Thread Rating:
  • 5 Vote(s) - 4.2 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
#10
৩।

সবকিছু মিলিয়ে ছত্রিশ বছরের একজন পূর্ণাঙ্গ নারীর যে শারীরিক আবেদন থাকতে পারে
, সেটা তাঁর মাঝে শতভাগ, বরং তার চেয়েও বেশি উপস্থিত। অথচ এই পুরো আবেদনটার মধ্যে কোনো উগ্রতা নেই। আছে এক ধরনের পরিশীলিত মুগ্ধতা। হালকা মেকআপ করেছেন তিনি। ঠোঁটে শাড়ির সাথে মিলিয়ে গাঢ় মেরুন রঙের লিপস্টিক। চুলগুলো খোঁপা করা, সেখান থেকে দু-এক গোছা অবাধ্য চুল ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে। পুরো রুমের বাতাসে একটা খুব দামি পারফিউমের গন্ধ ভাসছে। শ্যানেল বা ডিওর-এর কোনো একটা পারফিউম হবে হয়তো।

 
মতিন সাহেব গলা খাঁকারি দিলেন। "আনিকা আপা, এই যে আমাদের রাশেদ ভাই। রাশেদ আহমেদ। উনিই আপনার বইয়ের প্রুফ দেখেছেন। খুব মেধাবী ছেলে। ঢাকা পেপারসের ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে আছেন, আবার আমাদের এখানেও সময় দেন।"

আনিকা নাওহার মুখ তুলে তাকালেন। উনার চোখের মণি দুটো হালকা বাদামি। উনি খুব মিষ্টি করে হাসলেন।

"ওহ, আপনিই রাশেদ সাহেব? আপনার কথা মতিন ভাইয়ের কাছে অনেক শুনেছি। থ্যাংক ইউ সো মাচ। আপনি খুব যত্ন করে আমার পাণ্ডুলিপির প্রুফ দেখেছেন। আমি দেখেছি, আপনি অনেকগুলো চমৎকার শব্দ ব্যবহার করে আমার কিছু লাইনের ইমপ্রুভমেন্টও করেছেন।"

উনার গলার স্বরটা খুব মোহনীয়। বাংলা উচ্চারণে সামান্যতম কোনো বিদেশি টান নেই। একদম নিখুঁত, প্রমিত বাংলা।

আমি একটু অপ্রস্তুত বোধ করলাম। আমার পকেটে পঁচিশ হাজার টাকার বাজেট, মেসে রাজুর বুরকিনা ফাসোর রাজধানী মুখস্থ করা আর অফিসে মামুনের বালতিতে লাথি মারা— এসবের মাঝখান থেকে উঠে এসে হঠাৎ করে এরকম একজন অপরূপা, সুশিক্ষিত এবং অভিজাত নারীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটা একটু কেমন যেন পরাবাস্তব মনে হচ্ছিল।

আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম, "ধন্যবাদ। আপনার কবিতাগুলো আসলে বেশ ভালো। প্রুফ দেখার সময় আমাকে খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি। বানান ভুল প্রায় ছিলই না।"

আনিকা নাওহার আরেকটু হাসলেন। "আমি তো বছরে একবার আসি দেশে। বাংলা ভাষার চর্চাটা ওভাবে হয় না লন্ডনে। তাই একটু ভয়েই ছিলাম।"

মতিন সাহেব ঘড়ি দেখে বললেন, "চলুন আপা, বাইরে সবাই অপেক্ষা করছে। আমরা প্রোগ্রামটা শুরু করে দিই।"

প্রকাশনীর সামনের দিকের বড় রুমটায় তখন জনা বিশেক মানুষ জড়ো হয়েছেন। এদের মধ্যে কয়েকজন বয়স্ক কবি, কয়েকজন তরুণ সাহিত্যিক এবং কিছু পত্রিকা অফিসের সাহিত্য পাতার লোক।

সামনে একটা ছোট টেবিল রাখা। সেখানে আনিকা নাওহারের ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’ বইয়ের কয়েকটা কপি সাজানো। আমাকে এবং আনিকা নাওহারকে পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসানো হলো। আমার গা ঘেঁষেই উনি বসেছেন। উনার পারফিউমের দামি সুবাসটা আমার স্নায়ুকে কিছুটা হলেও এলোমেলো করে দিচ্ছে।

