলাম, অত্যন্ত ভদ্রভাবে সাহিত্যের কথা বলেছিলাম। আর এখন, মেসে ফিরে এসে বাথরুমের ভেতর এক বিবাহিতা নারীর ছবি দেখে একটা পশুর মতো মাস্টারবেট করলাম।
মানুষের দুটো রূপ থাকে। একটা সে সমাজকে দেখায়, আরেকটা সে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখায়। আমি পানির ট্যাপটা ছেড়ে দিলাম। ঠান্ডা পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে করতে ভাবলাম, আমার এই ফ্যান্টাসির শেষ কোথায়? এই যে আমি আনিকা নাওহারকে নিয়ে এই অসম্ভব, নোংরা অথচ তীব্র উত্তেজনাময় কল্পনার জগতে ঢুকে পড়েছি— এখান থেকে আমি বের হবো কীভাবে? নাকি আমি বের হতে চাইই না?
আমি মুখ ধুয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলাম। রুমের ফ্যানটা এখনো ক্যাঁচক্যাঁচ করে ঘুরছে। আমি বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। আমার শরীরটা এখন সম্পূর্ণ নিস্তেজ। কোনো শক্তি নেই। কিন্তু আমার মাথার ভেতর একটা জিনিস খুব পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমি আনিকা নাওহারের প্রেমে পড়িনি। আমি উনার শরীরের প্রেমে পড়েছি। উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর জ্যামিতির প্রেমে পড়েছি। আর এই প্রেমটা আমাকে ধীরে ধীরে একটা অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যে অন্ধকারের শেষ কোথায়, সেটা আমি নিজেও জানি না।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)