Yesterday, 12:01 AM
অষ্টম অধ্যায়: রক্তের প্রথম দাগ
গুলশানের পেন্টহাউসের আধুনিক, মডুলার রান্নাঘরটা দেখতে কোনো বিদেশি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের মতো। চারপাশটা চকচকে ক্রোমিয়াম, দামি ওভারহেড চিমনি আর অটোমেটিক ওভেনের নিরেট আভিজাত্যে মোড়ানো। সেখানে দাঁড়িয়ে ফাতেমার জন্য এক গ্লাস জল ঢালতে গিয়ে জোয়া হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। কাঁচের ওয়াটার পিউরিফায়ার থেকে জল পড়ার একটানা ঝিরঝির শব্দের সমান্তরালে তার তলপেটের ভেতর এক চেনা, তীব্র এবং ধারালো মোচড় দিয়ে উঠল।
মোচড়টা এক সেকেন্ডের জন্য জোয়ার মেরুদণ্ড সোজা করে দিল। সে কাউন্টার টপটা এক হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। আজ তার পিরিয়ডের বা ঋতুস্রাবের প্রথম দিন। প্রতি মাসের এই বিশেষ দিনটায় তার মনে হয়, তার জরায়ুর দেওয়ালে কে যেন এক জোড়া অদৃশ্য নোখ দিয়ে অবিরাম আঁচড়ে চলেছে। একটা চটচটে, উষ্ণ তরল স্রোত তার উরু বেয়ে নেমে যাওয়ার অনুভূতি হতেই জোয়া এক গভীর অবসাদে চোখ বুজল। এই চেনা শারীরিক যন্ত্রণাটা তাকে এক মুহূর্তে টেনে নিয়ে গেল আজ থেকে ঠিক বিশ বছর আগের এক তপ্ত, ধুলোবালি মাখা দুপুরে, যখন সে বারো বছরের এক অবুঝ, নিষ্পাপ বালিকা।
পেন্টহাউসের সুদৃশ্য ইতালিয়ান বাথরুমে ঢুকে দরজাটা লক করল জোয়া। ড্রয়ার খুলে সে একটা আমদানিকৃত, সুগন্ধি আর সিল্কের মোড়কে ঢাকা দামি স্যানিটারি প্যাড বের করল। প্যাডটার আঠার কাগজটা আলতো করে টেনে প্যান্টের সাথে আটকাতে আটকাতে জোয়া আয়নায় নিজের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, এই দামি সুগন্ধি আর সিল্কের মোড়ক আসলে একটা মস্ত বড় প্রতারণা। এটা আসলে নারীর ভেতরের রক্তক্ষরণ আর যন্ত্রণাকে সমাজের চোখে অদৃশ্য করে রাখার এক আধুনিক খোলস মাত্র।
স্মৃতির পাতাগুলো মড়মড় করে খুলে গেল জোয়ার মগজে। বিশ বছর আগে, সে তখন ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। ফ্রক আর স্কার্ট পরার সেই দিনগুলো। সেদিন কলেজের টিফিন পিরিয়ডে বেঞ্চ থেকে ওঠার সময় সে খেয়াল করেনি তার নীল সুতির স্কার্টের পেছনে একটা বড়, গাঢ় লাল রঙের রক্তের দাগ লেগে গেছে। সে যখন ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, পেছনের বেঞ্চের কয়েকজন সহপাঠী ছেলে আর মেয়ে একসাথে খিলখিল করে হেসে উঠেছিল।
"ওই দেখ, জোয়ার স্কার্টে ভূত লেগেছে! রক্ত!" একটা ছেলে আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠেছিল।
বারো বছরের জোয়া তখনো জানত না পিরিয়ড কী, রক্তক্ষরণ কী। সে ভেবেছিল তার শরীরে কোনো মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে, সে হয়তো আর বাঁচবে না। ভয়ে, চরম অপমানে আর এক অজানা আশঙ্কায় সে ক্লাসরুমের মেঝেতে দাঁড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ফেলেছিল। সহপাঠীদের সেই ক্রূর, লোলুপ আর বিদ্রূপাত্মক হাসিগুলো তার কচি মনে এক আজন্মের ট্রমা তৈরি করে দিয়েছিল।