অনুষ্ঠান শুরু হলো। মতিন সাহেব ছোট্ট একটা স্বাগত বক্তব্য দিলেন। এরপর একজন বয়স্ক কবি আনিকা নাওহারের সাহিত্যচর্চা নিয়ে বেশ কিছু ভারিক্কি কথা বললেন, যার অর্ধেকই আমি বুঝতে পারলাম না।

এরপর মতিন সাহেব আমার দিকে তাকালেন। "এবার আমাদের তরুণ অনুবাদক এবং প্রুফরিডার রাশেদ আহমেদ বইটির ওপর তার পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাবেন।"

আমি আস্তে করে উঠে দাঁড়ালাম। আমি জানি, এই ধরনের জায়গায় কী বলতে হয়। আমি গলাটা একটু খাদে নামিয়ে, অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বলতে শুরু করলাম।

"উপস্থিত সবাইকে শুভ সন্ধ্যা। আনিকা নাওহারের ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’ বইটির পাণ্ডুলিপি পড়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমরা যারা ঢাকা শহরে থাকি, আমাদের চারপাশের বাস্তবতা বড়ই রূঢ়। কিন্তু আনিকা নাওহার যখন সুদূর ইংল্যান্ডে বসে কবিতা লেখেন, তখন তার কবিতায় আমরা এক ধরনের প্রবাসকালীন বিচ্ছিন্নতাবোধ বা ডায়াসপোরা (Diaspora) দেখতে পাই। এই শূন্যতা শুধু ব্যক্তির নয়, এই শূন্যতা যেন পুরো আধুনিক সভ্যতার।"

আমি আড়চোখে আনিকা নাওহারের দিকে তাকালাম। উনি খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছেন। উনার চোখে একটা মুগ্ধতার আবেশ।

আমি চালিয়ে গেলাম, "উনার কবিতায় শব্দচয়ন খুব সহজ, কিন্তু তার ভেতরের অর্থ অনেক গভীর। যেমন একটা কবিতায় উনি বলেছেন, ‘আমি আয়নায় নিজেকে দেখি, কিন্তু ছায়াটা আমার নয়’। এই যে আত্মপরিচয়ের সংকট, আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, এটাই উনার কবিতার মূল সুর। আমি মনে করি, এই বইটি আমাদের সমসাময়িক বাংলা কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হয়ে থাকবে।"

আমি বক্তব্য শেষ করে বসলাম। সবাই হাততালি দিল। আনিকা নাওহার আমার দিকে সামান্য ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললেন, "অসাধারণ বলেছেন আপনি। আমার নিজের কবিতায় যে এত গভীরতা আছে, সেটা আমি নিজেও জানতাম না।"

উনার বলার ভঙ্গিতে একটা সূক্ষ্ম হিউমার ছিল। আমি বুঝতে পারলাম, এই নারী শুধু সুন্দরীই নন, যথেষ্ট বুদ্ধিমতী এবং রসিকও। আমি মৃদু হেসে বললাম, "সমালোচকদের কাজই হলো লেখকের না-জানা কথাগুলো বানিয়ে বানিয়ে বলা।"

আনিকা নাওহার এবার শব্দ করে হেসে উঠলেন।

আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন শেষ হলো। বইয়ের ফিতা কাটা হলো। এরপর শুরু হলো চা-চক্র। সিউডোর আঠা আর বইয়ের গন্ধের সাথে এবার সিঙারা আর চায়ের গন্ধ যোগ হলো। সবাই আনিকা নাওহারকে ঘিরে ধরেছে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য।

আমি ভিড় থেকে একটু দূরে, একটা বুকশেলফে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম আর সিঙারায় কামড় দিচ্ছিলাম। আমার কাজ শেষ। এখন আমার মেসের দিকে রওনা হওয়ার কথা।

হঠাৎ দেখলাম আনিকা নাওহার ভিড় ঠেলে আমার দিকেই এগিয়ে আসছেন। উনার হাতে উনার বইয়ের একটা কপি। শাড়ির আঁচলটা আলতো করে এক হাতে ধরা। হাঁটার সময় উনার শরীরের নিখুঁত ঢেউগুলো খুব সুন্দর একটা ছন্দের সৃষ্টি করছে।

উনার দিকে তাকিয়ে আমার মিরপুরের মেসের কথা মনে পড়ল। এই মহিলার সাথে আমার কোনোভাবেই কোনো সংযোগ হতে পারে না। আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই গ্রহের বাসিন্দা।

উনি আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। "রাশেদ সাহেব, আপনি পালিয়ে যাচ্ছেন না তো?"

