Thread Rating:
  • 11 Vote(s) - 3.55 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
#28
৬।
যৌনতা জিনিসটা আসলে কী
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের নিচের কালি দেখতে দেখতে আমি এই অতি জটিল এবং আদিম বিষয়টা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। গত রাতের সেই অদ্ভুত, নগ্ন এবং বন্য স্বপ্নের পর আমার মস্তিষ্ক যেন স্বাভাবিক লজিকে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, আমি যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি। যে রাশেদ আহমেদকে আমি চিনতাম— শান্ত, নিরাসক্ত, পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের একঘেয়ে অনুবাদক— তার ভেতরে এত তীব্র একটা আদিম ক্ষুধা লুকিয়ে ছিল, সেটা আমি নিজেই জানতাম না।

যৌনতা নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের অদ্ভুত লুকোচুরি আছে। আমরা সবাই এই প্রক্রিয়ার ফসল, অথচ আমরা এমন ভান করি যেন এটা পৃথিবীতে এক্সিস্টই করে না। বাসে একটু গা লাগলে আমরা এমনভাবে চমকে উঠি, যেন আমরা সবাই আকাশ থেকে পড়া কোনো পবিত্র ফেরেশতা। আমি ব্রাশে পেস্ট লাগাতে লাগাতে ভাবলাম, যৌনতা নিয়ে পৃথিবীর বড় বড় দার্শনিক আর বিজ্ঞানীরা কী বলে গেছেন?


সিগমুন্ড ফ্রয়েডের কথা ধরলে, মানুষের জীবনের প্রতিটি কাজের পেছনেই নাকি অবদমিত যৌনাকাঙ্ক্ষা কাজ করে। আপনি যে একটা সুন্দর বাড়ি বানাচ্ছেন, ভালো চাকরি খুঁজছেন, এমনকি সুন্দর করে চুল আঁচড়াচ্ছেন— সবকিছুর পেছনেই আছে বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করার একটা সুপ্ত বাসনা। রিচার্ড ডকিন্স তার ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইয়ে বলেছেন, আমরা মানুষেরা হচ্ছি আমাদের জিনের বহনকারী গাড়ি মাত্র। আমাদের জিনের একটাই উদ্দেশ্য— যেকোনো মূল্যে সারভাইভ করা এবং বংশবৃদ্ধি করা। আর এই বংশবৃদ্ধির জন্য জিন আমাদের মস্তিষ্কে এমন একটা কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন তৈরি করে, যার নাম আমরা দিয়েছি ‘যৌনতা’ বা ‘প্রেম’। জিন আমাদের বোকা বানিয়ে নিজের কাজ উদ্ধার করে নেয়।

কিন্তু পুরুষ আর নারীর কাছে যৌনতার ধারণা কি এক?

আমি বেসিনে মুখ ধুতে ধুতে ভাবলাম, না, এক নয়। বিবর্তনবাদ অনুযায়ী, একজন পুরুষের মূল লক্ষ্য হলো তার জিন যত বেশি সম্ভব ছড়িয়ে দেওয়া। কারণ পুরুষের রিপ্রোডাক্টিভ কস্ট বা প্রজনন ব্যয় খুব কম। তাই পুরুষ প্রকৃতিগতভাবেই ‘ভিজ্যুয়াল’ বা দৃষ্টি-নির্ভর। একটা সুন্দর, প্রতিসম (symmetrical) শরীর, চওড়া নিতম্ব, ভরাট বক্ষদেশ— এগুলো দেখলে পুরুষের মস্তিষ্ক সিগন্যাল দেয় যে, এই নারী সুস্থ এবং সন্তান ধারণে সক্ষম। তাই পুরুষ খুব সহজেই শারীরিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়।

অন্যদিকে, একজন নারীর প্রজনন ব্যয় অনেক বেশি। তাকে দীর্ঘ নয় মাস গর্ভধারণ করতে হয়, জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়। তাই নারী শুধু শরীর দেখে আকৃষ্ট হয় না। সে খোঁজে নিরাপত্তা, ক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা এবং কমিটমেন্ট। সে চায় এমন একজন পুরুষ, যে তাকে এবং তার সন্তানকে প্রটেকশন দিতে পারবে। এ কারণেই হয়তো পুরুষরা পর্নোগ্রাফি বা ভিজ্যুয়াল জিনিসের প্রতি বেশি আসক্ত হয়, আর নারীরা আকৃষ্ট হয় ইমোশনাল কানেকশন বা রোমান্টিক উপন্যাসের প্রতি।