ছুটি হওয়ার পর সে কোনোমতে ব্যাগটা পেছনের দিকে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছিল। সে ভেবেছিল মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলবে, ‘কোনো ভয় নেই মা’। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মা তার রক্তাক্ত স্কার্টটা দেখেই কপালে হাত দিয়ে ঘরের দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন। জোয়াকে জড়িয়ে ধরা তো দূরের কথা, তাকে ঘরের একটা অন্ধকার কোণায় ঠেলে বসিয়ে দিয়ে মা চারপাশ তাকিয়ে ফিসফিস করে ক্রুদ্ধ গলায় বলেছিলেন,
"চুপ কর! একদম কান্দিস না! গলার আওয়াজ নিচে নামা। বাইরে তোর বাবা আর ভাইয়া বসে আছে, তারা যেন এক বিন্দুও জানতে না পারে। আজ থেকে তুই বড় হয়েছিস জোয়া। তোর শরীরে নজর লাগবে। এখন থেকে ছেলেদের থেকে চার হাত দূরে থাকবি। নিজের এই নোংরা জামাকাপড় ধুয়ে লুকিয়ে রাখ।"
মা সেদিন তাকে সান্ত্বনা দেননি, বরং তার মনে এই বিশ্বাসটা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে—তার এই নারী শরীরটা আসলে একটা পাপের বস্তু, একটা লজ্জার আধার, যাকে সবসময় পৃথিবীর চোখ থেকে লুকিয়ে রাখতে হয়।
আজ এত বছর পর, বিবাহিত জীবনে এসেও জোয়া টের পায় সেই বারো বছর বয়সের ভয়, একাকীত্ব আর শরীরের প্রতি ঘৃণাটা আজও শেষ হয়নি। আসিফ চৌধুরী একজন উচ্চশিক্ষিত, আধুনিক পুরুষ। সে নারীর অধিকার নিয়ে বড় বড় সেমিনারে স্পন্সর করে। কিন্তু এই শোবার ঘরের চার দেওয়ালে এলে আসিফের সেই আধুনিকতার মুখোশটা এক সেকেন্ডে খসে পড়ে।
জোয়ার স্পষ্ট মনে আছে, গত মাসেও যখন তার পিরিয়ডের দ্বিতীয় দিন চলছিল, তখন সে তীব্র শারীরিক যন্ত্রণায় আর মানসিক অবসাদে বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল। তলপেটের ব্যথায় তার কপাল দিয়ে ঘাম ঝরছিল। আসিফ মাঝরাতে মদ্যপ অবস্থায় ঘরে ঢুকে জোয়ার সেই যন্ত্রণাকাতর শরীরটার ওপরেই নিজের অধিকার ফলাতে এসেছিল।
জোয়া যখন আসিফের হাতটা সরিয়ে দিয়ে ক্লান্ত গলায় বলেছিল, "আসিফ, প্লিজ আজ নয়। আমার খুব পিরিয়ডের ব্যথা হচ্ছে। শরীরটা একদম চলছে না।"
আসিফ তখন তার চেনা, শীতল এবং বিষাক্ত হাসিটা হেসে জোয়ার চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরে বলেছিল,
"আই ডোন্ট কেয়ার জোয়া। পিরিয়ডের ব্যথা সব মেয়েরই হয়। ওটা কোনো প্যারালাইসিস নয়। আমি বাইরে সারাদিন খাটাখাটনি করে এসে যদি ঘরে শান্তি না পাই, তবে আমার এই কোটি টাকার পেন্টহাউস আর তোমাকে এত দামি শাড়ি কিনে দেওয়ার মানে কী? ইউ আর মাই ওয়াইফ, জোয়া। তোমার শরীরটা সবসময় আমার ক্ষুধা মেটানোর জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।"