আমি সিঙারার শেষ অংশটুকু গিলে বললাম, "পালিয়ে যাব কেন? আমার কাজ তো শেষ। চা খাচ্ছিলাম।"

উনি বইটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। "এটা আপনার জন্য। আমি অটোগ্রাফ দিয়েছি। যদিও আপনি প্রুফ দেখার সময় পুরোটা পড়েছেন, তবুও লেখকের নিজের হাতের একটা কপি আপনার কাছে থাকা উচিত।"

আমি বইটা নিলাম। প্রথম পাতায় খুব সুন্দর পেঁচানো অক্ষরে লেখা— ‘রাশেদ আহমেদকে, যিনি আমার কবিতার ভেতরের শূন্যতাটুকু এত সুন্দর করে ধরতে পেরেছেন। শুভকামনা— আনিকা নাওহার।’

আমি বললাম, "অনেক ধন্যবাদ। বইটা আমি সযত্নে রাখব।"

"আমি আসলে আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাইছিলাম," আনিকা একটু ইতস্তত করে বললেন।

"বলুন।"


"আমি আমার পরের বইয়ের কাজ শুরু করেছি। একটা উপন্যাস।"

"খুব ভালো কথা।"

"আমি চাই, আমার ওই উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিটাও আপনি এডিট করে দিন। মানে, প্রুফ দেখা আর ভাষাটা একটু ঠিকঠাক করে দেওয়া। আমি মতিন ভাইকে বলেছিলাম, কিন্তু উনি বললেন আপনি নাকি খুব ব্যস্ত থাকেন। তাই সরাসরি আপনাকে বলা।"

আমি একটু অবাক হলাম। আমার মতো একজন সাধারণ অনুবাদকের কাছে একজন লন্ডনপ্রবাসী সুন্দরী লেখিকা সরাসরি কাজ চাইছেন।


আমি বললাম, "ব্যস্ত থাকি ঠিকই, তবে সময় বের করা যাবে। আপনি পাণ্ডুলিপি পাঠালে আমি দেখে দেব।"

"দ্যাটস গ্রেট!" আনিকার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। "আমি কি আপনার ফোন নাম্বারটা পেতে পারি? মানে, আমি তো হোয়াটসঅ্যাপেই স্ক্রিপ্ট পাঠাব। আপনার সাথে যোগাযোগ রাখতে সুবিধা হবে।"

একজন অপরূপা নারী নিজে থেকে ফোন নাম্বার চাইছে, আর আমি ঢাকা শহরের একজন সামান্য ব্যাচেলর মানুষ হয়ে সেটা দেব না— এমন বোকা আমি নই।

আমি বললাম, "অবশ্যই।"

আমি আমার নাম্বারটা বললাম। আনিকা নিজের আইফোন বের করে নাম্বারটা সেভ করে নিলেন।

"আমি আপনাকে একটা মিসড কল দিয়ে রাখছি। আমার নাম্বারটা সেভ করে নিয়েন। আনিকা নামে।"

আমার পুরনো শাওমি ফোনটা বেজে উঠল। আমি স্ক্রিনে দেখলাম একটা আননোন নাম্বার।

"পেয়েছি," আমি বললাম।

"ওকে রাশেদ। আমি পাণ্ডুলিপি রেডি করে আপনাকে হোয়াটসঅ্যাপে নক করব। আর হ্যাঁ, আপনার আজকের স্পিচটা সত্যিই খুব দারুণ ছিল।"

আনিকা নাওহার আবার ভিড়ের ভেতর হারিয়ে গেলেন। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার হাতের তালুতে উনার দেওয়া বইটার স্পর্শ। বাতাসে তখনো উনার পারফিউমের হালকা সুবাস লেগে আছে। ৩৬-২৮-৩৬ এর এক অদ্ভুত রহস্যময়ী নারী, যিনি ইংল্যান্ডে আইটি ফার্ম চালান, আবার বাংলায় শূন্যতার কবিতা লেখেন।

আমি প্রকাশনীর অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এলাম। রাত আটটা বাজে। কাঁটাবনের রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের আলোয় সবকিছু একটু ঘোলাটে লাগছে।
আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। কল হিস্ট্রিতে গিয়ে সর্বশেষ নাম্বারটা সেভ করলাম। ‘Anika Nawhar’.

