Thread Rating:
  • 5 Vote(s) - 4.2 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
#19
৪।
মায়ের কথাটা আমি একদম উড়িয়ে দিতে পারিনা। সমাজে থাকতে গেলে বিয়ে-শাদি নিশ্চয়ই করতে হবে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থাটাই এমনভাবে তৈরি যে, আপনি সারাজীবন একা থাকতে পারবেন না। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর আপনি যদি একা থাকেন, সমাজ আপনাকে বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করবে। লোকে ভাববে আপনার চরিত্রে কোনো সমস্যা আছে, অথবা আপনার শারীরিক কোনো অক্ষমতা আছে। সমাজ চায় সবাই একটা ছাঁচে ঢালা জীবন পার করুক। পড়াশোনা, চাকরি, বিয়ে, বাচ্চা, রিটায়ারমেন্ট এবং মৃত্যু। এর বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।

আমি জানি, আমাকেও কোনো একদিন এই সিস্টেমের কাছে মাথা নত করতে হবে। কোনো একদিন আমাকেও একটা বিয়ের পিঁড়িতে গিয়ে বসতে হবে। কিন্তু আপাতত না। আমি এখনো নিজের সাথে জীবন কাটানোটা উপভোগ করছি।


তবে একটা মানুষের সাথে জীবন শেয়ার করা মানে কী?

এর মানে হলো, আপনার একান্ত ব্যক্তিগত শূন্যতাটুকু অন্য একজনকে ভাগ করে দেওয়া। আপনার বাথরুম, আপনার বিছানা, আপনার পড়ার টেবিল— সবকিছুতে অন্য একজনের অস্তিত্ব মেনে নেওয়া। আমি কি এর জন্য প্রস্তুত?

আমার মনে হয়, আমি এখনো ভেতর থেকে একটা অপরিণত বালক হয়ে আছি। যে বালক প্রতিদিন সকালে উঠে অফিসে আসে, গম্ভীর মুখে কি-বোর্ডে আঙুল চালিয়ে বিশ্বের বড় বড় খবর অনুবাদ করে, কিন্তু দিন শেষে সে চায় কেউ তাকে বিরক্ত না করুক। সে চায় নিজের একটা জগৎ, যেখানে সে একা।

অফিসে আমার নারী কলিগদের দিকে তাকালে আমার কখনোই মনে হয়নি, এদের কারো সাথে জীবন শেয়ার করা যায়। নিতি, ফারহানা আপা বা অন্য যারা আছেন— তারা সবাই ভালো মানুষ। কিন্তু তাদের সাথে জীবন কাটানোর কথা ভাবলে আমার কেন যেন দমবন্ধ লাগে। আমার মনে হয়, এদের সাথে বিয়ে হলে আমাকে সারাজীবন শাহরুখ খানের সিনেমার রিভিউ শুনতে হবে, অথবা গরুর মাংসের ভুনার রেসিপি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

এই যে ‘ম্যাচুরিটি’ বা পরিপক্বতার কথা আমি মাকে বললাম, এই জিনিসটা আসলে কী? হঠাৎ করে আমার চোখের সামনে আনিকা নাওহারের মুখটা ভেসে উঠল।

গত মঙ্গলবার চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর সেই ছোট্ট কেবিনটায় আমি যে নারীটিকে দেখেছিলাম। ছত্রিশ বছর বয়সী এক পরিপূর্ণ নারী। উনার দিকে তাকিয়ে আমার একবারের জন্যও মনে হয়নি যে উনি কোনো অপরিণত বা অগভীর মানুষ। উনার বসার ভঙ্গি, উনার শাড়ির আঁচল টেনে নেওয়ার ধরন, এমনকি উনার চোখের শান্ত দৃষ্টি— সবকিছুর মধ্যে একটা দারুণ আভিজাত্য এবং মানসিক পরিপক্বতা ছিল।