আসিফ সেদিন জোয়ার কোনো আপত্তি শোনেনি। তার সেই তীব্র তলপেটের ব্যথার ওপরই আসিফ নিজের পাশবিক কামনার চাবুক চালিয়েছিল। জোয়া বিছানার চাদরটা খামচে ধরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলেছিল। তার মনে হয়েছিল, এই সমাজ যাকে ‘বিয়ে’ বলে একটা পবিত্র তকমা দেয়, তা আসলে একজন পুরুষের জন্য নারীর শরীরকে বৈধভাবে ব্যবহারের এক লাইসেন্স মাত্র। সেখানে নারীর সম্মতি, তার শারীরিক অসুস্থতা বা যন্ত্রণার কোনো মূল্য নেই। আসিফের কাছে জোয়ার শরীরটা একটা দামি অলঙ্কার, যা সে যখন খুশি যেভাবে খুশি ব্যবহার করতে পারে।
বাথরুম থেকে বের হয়ে জোয়া আবার রান্নাঘরে ফিরে এলো। ফাতেমা তখন রান্নাঘরের এক কোণে মেঝেতে বসে বঁটি দিয়ে তরকারি কাটছিল। জোয়া ফাতেমার সামনে গিয়ে জলের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিল।
ফাতেমা জলের গ্লাসটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই সে থমকে গেল। সে জোয়ার মুখের দিকে তাকাল। জোয়ার ফর্সা মুখটা তখন ব্যথায় কেমন যেন হলদেটে মেরে গেছে, চোখের নিচে ক্লান্তির গাঢ় ছায়া, আর সে নিজের অজান্তেই এক হাত দিয়ে তলপেটটা চেপে ধরে আছে। ফাতেমা একজন চরের মেয়ে হতে পারে, কিন্তু নারীর শরীরের এই চেনা ক্লান্তি আর যন্ত্রণার রঙ চিনতে তার এক মুহূর্তও লাগল না।
ফাতেমা বঁটিটা একপাশে সরিয়ে রেখে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াল। সে সোজা জোয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম, এক গভীর মাতৃত্বের সুরে বলল, "বুজান, আফনেরও কি আজ পেটে কামড় দিতাছে? শরীলডা ভালো ঠেকতাছে না?"
জোয়া প্রথমে একটু চমকে গেল। সে আশা করেনি ফাতেমা এত সহজে তার ভেতরের কষ্টটা ধরে ফেলবে। সে আস্তে করে মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ ফাতেমা। আজ প্রথম দিন। বড্ড ব্যথা করছে।"
ফাতেমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর সে নিজের শাড়ির আঁচলের খুঁট থেকে একটা পুরনো, মলিন কিন্তু পরিষ্কার সুতি কাপড়ের টুকরো বের করল। সে কাপড়ের টুকরোটার দিকে তাকিয়ে এক ম্লান হাসি হেসে বলল, "বুজান, আমাগো কপালডা এক্কেরে এক। আমারও আজ দুই দিন চলে। এই চরের বাতাসে আর মেঘনার নোনা জলে আমাগো জরায়ুডাও বুঝি শুকাইয়া পাথর হয়া গেছে।"
জোয়া ফাতেমার হাতের সেই পুরনো কাপড়ের টুকরোটার দিকে তাকাল। তার মনে পড়ে গেল, ফাতেমারা তো চরের প্রান্তিক মানুষ। তাদের জীবনে এই সিল্কের দামি প্যাড, সুগন্ধি বা আধুনিক বাথরুম এক অলীক কল্পনা।
ফাতেমা মেঝেতে আবার বসতে বসতে বলতে লাগল, "বুজান, আফনেরা তো বড় লোক। দালানকোঠায় থাহেন। দামি জিনিস পরেন। আমাগো চরের জীবনে এইগুলা নাই। আমরা গরিব মেয়েছেলে। এই পিরিয়ডের দিনগুলায় পুরনো শাড়ির নোংরা ন্যাকড়া ব্যবহার করা লাগব। হেই ন্যাকড়া আবার ধুইয়া রোদ্রে দেওন যাইব না। চরের পুরুষমানুষদের নজর যদি হেই কাপড়ে পড়ে, তবে নাকি মহাপাপ হইব! সমাজ কইব মেয়েছেলেদের এইগুলা অলক্ষুণে কথা, গোপন জিনিস লোকসমক্ষে আনন যাইব না। তাই আমরা ঘরের অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে কোণায় বা গোয়ালঘরের পেছনে হেই ভেজা ন্যাকড়া লুকাইয়া শুকাইতাম। অসুখ-বিসুখ হয়া চরের কত মেয়েছেলে যে মরল, তার কোনো হিসাব নাই বুজান। কিন্তু সমাজ খালি একটা কথাই জানে—মেয়েছেলের শরীর মানেই লজ্জা, তারে লুকায়া রাখো।"