নামটা সেভ করার সময় আমার মনের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। আমার একঘেয়ে, রুটিনবাঁধা জীবনে, যেখানে কিম জং উনের মিসাইল, নিহাদের বাইকের ক্ষতিপূরণ আর মেসের বাথরুমের লাইন ছাড়া আর কিছু ছিল না— সেখানে হঠাৎ করে একটা খুব দামি পারফিউম মাখা, মেরুন শাড়ি পরা আভিজাত্য এসে উঁকি দিয়েছে।

আমি একটা সিগারেট ধরালাম। ধোঁয়া ছেড়ে আকাশের দিকে তাকালাম। ঢাকা শহরের আকাশে তারা দেখা যায় না। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, ধোঁয়ার আড়ালে কোথাও হয়তো দু-একটা তারা জ্বলজ্বল করছে।


 
মানুষ হিসেবে আমি অত্যন্ত বিরক্তিকর। কথাটা আমি কোনো বিনয় দেখানোর জন্য বলছি না। আমি আসলেই বিরক্তিকর একজন মানুষ। আমার জীবনে কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো গভীর ট্র্যাজেডি নেই, এমনকি উল্লেখ করার মতো কোনো রোমাঞ্চও নেই। একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট হিসেবে আমার জীবন নিয়ে যদি কোনো পরিচালক সিনেমা বানাতে চান, তবে সেই সিনেমার প্রথম দশ মিনিটেই দর্শকরা ঘুমিয়ে পড়বে এবং পরিচালককে টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য হলের বাইরে বিক্ষোভ হবে।

আমার প্রতিদিনের রুটিন একটা ফটোকপি মেশিনের মতো। সকালে উঠি, রহিমা খালার রান্না করা আগের রাতের বাসি তরকারি দিয়ে দুটা রুটি খাই, মিরপুর দশ নাম্বার থেকে কনুই চালিয়ে বিকল্প বাসে উঠি, কারওয়ান বাজারে অফিসে যাই, ল্যাপটপের সামনে বসে দুনিয়ার তাবৎ খবর বাংলায় অনুবাদ করি, তারপর আবার বাসের হাতল ধরে ঝুলে ঝুলে মেসে ফিরে আসি। এর মধ্যে কোনো থ্রিল নেই।

আমি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে বসে প্রতিদিন দেখি পৃথিবীতে কত কী ঘটে যাচ্ছে! ফ্রান্সে দাঙ্গা হচ্ছে, মেক্সিকোতে মাফিয়ারা পুলিশের সাথে গুলি বিনিময় করছে, জাপানে ভূমিকম্প হচ্ছে, আমেরিকায় কোনো এক সিরিয়াল কিলার ধরা পড়ছে। এই পুরো পৃথিবীটা একটা বিশাল অ্যাকশন মুভি। আর সেই মুভির এক কোণায়, মিরপুরের একটা স্যাঁতস্যাঁতে মেসের বাসিন্দা রাশেদ আহমেদ অত্যন্ত শান্তিতে তার একঘেয়ে, বিরক্তিকর জীবন পার করছে।

আমার এই একঘেয়ে জীবন নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। বরং আমি এটাই পছন্দ করি। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি একটা শামুকের মতো। নিজের খোলসের ভেতর গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকতেই আমার সবচেয়ে বেশি আরাম লাগে। খোলস থেকে মাথা বের করলেই বাইরের পৃথিবীর রোদে আমার চোখ ধাঁধিয়ে যায়।

ঢাকা শহরে আমার চেনাজানার পরিধি নেহাত ছোট না। সাংবাদিকতার সাথে (পড়ুন, অনুবাদের সাথে) যুক্ত থাকার কারণে, আর চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীতে যাতায়াতের সুবাদে আমার ফোনবুকে কয়েকশ মানুষের নাম্বার সেভ করা আছে। রাস্তাঘাটে বের হলে অনেকেই হাত তুলে বলে, ‘কী অবস্থা রাশেদ ভাই?’ আমিও দাঁত বের করে হাসি, বলি, ‘এই তো ভাই, চলছে। আপনার খবর কী?’