প্রাচীনকালে যৌনতা ছিল নেহাতই একটা বায়োলজিক্যাল প্রয়োজন। টিকে থাকার লড়াই। কিন্তু আধুনিক মানুষ এই বায়োলজিক্যাল প্রয়োজনটাকে একটা বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত করেছে। যৌনতা এখন শুধু আর প্রজননের উপায় নেই, এটা এখন ক্ষমতা, বিনোদন আর পণ্যের প্রতীক।

এই যে আমি আনিকা নাওহারের কথা ভাবছি, এটা কেন হচ্ছে? আমার হঠাৎ করে একটা অদ্ভুত থিওরির কথা মনে পড়ল। এডওয়ার্ড ওয়েস্টারমার্কের ‘ওয়েস্টারমার্ক ইফেক্ট’। মানুষ কেন নিজের মা, বোন বা পরিবারের কাছের মানুষদের নিয়ে কখনো যৌনভাবে ভাবে না? অথচ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা মেয়েকে নিয়ে খুব সহজেই ফ্যান্টাসাইজ করতে পারে! কেন?

সমাজবিজ্ঞানীরা হয়তো বলবেন, এটা সমাজের নিয়ম বা নৈতিকতার কারণে। কিন্তু বিবর্তনবাদীরা বলেন অন্য কথা। প্রকৃতি খুব স্মার্ট। রক্তের সম্পর্কের কারও সাথে প্রজনন হলে জেনেটিক মিউটেশন বা বিকলাঙ্গ সন্তান হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই প্রকৃতি মানুষের মস্তিষ্কে একটা বিল্ট-ইন সফটওয়্যার দিয়ে দিয়েছে। জন্মের পর থেকে জীবনের প্রথম কয়েক বছর আমরা যাদের সাথে একসাথে বড় হই, যাদেরকে প্রতিদিন দেখি— আমাদের মস্তিষ্ক তাদেরকে ‘ডু নট টাচ’ বা ‘ফ্যামিলি’ নামক ফোল্ডারে সেভ করে ফেলে। এদের প্রতি আমাদের কোনো সেক্সুয়াল রেসপন্স তৈরি হয় না। একেই বলে ওয়েস্টারমার্ক ইফেক্ট।

কিন্তু যখনই আমরা ফ্যামিলির বাইরে নতুন কোনো মুখ দেখি, নতুন কোনো জিন দেখি— মস্তিষ্ক তখন হিসেব কষতে শুরু করে। আর সেই নতুন মুখটার যদি একটা পারফেক্ট ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতি থাকে, যদি তার শরীরে একটা দামি পারফিউমের গন্ধ থাকে, আর তার চোখে যদি একটা পরিণত বুদ্ধিমত্তার ছাপ থাকে— তখন মস্তিষ্ক অ্যালার্ম বাজিয়ে ওঠে— “মেট! মেট! মেট!”

আমি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে নিজের ঘরে ফিরে এলাম। আমার মস্তিষ্ক গত রাতে আনিকা নাওহারকে দেখে ঠিক এই অ্যালার্মটাই বাজিয়েছে। মেসের সকালবেলাটা আজ বেশ শান্ত। রাজু আজ বারান্দায় নেই। সে হয়তো কাল রাত জেগে বিসিএস পড়েছে , এখন ঘুমাচ্ছে। আমি ডাইনিংয়ে গিয়ে দেখলাম তুহিন বসে বসে রুটি আর ডিম ভাজি খাচ্ছে।"গুড মর্নিং ব্রাদার রাশেদ!" তুহিন ডিমের কুসুম দিয়ে রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল।

"মর্নিং। আইইএলটিএস-এর কী অবস্থা?"

তুহিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "ভাই, স্পিকিং নিয়ে প্যারা নাই। আই ক্যান স্পিক লাইক এ নেটিভ। বাট রিডিংয়ে গিয়ে আটকে যাচ্ছি। এত কঠিন কঠিন প্যাসেজ দেয়! কালকে একটা প্যাসেজ পড়লাম ডাইনোসরের বিলুপ্তি নিয়ে। আচ্ছা ভাই, ডাইনোসররা যে মরে গেল, এটা নিয়ে আমাদের এত টেনশন করার কী আছে? আমরা কি ওদের আত্মীয় লাগি?"