আমি মনে মনে একটা অদ্ভুত হিসাব মেলাতে শুরু করলাম। আমি যদি কখনো বিয়ে করি, তবে আমার এমন কাউকেই দরকার। যার সাথে কথা বলার জন্য আমাকে শাহরুখ খানের সাহায্য নিতে হবে না। যার সাথে আমি চুপচাপ বসে থাকলেও মনে হবে না যে আমি সময় নষ্ট করছি। আনিকা নাওহারের মতো রূপবতী, গুণবতী, আকর্ষণীয় এবং পরিণত (Mature) কাউকে যদি আমি বিয়ে করতে পারতাম, তবে বিষয়টা মন্দ হতো না।

উনার শারীরিক গঠন, ওই যে ৩৬-২৮-৩৬ এর নিখুঁত জ্যামিতি— সেটা শুধু একটা বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়। আমার মনে হয়, একজন নারীর শরীর যখন তার বয়সের সাথে সাথে পূর্ণতা পায়, তখন তার মনটাও পূর্ণতা পায়। আনিকা নাওহারের সেই পূর্ণতাটুকু আছে। উনার সাথে কথা বলার সময় মনে হচ্ছিল, আমি এমন একজনের সাথে কথা বলছি যে আমার প্রতিটি কথার ওজন বুঝতে পারছে। উনার পারফিউমের সেই হালকা শ্যানেল বা ডিওর-এর সুবাসটা আমার মাথার ভেতর এখনো মাঝেমধ্যে হানা দেয়।

আমি জানি, আনিকা নাওহারের মতো কাউকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আর আনিকা নাওহারকে তো নয়ই। আমি জানি উনি বিবাহিতা। চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর মতিন সাহেবের সাথে একদিন কথার ছলে জেনেছিলাম। মতিন সাহেব বলেছিলেন, "আনিকা আপার হাসব্যান্ড তো অনেক বড় ইঞ্জিনিয়ার। লন্ডনে উনাদের বিশাল বাড়ি। আপা তো শখে লেখালেখি করেন।"

সুতরাং আনিকা নাওহার আমার কাছে একটা সুন্দর স্বপ্নের মতো। একটা স্ট্যান্ডার্ড। যদি কখনো বিয়ে করতেই হয়, তবে আমি এমন কাউকেই খুঁজব, যার ভেতরে আনিকা নাওহারের মতো একটা স্থিরতা আছে। যে আমাকে আমার মতো থাকতে দেবে, আবার একই সাথে আমার একাকীত্বটাকে একটা সুন্দর সঙ্গ দিয়ে ভরিয়ে তুলবে।

আমি লাউঞ্জ থেকে উঠে আবার আমার ডেস্কে ফিরে এলাম। ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা নতুন নিউজ এসেছে। স্পেনের মাদ্রিদে এক লোক তার বাড়ির ছাদে একটা বিশাল টেলিস্কোপ বানিয়েছে, শুধু মঙ্গল গ্রহ দেখার জন্য। তার দাবি, মঙ্গল গ্রহে নাকি মানুষের চেয়েও উন্নত কোনো প্রাণী আছে।

আমি কি-বোর্ডে হাত রাখলাম। স্পেনের লোকটার মঙ্গল গ্রহের প্রতি এই আকর্ষণ দেখে আমার হাসি পেল। মানুষ নিজের পৃথিবীর মানুষদের সাথে ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারে না, অথচ কোটি কোটি মাইল দূরের মঙ্গল গ্রহের প্রাণীর সাথে যোগাযোগ করার জন্য টেলিস্কোপ বানিয়ে বসে আছে!আমি অনুবাদ করতে শুরু করলাম।

"স্পেনের মাদ্রিদ শহরের এক বাসিন্দা মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন..."

অফিস শেষ করে মেসে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে গেল। আজ মেসে রহিমা খালা আসেননি। তুহিন আর রাজু মিলে ডিম ভাজি আর ডাল রান্না করেছে। আমি চুপচাপ তাদের সাথে খেতে বসলাম।

তুহিন খেতে খেতে বলল, "রাশেদ ভাই, আপনি তো নিউজ করেন। আপনি কি জানেন কানাডায় ইমিগ্রেশনের নতুন রুলস কী?"