কিন্তু এই ‘চেনাজানা’ মানুষগুলোর মধ্যে আমার একজনও ‘বন্ধু’ নেই।

বন্ধু বলতে আমি সেই মানুষটাকে বুঝি, যাকে রাত তিনটার সময় ফোন করে বলা যায়, ‘দোস্ত, আমার খুব মন খারাপ, তুই আয়।’ আমার ফোনবুকে এমন কোনো নাম্বার নেই। আর সত্যি কথা বলতে কী, আমার কখনো কাউকে রাত তিনটায় ফোন করার প্রয়োজনও পড়ে না। আমার মন খারাপ হলে আমি কাউকে ডাকি না। আমি চুপচাপ বারান্দায় ইজি চেয়ারটায় বসে একটা সিগারেট ধরাই। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আকাশের দিকে তাকাই। ঢাকা শহরের আকাশে তারা দেখা যায় না, কিন্তু আমি মনে মনে কয়েকটা তারা বসিয়ে নিই। আমার কাছে নিজের সঙ্গটাই সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়।

মানুষের সঙ্গ আমার খুব একটা পছন্দ না। আমি গভীর সম্পর্ক ভয় পাই। গভীর সম্পর্ক মানেই হলো দায়িত্ব, প্রত্যাশা আর দিন শেষে একগাদা অভিমান। আমি হালকা কথাবার্তাতেই সবচেয়ে বেশি খুশি। ওই যে, রাস্তায় দেখা হলে ‘কেমন আছেন’, ‘দিনকাল কেমন যাচ্ছে’, ‘বাসায় সব ভালো তো’— এই ধরনের কথা। এই কথাগুলোর কোনো ওজন নেই। এগুলো বাতাসের মতো। বললাম, আর মিলিয়ে গেল। কেউ কারো কাছে কোনো জবাবদিহিতার মধ্যে থাকল না।

আজ অফিসে এসে ল্যাপটপ খুলেই আমি একটা অদ্ভুত খবর পেলাম। রয়টার্সের নিউজ। জাপানের টোকিও শহরে এক লোক নিজেকে ভাড়া দেয়। তার কাজ হলো, যাদের বন্ধু নেই বা যারা একা, তাদের সাথে সময় কাটানো। সে কোনো কথা বলে না, কোনো উপদেশ দেয় না। শুধু চুপচাপ পাশে বসে থাকে। ক্লায়েন্ট চাইলে সে তার সাথে কফি খায় বা পার্কে হাঁটে। এর বিনিময়ে সে প্রতি ঘণ্টায় দশ হাজার ইয়েন চার্জ করে।

খবরটা অনুবাদ করতে করতে আমার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। আমি মনে মনে ভাবলাম, লোকটার পেশাটা তো দারুণ! আমার চরিত্রের সাথে একদম মানিয়ে যায়। আমিও তো চুপচাপ থাকতে পছন্দ করি। টোকিওতে থাকলে হয়তো আমিও ভালো একটা ব্যবসা করতে পারতাম।

আমার পাশের ডেস্কে মামুন বসে আছে। সেও একটা নিউজ নিয়ে খুব গম্ভীর।

আমি বললাম, "মামুন, কী নিউজ করছ?"

মামুন চোখ না তুলেই বলল, "ভাই, ফ্লোরিডায় এক লোক তার পোষা কুমিরের সাথে বিয়ে করেছে। কুমিরের নাম ডেইজি। লোকটা কুমিরটাকে ওয়েডিং গাউন পরিয়ে চার্চে নিয়ে গেছে।"

"খুবই ভালো খবর। তা তুমি কি অনুবাদ করছ?"