আমি চেয়ার টেনে বসে রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললাম, " আত্মীয় লাগি না ঠিকই, তবে আমরা ডাইনোসরদের রিপ্লেসমেন্ট। ওরা বিলুপ্ত না হলে আমরা আসতাম না। আমাদের অস্তিত্বের সাথে ওদের বিলুপ্তি যুক্ত।" তুহিন চোখ পিটপিট করে বলল, "আপনার কথাবার্তা মাঝে মাঝে আমি বুঝি না ভাই। খুব ফিলোসফিক্যাল।" আমি হাসলাম। আমার নিজের ফিলোসফি নিয়েই আমি আজ বিপদে আছি, তুহিন আর কী বুঝবে!

সকাল নয়টা চল্লিশে আমি কারওয়ান বাজারের বাসে ঝুলছি।

বিকল্প বাস আজ অতিরিক্ত ভিড়। আমার সামনে একটা কলেজপড়ুয়া ছেলে তার বিশাল ভারী ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে এক বয়স্ক লোক, যিনি বাসের প্রতিটা ঝাঁকুনিতে আল্লাহ-রসুলের নাম জপছেন। এই বাসের ভেতরের মানুষগুলোকে দেখলে মনে হয় না যে এদের জীবনে যৌনতা, রোমান্স বা প্রেম বলে কিছু আছে। অথচ এরা প্রত্যেকেই সেই আদিম প্রক্রিয়ার ফসল।

অফিসে পৌঁছালাম দশটা দশে।

এহসান ভাই আজ একটু উত্তেজিত। তার কপালে ভাঁজ। আমাকে দেখেই বললেন, "রাশেদ, আজকে কিন্তু প্রচুর প্রেসার। ইউক্রেন-রাশিয়া বর্ডারে আবার উত্তেজনা শুরু হয়েছে। আমি তোমাকে কয়েকটা নিউজ অ্যাসাইন করেছি, একদম ঝটপট নামিয়ে ফেলবে।" আমি ডেস্কে গিয়ে বসলাম। মামুনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে একটা ফরাসি নিউজ পোর্টালের খবর অনুবাদ করছে। "কী খবর মামুন?" আমি ল্যাপটপ অন করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম। মামুন খুব উৎসাহ নিয়ে বলল, "ভাই, ফাটাফাটি নিউজ। ফ্রান্সের এক মন্ত্রীর সাথে এক মডেলের পরকীয়া ফাঁস হয়ে গেছে। আমি হেডলাইন দিচ্ছি— ‘ফরাসি নেতার পরকীয়ায় ফ্রান্স জুড়ে ছি ছি রব, মডেলের সাথে গোপন অভিসার’।" আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "মামুন, এটা ফ্রান্স, বাংলাদেশ না। ফ্রান্সে পরকীয়া নিয়ে কেউ ছি ছি করে না। ওদেশে এটা খুব ডালভাত ব্যাপার। তুমি হেডলাইন দাও— ‘ফ্রান্সের রাজনীতিতে নতুন স্ক্যান্ডাল: মডেলের সাথে মন্ত্রীর সম্পর্ক ফাঁস’।" মামুন একটু হতাশ হলো। "ভাই, আপনার নিউজগুলো এত শুকনা কেন? একটু মসলা না দিলে কি নিউজ পড়ে মজা আছে?"

"আমাদের কাজ খবর দেওয়া, চটপটি বানানো না মামুন।"

আমি আমার কাজে মন দিলাম। ইউক্রেন-রাশিয়ার বর্ডারের খবর। ট্যাঙ্ক, মিসাইল, কূটনীতি, মৃত্যু। কিন্তু আমার মাথার ভেতর তখনো একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্যপটের রেশ রয়ে গেছে। আনিকা নাওহারের সেই বৃষ্টিভেজা, নগ্ন শরীরটা আমার নিউরনের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি যখন ল্যাপটপে টাইপ করছি— "রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এক কঠোর বার্তায় জানিয়েছেন...", তখন আমার চোখের সামনে ভাসছে আনিকা নাওহারের সেই নিটোল নাভির গভীরতা।