আমি ভাতে ডাল মাখাতে মাখাতে বললাম, "তুহিন, আমি ইন্টারন্যাশনাল নিউজ অনুবাদ করি, ইমিগ্রেশন কনসালটেন্সি করি না। তুমি গুগলে সার্চ করলেই তো পারো।"

রাজু ডিমের কুসুমটা মুখে দিয়ে বলল, "রাশেদ ভাইয়ের তো কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। উনি মিরপুরের মেসে বসে সারা জীবন কাটিয়ে দেবেন। তাই না ভাই?"

আমি হাসলাম। কোনো উত্তর দিলাম না। রাজু কথাটা খুব একটা ভুল বলেনি।আমার আসলেই কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। আমি শুধু চাই, আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে তিন লাখ টাকা জমুক, বাবা-মা উমরাহ করে আসুক, আর আমি আমার এই শান্ত, বিরক্তিকর জীবনে প্রতিদিন সকালে উঠে এক কাপ চা খেয়ে অফিসে যাই।

খাওয়া শেষ করে আমি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। মিরপুরের রাস্তায় তখনো প্রচুর গাড়ি। সিএনজির হর্ন আর বাসের ইঞ্জিনের শব্দে চারপাশ মুখরিত। আমি পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালাম। সিগারেটের ধোঁয়াটা বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে।

আকাশে আজ মেঘ নেই। দূর থেকে ঢাকা শহরের সোডিয়াম বাতিগুলোকে মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীতে নেমে আসা এক ঝাঁক ক্লান্ত তারা। 




মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য কীএই অতি গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং দার্শনিক প্রশ্নটা সাধারণত মানুষের মাথায় আসে গভীর রাতে। যখন চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে, ঘরের ভেতর টিকটিকি পোকা ধরার জন্য ওত পেতে থাকে, আর মানুষের চোখে ঘুম থাকে না— ঠিক তখন। কিন্তু আমার মাথায় এই প্রশ্নটা এল সকালবেলা, মিরপুর দশ নাম্বারের গোলচত্বরে দাঁড়িয়ে ‘বিকল্প অটো’ বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময়।

চারপাশের দিকে তাকালে জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। আমার সামনে দিয়ে একটা লোক এক কাঁধে মুরগির খাঁচা আর অন্য কাঁধে সবজির বস্তা নিয়ে দৌড়াচ্ছে। তার জীবনের এই মুহূর্তের উদ্দেশ্য হলো কাওরান বাজারে গিয়ে এগুলো বিক্রি করা। একটু দূরে এক ট্রাফিক পুলিশ অত্যন্ত বিরক্ত মুখে হাত নেড়ে একটা রিকশাকে থামাচ্ছেন। তার জীবনের উদ্দেশ্য হলো এই জ্যাম কমানো, অথবা রিকশাওয়ালার কাছ থেকে বিশ টাকা জরিমানা আদায় করা।

কিন্তু সামগ্রিকভাবে, একটা মানুষের জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কী? আমি বাস থেকে ধাক্কাধাক্কি করে ওঠার সময় এই বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলাম। বাসে আজ বসার সিট পাইনি। একটা রডের হ্যান্ডেল ধরে বাদুড়ের মতো ঝুলে আছি। আমার ঠিক নিচে বসা এক ভদ্রলোক পত্রিকা পড়ছেন। পত্রিকার হেডলাইন— ‘শেয়ারবাজারে ধস, কোটিপতি থেকে রাস্তায়’।

আমি ভাবলাম, এই যে আমরা প্রতিদিন সকালে উঠে গাধার মতো খাটছি, মাস শেষে কিছু টাকা পাচ্ছি, আবার সেই টাকা দিয়ে চাল-ডাল কিনছি— এর শেষ কোথায়?