ফাতেমার কথাগুলো রান্নাঘরের বাতাসে এক অদ্ভুত ভারী পরিবেশ তৈরি করল। জোয়া ফাতেমার পাশে মেঝেতেই বসে পড়ল। তার পরনের দামি নাইট গাউনটা রান্নাঘরের মেঝেতে লেপ্টে গেল, কিন্তু আজ তার কোনো পরোয়া নেই। সে ফাতেমার সেই খসখসে হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
দুজনের সামাজিক অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। একজন গুলশানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালকিন, যে পৃথিবীর সমস্ত আধুনিক সুবিধা পায়; আর অন্যজন বরিশালের এক প্রত্যন্ত চরের নিঃস্ব, পলাতক নারী, যে স্যানিটারি প্যাডের নামও হয়তো কোনোদিন শোনেনি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, প্রকৃতির দেওয়া এই রক্তক্ষরণ, তলপেটের এই আদিম কামড় আর তার ওপর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া সেই আজন্মের ‘লজ্জা’ আর ‘নিষেধের’ শৃঙ্খল—এক মুহূর্তের মধ্যে তাদের দুজনকে এক সমান্তরাল রেখায় এনে দাঁড় করাল।
জোয়া ফাতেমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "জানিস ফাতেমা, আমাদের সমাজটা অদ্ভুত। তারা আমাদের শরীর থেকে জন্ম নেয়, কিন্তু আমাদের এই স্বাভাবিক রক্তক্ষরণটাকেই সবচেয়ে বড় অপবিত্র আর নোংরা জিনিস মনে করে। এরা আমাদের দেবী বলে পূজা করতে পারে, কিন্তু পিরিয়ডের দিনে রান্নাঘরে ঢুকতে দিতে বা ছুঁতে দ্বিধা করে।"
ফাতেমা মাথা নাড়ল। তার চোখে তখন এক চিলতে বুনো আগুন। সে বলল, "হ বুজান। মন্টু মাঝি তো এই দিনগুলায় আমারে আরো বেশি কইরা পিটাইত। বলত, মেয়েছেলেদের এই সময় নাকি শরীর অপবিত্র থাকে, তাই কথা শুনলে ঘরের অমঙ্গল হইব। পুরুষমানুষেরা আমাগো রক্ত শোষণ কইরা বাঁইচা থাকে বুজান, অথচ আমাগো এই রক্তের দাগটারে ঘেন্না করে।"
দুই নারী নীরবে রান্নাঘরের মেঝেতে বসে রইল। বাইরে তখন দুপুরের চড়া রোদ গুলশানের কাঁচের দেওয়ালে এসে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু এই রান্নাঘরের ভেতরে, মেঝের ওপর বসে থাকা সিল্ক আর সুতির দুই প্রতিনিধি আজ তাদের জরায়ুর ব্যথা আর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া লজ্জার স্মৃতিগুলো একে অপরের সাথে ভাগ করে নিল। কোনো কান্নাকাটি নেই, কোনো উচ্চস্বরে হাহাকার নেই; শুধু এক গভীর, আদিম এবং নিঃশব্দ মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন।
তারা বুঝতে পারল, এই রক্ত কোনো লজ্জার বিষয় নয়; এই রক্ত হলো তাদের নারীত্বের, তাদের লড়াকু সত্ত্বার প্রথম বারুদ। এই সমাজ তাদের যত বেশি অন্ধকার কোণায় লুকিয়ে রাখতে চাইবে, তাদের ভেতরের সেই অবদমিত বুনো নদীটা তত বেশি শক্তি নিয়ে একদিন এই পুরুষতান্ত্রিকতার দেওয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে। রক্তের এই প্রথম দাগ আজ তাদের ভেতরের বাঘিনীকে আরও একবার মনে করিয়ে দিল—তারা আর কোনোদিন মাথা নিচু করে এই শৃঙ্খল মেনে নেবে না।