আমি কয়েকবার চোখ বন্ধ করে মাথা ঝাঁকালাম। এ কেমন পাগলামি শুরু হয়েছে আমার! আমি একজন ম্যাচিউর মানুষ। আমি জানি এই ফ্যান্টাসির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তবুও আমার মন বারবার ওই কল্পনার জগতেই ছুটে যাচ্ছে। সারাদিন অফিসে কাজের প্রচুর চাপ ছিল। ফারহানা আপা আজ বাসা থেকে চিকেন বিরিয়ানি এনেছিলেন। আমাকে ডেকে খাওয়ালেন। নিতি এসে দুইবার আমার ডেস্ক থেকে স্ট্যাপলার নিয়ে গেছে আর বলেছে, "রাশেদ ভাই, আপনি আজ এত চুপচাপ কেন? প্রেমে-টেমে পড়লেন নাকি?"

আমি মুচকি হেসে বলেছি, "অনুবাদকদের প্রেমে পড়ার কোনো নিয়ম নেই নিতি। আমরা শুধু অন্যের প্রেমের খবর অনুবাদ করি।" অফিস শেষ করে মেসে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে গেল।
আজ মেসে রহিমা খালা খুব সাধারণ রান্না করেছেন। আলু ঘাটি আর ডিমের তরকারি। আমি চুপচাপ খেয়ে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম।

আমার রুমের ভেতরে এক ধরনের গুমোট নীরবতা। সিলিং ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ঘুরছে। বাইরে রাস্তার গাড়িঘোড়ার আওয়াজ অনেক কমে এসেছে। আমি আমার ছোট বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিলাম। ঘরের আলো নেভানো, শুধু রাস্তার সোডিয়াম বাতির হলুদ আলো জানালার গ্রিল গলে আমার বিছানার ওপর একটা জেলখানার মতো ছায়া তৈরি করেছে। আমি প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম।

স্ক্রিন আনলক করতেই হোয়াটসঅ্যাপের আইকনটা চোখে পড়ল। আমার আঙুলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে হোয়াটসঅ্যাপে চলে গেল। কন্টাক্ট লিস্টে গিয়ে সার্চ করলাম— 'Anika Nawhar'। উনার কোনো মেসেজ আসেনি। আমার পাঠানোর কথাও না। আমি গতকাল রাতে উনার উপন্যাসের ভাষা নিয়ে যে ফিডব্যাক দিয়েছিলাম, উনি শুধু একটা থাম্বস আপ দিয়েছিলেন। আমি উনার নামের ওপর ট্যাপ করে চ্যাটবক্সটা ওপেন করলাম। তারপর উনার প্রোফাইল পিকচারটার (DP) ওপর ক্লিক করলাম। ছবিটা বড় হয়ে আমার পুরো স্ক্রিন জুড়ে ভেসে উঠল।

ছবিটা ইংল্যান্ডে তোলা। ব্যাকগ্রাউন্ডে লন্ডনের টেমস নদী আর বিশাল একটা নাগরদোলা— লন্ডন আই। শীতের দেশ বলে আনিকা নাওহার বেশ জম্পেশ শীতের কাপড় পরে আছেন। উনার গায়ে একটা গাঢ় নীল রঙের ভারী ট্রেঞ্চ কোট। গলায় একটা লাল রঙের মাফলার খুব সুন্দর করে পেঁচানো। মাথার চুলগুলো খোলা, বাতাসে একটু উড়ছে। দুই হাত ওভারকোটের পকেটে ঢোকানো। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে উনি খুব স্বাভাবিক, স্নিগ্ধ একটা হাসি দিয়েছেন।

ছবিতে উনার শরীরের এক ইঞ্চি চামড়াও দৃশ্যমান নয়, শুধু মুখমণ্ডল ছাড়া। একদমই রিভিলিং বা আবেদনময় কোনো ছবি নয়। সম্পূর্ণ শালীন, পরিশীলিত এবং একজন বুদ্ধিমতী লেখকের যেমন ছবি হওয়া উচিত, ঠিক তেমনই। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক বড়ই অদ্ভুত। সে যা দেখতে পায় না, তা কল্পনা করে নিতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে।