কেউ কেউ বলেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে মহৎ উদ্দেশ্য হলো নিজের বাবা-মাকে দেখে রাখা। কথাটা অবশ্যই খুব সুন্দর এবং পবিত্র। আমার নিজের জীবনের বর্তমান উদ্দেশ্যও অনেকটা সেরকমই। আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে তিন লাখ টাকা জমবে, আর আমি আমার বাবা-মাকে মক্কায় উমরাহ করতে পাঠাব। এটা ভেবে আমি এক ধরনের মানসিক শান্তি পাই।

কিন্তু আমি যদি লজিক দিয়ে চিন্তা করি
, তাহলে এখানে একটা বড় ফাঁকি আছে। বাবা-মা তো আর অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন না। প্রকৃতির নিয়মেই তারা একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবেন। তখন কী হবে? তখন কি আমার জীবনের উদ্দেশ্য শেষ হয়ে যাবে? তখন আমি কী করব?

এই প্রশ্নের উত্তর সমাজ খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। সমাজ বলে, বাবা-মা চলে যাওয়ার পর তোমার জীবনের উদ্দেশ্য হবে তোমার নিজের সন্তানদের দেখে রাখা। তাদের বড় করা, পড়াশোনা করানো, মানুষের মতো মানুষ করা।

আমি বাসের হ্যান্ডেল ধরে দুলতে দুলতে ভাবলাম, এটা তো তাহলে একটা রিলে রেসের মতো হয়ে গেল! রিলে রেসে যেমন একজন দৌড়ে এসে আরেকজনের হাতে কাঠি ধরিয়ে দেয়, জীবনটাও ঠিক তাই। আমার বাবা-মা আমাকে বড় করেছেন, আমি আমার সন্তানদের বড় করব, তারা তাদের সন্তানদের বড় করবে। এটা একটা বায়োলজিক্যাল সাইকেল। এখানে মহত্ত্বের কিছু নেই। কুকুর-বিড়ালও তাদের বাচ্চাদের দেখে রাখে। তাহলে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মানুষের জীবনের বিশেষ উদ্দেশ্যটা কী দাঁড়াল?

কেউ কেউ বলেন, মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য হলো অন্যের উপকার করা, মানুষের সেবা করা। যেমন মাদার তেরেসা। এই লজিকটা শুনতেও খুব ভালো লাগে। কিন্তু বাস্তব জীবনে অন্যের উপকার করাটা খুব কঠিন কাজ। আমি নিজের মেসের মিলের টাকাই ঠিকমতো হিসাব করে কুলিয়ে উঠতে পারি না, আমি আবার কার উপকার করব? বাসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঘর্মাক্ত লোকটার যদি এখন পকেটমার হয়ে যায়, আমি কি নিজের পকেট থেকে তাকে টাকা দেব? দেব না। আমি বড়জোর ‘আহারে, বেচারার পকেটটা গেল’ বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলব। এর বেশি কিছু না।

আবার আরেক দলের মানুষ আছেন, যারা ভাবেন জীবন হলো অ্যাডভেঞ্চার। তারা বলেন, ‘ইউ অনলি লিভ ওয়ানস’— ইয়োলো (YOLO)। জীবন মাত্র একবার। সুতরাং এই জীবনে প্রচুর টাকা কামাতে হবে, আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে হবে, সুইজারল্যান্ডে স্কাই-ডাইভিং করতে হবে।

আমি এই ‘অ্যাডভেঞ্চার’ দলের মানুষদের কথা ভেবে একটু হাসলাম। আমার অ্যাডভেঞ্চার শুরু হয় মিরপুরের মেস থেকে কারওয়ান বাজারের অফিসে যাওয়ার পথে। বিকল্প বাসের যে ঝাঁকুনি আর ড্রাইভারের যে ব্রেক কষার স্টাইল, তাতে সুইজারল্যান্ডের স্কাই-ডাইভিংয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম থ্রিল পাওয়া যায় না। তাছাড়া, পঁচিশ হাজার টাকা বাজেটের ভেতর জীবন পার করা একজন অনুবাদকের কাছে অ্যাডভেঞ্চার মানে হলো মাসের পঁচিশ তারিখে পকেটে এক হাজার টাকা বেঁচে যাওয়া।