গুলশানের পেন্টহাউসের আধুনিক, মডুলার রান্নাঘরটা দেখতে কোনো বিদেশি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের মতো। চারপাশটা চকচকে ক্রোমিয়াম, দামি ওভারহেড চিমনি আর অটোমেটিক ওভেনের নিরেট আভিজাত্যে মোড়ানো। সেখানে দাঁড়িয়ে ফাতেমার জন্য এক গ্লাস জল ঢালতে গিয়ে জোয়া হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। কাঁচের ওয়াটার পিউরিফায়ার থেকে জল পড়ার একটানা ঝিরঝির শব্দের সমান্তরালে তার তলপেটের ভেতর এক চেনা, তীব্র এবং ধারালো মোচড় দিয়ে উঠল।
মোচড়টা এক সেকেন্ডের জন্য জোয়ার মেরুদণ্ড সোজা করে দিল। সে কাউন্টার টপটা এক হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। আজ তার পিরিয়ডের বা ঋতুস্রাবের প্রথম দিন। প্রতি মাসের এই বিশেষ দিনটায় তার মনে হয়, তার জরায়ুর দেওয়ালে কে যেন এক জোড়া অদৃশ্য নোখ দিয়ে অবিরাম আঁচড়ে চলেছে। একটা চটচটে, উষ্ণ তরল স্রোত তার উরু বেয়ে নেমে যাওয়ার অনুভূতি হতেই জোয়া এক গভীর অবসাদে চোখ বুজল। এই চেনা শারীরিক যন্ত্রণাটা তাকে এক মুহূর্তে টেনে নিয়ে গেল আজ থেকে ঠিক বিশ বছর আগের এক তপ্ত, ধুলোবালি মাখা দুপুরে, যখন সে বারো বছরের এক অবুঝ, নিষ্পাপ বালিকা।
পেন্টহাউসের সুদৃশ্য ইতালিয়ান বাথরুমে ঢুকে দরজাটা লক করল জোয়া। ড্রয়ার খুলে সে একটা আমদানিকৃত, সুগন্ধি আর সিল্কের মোড়কে ঢাকা দামি স্যানিটারি প্যাড বের করল। প্যাডটার আঠার কাগজটা আলতো করে টেনে প্যান্টের সাথে আটকাতে আটকাতে জোয়া আয়নায় নিজের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, এই দামি সুগন্ধি আর সিল্কের মোড়ক আসলে একটা মস্ত বড় প্রতারণা। এটা আসলে নারীর ভেতরের রক্তক্ষরণ আর যন্ত্রণাকে সমাজের চোখে অদৃশ্য করে রাখার এক আধুনিক খোলস মাত্র।
স্মৃতির পাতাগুলো মড়মড় করে খুলে গেল জোয়ার মগজে। বিশ বছর আগে, সে তখন ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। ফ্রক আর স্কার্ট পরার সেই দিনগুলো। সেদিন কলেজের টিফিন পিরিয়ডে বেঞ্চ থেকে ওঠার সময় সে খেয়াল করেনি তার নীল সুতির স্কার্টের পেছনে একটা বড়, গাঢ় লাল রঙের রক্তের দাগ লেগে গেছে। সে যখন ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, পেছনের বেঞ্চের কয়েকজন সহপাঠী ছেলে আর মেয়ে একসাথে খিলখিল করে হেসে উঠেছিল।
"ওই দেখ, জোয়ার স্কার্টে ভূত লেগেছে! রক্ত!" একটা ছেলে আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠেছিল।
বারো বছরের জোয়া তখনো জানত না পিরিয়ড কী, রক্তক্ষরণ কী। সে ভেবেছিল তার শরীরে কোনো মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে, সে হয়তো আর বাঁচবে না। ভয়ে, চরম অপমানে আর এক অজানা আশঙ্কায় সে ক্লাসরুমের মেঝেতে দাঁড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ফেলেছিল। সহপাঠীদের সেই ক্রূর, লোলুপ আর বিদ্রূপাত্মক হাসিগুলো তার কচি মনে এক আজন্মের ট্রমা তৈরি করে দিয়েছিল।