আমি অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে উনার ওই শীতের পোশাকে ঢাকা ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। আর হঠাৎ করেই আমার শরীরের ভেতর একটা প্রচণ্ড উত্তাপ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। আমার শ্বাসের গতি ভারী হয়ে এল। আমার কল্পনার ক্যানভাসে ছবিটা পাল্টাতে শুরু করল। আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার মাথার ভেতর তখন আর লন্ডনের টেমস নদী নেই। আমার কল্পনায় আনিকা নাওহার এখন আমার এই ছোট্ট, অন্ধকার রুমের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন।

আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, উনি খুব ধীর লয়ে উনার গলার ওই লাল মাফলারটা খুলে ফেললেন। উনার চোখের সেই শান্ত, বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিটা এখন আর নেই; সেখানে এখন এক ধরনের বন্য, ক্ষুধার্ত এবং আদিম তৃষ্ণা। আমি বিছানা থেকে উঠে উনার সামনে দাঁড়ালাম। উনার শরীর থেকে সেই চেনা শ্যানেল পারফিউমের গন্ধটা আমার নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিচ্ছে। আমি কল্পনায় উনার গাঢ় নীল ট্রেঞ্চ কোটের বোতামগুলো একটা একটা করে খুলতে শুরু করলাম। উনার ভারী ওভারকোটটা খসে মেঝেতে পড়ে গেল। আমার শরীরের ভেতরের উত্তাপটা এখন একটা আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছে। আমি আমার ট্রাউজারের ভেতর হাত দিলাম। আমার পুরুষাঙ্গ তখন চরম উত্তেজনায় কঠিন হয়ে আছে। আমার হাতের মুঠোয় আমি নিজের সেই স্পন্দনশীল আদিমতাকে অনুভব করলাম।

কল্পনার জগতে আনিকা নাওহারের আবরণগুলো একে একে খসে পড়ছে। আমি উনাকে জড়িয়ে ধরলাম। উনার সেই ফর্সা, নিখুঁত কাঁধের ওপর আমার ঠোঁট রাখলাম। আমি স্পষ্ট অনুভব করছি উনার গায়ের উত্তাপ। উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর জ্যামিতিক শরীরটা এখন আমার দুই হাতের মুঠোয়। আমি উনার ভরাট বক্ষদেশের ওপর আমার মুখ গুঁজে দিলাম। উনার গায়ের পারফিউমের সুবাসের সাথে এখন মিশে গেছে এক ধরনের নোনতা ঘামের গন্ধ— যেটা সম্পূর্ণ আদিম এবং পাশবিক। আমার হাতের গতি বাড়তে লাগল। আমি বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি, কিন্তু কল্পনায় আমি আনিকাকে আমার বিছানায় টেনে নিয়েছি। উনার দুই পায়ের মাঝখানে আমি আমার শরীরটাকে স্থাপন করেছি। উনার সেই সুডৌল, মসৃণ ঊরু দুটো আমার কোমর জড়িয়ে আছে।

"রাশেদ..." কল্পনার আনিকা ফিসফিস করে আমার নাম ধরল। উনার সেই প্রমিত বাংলার মোহনীয় কণ্ঠস্বর এখন কামনার আধিক্যে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। উনার নখগুলো আমার পিঠে বসে যাচ্ছে।
আমি উনার শরীরের গভীরে প্রবেশ করলাম। আমার কল্পনায় কোনো রোমান্স নেই, কোনো সাহিত্য নেই। সেখানে শুধু আছে ঘাম, ঘর্ষণ আর মাংসের আদিম উল্লাস। আমি উনার ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরলাম। উনার ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস আমার কানের কাছে একটা ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ছে। আমি উনার কোমরের বাঁকটাকে দুই হাতে শক্ত করে ধরে আরও তীব্রভাবে, আরও বন্যভাবে উনার ভেতরে নিজেকে সঞ্চালিত করতে লাগলাম।

উনার শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। উনার গলা দিয়ে একটা অস্ফুট, চাপা গোঙানির শব্দ বের হচ্ছে। আমার হাতের মুঠি আরও দ্রুত হলো। আমার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু , প্রতিটি শিরা টানটান হয়ে গেছে। আমার শ্বাস আটকে আসছে। কল্পনায় আনিকার শরীরটা আমার নিচে প্রবল তৃষ্ণায় কাঁপছে। উনার সেই আভিজাত্য, উনার সেই লেখিকা সত্তা— সব কিছু গলে গিয়ে এখন শুধু একটা তৃষ্ণার্ত নারীদেহ আমার সামনে উন্মুক্ত।"আনিকা..." আমি বাস্তবেও একটা চাপা গোঙানি দিয়ে উঠলাম।