আমি একবার একটা ইংরেজি আর্টিকেলে পড়েছিলাম— 'টাইম ইজ আ ফ্ল্যাট সার্কেল'। মানুষের জীবন নাকি একটা সমতল বৃত্তের মতো। এই জীবনে আমরা যা করছি, তা আমরা বারবার করব। অনন্তকাল ধরে এই একই জিনিস ঘটতে থাকবে। আমি রাশেদ আহমেদ, একজন সাধারণ অনুবাদক, অনন্তকাল ধরে এই বিকল্প বাসে ঝুলতে ঝুলতে কারওয়ান বাজারে যাব। অনন্তকাল ধরে এহসান ভাই আমাকে তাড়া দেবেন, আর অনন্তকাল ধরে আমি কিম জং উনের মিসাইলের খবর বাংলায় অনুবাদ করব।

চিন্তাটা মাথায় আসতেই আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। অনন্তকাল ধরে একই কাজ করে যাওয়ার চেয়ে ভয়ংকর কোনো শাস্তি আর হতে পারে না। গ্রিক পুরাণের সিসিফাসের মতো, যে একটা পাথর পাহাড়ের চূড়ায় তোলে, আর সেটা আবার গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়। আমার জীবনটাও কি একটা সিসিফাসের পাথর?

অফিসে যখন পৌঁছালাম, তখন সকাল দশটা বেজে দশ মিনিট। এহসান ভাই আজ একটু শান্ত আছেন। পৃথিবীর কোথাও হয়তো গতরাতে বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটেনি। আমি ডেস্কে গিয়ে ল্যাপটপ অন করলাম। আমার পাশের ডেস্কে মামুন বসে আছে। সে গভীর মনোযোগ দিয়ে একটা নিউজ পড়ছে।

"কী ব্যাপার মামুন? এত সিরিয়াস কেন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। মামুন আমার দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখে এক ধরনের দার্শনিক দৃষ্টি। সে বলল, "রাশেদ ভাই, আপনি কি জানেন বিলিয়নিয়ার জেফ বেজোস তার স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স দিয়ে নতুন একটা মেয়ের সাথে প্রেম করছে?"

আমি বললাম, "হ্যাঁ, জানি। পুরোনো খবর। তো এতে তোমার এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে? জেফ বেজোস কি তার সম্পত্তির কোনো অংশ তোমাকে লিখে দিচ্ছে?"

মামুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ভাই, সম্পত্তির কথা হচ্ছে না। আমি আসলে একটা জিনিস নিয়ে চিন্তা করছিলাম। এই যে মানুষ এত টাকা কামায়, এত ক্ষমতা অর্জন করে, এত বড় বড় কোম্পানি বানায়— এগুলোর আসল উদ্দেশ্য কী?"

আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। একটু আগে বাসে আমি ঠিক এই জিনিসটা নিয়েই ভাবছিলাম। আমি বললাম, "কী? তুমিই বলো।" মামুন খুব গম্ভীর গলায় বলল, "নারী। ভাই, মানুষের জীবনের, বিশেষ করে পুরুষ মানুষের জীবনের সব উদ্দেশ্য, ইচ্ছা, আগ্রহ— সব কিছুর মূলেই হলো নারী। আপনি পৃথিবীর ইতিহাস দেখেন। ট্রয়ের যুদ্ধ কেন হয়েছিল? হেলেনের জন্য। সম্রাট শাহজাহান তাজমহল কেন বানিয়েছিলেন? মমতাজের জন্য। একজন পুরুষ যখন প্রচুর টাকা কামাতে চায়, তখন সে আসলে কী চায়? সে চায় ওই টাকা দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারীটিকে নিজের করে পেতে। আল্টিমেটলি এত টাকা দিয়ে সে নারীকে জিততে চায়।"