ছুটি হওয়ার পর সে কোনোমতে ব্যাগটা পেছনের দিকে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছিল। সে ভেবেছিল মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলবে, ‘কোনো ভয় নেই মা’। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মা তার রক্তাক্ত স্কার্টটা দেখেই কপালে হাত দিয়ে ঘরের দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন। জোয়াকে জড়িয়ে ধরা তো দূরের কথা, তাকে ঘরের একটা অন্ধকার কোণায় ঠেলে বসিয়ে দিয়ে মা চারপাশ তাকিয়ে ফিসফিস করে ক্রুদ্ধ গলায় বলেছিলেন,
"চুপ কর! একদম কান্দিস না! গলার আওয়াজ নিচে নামা। বাইরে তোর বাবা আর ভাইয়া বসে আছে, তারা যেন এক বিন্দুও জানতে না পারে। আজ থেকে তুই বড় হয়েছিস জোয়া। তোর শরীরে নজর লাগবে। এখন থেকে ছেলেদের থেকে চার হাত দূরে থাকবি। নিজের এই নোংরা জামাকাপড় ধুয়ে লুকিয়ে রাখ।"
মা সেদিন তাকে সান্ত্বনা দেননি, বরং তার মনে এই বিশ্বাসটা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে—তার এই নারী শরীরটা আসলে একটা পাপের বস্তু, একটা লজ্জার আধার, যাকে সবসময় পৃথিবীর চোখ থেকে লুকিয়ে রাখতে হয়।
আজ এত বছর পর, বিবাহিত জীবনে এসেও জোয়া টের পায় সেই বারো বছর বয়সের ভয়, একাকীত্ব আর শরীরের প্রতি ঘৃণাটা আজও শেষ হয়নি। আসিফ চৌধুরী একজন উচ্চশিক্ষিত, আধুনিক পুরুষ। সে নারীর অধিকার নিয়ে বড় বড় সেমিনারে স্পন্সর করে। কিন্তু এই শোবার ঘরের চার দেওয়ালে এলে আসিফের সেই আধুনিকতার মুখোশটা এক সেকেন্ডে খসে পড়ে।
জোয়ার স্পষ্ট মনে আছে, গত মাসেও যখন তার পিরিয়ডের দ্বিতীয় দিন চলছিল, তখন সে তীব্র শারীরিক যন্ত্রণায় আর মানসিক অবসাদে বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল। তলপেটের ব্যথায় তার কপাল দিয়ে ঘাম ঝরছিল। আসিফ মাঝরাতে মদ্যপ অবস্থায় ঘরে ঢুকে জোয়ার সেই যন্ত্রণাকাতর শরীরটার ওপরেই নিজের অধিকার ফলাতে এসেছিল।
জোয়া যখন আসিফের হাতটা সরিয়ে দিয়ে ক্লান্ত গলায় বলেছিল, "আসিফ, প্লিজ আজ নয়। আমার খুব পিরিয়ডের ব্যথা হচ্ছে। শরীরটা একদম চলছে না।"
আসিফ তখন তার চেনা, শীতল এবং বিষাক্ত হাসিটা হেসে জোয়ার চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরে বলেছিল,
"আই ডোন্ট কেয়ার জোয়া। পিরিয়ডের ব্যথা সব মেয়েরই হয়। ওটা কোনো প্যারালাইসিস নয়। আমি বাইরে সারাদিন খাটাখাটনি করে এসে যদি ঘরে শান্তি না পাই, তবে আমার এই কোটি টাকার পেন্টহাউস আর তোমাকে এত দামি শাড়ি কিনে দেওয়ার মানে কী? ইউ আর মাই ওয়াইফ, জোয়া। তোমার শরীরটা সবসময় আমার ক্ষুধা মেটানোর জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।"
আসিফ সেদিন জোয়ার কোনো আপত্তি শোনেনি। তার সেই তীব্র তলপেটের ব্যথার ওপরই আসিফ নিজের পাশবিক কামনার চাবুক চালিয়েছিল। জোয়া বিছানার চাদরটা খামচে ধরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলেছিল। তার মনে হয়েছিল, এই সমাজ যাকে ‘বিয়ে’ বলে একটা পবিত্র তকমা দেয়, তা আসলে একজন পুরুষের জন্য নারীর শরীরকে বৈধভাবে ব্যবহারের এক লাইসেন্স মাত্র। সেখানে নারীর সম্মতি, তার শারীরিক অসুস্থতা বা যন্ত্রণার কোনো মূল্য নেই। আসিফের কাছে জোয়ার শরীরটা একটা দামি অলঙ্কার, যা সে যখন খুশি যেভাবে খুশি ব্যবহার করতে পারে।