মামুন গর্বের সাথে বলল, "আমি হেডলাইন দিয়েছি— 'ফ্লোরিডায় কুমিরের গলায় বরমাল্য, ভালোবাসার জয়'।"

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "মামুন, কুমিরের গলায় বরমাল্য দিলে কুমির যদি বরের মাথা কামড়ে ধরে, তখন ভালোবাসার জয়টা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তুমি হেডলাইন দাও— 'পোষা কুমিরকে বিয়ে এক ব্যক্তির'।"

মামুন একটু হতাশ হলো। "ভাই, আপনার নিউজে কোনো ইমোশন নাই। আপনি একদম শুকনা মানুষ। সব কিছুতেই আপনি এত ফ্যাক্ট খোঁজেন কেন?"

মামুনের কথা খুব একটা ভুল না। আমি আসলেই শুকনা মানুষ। আমার ভেতরে ইমোশনের পরিমাণ খুবই কম।


আমাদের অফিসে বেশ কয়েকজন নারী, তরুণী এবং মেয়ে কলিগ আছেন। একটা পত্রিকা অফিসে সব ধরনের মানুষই থাকে। এন্টারটেইনমেন্ট ডেস্কে আছে নিতি। মেয়েটা সারাদিন বলিউড আর হলিউডের গসিপ নিয়ে পড়ে থাকে। তার ঠোঁটে সবসময় কড়া লাল লিপস্টিক থাকে আর চোখে থাকে রাজ্যের কৌতূহল। সে মাঝে মাঝে আমার ডেস্কে এসে দাঁড়ায়।

"রাশেদ ভাই, আপনার কাছে কি টাইপ-সি চার্জার হবে?" নিতি চুইংগাম চিবাতে চিবাতে জিজ্ঞেস করে।

আমি ড্রয়ার থেকে চার্জারটা বের করে দিই।

"থ্যাংক ইউ ভাই! জানেন, আজকে দীপিকা পাড়ুকোনের একটা ইন্টারভিউ পড়লাম। মেয়েটা যা না স্মার্ট! আপনার দীপিকাকে কেমন লাগে?"

আমি খুব নিরাসক্ত গলায় বলি, "ভালো।"

"শুধু ভালো? আরে, শি ইজ আ গডেস! আপনি এমন কেন ভাই? কোনো কিছু নিয়েই আপনার কোনো এক্সাইটমেন্ট নাই।"

নিতি চার্জার নিয়ে চলে যায়। আমি আবার আমার কাজে মন দিই।

ন্যাশনাল ডেস্কে আছেন ফারহানা আপা। উনার বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক আগে। উনার দুনিয়া উনার স্বামীকে ঘিরে। উনি মাঝে মাঝে টিফিন বক্সে করে বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসেন। খাওয়ার সময় আমাকে ডাকেন।

"রাশেদ, এদিকে আসো। আজ তোমার ভাইয়ার পছন্দের খমাংসের ভুনা এনেছি। খেয়ে দেখো তো কেমন হয়েছে।"

আমি এক টুকরো মাংস মুখে দিয়ে বলি, "খুব ভালো হয়েছে আপা।"

"তোমার ভাইয়া তো এক বসায় চার পিস মাংস খেয়ে ফেলে। সে আবার একটু ঝাল বেশি পছন্দ করে।"


আমি মাথা নাড়ি। ফারহানা আপার স্বামীর ঝাল খাওয়ার ক্ষমতা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, কিন্তু আমি সেটা প্রকাশ করি না। আমি হালকা হাসিমুখে উনার কথা শুনি।

এই যে নিতি বা ফারহানা আপা— এদের সবার সাথেই আমার সম্পর্ক এই পর্যন্তই। অফিসে দেখা হলে হাসি বিনিময় করা, কেউ কিছু খেতে দিলে খাওয়া, আর ফেসবুকের কল্যাণে কারো জন্মদিন হলে টাইমলাইনে গিয়ে একটা দায়সারা ‘হ্যাপি বার্থডে! মেনি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্য ডে’ লিখে দেওয়া। এর জবাবে তারা আমাকে লেখে, ‘থ্যাংক ইউ রাশেদ ভাই’। ব্যস, সম্পর্ক শেষ। পরের বছর জন্মদিনের আগ পর্যন্ত এই সম্পর্কের আর কোনো অগ্রগতি হয় না।