আমি অবাক হয়ে মামুনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ছেলেটা মাঝে মাঝে ‘বালতিতে লাথি মারা’ টাইপ অনুবাদ করলেও, তার মাথার ভেতরে দেখি একটা আস্ত দার্শনিক বাস করছে।

মামুন বলতে থাকল, "ক্ষমতা হলেও একই কথা ভাই। একজন মন্ত্রী বা বড় নেতা যখন ক্ষমতা দেখায়, তখন সে আসলে অবচেতন মনে প্রমাণ করতে চায় যে সে কতটা শক্তিশালী। আর শক্তিশালী পুরুষের প্রতি নারীরা দুর্বল থাকে। আপনি যতই বলেন না কেন যে মানুষ নিজের শান্তির জন্য টাকা কামায়, আসলে তা না। নারীই হলো পুরুষের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য।"

মামুনের এই ‘সিরিয়াস ফিলোসফি’ শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। কথাটা কি আসলেই সত্যি? ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের সমস্ত কাজের পেছনে নাকি অবদমিত যৌনাকাঙ্ক্ষা কাজ করে। মামুনের কথাটাও অনেকটা সেরকমই। একজন মানুষ সারাজীবন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যখন একটা বিশাল অট্টালিকা বানায়, তখন সে আসলে চায় ওই অট্টালিকার বারান্দায় একজন সুন্দরী নারী এসে দাঁড়াক। ওই নারী তার সম্পদের প্রশংসা করুক। নারী ছাড়া পুরুষের সমস্ত অর্জন যেন অর্থহীন।

আমি নিজের জীবনের দিকে তাকালাম। আমার বয়স উনত্রিশ। নারী কখনোই আমার জীবনের মূল ফোকাস ছিল না। আমি মেয়েদের থেকে সচেতনভাবেই একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলেছি। অফিসে নিতি বা ফারহানা আপার সাথে আমার কথা হয়, কিন্তু সেটা ওই ‘ভাই-বোন’ টাইপ সহকর্মীর সম্পর্ক। এর বাইরে কিছু না। রাস্তাঘাটে সুন্দরী মেয়ে দেখলে আমি হয়তো এক সেকেন্ডের জন্য তাকাই, কিন্তু পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে নিই। আমার মনে হতো, আমার মতো একজন ম্যাড়ম্যাড়ে, বিরক্তিকর এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনে কোনো রোমান্টিক অ্যাঙ্গেল থাকতে পারে না।

আমি সবসময় ভেবে এসেছি, বিয়ে-শাদি আমি করব সমাজ রক্ষার জন্য। বাবা-মায়ের চাপে পড়ে। আমার নিজের ভেতরের কোনো তাগিদ থেকে নয়।
কিন্তু...

কিন্তু মামুনের কথাটা শোনার পর থেকে আমার মাথার ভেতর একটা মুখ বারবার ভেসে উঠতে লাগল। আনিকা নাওহার। গত মঙ্গলবার চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর সেই ছোট কেবিনটায় আমি তাকে দেখেছিলাম। ছত্রিশ বছর বয়সী এক অপরূপ নারী। উনার সেই গাঢ় মেরুন শাড়ি, নিখুঁত ফর্সা ত্বক, আর একটা পারফেক্ট ‘আওয়ারগ্লাস’ ফিগার। ওই যে আমি মনে মনে হিসাব করেছিলাম— ৩৬-২৮-৩৬ এর এক অদ্ভুত জ্যামিতি।

আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি, কিন্তু আমার চোখের সামনে ভাসছে আনিকা নাওহারের সেই অবাধ্য চুলের গোছা, যেটা উনার ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছিল। উনার দামি পারফিউমের গন্ধটা যেন এখনো আমার নাসারন্ধ্রে লেগে আছে।

আমি নিজেকে একটা প্রশ্ন করলাম। যদি মামুনের কথা সত্যি হয়, যদি মানুষের জীবনের আল্টিমেট উদ্দেশ্য একজন নারীই হয়— তাহলে সেই নারীটি কেমন হওয়া উচিত? নিতি বা ফারহানা আপার মতো কেউ? যার সাথে সারাজীবন পাশের বাসার ভাবির গসিপ আর গরুর মাংসের রেসিপি নিয়ে কথা বলতে হবে? নাকি আনিকা নাওহারের মতো কেউ?