বাথরুম থেকে বের হয়ে জোয়া আবার রান্নাঘরে ফিরে এলো। ফাতেমা তখন রান্নাঘরের এক কোণে মেঝেতে বসে বঁটি দিয়ে তরকারি কাটছিল। জোয়া ফাতেমার সামনে গিয়ে জলের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিল।
ফাতেমা জলের গ্লাসটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই সে থমকে গেল। সে জোয়ার মুখের দিকে তাকাল। জোয়ার ফর্সা মুখটা তখন ব্যথায় কেমন যেন হলদেটে মেরে গেছে, চোখের নিচে ক্লান্তির গাঢ় ছায়া, আর সে নিজের অজান্তেই এক হাত দিয়ে তলপেটটা চেপে ধরে আছে। ফাতেমা একজন চরের মেয়ে হতে পারে, কিন্তু নারীর শরীরের এই চেনা ক্লান্তি আর যন্ত্রণার রঙ চিনতে তার এক মুহূর্তও লাগল না।
ফাতেমা বঁটিটা একপাশে সরিয়ে রেখে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াল। সে সোজা জোয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম, এক গভীর মাতৃত্বের সুরে বলল, "বুজান, আফনেরও কি আজ পেটে কামড় দিতাছে? শরীলডা ভালো ঠেকতাছে না?"
জোয়া প্রথমে একটু চমকে গেল। সে আশা করেনি ফাতেমা এত সহজে তার ভেতরের কষ্টটা ধরে ফেলবে। সে আস্তে করে মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ ফাতেমা। আজ প্রথম দিন। বড্ড ব্যথা করছে।"
ফাতেমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর সে নিজের শাড়ির আঁচলের খুঁট থেকে একটা পুরনো, মলিন কিন্তু পরিষ্কার সুতি কাপড়ের টুকরো বের করল। সে কাপড়ের টুকরোটার দিকে তাকিয়ে এক ম্লান হাসি হেসে বলল, "বুজান, আমাগো কপালডা এক্কেরে এক। আমারও আজ দুই দিন চলে। এই চরের বাতাসে আর মেঘনার নোনা জলে আমাগো জরায়ুডাও বুঝি শুকাইয়া পাথর হয়া গেছে।"
জোয়া ফাতেমার হাতের সেই পুরনো কাপড়ের টুকরোটার দিকে তাকাল। তার মনে পড়ে গেল, ফাতেমারা তো চরের প্রান্তিক মানুষ। তাদের জীবনে এই সিল্কের দামি প্যাড, সুগন্ধি বা আধুনিক বাথরুম এক অলীক কল্পনা।
ফাতেমা মেঝেতে আবার বসতে বসতে বলতে লাগল, "বুজান, আফনেরা তো বড় লোক। দালানকোঠায় থাহেন। দামি জিনিস পরেন। আমাগো চরের জীবনে এইগুলা নাই। আমরা গরিব মেয়েছেলে। এই পিরিয়ডের দিনগুলায় পুরনো শাড়ির নোংরা ন্যাকড়া ব্যবহার করা লাগব। হেই ন্যাকড়া আবার ধুইয়া রোদ্রে দেওন যাইব না। চরের পুরুষমানুষদের নজর যদি হেই কাপড়ে পড়ে, তবে নাকি মহাপাপ হইব! সমাজ কইব মেয়েছেলেদের এইগুলা অলক্ষুণে কথা, গোপন জিনিস লোকসমক্ষে আনন যাইব না। তাই আমরা ঘরের অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে কোণায় বা গোয়ালঘরের পেছনে হেই ভেজা ন্যাকড়া লুকাইয়া শুকাইতাম। অসুখ-বিসুখ হয়া চরের কত মেয়েছেলে যে মরল, তার কোনো হিসাব নাই বুজান। কিন্তু সমাজ খালি একটা কথাই জানে—মেয়েছেলের শরীর মানেই লজ্জা, তারে লুকায়া রাখো।"