আমার জীবন এভাবেই খুব মসৃণভাবে, কোনো ঢেউ ছাড়া গড়িয়ে যাচ্ছে।কিন্তু সম্প্রতি এই মসৃণ জীবনে একটা ছোটখাটো ঢেউ তোলার চেষ্টা করছেন আমার মা। মা ইদানীং ফোনে কথা বলার সময় কথায় কথায় বিয়ের প্রসঙ্গ টানছেন। সরাসরি কিছু বলেন না, আকার-ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করেন।

আজ দুপুরে খাওয়ার পর পরই মায়ের ফোন। আমি তখন অফিসের লাউঞ্জে বসে চা খাচ্ছিলাম।

"হ্যালো মা, বলো।"

"রাশেদ, খেয়েছিস?" মায়ের গলার স্বর খুব নরম। এই নরম স্বরের মানেই হলো সামনে কোনো কঠিন কথা আসছে।

"হ্যাঁ মা, এইমাত্র খেলাম। তুমি খেয়েছ?"

"আমি আর কী খাব! বয়স হচ্ছে, শরীরে নানান রোগবালাই বাসা বাঁধছে। আজ সকালে তোর ছোট ফুপুর সাথে কথা হলো।"

"ফুপুর কী অবস্থা?"

"ফুপুর অবস্থা তো ভালো। ফুপাতো ভাই সুমনের তো ছেলে হলো কালকে। ফুটফুটে একটা বাচ্চা। সুমন তো তোর চেয়ে দুই বছরের ছোট। সে এখন সন্তানের বাবা হয়ে গেল।"


আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলাম। "খুব ভালো খবর। সুমনকে আমার হয়ে কংগ্র্যাচুলেট করো। আমি পরে ওকে ফোন দিয়ে দেব।"

মা এবার মোক্ষম চালটা চাললেন। "সুমনের ছেলে হয়েছে, আর তুই এখনো মিরপুরের মেসে পড়ে আছিস। তোর তো এখন বয়স কম হলো না। উনত্রিশ পার হয়ে যাচ্ছে। আর কতদিন এভাবে একা একা থাকবি? এবার তো একটা সংসার করা দরকার।"

আমি শান্ত গলায় বললাম, "মা, সংসার করার জন্য যে যোগ্যতা লাগে, সেটা আমার এখনো হয়নি।"

মা রেগে গেলেন। "কীসের যোগ্যতা? তোর কি হাত-পা নেই? তুই কি চাকরি করিস না? মাসে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা বেতন পাস। ঢাকা শহরে একটা স্বামী-স্ত্রী চলার জন্য এই টাকা যথেষ্ট।"

"মা, সংসারের যোগ্যতা মানে শুধু টাকা না। সংসারের যোগ্যতা হলো ম্যাচুরিটি। মানসিক পরিপক্বতা। আমার মনে হয় না আমার সেই ম্যাচুরিটি এখনো এসেছে।"

"এসব তুই বইয়ের ভাষায় কথা বলছিস। বিয়ে করলে সব ম্যাচুরিটি এমনিতেই চলে আসবে। মানুষ কি শিখে তারপর বিয়ে করে? বিয়ে করার পর শেখে।"

"মা, এটা তো কোনো ড্রাইভিং কলেজ না যে রাস্তায় গাড়ি নামিয়ে তারপর ধাক্কা খেতে খেতে চালানো শিখব। এটা আরেকজন মানুষের জীবনের ব্যাপার। আপাতত আমি এসব নিয়ে ভাবছি না।"

মা একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "তুই বুঝবি না। আমরা মরে গেলে যখন দুনিয়ায় তোর আপন বলতে কেউ থাকবে না, তখন বুঝবি একা থাকার কী কষ্ট।"

মায়েরা এই একটা জায়গায় এসে খুব সুন্দর ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করতে পারেন। আমি আর কথা বাড়ালাম না। মাকে শান্ত করে ফোনটা কেটে দিলাম।
ফোন কেটে আমি লাউঞ্জের কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরের কারওয়ান বাজারের ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
[+] 5 users Like Orbachin's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস? - by Orbachin - 12-06-2026, 01:36 PM



Users browsing this thread: 2 Guest(s)