আমি চোখ বন্ধ করে দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। আমি কাজ থেকে ফিরেছি। আমার ড্রয়িংরুমে একটা বুকশেলফ। সেখানে অনেক বই। আর সোফায় বসে আছেন আনিকা নাওহার। উনার হাতে একটা কফির মগ। উনি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো চপলতা নেই, আছে এক ধরনের গভীর প্রশান্তি আর মানসিক পরিপক্বতা। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আজকের দিনটা কেমন কাটল আপনার?" আর আমি উনাকে বললাম, "আজকে অফিসে একটা ফরাসি দার্শনিকের খবর অনুবাদ করছিলাম..."

কল্পনাটা করতেই আমার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল। আমি চোখ খুলে ফেললাম। আমার মতো মানুষের জীবনে এরকম কল্পনা করাটাও এক ধরনের অপরাধ। আনিকা নাওহার একজন বিবাহিতা নারী। লন্ডনে উনার স্বামী আছেন, যিনি অনেক বড় ইঞ্জিনিয়ার। উনাদের বিশাল আইটি ফার্ম আছে। আনিকা নাওহার আমার থেকে যোজন যোজন দূরের এক নক্ষত্র। উনি শুধু শখে দেশে আসেন, বই বের করেন, আর আমার মতো অনুবাদকদের দিয়ে উনার বইয়ের শূন্যতা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ান।

কিন্তু লজিক্যালি চিন্তা করলে, আনিকা নাওহারের এই উপস্থিতি আমার দর্শনে একটা বিশাল পরিবর্তন এনে দিয়েছে। আমি এতদিন ভাবতাম, আমি একা থাকতে পছন্দ করি। আমার নারীসঙ্গ পছন্দ না। কিন্তু আনিকাকে দেখার পর আমার মনে হচ্ছে, বিষয়টা আসলে তা নয়। আমার নারীসঙ্গ পছন্দ না, এটা ভুল। বরং, আমার ‘সাধারণ’ নারীসঙ্গ পছন্দ না। আমি আসলে খুঁজছিলাম এমন কাউকে, যার ভেতরে একটা গভীরতা আছে। যার শারীরিক সৌন্দর্য আমাকে আকর্ষণ করবে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আকর্ষণ করবে তার বুদ্ধিমত্তা, তার কথা বলার ভঙ্গি, তার আভিজাত্য।

যদি আনিকা নাওহারের মতো রূপবতী, গুণবতী, আকর্ষণীয় এবং পরিণত (Mature) একজন নারী জীবনের উদ্দেশ্য হয়, তবে সেই উদ্দেশ্যটা কিন্তু একেবারেই মন্দ হয় না। বরং, তেমন একজন নারীকে জয় করার জন্য, তার মনোযোগ পাওয়ার জন্য, আমি হয়তো জীবনের যেকোনো ফ্ল্যাট সার্কেল ভাঙতে রাজি আছি।

"ভাই, কী ভাবছেন এতক্ষণ ধরে?" মামুনের কথায় আমার ঘোর কাটল।


আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম, "কিছু না। তোমার জেফ বেজোসের থিওরি নিয়েই ভাবছিলাম। কথাটা তুমি খুব একটা খারাপ বলোনি।" মামুন বিজয়ের হাসি হাসল। "আমি তো আপনাকে বলি ভাই, দুনিয়ার সব লজিক ফেল মারবে, কিন্তু আমার লজিক ফেল মারবে না। আপনি মিলিয়ে দেখেন।"