ফাতেমার কথাগুলো রান্নাঘরের বাতাসে এক অদ্ভুত ভারী পরিবেশ তৈরি করল। জোয়া ফাতেমার পাশে মেঝেতেই বসে পড়ল। তার পরনের দামি নাইট গাউনটা রান্নাঘরের মেঝেতে লেপ্টে গেল, কিন্তু আজ তার কোনো পরোয়া নেই। সে ফাতেমার সেই খসখসে হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
দুজনের সামাজিক অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। একজন গুলশানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালকিন, যে পৃথিবীর সমস্ত আধুনিক সুবিধা পায়; আর অন্যজন বরিশালের এক প্রত্যন্ত চরের নিঃস্ব, পলাতক নারী, যে স্যানিটারি প্যাডের নামও হয়তো কোনোদিন শোনেনি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, প্রকৃতির দেওয়া এই রক্তক্ষরণ, তলপেটের এই আদিম কামড় আর তার ওপর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া সেই আজন্মের ‘লজ্জা’ আর ‘নিষেধের’ শৃঙ্খল—এক মুহূর্তের মধ্যে তাদের দুজনকে এক সমান্তরাল রেখায় এনে দাঁড় করাল।
জোয়া ফাতেমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "জানিস ফাতেমা, আমাদের সমাজটা অদ্ভুত। তারা আমাদের শরীর থেকে জন্ম নেয়, কিন্তু আমাদের এই স্বাভাবিক রক্তক্ষরণটাকেই সবচেয়ে বড় অপবিত্র আর নোংরা জিনিস মনে করে। এরা আমাদের দেবী বলে পূজা করতে পারে, কিন্তু পিরিয়ডের দিনে রান্নাঘরে ঢুকতে দিতে বা ছুঁতে দ্বিধা করে।"
ফাতেমা মাথা নাড়ল। তার চোখে তখন এক চিলতে বুনো আগুন। সে বলল, "হ বুজান। মন্টু মাঝি তো এই দিনগুলায় আমারে আরো বেশি কইরা পিটাইত। বলত, মেয়েছেলেদের এই সময় নাকি শরীর অপবিত্র থাকে, তাই কথা শুনলে ঘরের অমঙ্গল হইব। পুরুষমানুষেরা আমাগো রক্ত শোষণ কইরা বাঁইচা থাকে বুজান, অথচ আমাগো এই রক্তের দাগটারে ঘেন্না করে।"
দুই নারী নীরবে রান্নাঘরের মেঝেতে বসে রইল। বাইরে তখন দুপুরের চড়া রোদ গুলশানের কাঁচের দেওয়ালে এসে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু এই রান্নাঘরের ভেতরে, মেঝের ওপর বসে থাকা সিল্ক আর সুতির দুই প্রতিনিধি আজ তাদের জরায়ুর ব্যথা আর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া লজ্জার স্মৃতিগুলো একে অপরের সাথে ভাগ করে নিল। কোনো কান্নাকাটি নেই, কোনো উচ্চস্বরে হাহাকার নেই; শুধু এক গভীর, আদিম এবং নিঃশব্দ মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন।
তারা বুঝতে পারল, এই রক্ত কোনো লজ্জার বিষয় নয়; এই রক্ত হলো তাদের নারীত্বের, তাদের লড়াকু সত্ত্বার প্রথম বারুদ। এই সমাজ তাদের যত বেশি অন্ধকার কোণায় লুকিয়ে রাখতে চাইবে, তাদের ভেতরের সেই অবদমিত বুনো নদীটা তত বেশি শক্তি নিয়ে একদিন এই পুরুষতান্ত্রিকতার দেওয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে। রক্তের এই প্রথম দাগ আজ তাদের ভেতরের বাঘিনীকে আরও একবার মনে করিয়ে দিল—তারা আর কোনোদিন মাথা নিচু করে এই শৃঙ্খল মেনে নেবে না।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)