আমার শরীরের ভেতর থেকে একটা তীব্র বৈদ্যুতিক শক যেন মেরুদণ্ড বেয়ে ওপরে উঠে এল। এবং ঠিক পরমুহূর্তেই এক প্রচণ্ড, বন্য স্খলনের মাধ্যমে আমার শরীরের সমস্ত জমানো উত্তেজনা, সমস্ত তৃষ্ণা ছিটকে বেরিয়ে এল। আমি হাঁপাতে লাগলাম। আমার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। হাতের তালুতে সেই আঠালো, উষ্ণ তরলের স্পর্শ।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার মাথাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে রইল। কোনো চিন্তা নেই, কোনো দর্শন নেই, কোনো ইউক্রেন-রাশিয়ার বর্ডার নেই। শুধু এক ধরনের অদ্ভূত, শূন্য প্রশান্তি। কিন্তু এই প্রশান্তির আয়ু খুব কম। আস্তে আস্তে আমার শ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল। আমি চোখ খুললাম। রাস্তার হলুদ আলোটা এখনো আমার বিছানায় পড়ে আছে। সিলিং ফ্যানটা আগের মতোই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করছে। আমার এক হাতে মোবাইলটা ধরা, স্ক্রিনে তখনো আনিকা নাওহারের সেই ওভারকোট পরা শালীন ছবিটা জ্বলজ্বল করছে।

হঠাৎ করে আমার ভেতরে এক ধরনের তীব্র অপরাধবোধ এবং একাকিত্ব ভর করল। পোস্ট-কয়টাল ট্রিস্টেস (Post-coital tristesse)— যৌন স্খলনের পর মানুষের মনে যে হঠাৎ করে একটা তীব্র বিষণ্ণতা নেমে আসে, এটা বিজ্ঞানেরই একটা প্রমাণিত বিষয়। কিন্তু আমার এই বিষণ্ণতাটা বিজ্ঞানের চেয়েও অনেক বেশি বাস্তব। আমি বাথরুমে গেলাম। নিজেকে পরিষ্কার করে বেসিনের আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম।

আমি এইমাত্র একজন বুদ্ধিমতী, অভিজাত এবং আমার চেয়ে যোজন যোজন দূরের এক বিবাহিতা নারীর সম্পূর্ণ শালীন একটা ছবি দেখে মাস্টারবেট করেছি। আমার নিজেকে খুব ক্ষুদ্র, খুব নোংরা এবং খুব একা মনে হলো।

মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য কী? নারী?

যদি তা-ই হয়, তবে সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আমি যে পথটা বেছে নিয়েছি, সেটা আমার নিজের কাছেই খুব করুণ মনে হচ্ছে। আমি জানি, আনিকা নাওহারের সাথে বাস্তবে আমার কোনোদিন এরকম কিছু হবে না। আমি কেবল অন্ধকারে শুয়ে কল্পনার ফানুস উড়াতে পারি।

আমি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে রুমে ফিরে এলাম। মোবাইলটা চার্জে লাগিয়ে আমি আবার বিছানায় শুয়ে পড়লাম। বাইরে ঢাকা শহরটা ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কাল সকালে আবার আমাকে উঠতে হবে, আবার সেই বিকল্প বাসে ঝুলতে হবে, আবার সেই অন্যের খবর অনুবাদ করতে হবে। আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার হাতের তালুতে তখনো আনিকা নাওহারের কল্পিত উষ্ণতা লেগে আছে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এই শহরে আমার মতো বিরক্তিকর মানুষের বেঁচে থাকার জন্য হয়তো মাঝে মাঝে এরকম কিছু আদিম, নোংরা এবং গোপন কল্পনার প্রয়োজন হয়। নাহলে এই একঘেয়ে রুটিনের চাপে আমি হয়তো কবেই পাগল হয়ে যেতাম।
[+] 9 users Like Orbachin's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস? - by Orbachin - 16-06-2026, 01:49 AM



Users browsing this thread: 2 Guest(s)