আমি আর কথা বাড়ালাম না। ল্যাপটপে নতুন একটা খবর এসেছে। ইতালির ভেনিস শহরে এক বৃদ্ধ দম্পতি তাদের বিয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আবার বিয়ে করেছেন। আমি খবরটা অনুবাদ করতে শুরু করলাম। কিন্তু আমার শব্দগুলোর ভেতরে কেমন যেন একটা নরম অনুভূতি কাজ করতে লাগল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। অফিসের লাউঞ্জে বসে আমি একা চা খাচ্ছি। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। ঢাকা শহরে বৃষ্টি নামলে রাস্তার যে কী জঘন্য অবস্থা হয়, সেটা সবাই জানে। ড্রেনের পানি উপচে রাস্তা তলিয়ে যায়। রিকশাওয়ালারা ভাড়া ডাবল করে দেয়। কিন্তু লাউঞ্জের এই কাঁচের জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে মন্দ লাগে না।

হঠাৎ আমার প্যান্টের পকেটে মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠল। আমি মোবাইলটা বের করলাম। হোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশন। আমি স্ক্রিন আনলক করলাম। মেসেজটা এসেছে 'Anika Nawhar' এর কাছ থেকে।আমার আঙুলগুলো একটু কাঁপল। আমি মেসেজটা ওপেন করলাম।

"Hi Rashed, this is Anika. Hope you are having a good day. আমি আমার নতুন উপন্যাসের প্রথম তিনটে চ্যাপ্টারের ড্রাফট রেডি করেছি। আপনাকে পাঠালাম। সময় করে একটু দেখে জানাবেন, ল্যাঙ্গুয়েজটা ঠিক আছে কি না। No rush. টেক ইওর টাইম।"

মেসেজের নিচে একটা পিডিএফ ফাইল অ্যাটাচ করা। আমি মেসেজটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। এই মেসেজটার মধ্যে রোমান্টিক কিছু নেই। এটা সম্পূর্ণ একটা প্রফেশনাল মেসেজ। একজন লেখক তার প্রুফরিডারকে পাণ্ডুলিপি পাঠিয়েছেন। এর বেশি কিছু না।

কিন্তু আমার কেন যেন মনে হলো, এই মেসেজটা আমার সেই ‘ফ্ল্যাট সার্কেল’ জীবনের একঘেয়েমিতে একটা ছোট্ট ঢিল ছুঁড়ে মেরেছে। পুকুরের শান্ত জলে ঢিল পড়লে যেমন ছোট ছোট তরঙ্গ তৈরি হয়, আমার মাথার ভেতর এখন ঠিক তেমন কিছু তরঙ্গ তৈরি হচ্ছে।

আমি টাইপ করতে শুরু করলাম। "Hello Anika. Got the file. I will look into it tonight and let you know. Thanks."

মেসেজটা সেন্ড করে আমি মোবাইলটা টেবিলে রাখলাম। তারপর চায়ের কাপে একটা বড় চুমুক দিলাম। বাইরে বৃষ্টি আরও তীব্র হয়েছে। কারওয়ান বাজারের মোড়ে একটা বাস আটকে আছে। মানুষজন ছাতা মাথায় দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে। ঢাকা শহরের বিশৃঙ্খলা, আমার পঁচিশ হাজার টাকা বাজেটের জীবন, আর মিরপুরের মেস। কিন্তু আমার ভেতরে আজ একটা পরিবর্তন এসেছে। আজ আমি জানি, আমার জীবনের উদ্দেশ্য যদি কোনোদিন বদলায়, তবে সেটা কেমন হবে। আমি আনিকা নাওহারকে পাব না, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। কিন্তু আনিকা নাওহার আমাকে শিখিয়ে দিয়ে গেলেন, আমার গন্তব্যটা আসলে কী হতে পারে। জীবনটা সত্যিই মাঝে মাঝে খুব ইন্টারেস্টিং হয়ে ওঠে।
[+] 3 users Like Orbachin's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস? - by Orbachin - Yesterday, 01:48 AM



Users browsing this thread: 4 Guest(s)